গলনাঙ্ক-নতুন পর্ব

378

(গত পর্বের পরে…)

আর সেই সন্ধেতেই প্রথমবার মিলিত হল তারা | ওষ্ঠ চুম্বনেরও আগে রঘুবীর পাগলের মত আদর করতে লাগলেন তার দুটো পা-কে | সে নগ্ন হওয়া মাত্র মুখ গুঁজে দিলেন উরুতে‚ জঙ্ঘায়‚ হাঁটুর পেছনের নরম অংশে | সমস্ত চুম্বন তার পায়েই অর্পণ করলেন রঘুবীর | যৌন কেশর ঘেঁটে অবাক হয়ে জানতে চাইলেন এখানেও পিম্পল হয় ? সে হেসে ফেলল‚ চুল ঘেঁটে দিল রঘুবীরের মাথার | নিতম্বের খাঁজে অঙ্গুলি চালনা করতে করতে রঘুবীর বললেন ‚এতো নদী!এতো গভীর খাত!

নিজেকে প্রবেশ করাতে গিয়ে রঘুবীরের বিস্ময় প্রায় আঘাতের পর্যায়ে পৌঁছে গেল | আর তাই দেখে গর্বীর মত মেয়ে বিহ্বলতায় কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে‚ আর অহরহ কেঁপে উঠতে উঠতে সে টের পেল তার মাথার মধ্যে দ্বিতীয় কোনো জগতের দরজায় ঘা দিচ্ছে না কেউ! সেই স্ক্রিনটা আর খুলে যাচ্ছে না যেখানে আরও একটা সঙ্গম ক্রিয়াশীল‚ সুড়ঙ্গের চাপাচাপির মধ্যে আরও একজন পুরুষ চেষ্টা করছে না তার সঙ্গে মিলিত হতে | রঘুবীর সেই মুহূর্তে যা যা করছেন তাতেই তার শরীর উত্তপ্ত হয়ে বাষ্প ছড়াচ্ছে মস্তিষ্কে | রঘুবীরের স্পর্শ, রঘুবীরের স্পর্শ হয়েই পৌঁছচ্ছে মাথায় | মাথার ভেতর প্রতিস্পৃহায় ঘটে যাচ্ছে নাআর কোনও ঘটনা | কোনও দ্বন্দ্ব‚ কোনও টানাপোড়েনের মধ্যে নিজের শরীর আর মন নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে না গর্বী – বাস্তবতা আর ফ্যান্টাসির মধ্যে সংঘাতে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে না | গর্বী যেন বুঝতে পারছে দেহ‚ মন সব একাকার হয়ে যাচ্ছে তার রঘুবীরের সঙ্গে |

তীব্র‚ তীব্র ভাবে রঘুবীরকে বুকে চেপে ধরে সে তখনই অনুধাবন করতে পারে কীসের অপেক্ষা ছিল তার‚ কেন সে ছিল প্রেম নিবারক যন্ত্রের মত এতদিন ! সে রঘুবীরের কাঁধে পা তুলে দেয় | বলে ‚ ‘একে বলে ইওর হাইনেস ‘ পজিসন রঘুবীরদা‚ আপনি আমার পা দুটো দেখতে পাচ্ছেন কিনা বলুন? আর সে চায় রঘুবীর এই অবস্থাতেই রমণ করুক তাকে | তুলির টানগুলো বদলাতে চায় না গর্বী‚বুঝতে পারে তূনীর বা যশমাল্যর সঙ্গে বারবার বিভঙ্গ পাল্টে পাল্টে যাওয়ার মধ্যে ছিল নিরানন্দের‚ বেদনার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিঘ্ন | মুহূর্তে মুহূর্তে পুরোনো হয়ে যেত এক একটা পোজ আর পোজগুলো বদলে ফেলার সময় এক ধরনের নিস্পৃহতায় ভুগত সে | সেই সন্ধ্যায় সে চাইল রঘুবীর ওই ভাবেই আদর করুক | রঘুবীরের মুখটা সে দেখতে পাক সামনে থেকে সর্বক্ষণ এবং রঘুবীর তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও ছেড়ে যাবে ভেবে ফেলেই ভয়ের তিনকাল পার হয়ে চলে গেল সে | সব ভয় তখনই, তখনই পেয়ে গেল গর্বী | সে বুঝতেও পারল তার ভয় হল‚ — এই হল ভয় | আর সে আঁকড়ে ধরল রঘুবীরকে‚ ভুলে গেল সকালেও রঘুবীরকে স্পর্শ করার আগে সে জানতে চেয়েছিল‚ ‘ চাপ লাগছে? ব্যথা লাগছে?’ রঘুবীর যেই বললেন্‚ ‘ আমি আর পারছিনা‚ আমি এবার আসব !’ সে বলে উঠল ‘ রঘুবীর! ‘ আপনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আসুন রঘুবীর!’ আসলে তখন সে বলতে চাইল একটা স্রোত ছিটকে এসে পড়ুক চোখ থেকেও‚ চোখে | মাখামাখি হয়ে যাক ! আসলে তখন সে বলতে চাইল সে কখনো‚ কখনো কারও প্রেমে পড়েনি | এই‚ এই তার জীবনে প্রথম প্রেম ! এবং এই তার জীবনের প্রথম ভয়ও | সেটা এই অবস্থাতেও খেয়াল করল গর্বী !

মিলন সম্পূর্ণ করে রঘুবীরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইল সে‚ তাকিয়ে রইল হাঁ করে রঘুবীরের মুখের দিকে‚ চোখে লেগে রইল আঠার মত প্রেম ! গর্বীর !

আর দিন পনেরো পরের একটা সন্ধ্যেবেলা রঘুবীরের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে যখন রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা গাড়ি আচমকা এমন ভাবে এসে পড়ল যে রঘুবীর তার হাত ছেড়ে দিয়ে একাই পার হয়ে গেলেন রাস্তাটা — তখন ভীষণ অভিমান হল তার‚ চুপ করে গেল সে | গর্বী আর হাত ধরল না রঘুবীরের | রঘুবীর তার এই পরিবর্তন লক্ষ করলেন না | নিশ্চিন্ত মনে কথা বলতে বলতে এগোতে লাগলেন | ভ্রমণের শেষে গর্বীর বাড়ির সামনে তাকে ছেড়ে দিয়ে রঘুবীর যখন চলে যাচ্ছেন তখন সে বলল‚ ‘আপনার আর রোড ক্রস করতে ভয় হয় না বলুন?’

রঘুবীরের মুখ থেকে হাসি মুছে গেল‚ ‘তাই তো ? আজ সারাদিন প্রায় কোনও কিছু নিয়েই ভয় হয়নি আমার গর্বী | শুধু সকালে একটা ফোন এল অচেনা নাম্বার থেকে‚ সেই ফোনটা পেয়ে কিছুক্ষণ আর কোনো সাড় ছিল না আমার | এত বছর পরে ওই গলাটা …!’

‘কার ফোন? আপনি আমাকে বলেননি তো? ভয় পেলেন অথচ বললেন না রঘুবীর?’ এ যন দ্বিতীয় অভিমান হয়ে জমা হল তার বুকে |

‘হ্যাঁ‚ তোমাকে বলা হয়নি’|

‘কেন বলেননি?’

‘তখন তুমি ক্লাস নিচ্ছিলে | ‘

‘ও‚ কার ফোন?’ জানলেও হয়‚ না জানলেও হয়‚ এইভাবে জিজ্ঞেস করল সে|

‘হিতৈষণা’!

সে স্তম্ভিত হয়ে গেল‚ হিতৈষণাকে চূড়ান্ত ভয় পেতেন রঘুবীর | অলিভিয়া‚ মৃত্তিকা‚ হিতৈষণা এরা সব এখনও বেঁচে আছে ! মৃত শুধু ভ্রমর?

‘কেন‚ কেন ফোন করল হিতৈষণা?’

‘প্রায় পাঁচ বছর পর ফোন করল হিতৈষণা | ও জানতে চাইছিল আমি কেমন আছি ! ‘

‘এত বছর পরে সে খবর নেওয়ার কী দরকার পরল ওর ? ‘

‘আমি তা জিজ্ঞেস করতে পারিনি গর্বী ! কথা বলতে গিয়ে ঘেমে যাচ্ছিলাম | বলেছি পরে কথা বলব |’

‘পরে? তার মানে ও পরে আবার ফোন করবে |’

‘তাই তো বলল |’

গর্বী আর দাঁড়াল না‚ ঢুকে পড়ল ফ্ল্যাট বাড়ির কম্পাউন্ডে | সাহানা আবার ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটে গেছে | তিন চারদিন পরে ফিরবে | ফ্ল্যাটে ঢুকে একটাও আলো জ্বালল না গর্বী | চুপ করে বসে রইল লিভিংরুমের সোফায় | নিজের ঘরটাও তার কাছে পর হয়ে গেছে কেমন | অন্য যে এয়ারহোস্টেস থাকতে আসবে এখানে তার নাম তিনিশ | সে চলে এলে সঙ্গত কারণেই গর্বী শিফট করে যাবে সাহানার রুমে |

সে অপেক্ষা করতে লাগল রঘুবীরের ফোনের‚ প্রতি মুহূর্তে তার মনে হল রঘুবীর ফোন করবেন | বাড়ি ফিরে স্নান করে‚ খাবার গরম করে খেতে বসেই ফোন করবেন রঘুবীর তাকে | কয়েকটা রাত সে রঘুবীরের সঙ্গে কাটিয়েছে‚ এক সঙ্গে খেয়েছে তখন‚ রঘুবীরকে বলেছে‚ ‘আমাকে দাঁত ব্রাশ করিয়ে দিন |’ ঘুমোতে গেছে রঘুবীরকে জড়িয়ে ধরে‚ যতবার রঘুবীর অন্য পাশ ফেরার চেষ্টা করেছেন ঘুম ভেঙ্গে গেছে তার | ‘আমার দিকে‚ আমার দিকে !’ বলে উঠেছে গর্বী জেদি‚ একগুঁয়ে মেয়ের মত |

দেখতে দেখতে এগারটা বেজে গেল | ক্রমশ রাগ হতে লাগল গর্বীর‚ এবং রাগটা এমন মাত্রায় পৌঁছোলো যে সত্যি যখন ফোন এল রঘুবীরের তখন ফোনই ধরল না সে | ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল | সে ভাবল ফোনে না পেয়ে রঘুবীর উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়বেন এবং বারংবার ফোন করবেন | কিন্তু বসে থাকতে থাকতে কষ্টে পাথর হয়ে গেল গর্বী অথচ আর দ্বিতীয়বার এল না রঘুবীরের ফোন| তখন সে নিজেই রিং ব্যাক করল রঘুবীরকে‚ ‘ফোন করেছিলেন ?’

‘হ্যাঁ‚ তুমি ধরলে না দেখে ভাবলাম ঘুমিয়ে পড়েছো |’

‘হতে পারে! আপনার সঙ্গে কথা না বলে আমি ঘুমিয়ে পড়ব?’

‘আমি তাই ভাবলাম গর্বী ! এত টায়ার্ড ছিলে!’

‘ব্যস! আপনার কোনও দুশ্চিন্তা হল না?’

‘দুশ্চিন্তা?’ রঘুবীর চুপ করে থাকলেন একটু‚ ‘দুশ্চিন্তা হওয়ার তো কোনো কারণ নেই | তোমাকে নিয়ে আমার কোনও দুশ্চিন্তা নেই | তুমি নিজেকে তৈরি করেছ নিজেকে সামলাবার মত করে | ইউ আর আ স্ট্রং গার্ল | আমাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে গেছ তুমি | একটা অন্ধকার গর্তের মধ্যে এক যুগের বেশী বসে ছিলাম‚ — কত বড় বার্ডেন‚ কত রকম ভার‚ ইউ হ্যাভ লেসেন মাই বার্ডেন |
থ্যাংকস ফর বিয়িং দেয়ার ! এখন আমার ইচ্ছে করছে তোমার ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে কাঁদি ! শুধু কাঁদি ! প্লিজ বিয়ার উইথ মাই ইনস্যানিটি গর্বী ?’

সে কাঁদতে লাগল এসব শুনতে শুনতে — রঘুবীর তার কথাই বলছেন‚ রঘুবীরের জীবনে তার গুরুত্বের কথাই বলছেন | তার ডিসট্যান্স প্রেজেন্সকে ক্লোজলি ফিল করছেন অথচ সেই দূরত্ব মুছে দেওয়ার জন্য অস্থির হচ্ছেন না‚ তাকেই ভাবছেন অথচ তাকে খুঁজছেন না — রঘুবীর শান্ত হয়ে বসে আছেন ! জিম রিভস্-এর গানটা শুনছি গর্বী‚ ওয়াক থ্রু দিস ওয়ার্ল্ড উইথ মি|’

সে চুপ করে শুনতে চেষ্টা করল রঘুবীর কী বলেন‚ ‘নাউ ইউ টেক রেস্ট | তোমার ডেসার্টেশনটা কদ্দুর? কাদের কাদের সঙ্গে কথা বলছ ?’

ফোর্থ সেমেসের জন্য একটা প্রায় দশ হাজার শব্দের রিসার্চ পেপার তৈরি করতে হয় তাদের | সেখানে নিজের মতামতকে সম্পূর্ণ উহ্য রেখে ফিল্ম স্টাডিজের ফ্যাকাল্টি‚ সিনেমা করিয়ে‚ সিনেমা সমালোচক এমন কি সুশিক্ষিত সিনেমা দর্শক — এরকম নানান ব্যক্তিত্বকে ইন্টারভিউ করে তৈরি করতে হয় পেপারটা | গর্বী ‘স্সামিরা মাঙ্ক মাল বাফের’ ওপর রিসার্চ করছে | অভিজিৎদা সাহায্য করছেন তাকে‚ অভিজিৎদাকেই গাইড হিসেবে চেয়েছিল সে | কিন্তু অভিজিৎদা বললেন ‘তুমি শমীকদার কাছে যাও !’ পি এইচ ডি করলে এই পেপারটাকেই পি এইচ ডির ফার্স্ট পেপার হিসেবে কনসিডার করা হবে | এর গুরুত্ব অসীম | তার এখন সত্যিই মন দিয়ে পড়াশোনা করা উচিত | এ ছাড়াও এখন পোস্টমর্ডানিজমের ক্লাস নিচ্ছেন চার্বাকদা | অনুরাগ কাশ্যপের ‘নো স্মোকিং’ এবং ‘দেব ডি’ দুটোই ভারতীয় পোস্টমর্ডান ছবি হিসেবে পড়ানো হচ্ছে | অনুরাগ কাশ্যপকে নিয়ে রক্তিমরাও ব্যাপক মাতামাতি করে | গর্বী যেন এসবের মধ্যে থেকেও নেই ! হঠাৎই সবার কাছ থেকে সরে গেছে সে | সবার চোখে তার সম্পর্কে ‘যেটা আমরা ভেবেছিলাম সেটাই হল!’ এরকম একটা দৃষ্টি | যদিও ইউনিভার্সিটিতে তার ভাবমূর্তি কি দাঁড়াল এই নিয়ে সে আদৌ ভাবিত নয় , বিচলিত নয় |

হ্যাঁ‚ পড়াশুনোয় ফিরতেই হবে তাকে‚ কিন্তু গর্বী তো শুধু পড়াশুনো করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় তা নয় — সে তো নিজের প্রেমটাকেও দাঁড় করাতে চায় নিজের পায়ে | সিনেমা তার যতটা প্যাশন‚ প্রেমটা তার তুলনায় কোন অংশে কম প্যাশনের নয় ! রঘুবীর‚ রঘুবীর‚ ভেঙ্গেচুরে‚ উল্টে পাল্টে দেখতে চায় সে রঘুবীরকে | বরফ পড়ার মত রঘুবীরের ওপর ভয় ঝরে পড়তে দেখেছে সে | দেখেছে ভয়ে ফ্রজেন হয়ে থাকা মানুষটাকে | আর এখন রঘুবীর গান শুনছেন‚ ‘নাউ দ্যাট আই হ্যাভ ফাউন্ড ইউ‚ নিউ হরাইজনস আই সি !’

‘আপনি গান শুনুন রঘুবীরদা‚ আজ আমি সত্যিই টায়ার্ড! চাইলেও এখন পড়তে বসতে পারব না | ঘুমিয়ে পড়ি বরং!’ ফোন ছেড়েছে কি ছাড়েনি‚ বাজতে লাগল ফোনটা ফের‚ সে ভাবল রঘুবীরই কিছু বলবেন হয়তো‚ কিন্তু দেখল স্ক্রিনে ভাসছে যশমাল্যর নাম!

যশমাল্য ! এক মাস কেটে গেল? ফিরে গেছে যশমাল্য কলকাতায়? এই এক মাস যশমাল্যর কথা প্রায় মনেই পড়েনি তার! গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন সকালে যশের বাড়ি যাওয়ার অভ্যেসটাও বিন্দুমাত্র সামনে এসে দাঁড়ায়নি | সাদার্ন এভিনিউ নিত্যদিন উজিয়ে গেছে গর্বী এদিক‚ ওদিক | বাড়িটার দিকেও তাকায়নি ফিরে ! যশের একটা মেলেরও জবাব দেওয়া হয়নি ! ভীষণ লজ্জিত বোধ করল সে সেই মুহূর্তে‚ ‘যশ তুমি ফিরে গেছ ? ‘ আমতা আমতা করল গর্বী | একটা অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতে পেল সে ফোনে‚ যেন দূর থেকে ভেসে আসছে | আর সব চুপচাপ | ‘যশ?’ আবার বলল সে | অনেকক্ষণ পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও প্রান্ত‚ ‘বেঁচে আছিস?’

কেন কে জানে জল চলে এল চোখে তার | সে বলল‚ ‘ধ্যাৎ তুমি কোথায়?’

‘সান্টাক্রুজে বসে আছি‚ কানেক্টিং ফ্লাইট ধরব | ডিলে আছে | কলকাতায় নামতে নামতে দুটো তিনটে বেজে যাবে |’

সে নিজে থেকেই বলল‚’ আসব তোমার কাছে কাল সকালে?’

‘দ্যাখ‚ যদি আসতে পারিস|’

‘এরকম করে কথা বলছো কেন? তুমি কি রাগ করেছো আমার ওপর?’ প্রশ্নটা করে গর্বী ভাবল আজ পর্যন্ত কে রাগ করল না করল তাতে তার কখনো কিছু যায় আসেনি| তার চরিত্রের মধ্যে এমন দুর্বলতা কী করে এবং কবে ঢুকে গেল?

যশ বলল‚ ‘দুদিন ফোন করেছিলাম তোকে গর্বী‚ দুদিনই ফোন সুইচড অফ ছিল| আচ্ছা‚ এখন রাখছি রে|’

তার মনে পড়ল যশমাল্যই একদিন বলেছিল তাকে‚ ‘প্রেম জিনিসটা হল কতগুলো ব্রিফ মোমেন্টস অফ প্যাসন ! যেটা এভার লাসটিং সেটা হল সম্পর্ক| প্রেমের থেকেও সম্পর্ক অনেক বড় ব্যাপার !’ তখন সম্পর্কে বিশ্বাসই করত না গর্বী| এখন সে যেন একটু একটু বুঝতে পারছে সম্পর্ক আসলে একটা গাছের মত| তার শেকড় আছে‚ কান্ড‚ ডালপালা‚ ফুল‚ পাতা সবই আছে| প্রেমটা যদি শেকড় হয় তাহলে সেই শেকড় মাটিতে পুঁতে দেওয়ার পর মাটি ফুঁড়ে গাছটা বেরোবেই! শেকড়টা একবার মাটি পেয়ে গেলে তাকে শুধু শেকড় হয়ে থাকতে বাধ্য করা যাবে না !

সমস্ত রাত্রি ঘুমের মধ্যে গর্বী ভাবল‚ তাহলে ‘আই লাভ ইউ’ বাক্যবন্ধ কি আসলে সম্পর্কেরই বার্তাবাহক? সম্পর্ক ঘটে যায় বলেই কি মানুষ মানুষকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে?

তার গলার কাছে যেন বিঁধে রয়েছে রঘুবীরকে‚ ‘আই লাভ ইউ’ বলার বাসনা| তার আঙ্গুলগুলো যেন ঘুমের মধ্যেই নিশপিশ করছে রঘুবীরকে ‘আই লাভ ইউ’ লেখা এস এম এস পাঠাতে| কিন্তু রঘুবীর উত্তরে কী লিখবেন এই ভেবে ঘুমটা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে তার| ঘুম থেকে উঠল সে এই সংকল্প নিয়ে যে ঘন্টা দুয়েক পড়াশুনো করে তৈরি হয়ে যশের কাছে যাবে| সেখান থেকে সোজা ইউনিভার্সিটি‚ পোস্ট মর্ডানিজমের ওপর একটা নোট তৈরি করা দরকার তার ‘ডামাটার্জি অফ ফিল্ম ফর্ম’ — ফার্স্ট ইয়ারে পড়া এই বিষয়টা একবার ঘুরে দেখা দরকার সে কারণেই| বইপত্তর নামিয়ে গুছিয়ে বসল গর্বী টেবিলে‚ কিন্তু মন বসাতে পারল না| ঘুরে ফিরে আসতে লাগলেন রঘুবীর চৌধুরী অনেক প্রশ্ন সমেত তার চিন্তায়| দ্রবীভূত হতে না পারার বিরক্তি নিয়ে গর্বী বারবার এ ঘর ও ঘর হেঁটে বেড়ালো‚ আবার গিয়ে বসল টেবিলে‚ একে তাকে ফোন করল| একবার ভাবল একটু স্যান্ডুইচ বানিয়ে খায়‚ পরমুহূর্তেই বাতিল করল সেই পরিকল্পনা| দুধ গরম করে কর্নফ্লেক্স দিয়েই প্রাতরাশ সারল যখন এতটুকুনি খেতে ইচ্ছে করছিল না তার্| ‘থিওরি অফ হিসটোরিকাল মেটারিয়েলিজম’ পড়তে গিয়ে ধূ ধু মরুভূমি ভাসতে লাগল চোখে| পড়া জিনিস সব কখন মাথা থেকে বেড়িয়ে গেছে ভেবে দুঃখ হল তার — সে তো ফাঁকিবাজ ছিল না কখনও| ইদানীং সে কোন কিছুতেই মনসংযোগ করতে পারছে না| সে শুধু রঘুবীরে কথাই ভাবছে|

বসে থেকে থেকেই দু ঘন্টা কেটে গেল বলা যায়| স্নান করতে ঢুকে নগ্ন হওয়া মাত্র এত বেশী রঘুবীরের শরীর হানা দিতে লাগল তার অন্তরাত্মায় যে ছুটে বেড়িয়ে পৌঁছে যেতে ইচ্ছে হল রঘুবীরের কাছে| তা সত্তেও সে আত্মসংযত হয়ে বেরোলো সাদার্ন এভিনিউ এর উদ্দেশ্যে| যোধপুর পার্কের মোড়ে পৌঁছেও গেল গুটিগুটি| একটা বাস দাঁড়িয়েও পড়ল তাকে দেখে| কিন্তু তখনই ফোন এল রঘুবীরের ‘গর্বী? সকাল থেকে সাড়া শব্দ নেই কেন?’

‘এই তো‚ এই তো আমি !’ বলল সে আর অমনি পথ পাল্টে গেল তার| সে ঢুকে পড়ল রঘুবীরের বাড়ি| এবং ঢুকে দেখল মেঝের ওপর অজস্র বই পত্তর‚ অ্যালবাম ডাঁই হয়ে রয়েছে আর তার মাঝখানে বসে সে সবই ঘাঁটাঘাঁটি করছেন রঘুবীর| রঘুবীর বললেন‚ একী? কোথায় যাচ্ছিলে গেলে না?’

‘নাহ’

‘কেন গর্বী?‚’

‘আপনার কাছেই আসতে ইচ্ছে হল! একটা কথা বলতে ইচ্ছে করল আমার আপনাকে এখনই’|

‘কী কথা?’

‘আমি আপনাকে ভালবাসি রঘুবীর|’ এটাই বলতে চাইল গর্বী| কিন্তু শেষ মুহূর্তে বলতে না পেরে বলল‚ ‘আপনার আর কোন কিছুকে তেমন ভয় লাগে না‚ তাই না রঘুবীরদা?’
‘তুমি পাশে না থাকলে একটু একটু লাগে গর্বী|’
সামান্য নিশ্চিন্ত বোধ করল সে‚ ‘আমি তো এই জন্য সব সময় আপনার পাশে পাশে থাকি| আমি তো ছেড়ে যাই না|’

রঘুবীর মাথা নারলেন‚ ‘কিন্তু তোমারও তো নিজস্ব কাজ আছে‚ ব্যস্ততা আছে‚ পড়াশুনো‚ বন্ধুবান্ধব আছে| এখন তুমি সব বন্ধ করে আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকো| সেটা ঠিক নয়|’

‘ এই সব বাস্তব বুদ্ধি আপনার ফিরে আসছে রঘুবীরদা?’

‘আমার এখন অনেক কিছু নতুন করে ফিরে আসছে গর্বী| সব চেয়ে বেশী আফশোষ যে সময়টা চলে গেছে সেই সময়টা নিয়ে ! সেই সময়টা যদি ফিরে আসত? যখন দুঃখ বোধ ছিল কিন্তু অশান্তি ছিল না? ভয় চলে গেলেও অশান্তি তো আমাকে ছেড়ে যায়নি! তোমার আমর বয়েসের পার্থক্যটাও এত বেশী যে তোমার দিকে হাত বাড়াতে আমার লজ্জা করে, তোমাকে এভাবে ধরাটা অন্যায়|’

‘ ন্যায় অন্যায় আপনাকে ভাবতে হবেনা ! আমাকে ধরতেও হবে না| শুধু বলুন আপনি কী চান‚ আপনি কী আমাকে চান?’
‘চাই বললে কম বলা হবে না গর্বী?’

আর একটু চাপ‚ আর একটু চাপ সে তৈরি করতে চায় রঘুবীরের ওপর্‚ রঘুবীর যদি একবার বলেন‚ ‘আমি তোমাকে ভীষণ ভালবাসি গর্বী !’ তাহলে সেও বলে উঠতে পারে‚ ‘আমিও…., আমিও !’

সে বলে ওঠে‚ ‘চাওয়ার থেকে বেশী আর কী হতে পারে রঘুবীরদা?’

‘তোমাকে চাওয়ার থেকে আর ও বড় জিনিস হল তোমাকে স্বাধীন দেখা‚ ব্লুম করতে দেখা| আমার জীবনে তুমি শুটিং স্টারের মত গর্বী| একবার হঠাৎ দেখে ফেলেছি ঠিকই কিন্তু এখনতো নিজেকে বোঝাতে হবে রোজ ঘাড় তুলে আকাশের দিকে মুখ করে তাকিয়ে থাকলেই হল না ! ইউ আর বিয়ন্ড মাই রিচ !’

(ক্রমশ)

গত পর্বের লিঙ্ক: http://www.banglalive.com/Magazine/Dharabahik/7599

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.