কলকাতা পুরসভায় এসেই শহরবাসীকে আবর্জনার দুর্গন্ধ থেকে রেহাই দিয়েছিলেন নেতাজি

675

সে অনেক কাল আগের কথা । ব্রিটিশরা তখন জাঁকিয়ে বসেছে শহর কলকাতায় । লটারির টাকায় বাড়ি উঠেছে-বাজার হয়েছে, পথ পরিণত হয়েছে রাজপথে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, নগর কলকাতা ভোল বদলে হয়েছে মহানগর । মানে, জীবিকার টানে তখন কলকাতায় বেড়েছে লাখ লাখ মানুষের আনাগোনা । আর মহানগরে যদি সাধারণ মানুষের আনাগোনা বাড়ে, তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়ে নাগরিক পরিষেবার বিষয়টি । নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যে নজর দেওয়ার জন্যই ব্রিটিশরা কলকাতা পুরসভা তৈরি করে ।

সেই পুরসভাতেই নেতাজির পা ১৯২৪ সালে । বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট ১৯২৩ অনুযায়ী চিত্তরঞ্জন দাশ কলকাতা পুরসভার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন । সেবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র। মেয়রের আহ্বানে তিনি হন পুরসভার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। বেতন নেহাতই কম নয়। মাসিক ৩ হাজার টাকা। কিন্তু নেতাজি এত মাইনে নিতে রাজি ছিলেন না। তিনি নিজেই নিজের মাইনে কমিয়ে করে দেন দেড় হাজার। আসলে ‘শিষ্য’ নেতাজি এবং ‘গুরু’ দেশবন্ধু দুজনেই চেয়েছিলেন ব্রিটিশ কলকাতার বাসিন্দাদের এক নয়া পুর পরিষেবার আওতায় আনতে ।

আর এই পুরসভার লাল ভবনের মধ্য থেকেই প্রশাসন পরিচালনায় ভারতীয়দের দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে যেতে চেয়েছিলেন গুরু-শিষ্য দুজনেই । উন্নত মানের পুর পরিষেবা দিতে গেলে যে খোলনলচেটা বদলে ফেলতে হবে তা বুঝতে পেরেছিলেন নেতাজি । কিন্তু কী করবেন ? আর কী না করবেন ? এই দুই
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু অতীত কলকাতায় ফেরা যাক—১৮৫০-এর অনেক আগে থেকেই কলকাতা বেশ ঘন। অনেক মানুষের বাস। ফলে জঞ্জাল বা আবর্জনাও বাড়বে, এ তো খুব স্বাভাবিকই। ব্রিটিশরা অবশ্য সব সময় শহরটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে চেয়েছিলেন। শহরের আবর্জনা পরিষ্কারের জন্য
একাধিক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন । যেমন, দিনে দু’বার রাস্তায় পড়ত ঝাঁট। কোথাও কোথাও জল দিয়ে রাস্তা ধোয়া হতো। ঘোড়ায় টানা টেমপো দিয়ে জঞ্জাল উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলা হত নির্দিষ্ট জায়গায়। এমনকি মানুষ যাতে যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ না করে, সে জন্য মোড়ে মোড়ে ছিল শৌচাগার। আর ছিল জঞ্জাল ফেলার ট্রেন।

হ্যাঁ, জঞ্জাল ফেলার ট্রেন। ট্রেন শহর কলকাতার নোংরা-আবর্জনা নিয়ে হেলতে দুলতে চলে যেত একেবারে ধাপার মাঠে। ডঃ অতুল সুর সে ট্রেনের একটা বিবরণ দিয়েছেন—‘এই রেলপথটা তৈরি করা হয়েছিল ১৮৬৮-৬৯ খ্রিস্টাব্দে।…এটা বাগবাজারের অন্নপূর্ণা ঘাটের সামনে থেকে শুরু করে সমস্ত বাগবাজার স্ট্রিটের উত্তরাংশ দিয়ে কর্নওয়ালিশ ( এখন বিধান সরণি ) স্ট্রিটে এসে সারকুলার রোড ধরে ধাপা পর্যন্ত চলে গিয়েছিল । আগে সারকুলার রোড ও উল্টোডাঙা মোড়ের কাছে যে প্ল্যাটফর্মের কথা বলেছি, রেলগাড়িটা ওই প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁষে যেত । প্ল্যাটফর্মের উপর থেকে সমস্ত আবর্জনা রেলগাড়িতে ভর্তি করে দেওয়া হত । অনুরূপ প্ল্যাটফর্ম ছিল রাজাবাজারের কাছে। সেখানেও আবর্জনা ওই রেলের মালগাড়িতে ভর্তি করা হত । এরকমভাবে আবর্জনা নিতে নিতে রেলগাড়িটা ধাপা পর্যন্ত গিয়ে খালাস হত ।’

আরও একটি মজার তথ্য । এই রেলগাড়িতে যেমন জঞ্জাল তোলা হতো প্ল্যাটফর্ম থেকে, তেমনই আবার রেলগাড়িতে ঢুকে যেত ঘোড়ায় টানা আবর্জনার গাড়ি । সে সম্পর্কে একটা বিবরণ দিয়েছেন ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর—‘রেলগাড়ী বোঝাই করিবার জন্য রেললাইনের পাশে একটানা সুদীর্ঘ খিলানের গাঁথুনি করা হইয়াছে । তাহার উপর দিয়ে গরুর গাড়ী তো আর আজকাল যায়ই না, ঘোড়াগাড়ীকেও লইয়া গিয়া সেই গাড়ীর লেজটা একেবারে রেলগাড়ীর ভিতরে নামাইয়া দেওয়া হয়…’

কিন্তু পথ পরিষ্কার করতে গিয়ে পথের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হয়ে গিয়েছিল । মানুষজনের নাভিঃশ্বাস ওঠার জোগার । সে সম্পর্কেও বিবরণ পাওয়া যায়—‘রেলগাড়ী পূর্ণ করিবার সময় কাক-চিলের কি উপদ্রব, আর কি দুর্গন্ধ ! ঐ রাস্তার পশ্চিম ধারে যে সকল ভদ্রলোকের বাসগৃহ ছিল, সে সমস্ত গৃহ ঐ আবর্জনা-ভোজী কাক-চিল, এমন কি শকুনীর উপদ্রবে অব্যবহার্য হইয়া উঠিয়াছিল বলিলেও অত্যুক্তি হয় না । সে সমস্ত গৃহের সার্শি তো দিনরাত্রি বন্ধ করিয়া রাখিতে হইত; আবার যখন রেলগাড়ী
লইয়া যাইতে যাইতে পরস্পরের মধ্যে ঢকাঢক ধাক্কা লাগিত, তখন সেই সমস্ত আবর্জ্জনারাশির অনেক অংশ মাটিতে পড়িয়া যাইত এবং তাহার ফলে সমস্ত আপার সার্কুলার রোডটা দুর্গন্ধে অগম্য হইয়া উঠিত।’

কী কাণ্ড ভাবুন তবে । পথ পরিষ্কার করতে গিয়ে ব্রিটিশদের বুদ্ধিতে পথ হয়ে উঠল অগম্য, আর যে বাড়িগুলি ছিল সে বাড়ির বাসিন্দাদের অবস্থাটা একবার কল্পনা করুন। আর ব্রিটিশ শাসকরা সব কিছু জেনেও ছিলেন নীরব। কর্পোরেশনে আসার পর প্রশাসক নেতাজিই আবর্জনার রেলগাড়ি বন্ধ করে দেন। বন্ধ করে দেন এই এই জঞ্জালের উপদ্রব। এমনটাই তো শোনা যায়। পুরনো দিনের লোকেদের মুখে শুনেছি, নেতাজি না থাকলে এই জঞ্জালের রেলগাড়ি কোনও দিন বন্ধ করা সম্ভব ছিল না। আর রেলগাড়ি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে মিলে যায় পুরসভায় নেতাজির আবির্ভাবও। বিশ শতকে একটি লেখায় ডঃ অতুল সুর লিখেছেন, ‘শতাব্দীর প্রথম পাদের শেষ পর্যন্ত শহরের ভিতর দিয়ে করপোরেশনের একটা রেলপথ ছিল।’ (পাদ শব্দটির অর্থ হল কোয়ার্টার। বিশ শতাব্দীর প্রথম পাদ মানে ১৯২৫ সাল । আর পুরসভায় নেতাজির আবির্ভাব ১৯২৪ সালে )

শহর পরিষ্কার তো পুর পরিষেবার একটা দিক। কিন্তু পুর পরিষেবার অন্য দিকগুলিতেও নেতাজি
সমান দৃষ্টি দিয়েছিলেন। যেমন জল নিকাশি ব্যবস্থা, গ্যাস আলোর বৈদ্যুতিকরণ, মহামারি
প্রতিরোধ, হাসপাতাল সংস্কার ইত্যাদি। এরপরেও নেতাজি চেষ্টা করেছিলেন পুর পরিষেবাকে এক
অন্য মাত্রায় পৌছে দিতে । ১৯২০-র দশকে কলকাতা যেহেতু অনেক বড় শহর, সেহেতু কলকাতায় তখন মিশ্র জনবসতি । এর মধ্যে দরিদ্র মানুষরাও যেমন আছেন, তেমনই আছে অনাথ বা পিছিয়ে পড়া শিশুরা, তেমনই দরিদ্র বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সংখ্যাটাও কম নয় । এই মানুষগুলির দায়িত্ব কার ? এগিয়ে এল তৎকালীন পুরবোর্ড । দেশবন্ধু এবং নেতাজির উদ্যোগে গড়ে উঠল ‘দক্ষিণ কলকাতা সেবাশ্রম’ ও ‘দক্ষিণ কলকাতা সেবক সমিতি’। দক্ষিণ কলকাতা সেবক সমিতি হল পাঠাগার এবং তরুণদের সমাজ
উন্নয়নমূলক আলোচনার জায়গা । আর ‘দক্ষিণ কলকাতা সেবাশ্রম’ হল অনাথাশ্রম । যেখানে শুধু
তাদের থাকার ব্যবস্থায় নেই, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানিক বিকাশের কেন্দ্র।

প্রথমে এই দুই সংস্থা ভাড়া বাড়িতে শুরু হয় । পরে অবশ্য পুরসভার জমিতেই পাকাপাকি বন্দোবস্ত হয় এই দুই সংস্থারই । গরিব ছাত্র এবং শিশুদের পাশাপাশি পুরসভার উদ্যোগে সে সময় একাধিক প্রকল্প
নেওয়া হয় বয়স্ক ব্যক্তি এবং পতিতাদের জন্য । ডঃ জয়ন্ত চৌধুরীর মতে—‘বাবু কালচারে সমৃদ্ধ
পুরনো কলকাতাতে খোলনলচে বদলে জনমুখি উন্নয়নমূলক ভাবনাচিন্তার বাস্তবায়নের পথে
কলকাতা পুরসভা হেঁটেছিল সুভাষচন্দ্রের হাত ধরেই।’

কিন্তু পুরসভাও যে জনমুখী উন্নয়নকাজ করে, তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছবে কী করে ? এই পথটিও বাতলে দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র । ১৯২৪ সালের ১৫ নভেম্বর সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্যোগে প্রকাশিত হয় এশিয়ার প্রথম পুর সংবাদপত্র ‘ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল গ্যাজেট’। ডঃ জয়ন্ত চৌধুরী লিখছেন, ‘দরিদ্র মানুষের কল্যাণার্থে এই সময় পুরসভার যে সমস্ত কর্মসূচির ঘোষণা জানা যায় তার খবর পাওয়া যায় এক বছর পূর্তির বিশেষ গ্যাজেটের সংখ্যায় । জানা গেছে, মেয়রের প্রথম বক্তৃতায় যে অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, দরিদ্রদের জন্য নিখরচায় চিকিৎসা, সস্তায় খাঁটি খাবার ও দুধ সরবরাহ, বস্তি এলাকায় উন্নততর পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা, দরিদ্রদের জন্য গৃহনির্মাণ প্রকল্প, সংযোজিত পুর এলাকার উন্নয়ন, যানবাহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং খরচ কমিয়ে প্রশাসনের উন্নয়ন। আসলে দরিদ্র জনগণ ভারতীয় ঐতিহ্যে যাদের ‘দরিদ্র নারায়ণ’ বলা হয় তাদের কল্যাণেই যে পুরসভা পরিষেবার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, দেশবন্ধু তাদের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সে কথাটিই বোঝাতে চেয়েছিলেন।’

নেতাজি কিন্তু শুধুমাত্র পুর পরিষেবার উন্নতি, ‘দরিদ্র নারায়ণ’ সেবা (পড়ুন পরিষেবা), জনমুখী
প্রকল্পে পুরসভাকে বেঁধে রাখতে চাননি । তিনি পুরসভাকে করে তুলেছিলেন সর্বজনীন । যে সর্বজনীনতায় সঙ্গে মিশে রয়েছে কলকাতার ঐতিহ্য। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার উল্লেখ করা যাক—
নেতাজি তখন মেয়র। সালটা ১৯৩০ সাল। কলকাতার হরিজনরা তখনও দুর্গা পুজোতে অংশ
নিতে পারেন না। তাঁদের অবাধ প্রবেশ নেই কোনও পুজোতে। নেতাজি এবং তাঁর পুরসভা এগিয়ে
এল এই হরিজনদের জন্য। মেয়র সুভাষচন্দ্রের নির্দেশেই হরিজন সম্প্রদায়ের জন্যই হাজরা
পার্কে দুর্গা পুজো শুরু করল কলকাতা পুরসভা।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.