স্বপ্নময় চক্রবর্তীর ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাসের সঙ্গে ‘নগরকীর্তন’ ছবির চমকপ্রদ মিল!

‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাসটা ধারাবাহিক হিসেবে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর ‘রোববার’ ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল ২০১২-১৩ সাল নাগাদ। এরপর প্রায় ৬০০ পাতার সুবৃহৎ বই হয়ে ওটা ছেপে বের হয় ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে।

যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা তো জানেনই। যাঁরা পড়েন নি, তাঁদের জানিয়ে রাখি, স্বপ্নময় চক্রবর্তীর এই উপন্যাসের উপজীব্য মূলত LGBT মানুষেরা। LGBT মানে হল লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল আর ট্রান্সজেন্ডার – এই প্রবণতার লোকজন। বই সম্পর্কে বইয়ের ব্লার্বে লেখা রয়েছে এই কথাগুলো, ‘সমাজের শরীর ও শরীরের সমাজতত্ত্ব নিয়ে এক দুঃসাহসিক উপন্যাস এই হলদে গোলাপ। …কাহিনি বয়নে মানুষের লিঙ্গ পরিচয়ের সমস্যা তুলে আনতে গিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমে (লেখক) খুঁড়েছেন ইতিহাস, নৃ-বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, শারীর বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, জিনেটিক্‌স্‌, মিথ-পুরাণ…।’

পাঠক হিসেবে এই উপন্যাস পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, যৌনতার দিক থেকে সমাজে যে মানুষগুলোর মার্জিনালাইজ্‌ড দশা, খুব মরমী কলমে তাঁদের কথা শোনানো হয়েছে যেন। আর জোরাল একটা আলো ফেলে স্পষ্ট করে দেওয়া আছে তাঁদের রহস্য-ঘেরা জীবনচর্যাটুকু।

২০১৮ সাল। উপন্যাসটা বই হিসেবে ছাপা হওয়ারও প্রায় বছর তিনেক পর কৌশিক গাঙ্গুলী শুট করলেন তাঁর ‘নগরকীর্তন’ ছবি। ছবির ইংরেজি নাম ‘দ্য ইউনাক অ্যান্ড দ্য ফ্লুট প্লেয়ার’। এক হিজড়ে এবং এক বংশী বাদকের প্রেমের গল্প এটা।

মুশকিল হচ্ছে, ‘নগরকীর্তন’ দেখতে গিয়ে আমার খালি মনে হচ্ছিল ছবির হিজড়ে মানুষটি যেন সোজাসুজি উঠে এসেছেন স্বপ্নময়ের উপন্যাসের থেকে। এবং শুধু এই একটা মানুষই নন। ছবির আরও বেশ কিছু অংশের সঙ্গে উপন্যাসের চমকপ্রদ মিল!

তবে এত মিল থাকলেও ছবির কোথাও এই উপন্যাসের কাছে ঋণস্বীকারের কোন চিহ্ন চোখে পড়ে নি আমার। ছবির শুরুতে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে একটা অ্যাকনলেজমেন্টের কার্ড দ্যাখান হয়েছে ঠিকই। সেখানে একটা প্লেটে প্রায় খান তিরিশেক নাম। সেই লিস্ট পুরো পড়ার আগেই স্ক্রিন থেকে সেটা হাওয়া। ঋণস্বীকারের বারোয়ারি এই কার্ডের মধ্যে স্বপ্নময়ের নাম কোথাও ছিল কিনা, জানি না সেটা আমি। কিন্তু আলাদা করে তাঁর কিংবা তাঁর বইয়ের উল্লেখ নেই কোন!

এই ছবির সঙ্গে কোথায় কোথায় ওই উপন্যাসের মিল পেয়েছি, এবার সেগুলো এক-এক করে লিখি।

ছবির প্রধান দুই চরিত্রের একজন হলেন পুঁটি (অভিনয়ে ঋদ্ধি সেন)। আর অন্যজন হলেন তাঁর প্রেমিক মধু (ঋত্বিক চক্রবর্তী)। এখন এই পুঁটি হলেন একজন রূপান্তরকামী তরুণ। জন্মেছেন পুরুষ শরীর নিয়ে, কিন্তু মনে মনে তিনি মেয়ে। পুঁটির আসল নাম কী? ছবির সংলাপ থেকে জানতে পারছি, সেটা হল ‘পরিমল’, আর সংক্ষেপে ওঁকে ‘পরি’ বলে ডাকা হত।

বুঝুন কাণ্ড! ‘হলদে গোলাপ’ পড়লে আপনি জানতে পারবেন, সে বইয়েরও অন্যতম প্রধান চরিত্র হল ‘পরিমল’ নামে এক রূপান্তরকামী তরুণ! আর সেখানেও তাঁর ডাকনাম হল, ‘পরি’! পরিমল ওরফে পরি সেখানেও শরীরে পুরুষ, আর মনে মনে পুরো মেয়ে!

সিনেমায় আপনি দেখতে পাবেন কম বয়সে এই পরির প্রেম হয়ে যায় তাঁরই পাড়ার টিচার দাদা ‘সুভাষদা’র (ইন্দ্রাশিস রায়) সঙ্গে। কিন্তু পরি আঁচ করতে পারেন নি যে, তাঁর এই পাড়াতুতো দাদাটি তাঁর মত নিছক হোমোসেক্সুয়াল নন, বরং বাইসেক্সুয়াল মানুষ। অর্থাৎ পুরুষ ও নারী, উভয় শরীর থেকেই তিনি যৌনতৃপ্তি নেন। পরিভাষায় যাঁদের ‘ডাবলডেকার’ বলে। একটা সময় পরিকে ঠকিয়ে এই সুভাষদা বিয়ে করে বসেন পরিরই নিজের দিদিকে!

কাট টু এবার ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাসে আসুন। সেখানকার পরির জীবনেও হুবহু প্রায় এই স্টোরিটাই আছে! অল্পবয়স থেকেই পরির সঙ্গে প্রেম হয়ে যায় ওর প্রাইভেট টিউটর অরূপদার। ক্রমে দু’জনের লুকিয়ে লুকিয়ে যৌনলীলা শুরু। এরপর বিশেষ একটা ঘটনা থেকে হঠাৎ পরি বুঝতে পারে, অরূপ ঠকিয়ে যাচ্ছে তাকে। পরির শরীর ভোগ করার পাশাপাশি তৃষ্ণা নামে একটি মেয়ের সঙ্গেও সেক্স রিলেশন চালিয়ে যাচ্ছে অরূপ। এবং শুধু ওই একটা মেয়েই নয়, এছাড়া ওর আরও বেশ কয়েকটা বয়ফ্রেন্ডও আছে!

শক্‌ড হয়ে যায় উপন্যাসের ‘পরি’। ঠিক যেরকম শক্‌ড হতে দেখেছেন সিনেমার ‘পরি’কেও!

উপন্যাসে দেখতে পাবেন, অরূপদার কাছে ঘা খেয়ে রিলেশন ভেঙে যাওয়ার পর পরির রিলেশন শুরু হচ্ছে কবি চয়ন মল্লিকের সঙ্গে। আর সিনেমায় এটা দ্যাখান হল যে, সুভাষদার কাছে ঘা খাওয়ার পর পরি ওরফে পুঁটি গিয়ে জোটে বাঁশিওয়ালা মধুর কাছে।

দুই জায়গার দুই পরিকে এবার প্রায় একরকমেরই মনে হচ্ছে কিনা, বলুন?

সিনেমায় আপনি দেখতে পাবেন রিয়্যাল লাইফ থেকে এসে ছবির ন্যারেটিভে ঢুকে পড়ছেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত মানুষ। জানেন নিশ্চয় যে, মানবী আগে ছিলেন পুরুষ, তখন নাম ছিল সোমনাথ। SRS বা ‘সেক্স রিঅ্যাসাইমেন্ট সার্জারি’ করে এখন তিনি নারী এবং কৃষ্ণনগর উইমেনস কলেজের অধ্যক্ষ। টিভিতে তাঁর ইন্টারভিউ দেখে ইন্সপায়ার্ড হয়ে পুঁটিকে সঙ্গে নিয়ে কৃষ্ণনগরে তাঁর কলেজে পৌঁছে গেলেন এই সিনেমার মধু। এরপর কলেজে তাঁর রুমে বসে লিঙ্গ পালটে ফ্যালার জন্য কী সার্জারি করতে হবে, সেই বিষয়ে মানবীদির থেকে গাইডেন্স চাওয়া হয়।

এখন কাণ্ড দেখুন, হুবহু এই ঘটনাটা একটু অন্যভাবে ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাসেও আছে! সেখানেও ম্যারেটিভে মাঝে মাঝেই এন্ট্রি নিচ্ছেন মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় এসে। খবরের কাগজে তাঁর ইন্টারভিউ পড়ে পরামর্শ চাওয়ার জন্য তাঁকে সরাসরি ফোন করে বসছে পরি। আর সিনেমায় আপনি যেটা দেখেছেন, সেখানেও ঠিক সেই ব্যাপারটাই ঘটে, অর্থাৎ সেক্স চেঞ্জ করার ব্যাপারে মানবীদির পরামর্শ চায় সে!

সিনেমায় এই অংশটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, শুধু সিকোয়েন্স নয়, সংলাপও যেন ওই বইয়ের থেকেই নেওয়া। সেখানেও পরির অপারেশন করার ইচ্ছে হয়েছে শুনে মানবী প্রথম জানতে চান, ‘প্রথমে একতলাটা করবি, নাকি দোতলা?’ (পৃষ্ঠা ৫১৮)। আর সিনেমায় এটা দেখতে পাবেন যে, এই সিকোয়েন্সে পরি আর মধুর কাছে মানবী জানতে চাইছেন, ‘ফুল বডি অপারেশন না হাফ বডি অপারেশন, বলুন? ওপরেরটা না নিচেরটা?’

অবশ্য উপন্যাসের পরি আর সিনেমার পরি পুরোপরি একরকমের নয়। উপন্যাসের পরি সত্যি সত্যি এগিয়ে যায় সেক্স চেঞ্জ অপারেশনের দিকে। তার বুকে সিলিকন জেল ইমপ্ল্যান্ট করা হয়। সিনেমার পরি কিন্তু ওই দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না কোন।

মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল, সিনেমার পরি ওরফে পুঁটির মধ্যে উপন্যাসের দুটো ক্যারেকটারকে একসঙ্গে মেশান রয়েছে যেন। একটা পরি নিজে, আরেকটা হল দুলাল বা দুলালী। উপন্যাসে দুলালও ছিল মেয়ে-হতে-চাওয়া ছেলে। এমনিতে তো একটা মেয়েকে বিয়েও করেছিল, এমনকি বাচ্চাও হয় ওর। কিন্তু জীবনের নানাবিধ চাপ নিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত গিয়ে জুটেছিল হিজড়েদের দলে। যে দুলালের পেশা ছিল সাইকেলে চড়ে টিপ, ফিতে, বুক-বাঁধা বিক্রি করে বেড়ান, সেই দুলালেরই পেশা এরপর হয়ে দাঁড়াল হিজড়েবৃত্তি করা। তবে সেই জীবনও সহ্য হল না ওর, শেষ পর্যন্ত মুক্তি পেতে সুইসাইড করে বসেছিল সে।

এবার সিনেমা থেকে পরি কিংবা পুঁটিকে নিয়ে পরখ যদি করেন তো দেখতে পাবেন এর মধ্যেও বেশ খানিকটা দুলাল রয়েছে যেন! এরও সাধারণ ঘরে জন্ম, বাবা করতেন ঘড়ি সারাই করার কাজ। এরপর হঠাৎ সবকিছু ছেড়ে এও কেন হিজড়েদের দলে গিয়ে জয়েন করল, সিনেমায় তার স্পষ্ট কোন কারণ নেই কিছু। ধরে নিন সেটা সেই প্রেমে দাগা খেয়ে গিয়েই হল! আর এই মানুষেরও শেষ পরিণতি দুলালেরই মতো হল কিনা, সেটা লিখে দিয়ে ছবির ক্লাইম্যাক্স ফাঁস করতে চাই না আমি। সিনেমা হল-এ পৌঁছে গিয়ে আপনি সেটা নিজে দেখে নিন প্লিজ।

তবে একটা কথা ঠিকই, ছবির সঙ্গে উপন্যাসের খুব বড় একটা ফারাকও রয়েছে কিন্তু। হিজড়ে জীবন যাপন করা যে শারীরিকভাবে কী ভয়ানক আর নির্মম হতে পারে, গ্রাফিক ডিটেলে সেই বিবরণ উপন্যাসে আছে। এর পাশে কৌশিকের এই সিনেমা যেন নিছক এক ভালবাসার স্টোরি।

ইন ফ্যাক্ট যখন বাসে করে নিজেদের চেনা শহর থেকে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে মধু এবং পুঁটি, তখন আমার মনে হচ্ছে এটা আদৌ কোন মার্জিনাল ভালবাসার স্টোরি নাকি সেই ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ (২০০৮) থেকে কপি করা কোন সিন। সেখানেও তো এইভাবেই বাসে করে সবার চোখ এড়িয়ে পালিয়ে গেছিল ছবির প্রায় কিশোর বয়সী প্রেমিক প্রেমিকা দুজন?

চারটে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে বলে ‘নগরকীর্তন’ নিয়ে সবাই ফাটিয়ে হৈ-হৈ করছে এখন ঠিকই। এটাও সত্যি যে কিশোর হিজড়ের ভূমিকায় ঋদ্ধি সেন অভিনয় করেছেন অবিশ্বাস্য ভাল। আর ঋত্বিককে নিয়ে এক্সট্রা কী আর বলব বলুন? অভিনয় তো করেন না উনি, রেলা নিয়ে জাস্ট বিহেভ করে যান, এখানেও এক্কেবারে সেই কেতাতেই আছেন।

কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়, অভিনয় যতই ভাল হোক না কেন, জায়গায় জায়গায় নড়বড় করছে স্ক্রিপ্ট! আর সেটা ঢাকা দেওয়ার জন্যেই অনর্থক জটিল করে সাজানো হয়েছে স্টোরি। দুটো আলাদা টাইমলাইনকে পাশাপাশি রেখে যে ভাবে ইন্টারকাট করে করে জটিল ভাবে গল্প বলা হয়, ভেবে দেখুন আসলে কিন্তু তার তেমন দরকার ছিল না!

এবার লজিকের গোলমাল নিয়ে বলি? আগেই তো এটা লিখেছি যে, সাধারণ ঘরের মানুষ পুঁটি কী কারণে হিজড়ে হয়ে গেলেন, ছবিতে সেই কারণটাই নেই! বাড়িতে মা রয়েছেন, বাবা রয়েছেন, স্কুল রয়েছে, প্রাইজ রয়েছে। সবকিছু ছেড়ে শুধু লাভ লাইফে দাগা খেয়ে কেউ হিজড়ে গ্রুপে যায়?

আর ছবিতে দ্যাখান হিজড়ে জীবনও তো কার্যত যেন পেলব ভালবাসা দিয়ে মোড়া! সেখানে একটু নাচ-গান হয়, আর তার পাশাপাশি ট্র্যাফিক-সিগন্যালে থমকে যাওয়া গাড়ির থেকে পয়সা তোলা চলে। এই জীবনের রক্ত-মাংস-ক্লেদ-ঘামগুলো গেলটা কোথায়, সাহেব?

হাতুড়ে ডাক্তার ডেকে এনে কী ভাবে পুরুষাঙ্গ কেটে বাদ দেওয়া হয় এঁদের, নারকীয় সেই ব্যাপার-স্যাপার এ ছবিতে কণামাত্র নেই! লিঙ্গচ্ছেদ হওয়ার পরে সাতটা সাতরকম সাইজের কাঠের লিঙ্গ নিজের পায়ুপথে প্রবেশ করিয়ে পায়ুপথকে কাজের জন্য ‘ঠিকঠাক’ করে তুলতে হয়। এগুলোর সাইজ দু’ইঞ্চি থেকে শুরু করে সাড়ে সাত ইঞ্চি পর্যন্ত হয়। এই পুরো সময় জুড়ে যে যন্ত্রণা আর চিৎকারগুলো হয়, সেটা চাপা দেওয়ার জন্য ঢোল সহযোগে গান ধরে হিজড়েরা। এসব পুরো ডিটেল জানতে হলে উপন্যাসের ৩৫৮ বা ৩৭২ পাতা খুলুন। এবার পাশাপাশি কৌশিকের ছবিটা দেখুন শুধু। মনে হবে, আরে এ কী দেখছি, এমন কোন ঘটনা এখানে দূরে থাকুক, কারুর সংলাপে তো কোথাও এই জাতীয় কোন কিছুর লেশমাত্র নেই!

হিজড়েরা তো মনে হয় রূপকথার দুনিয়ায় আছে যেন!

এবং বইয়ে খুব গুরুতর একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন স্বপ্নময়, যার কোন উত্তর এই ছবিতেও খুঁজে পাবেন না আপনি। ‘পায়ুমেহনেই যদি তোমাদের যৌনতা মেটে, তবে কেন মাংস কুঁদে-কেটে যোনি নির্মাণ?’ (পৃষ্ঠা ৫৭৭)। সত্যি না, বলুন? রূপান্তরকামী পুঁটি তো মধুদার থেকে শরীরের সুখ ভালভাবেই নেয়! তবু কেন অপারেশন করে সে যোনি বানাতে চায়? এ প্রশ্ন তাকে কেউ করে না, মানবীদিও নয়।  

আরও কোথায় গোলমাল লাগছিল ছবিতে, শুনুন। ছবিতে পুঁটি যে পরচুলাটা পরে থাকে, সেটা নেহাতই সস্তা দরের চুল। অল্প একটু নজর করলেই বোঝা যাচ্ছিল নকল চুল বলে। অথচ সিনেমায় দ্যাখান হচ্ছে মধু’র বৌদি (অভিনয়ে বিদীপ্তা চক্রবর্তী) পুঁটির সঙ্গে নির্জন ঘরে গল্প করতে করতেও আদৌ টের পাচ্ছেন না যে ওটা নকল চুল বলে! উলটে চুলের প্রশংসা করতে থাকেন প্লাস এটাও জানতে চান পুঁটি সপ্তাহে কতবার শ্যাম্পু দ্যায় চুলে!

আর একটা কথা বলুন আমায় কৌশিক। শুধু নকল চুল খুলে যাওয়ার ঘটনা থেকেই কী করে সবাই বুঝতে পারল যে পুঁটি আসলে মেয়ে নয়, ছেলে! আমার তো ছোট চুলের পুঁটিকেও পুরো মেয়ের মতই লাগছিল! আরে বাবা, ছোট চুলের মেয়েরাও তো জাস্ট সাজার জন্যে লম্বা কোন পরচুলা পরে থাকে! সেই পরচুলা যদি কোন কারণে খুলেই পড়ে, তাহলে সবাই বড়জোর অবাক হয়ে ভাবতে পারে যে, ওমা মেয়েটার চুল এত ছোট ছোট বুঝি! কিন্তু সেটা না ভেবে সবাই মিলে মেয়েটাকে ছেলে বলে কেউ ভেবে বসবে কেন?

ছবিতে দ্যাখান হয়েছে কলকাতায় ‘চাইনিজ ওয়াল’ নামে একটা রেস্তোরাঁয় খাবার ডেলিভারি বয়ের কাজ করে মধু। এবং খাবার ডেলিভারি করতে যায় সাইকেল চালাতে চালাতে! আচ্ছা দাদা, এখন কি কেউ সাইকেলে চেপে ফুড ডেলিভারি করে? তার ওপর কাণ্ড দেখুন আরও। গুগল করুন, দেখতে পাবেন ‘চাইনিজ ওয়াল’ নামে এই দোকান হল উত্তর কলকাতার ফড়িয়াপুকুরে। কৌশিক দ্যাখাচ্ছেন, সেখান থেকে সাইকেলে চেপে দক্ষিণ কলকাতার হাজরা লেনে খাবার দিচ্ছে মধু! বাড়াবাড়ির কি সীমা নেই কোন, স্যর?

আর এ ছবিতে এতবার করে এই খাবার দোকানটা দ্যাখান হয়, সংলাপে তার নাম শোনান হয়, যে একটা সময় তো খুব ইচ্ছে হচ্ছিল এটা জানার যে কী কী শর্তে এমন একটা ছবির মধ্যে এরকমের বিজ্ঞাপনী ইন্টিগ্রেশন হল!

এবং ডেলিভারি বয়ের কাজ ছেড়ে পুঁটিকে সঙ্গে নিয়ে যখন কৃষ্ণনগর কেটে পড়ল মধু, খেয়াল করে দেখুন, তারপর থেকে তার কাছে একবারও কোন ফোন এল না খাবার দোকান থেকে। নিজের কাজ থেকে লম্বা ছুটি নিয়ে গিয়েছিল বুঝি?

ছবির শেষদৃশ্যে এরকম একটা হিন্ট রয়েছে যে, সমকামী একজন মানুষ শোকের চোটে হিজড়ে হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা চমক হিসেবে দিব্যি লাগছে ঠিকই। কিন্তু বাস্তবে কি সত্যি এমন হয়? রূপান্তরকামী মানুষ নানা কারণে হিজড়ে হয়ে থাকেন। কিন্তু সাধারণ সমকামীরা যত শোকই পান না কেন, হিজড়ে পেশায় যোগ দিয়ে দ্যান কি?

‘নগরকীর্তন’ দেখে মুগ্ধ হয়ে ভেসে যাওয়ার একটা ট্রেন্ড চলছে এখন। হাউসফুল হল-এ সিনেমা দেখতে গিয়ে শুনতে পাচ্ছি পেছনের সিট থেকে আওয়াজ আসছে, ‘কী জিনিস বানিয়ে দিল দেখুন। সিওর এবার অস্কার এসে যাবে’!

এই আবেগে সামিল হওয়ার ইচ্ছে নেই কোন। ছবিটা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে, আমি বলব, মোটের ওপর ভাল। তবে আহামরি কিছু নয়। আরও যত্ন, নিষ্ঠা, রিসার্চ থাকলে হয়তো আরও ভাল ছবি হতো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here