সাইবেরিয়ায় ঘুমিয়ে আছেন নিথর সুভাষচন্দ্র বসু ?

15462

জাতীয় স্তরে বীরত্বের প্রতীক বাঙালির কাছে খুব বেশি নেই | তাই রোমাঞ্চ আর বীরত্বের ককটেল হিসেবে নেতাজিকে নিয়ে আমরা শিহরিত হই | এই মহান দেশপ্রেমিকের জীবনে তাঁর অন্য সব কৃতিত্ব কার্যত চাপা পড়ে যায় তাঁর অন্তর্ধান-রহস্যে |  আমরা ভেবে আসছি সত্যি কি উনি তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন ?

বিজেপি-র সুব্রহ্ম্যম স্বামী বলেছেন‚ নেতাজিকে তিলে তিলে হত্যা করেন স্তালিন‚সাইবেরিয়ার তুষার-প্রান্তে | অথচ‚ ১৯৯৯ সালে এনডিএ সরকারের আমলে মুখার্জি কমিশন রেনকোজি মন্দিরের চিতা-ভস্মকে নেতাজির বলে মানেনি | কিন্তু স্পষ্ট করে বলেওনি শেষ অবধি কী হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বোসের ?

এই সাইবেরিয়া তত্ত্বও বহু পুরনো | ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই উঠেছিল এই সাইবেরিয়া তত্ত্ব | প্রধানত গলা তুলেছিলেন ডক্টর সত্যনারায়ণ সিনহা | ১৯১০ সালে বিহারের ছাপড়ায় জন্মানো এই কংগ্রেসি জীবনের শুরুতেই গান্ধীজির সংস্পর্শে আসেন | তবে মাত্র ২০ বছর বয়সে চলে যান ইতালি | সান্নিধ্য পান গোর্কির | ঘটনাবহুল জীবনে তিনি দু বছর রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন দোভাষী হিসেবে‚ ইথিওপিয়ায় যুদ্ধ করেছেন মুসোলিনীর বাহিনীর হয়ে‚ আবার পরে ভারতে ফিরে এসে নেহরুর সঙ্গী হন | প্রথম লোকসভায় সাংসদ ছিলেন‚ ফরেন সার্ভিসে চাকরি করেন | দু বছর পরে পদত্যাগও করেন |

একাধিক বিদেশি ভাষা জানতেন সত্যনারায়ণ | তাঁকে ইউরোপে বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করেন নেহরু | তবে নেতাজিকে নিয়ে সত্যনারায়ণ এত নিশ্চিত হয়েছিলেন সাইবেরিয়া গিয়ে | সেখানে তিনি দোভাষী হিসেবে রুশ সেনার কর্মী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন | সাইবেরিয়ায় তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় বহু দেশের গুপ্তচরের |

তবে রুশ এজেন্ট কোজলভের সঙ্গে সত্যনারায়ণের দেখা হয়েছিল অন্যত্র | তিনি সত্যনারায়ণকে বলেন‚ সাইবেরিয়ার য়াকুৎস্ক শহরে বন্দি-আবাসে ৪৫ নম্বর সেলে তিনি সুভাষ বোসকে দেখেন | সেটা অবশ্যই ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্টের পরে | খাতায় কলমে ওইদিনই তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনা হয় | এবং এই কথা কোজলভের কাছ থেকে সত্যনারায়ণ জানতে পারেন পাঁচের দশকে | ব্রিটিশ শাসনের কলকাতায় বহু বিদেশি গুপ্তচরের মধ্যে কোজলভও ছিলেন | তখন কলকাতায় তিনি সুভাষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন | চিনতেন নেতাজির বসতবাড়িও |

আর এক গুপ্তচর কার্ল লিওনার্ড | রাশিয়ার কাছে জার্মানি পরাজিত হওয়ায় এই জার্মান চর সাইবেরিয়াতে ছিলেন যুদ্ধবন্দি হিসেবে | সেখানে তিনি সুভাষ বোসকে দেখতে পান | কার্লের সঙ্গে সত্যনারায়ণের পরবর্তী সময়ে দেখা হয় জার্মানির লিপজিগে |

কিন্তু সাইবেরিয়ার য়াকুৎস্ক শহরে এত বন্দি কেন ? মস্কো থেকে বহুদূরে এটা পৃথিবীর শীতলতম শহর | এখানে সাধারণ তাপমাত্রা মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস | খনিজ সম্পদের ভান্ডার এই জায়গা ছিল দুর্গম | খনিজ সম্পদ উত্তোলন করতে প্রচুর লোক দরকার‚ টের পেয়েছিলেন স্তালিন | শোনা যায়‚ তিনি সেখানে পাঠাতেন বন্দিদের | নির্মম কষ্টে অমানবিক পরিবেশে থেকে তারা খনির কাজ করত | রাস্তাঘাট বানাত | কাজ না করার অপরাধে তো বটেই | অনেকেই মারা পড়ত নিদারুণ ঠান্ডায় | অনেকেই বিশ্বাস করেন‚ সেই পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে প্রাণ হারিয়েছিলেন সুভাষ চন্দ্র বোস | ১৯৫৩-র মার্চে মারা যান স্তালিন | কোনও কোনও ঐতিহাসিক বলেন‚ তার কয়েক বছর পরে‚ য়াকুৎস্ক কারাগারের ৪৫ নম্বর সেলে মারা যান সুভাষ |

কিন্তু নেতাজি সাইবেরিয়া গিয়েছিলেন কেন ? অনেক ঐতিহাসিক বলেন‚ তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু মিথ্যা রটনা | নেতাজি বুঝেছিলেন‚ জাপানের পতনের পরে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসেবেই দেখবে মিত্রশক্তি | তিনি রুশ-আমেরিকাকে নিজের পাশে পেতে চেয়েছিলেন | তাই‚ তিনি যান মাঞ্চুরিয়ায় | চিনের এই অংশ ছিল জাপানের অধীন | পরে তা অধিকার করে নেয় রুশ সেনা | এখান থেকেই তাঁকে সাইবেরিয়া পাঠিয়ে দেওয়া হয় |

অনেক ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন‚ সেইসময় USSR ভেবেছিল‚ আমেরিকা বিরোধিতা করতে হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল রাখতে হবে | তাই‚ নেহরুকে প্রতিদ্বন্দ্বীহীন রাখতে স্তালিন নেতাজিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন | কারণ‚ আসন্ন ঠান্ডা যুদ্ধে ভারতের বন্ধুতা রাশিয়ার কাছে একান্ত কাম্য ছিল | প্রতিদানে‚ নেহরু সরকার রাশিয়ার কাছে থেকে কেনে সমরাস্ত্র | রাশিয়া সাহায্যও করে ভারতকে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত কাজে | অনেক মহল বিশ্বাস করে‚ সাইবেরিয়ায় নেতাজির মৃত্যুর কথা জানতেন নেহরু স্বয়ং !

জানত নাকি তৎকালীন ব্রিটিশ কূটনীতিক মহলও | ভারতে আসা ব্রিটিশ উচ্চ মহলের একটি গোপন টেলিগ্রাম বলে‚ তারা প্লেন ক্র্যাশে সুভাষের মৃত্যু বিশ্বাস করে না | তবে‚ স্তালিনের নির্দেশে সুভাষ যে নির্যাতিত হয়েছেন‚ তাঁর মতো ‘বিশ্বাসঘাতকের’ সেটাই প্রাপ্য | এবং ব্রিটেনের কাছে যিনি ‘বিশ্বাসঘাতক’‚ তাঁকে পলিটিক্যাল শেল্টার দিতে হয়তো সাহস পায়নি সোভিয়েত রাশিয়া |

এই সব তথ্য নেহরু এবং সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণকে জানান বলে দাবি করেন সত্যনারায়ণ | কিন্তু তাঁর দাবি‚ নেহরু শুনতে চাননি | এবং রাধাকৃষ্ণণ তাঁকে পরামর্শ দেন‚ এই বিষয়ে আর না এগোতে | তাহলে নষ্ট হয়ে যাবে কেরিয়ার | এই বলে তিনি নাকি সাবধান করেছিলেন সত্যনারায়ণকে |

সত্যনারায়ণ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন খোসলা কমিশনেও | কিন্তু কমিশন গুরুত্ব দেয়নি তাঁর বক্তব্যকে | উল্টে‚ বলা হয়েছিল‚ তাঁর দাবি আসলে মার্কিন প্রোপাগান্ডা ছাড়া কিছু নয় | ১৯৭০ সালে এই খোসলা কমিশন করেছিল ইন্দিরা-সরকার | তার আগে ১৯৫৬ তে‚ নেহরু-সরকারের আমলে হয়েছিল শাহনওয়াজ কমিশন | দুটি কমিশনই বলেছে‚ তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন নেতাজি |

খাতায় কলমে বলা হয়‚ ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে টোকিও যাওয়ার পথে তাইপেই (তৎকালীন ফরমোজা) তে ভেঙে পড়ে জাপানের সমর-বিমান | ওভার লোডিং-এর কারণে | এতেই সওয়ার ছিলেন নেতাজি | পরে সেই দুর্ঘটনাস্থলে যান সত্যনারায়ণ | তোলেন বহু ছবি | তাঁর দাবি‚ ওই দুর্ঘটনার সপক্ষে কোনও প্রামাণ্য নথি নেই | তাছাড়া‚ যে ছবি দুর্ঘটনার ছবি হিসেবে দেখানো হয়‚ তা আসল নয় | কারণ ‚ ছবিতে কিলুং নদী দেখা যাচ্ছে না কেন ?

পরে‚ ১৯৯৯ সালে মুখার্জি কমিশন বিস্ময় প্রকাশ করেছে‚ কেন সত্যনারায়ণের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি আগের দুই কমিশন | কিন্তু তারা স্পষ্ট করে বলতেও পারেনি শেষ অবধি নেতাজির কী হয়েছিল ? এতদিনেও কেন রেনকোজি মন্দিরে থাকা চিতাভস্মের DNA Test করা গেল না ? কেন বলা হয়‚ বিভিন্ন দফতরে থাকা নেতাজি অন্তর্ধানের গোপন ফাইল প্রকাশ করলে নষ্ট হবে ভারতের সঙ্গে রাশিয়া এবং গ্রেট ব্রিটেনের বৈদেশিক ও কূটনীতিক সম্পর্ক ?

সুভাষের চলে যাওয়ার খবর বিশ্বাস করতে পারেননি স্বয়ং গান্ধীজি | সেটা কি শুধুমাত্র তাঁর অন্তরাত্মার বাণী ? নকি জাতির জনকের কাছেও নির্দিষ্ট খবর ছিল‚ একদা তাঁর অনুসারী সুভাষকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সাইবেরিয়ার হিমশীতল প্রান্তে ?

সাইবেরিয়ার য়াকুৎস্ক শহরে লেনা নদীর ধারে ছিল বন্দিদের থাকার জায়গা | এই শহরের একটা রাস্তার নাম কোলাইমা হাইওয়ে | কিন্তু এর আর এক নাম Road of Bones | কারণ‚ এর দু পাশে চিরঘুমে শুয়ে আছেন অসংখ্য বন্দি | তাহলে কি তাঁদের মধ্যে সমাহিত হতে হয়েছে আমাদের বীর সুভাষকেও ?

আমার মনে হয়‚ সুভাষের অন্তর্ধান-রহস্য কোনওদিন উন্মোচিত হবে না | শুধু‚ ২৩ জানুয়ারি আমরা মাতামাতি করব | কেন সারা দেশে ছুটি দেওয়া হল না‚ সেটা নিয়ে ভাবব | আর‚ শ্যামবাজারে তেলেভাজার দোকানে বিনি পয়সায় তেলেভাজা খাওয়ানো নিয়ে প্রবন্ধ লিখব | আর ভুলে যাব‚ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জিতেও ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার পিছনে প্রধান অনুঘটক ছিল জানকীনাথ এবং প্রভাবতী দেবীর পুত্রের আত্মত্যাগ |

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

3 COMMENTS

  1. স্তালিন সত্যি সত্যিই সুভাষকে মেরেছিলেন কিনা, এনিয়ে আরো প্রামাণ্য তথ্য চাই, শুধু একজনের কথার ওপর বিশ্বাস করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না । তবে এটা ঠিক যে, তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনার থেকে স্তালিনের হাতে মৃত্যু অনেকবেশি বাস্তবসম্মত । তবে সুভাষের অন্তর্ধান রহস্য কোনদিন উন্মোচিত হবে না, এটা ঠিক নয় । ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট আমরা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেয়েছি । অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা পেলে ভারত আবার পৃথিবীতে সুপার পাওয়ার হবে । তখন আর কোন রহস্যই চাপা থাকবে না ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.