গলনাঙ্ক

110

ফোন অন করতেই সাত আটটা মিসড কল অ্যালার্ট ঢুকল | বেশিরভাগই তূনীরের | একটা যশমাল্যর | সঙ্গে যশমাল্যর মেসেজও একটা | যশ লিখেছে, “ইভনিং প্ল্যান ক্যানসেলড! কল ব্যাক!” সে কল করল যশকে, ‘বলো?’

‘রাহুল সেনগুপ্তর সঙ্গে আজই বসছি, বুঝলি? এই এখন রানীকে নিয়ে অফিস থেকে বেরোচ্ছি আমি | তুই কাল সকালে চলে আয়, ওই সাড়ে দশটা নাগাদ!’

‘ওকে, ফাইন!’ ফোনটা ছেড়ে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভাবল গর্বী | বাড়ি ফিরে যাবে? নাকি রিপন বা রক্তিমকে ফোন করে হেঁদুয়ায় চলে যাবে? গেলেই হয় | সন্ধেটা নিয়ে নয়ছয় করাই যায় | সবে সাতটা বাজে | এই সময় হঠাৎ ফোঁটা ফোঁটা করে শুরু হল বৃষ্টিপাত | সে ঠোঁট কামড়ে বলল, ‘যাঃ, আবার বৃষ্টি?’ এবং দেখতে না দেখতে তীব্রতা বাড়ল বৃষ্টির | ভিজতে ভিজতে নিজের প্রতি প্রায় নির্দেশহীনভাবেই সে এক দৌড়ে উঠে পড়ল একটা বাসে | বাসটা দেশপ্রিয় পার্ক হয়ে গড়িয়াহাট যাচ্ছে | গড়িয়াহাটের মোড়ে যখন নামল তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে | গর্বী ভিজেই গেছিল খানিকটা, এবার সে আরও ভেজাটাকে অগ্রাহ্য করে কোন আচ্ছাদনের তলায় আশ্রয় না নিয়ে হাঁটতে লাগল গোলপার্কের দিকে | বাসগুলোয় এত ভিড় দেখে উঠতে ইচ্ছে হল না তার | হয়ত খানিকটা অভ্যেসবশতই সে এগোলো অটো-স্ট্যান্ডের দিকে | জিনসটা জলে কাদায় মাখামাখি, ফোনটা বাজছে কিন্তু ধরার উপায় নেই | আচমকাই গর্বী টের পেল সারাদিন প্রায় না খেয়েই আছে সে | একটা এগরোল কাউন্টার আছে অটোস্ট্যান্ডের ওখানে | ভিজে যখন গেছেই তখন ভিজতে ভিজতে একটা এগরোল কিনে খেতে দোষ কী! এইসব মনস্থির করে হাঁটতে হাঁটতে, ফ্লাইওভার থেকে নেমে আসা জলস্ত্রোত থেকে মাথা বাঁচাতে বাঁচাতে সে হঠাৎই লক্ষ্য করল তার সামনে সামনেই তারই মত অকাতরে ভিজতে ভিজতে হাঁটছে যে লোকটা পেছন থেকে দেখে মনে হচ্ছে সে তার চেনা! আর একটু সচেতন হয়ে তাকিয়ে দেখতেই সে আবিষ্কার করল, এ তো রঘুবীর চৌধুরী! গর্বী চেঁচিয়ে উঠল — ‘রঘুবীরদা?‚’ তার চিৎকারে দাঁড়িয়ে পড়ে ঘুরে তাকাল রঘুবীরদা, (সাহিত্য এক অতি প্রাচীন ফর্ম অফ এক্সপ্রেশন | চলচ্চিত্র সে তুলনায় নেহাতই নবীন | ফলে সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলে চলচ্চিত্র কিছুটা কোণঠাসা ও অনিরাপদ বোধ করতে পারে | হয়ত এ কারণেই পৃথিবীর গ্রেট ডিরেক্টরসরা জীবনের একটা পর্যায়ে গিয়ে যত বেশি এই সম্পর্ক নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে, সমসাময়িক জগৎ বিখ্যাত সাহিত্যিকরা ততখানি রেসিপ্রকেট করেননি | সিনেমা কোন বিশুদ্ধ শিল্প নয়, অনেকগুলো আর্ট ফর্মের নির্যাস সিনেমা এবং সে বহুলাংশে সাহিত্যের মুখাপেক্ষী | চিত্রনাট্য যা চলচ্চিত্রের মেরুদণ্ড তা অবশ্যই সাহিত্যধর্মী | সাহিত্য এবং সিনেমার মধ্যে প্রধান ব্যবধান হল সিনেমায় স্ক্রিপ্ট রাইটারকে চরিত্রের স্ট্রিম অফ কনসাসনেসকে পাতি এক্সটারনাল ইনসিডেন্টে রূপান্তরিত করতে হয়! সাহিত্যে চরিত্রের যে কোনও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন, এনি শিফট অফ মাইন্ড কিন্তু সব সময় ইনসিডেন্ট-এর মাধ্যমে কনভে করা হয় না, সেখানে সাকসেসিভ থটস, ফ্লোয়িং থটস-এর অনবরত ভূমিকা থাকে…

এইভাবে পড়াতে পড়াতে কখন ক্লাস শেষ হয়ে গেছে, কখন রঘুবীর ইউনিভার্সিটি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে — তার খেয়ালই নেই | তখনও সে কথা বলে যাচ্ছিল নিজের সঙ্গে | কেমন তরল হয়ে গেছিল তার মনটা পড়াতে পড়াতে | হাঁটতে হাঁটতে সে নিজেকেই বলছিল, ‘কিন্তু ডিটেলিং-এর ক্ষেত্রে সাহিত্য প্রায়শই সিনেমা হয়ে উঠতে চায় না কি? বিষয়কে দৃশ্যগ্রাহ্য করে তোলার জেদ কি কখনও কখনও দেখা দেয় না লেখকের মধ্যে? ডানা মেলতে ইচ্ছে করে না কি ক্যমেরার মতো?’ তখন রঘুবীর ভাবল এই যে সে হেঁটে যাচ্ছে গোলপার্কের দিকে কেবল এই হাঁটা নিয়েই তো তৈরি হতে পারে একটা সিনেমা কিন্তু এই হাঁটাটুকু যুক্তিনিষ্ঠভাবে লিখে ওঠা কতই না কঠিন? হাজার হাজার পাতা লিখেও এই হাঁটাটুকুর বাস্তবোচিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা অসম্ভব কারণ একজনের প্রত্যেকটা পদক্ষেপের সঙ্গে বদলে যায় তার পেছনের পারসপেকটিভ, সামনের পারসপেকটিভ, দূরের জিনিস কাছে চলে আসে, কাছের জিনিস দূরে! এই রাস্তাটুকুর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে শত শত গাছ, কত কত বাড়ি, গাছগুলোর প্রত্যেকটার আলাদা পরিচয়, তাদের পাতার প্রতিটার রং ও ধরণ আলাদা আলাদা, বাড়িগুলোর প্রতিটা চেহারা ভিন্ন, জানলা দরজার গড়ন ভিন্ন, বারান্দায় মেলা জামাকাপড় হাওয়ায় দুলছে | একবার হাওয়ার ঝাপটায় যেদিকে উড়ে গেল পরের হাওয়ায় ঠিক সেভাবে উড়ল না | কোনটায় এই মুহূর্তে আলো জ্বলে উঠল, কোনটায় নিভে গেল, বাস, অটো, গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, ভিন্ন ভিন্ন শরীর তাদেরও, প্রত্যেকের আলাদা নাম্বার প্লেট, সেই সংখ্যাগুলো কিছু একটা ডেপিক্ট করে | প্রতি পদক্ষেপে চারপাশের শব্দের উত্থান পতন ভিন্ন, পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া মানুষগুলোর মুখের আদলে কত ইতিহাস, কাউকে চোখ দুবার দেখে, কাউকে একেবারেই দেখে না, হয়ত চোখ আটকায় তার জুতোয়, মানুষগুলো যেতে যেতে কথা বলে, দাঁড়িয়ে পড়ে তর্ক করে, মারামারি করে বা হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছাতা খুলে ধরে, বাচ্চাকে বেলুন কিনে দেয় | শেষ টান দিয়ে ছুঁড়ে ফ্যালে সিগারেট, বাট-টা চিপে দেয় পা দিয়ে — এই সব কোটি কোটি ঘটনা, কোটি কোটি রদবদল, তৈরি হওয়া ও ভেঙ্গে যাওয়া পরিস্থিতি মুহূর্তে মুহূর্তে পাল্টে দিতে থাকে চারপাশটাকে আগের পদক্ষেপ থেকে পরের পদক্ষেপে পৌঁছোনোর আগেই,- সেলিমপুরের যে গলির মুখটা সে এই এক্ষুনি পার হয়ে এল সেই গলির মুখে দাঁড়ানো রিক্সাগুলোকে এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না | রিক্সাগুলো স্ট্যান্ডে আসছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে | হাঁটতে হাঁটতে সে মুখটা দেখতে পেল, মানুষের রিক্সায় উঠে বসা দেখতে পেল | এখন আবার গলিটা চোখের অন্তরালে চলে গেছে | যেন দৃশ্যত হাঁটাটার যে অতীত তৈরি হচ্ছে তাও বদলে বদলে যাচ্ছে দ্রুত! এবং এই সমস্তটা লিখে ওঠা অসম্ভব — কিন্তু ছায়াছবি হলে এর সবটাই প্রায় বিনা প্রচেষ্টায় ধরে ফেলত | যেমন পুকুরের ঢিল পড়লে জলে যে রিপলস তৈরি হবে, লেখককে তা মনে করে লিখতে হয় | কিন্তু সিনেমায় ঢিলটা জলে ছুঁড়ে ফেলা মাত্র জল নিজেই ছোট ছোট গোল গোল ঢেউ-এ ভেঙ্গে গিয়ে ধরা দেবে ক্যামেরার কাছে!

তার মুখে হাসি খেলে গেছিল একটা — এই মনে হওয়ার মধ্যে সিনেমার জয় লুকিয়ে আছে | নিজের মনে এসব ভাবতে ভাবতে রঘুবীর গড়িয়াহাট পার হয়ে‚ জনস্রোতের সঙ্গে‚ জনস্রোতের বিপরীতে চলে গেছিল প্রায় গুরুসদয় দত্ত রোড অবধি | ঠিক তখন বৃষ্টি নামে এবং সে ফুটপাত বদল করে বাসে চড়ে বসে একটা | এবং কিছু দূর যাওয়ার পর কনডাক্টর পয়সা চায় তার কাছে | ভাড়া মেটাতে পকেটে হাত দেয় সে | সমস্ত পকেটগুলোয় হাত দেয় — কিন্তু কোথাওই মানিব্যাগ খুঁজে পায় না! মুহূর্তে বিভীষিকা দ্যাখে সে চোখের সামনে | কনডাক্টর তাগাদা দিতেই থাকে | সে ভাড়া দিতে অপারগ এদিক-ওদিক তাকায়! সে বুঝতে পারে তার সমস্যাটা জেনুইন | তার কাছে মানিব্যাগ ছিল | এখন নেই | পিক পকেট হয়েছে কিংবা কোথাও পড়ে গেছে | তার উচিত এই বিপন্নতার কথা কন্ডাক্টরের কাছে ব্যক্ত করা‚ বললে লোকটা বিশ্বাস করবেই‚ কেউ বলবে না সে বাস ভাড়া ফাঁকি দিয়ে বাসে চড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় | — কিন্তু রঘুবীর ভয় পেয়ে যায় | ঘেমে উঠতে থাকে | তার মনে হয় সমস্ত পৃথিবীটা চেপে আসছে তার দিকে‚ সে দেখতে পায় লম্বা লম্বা লোমশ‚ নীল শিরা ওঠা হাত তার গলা টিপে ধরছে | এবং ভুলটা করে বসে রঘুবীর চৌধুরী | সে নেমে পড়তে চেষ্টা করে বাস থেকে এবং পরিস্থিতিটা সঙ্গে সঙ্গে বিপক্ষে চলে যায় তার | কনডাক্টর রোদে ঝলসানো‚ মেঠো হাতে ধরে ফেলে তার কাঁধ‚ ধমকে ওঠে‚ ‘ভাড়া না দিয়ে নেমে যাচ্ছেন মানে?’ বাসের লোকজন সচকিত হয়ে তাকায় তার দিকে | সে বুঝতে পারে সময় উপস্থিত | এবার তাকে চরম অপমানিত হতে হবে | এই অপমান তার কাছে পুরো মাত্রায় ভয়ের! তার হাত কাঁপতে থাকে থরথর করে এত যে কনডাক্টর সেই হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায় বোধহয়, এবং সম্ভবত তার অস্বাভাবিকতা টের পেয়েই গড়িয়াহাটের মোড়ে ধীর গতি বাস থেকে হাল্কা ঠেলা দিয়ে নামিয়ে দেয় তাকে | ঠেলা হাল্কা হলেও রঘুবীর সামলাতে পারে না | দাঁড়িয়ে পড়তে পড়তেই কাৎ হয়ে পড়ে যায় জমে থাকা জলের ওপর | দু-চারজন হইহই করে ওঠে | বাস বেরিয়ে যায় | পেছনে দাঁড়িয়ে পড়া গাড়ির হর্ন তাকে বাধ্য করে কোনওমতে উঠে দাঁড়াতে | সরে যেতে | তখন তুমুল বৃষ্টি পড়ছে | বিধ্বস্ত রঘুবীর আর চোখ তুলে তাকায় না কোনওদিকে‚ ভিজতে ভিজতেই এগোয় ফুটপাত ধরে এবং তখনই তাকে পেছন থেকে ডেকে ওঠে কেউ‚ সে ঘুরে তাকিয়ে দেখে গর্বী‚ তারই মতো ভিজতে ভিজতে আসছে | গর্বীকে দেখা মাত্র ভয় আর অপমানবোধ ছেড়ে চলে যায় তাকে | সে ভেবে নেয় ওরও পার্স হারিয়ে গেছে বলে বৃষ্টিতে রাস্তা ধরে হাঁটছে ও‚ এক মূহুর্তে শরীর শিথিল হয়ে আসে তার | সে একাত্ম অনুভব করে গর্বীর সন্গে আর গর্বী বিস্ময় ও হাসিমাখা চোখে এসে হাত ধরে ফেলে তার | ‘রঘূবীরদা, আপনার বৃষ্টিতে ভিজতে এত ভাল লাগে?’ তার সমস্ত শরীর জুড়িয়ে যায় এই স্পর্শে, সে আবারও দেখে গর্বীর হাতের ছোঁয়ায় কোনও অনুভূতিই সংক্রমিত হয় না‚ কোনও চাপ নেই এই ধরায়, যেন ধরে আছে কিন্তু সত্যি সত্যি ধরেনি! কি নিরুদ্বিগ্ন | সে ভুলে যায় যে বৃষ্টিতে ভিজতে ভাল লাগে না তার, ভয়ই লাগে | বিদ্যুৎ চমকালে, বাজ পড়ার শব্দে, ঝড় উঠলে, বৃষ্টিতে ধূসর হয়ে গেলে পৃথিবী তার ভয় অনুপ্রাণিত হয় | সে বলে শুধু, ‘আমার পারসটা খুঁ্জে পেলাম না, তাই হাঁটছি | একটা বাসে উঠেছিলাম, নামিয়ে দিয়েছে আমাকে!’ মাথা বেয়ে মুখে নেমে আসছে ঝরঝরিয়ে বৃষ্টির জল, সেই অবস্থায় নাক কুঁচকে হেসে ওঠে মেয়েটা, ‘সত্যি?’

একটা ফাঁকা ট্যাক্সি দেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাতে উঠে বসে গর্বী, তাকেও টেনে নেয় হাত ধরে, তাদের মতো কাকভেজা দুজনকে সওয়ারি হিসেবে নেওয়ার প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও ট্যাক্সিটা চলতে শুরু করে | গর্বী বলে, ‘আরে, চলুন, চলুন, এই তো যোধপুর পার্কে নেমে যাব |’ তার উদ্দেশ্যে বলে, ‘আপনাকে আগে নামিয়ে দিচ্ছি |’ সে তাকিয়ে থাকে গর্বীর দিকে | ‘বাড়ি গিয়ে একটা হট ওয়াটার বাথ নেবেন রঘুবীরদা, নইলে ভুগতে হবে |’ সে মথা নাড়ে, ‘আমরা সত্যিই জল থই থই করে দিয়েছি ট্যাক্সিটাকে!’ সত্যিই তাদের শরীর থেকে জল নেমে জমছে ট্যাক্সির ভেতর, সেই জলের মধ্যে যেন ভেসে আছের গর্বীর পায়ের পাতা দুটো, জিনসটা গোটানো, পায়ের গোছ অবদি কাদার ছিঁটে — গর্বীর মুখ থেকে বেরিয়ে আসা ‘আমরা’ শব্দটা আলোড়িত করে দেয় তাকে | আশ্বস্ত করে | মনে হয় অনেক বাধা বিপত্তির বিরুদ্ধে উঠে এল এই ‘আমরা’টা এবং এই সন্ধেয় পৌঁছে রঘুবীর সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল হয়ে যায়, সম্পূর্ণ কনভিনস্ড হয়ে যায় গর্বীর উপস্থিতি, গর্বীর তার পাশে এসে দাঁড়ানোটা তার ভয় উপদ্রুত জীবনকে পুনরুজ্জীবিত করছে! তার ইচ্ছে হয় গর্বী নিজের নির্ভার হাতটার মধ্যে আর একবার হাতটা তুলে নিক তার! এবং এ কথা মনে হওয়া মাত্র বিদ্যুৎ চমকায় তার মনে — গর্বী অনেক কথা বলছে তাকে, হইহই করে কথা বলছে আর যেখানে দাঁড়িয়ে সে শুনছে সেটা একটা টার্নিং পয়েন্ট! এবং আড়চোখে প্রায় না তাকানোর মতো করে তাকিয়ে রঘুবীর দেখতে পায় মৃতদেহ বহন করার কালো কাচের গাড়িটা ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে পড়তে এক সময় রামকৃষ্ঞ মিশনের রাস্তায় ঢুকে গেল! যোধপুর পার্কে ঢুকে গর্বী দেখায়, ‘ এই বাড়িটার সাততলায় আমি থাকি, আপনার বাড়ি থেকে জাস্ট দু মিনিট দূরে |’ এই সামান্য উক্তি অন্য অর্থ বহন করে ফিরে আসে তার কাছে | ‘এত, এতটাই কাছে থাকে গর্বী তার?’ সে বলে,’তুমি তাহলে মাঝে মাঝে এসো!’ গর্বী শোনে কি শোনে না বোঝার আগেই ট্যাক্সি দাঁড়ায় তার বাড়ির গেটে | গর্বী বলে’ , স্নান, তারপর একট বড় মাগ কফি!’ সে নামতে যায় ধন্যবাদ দিয়ে, ট্যাক্সির দরজা খোলে, তখনও বৃষ্টি থামেনি, কিন্তু নামতে গিয়ে থামকে যায় রঘুবীর, তার বাড়ির গেট হাট করে খোলা, সদর দরজা হাট করে খোলা | নতুন করে আবার পা হড়কে যায় তার, ভয়ের গর্তে পড়ে যেতে যেতে সে বলে ওঠে ‘একি?’ গর্বী জানতে চায়, ‘কি হয়েছে?’ সে উত্তর দিতে ভুলে যায়, সে ধরেই নেয় তার বাড়ির ভেতর একটা কান্ড ঘটছে | কেউ বা কারা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছে দরজা ভেঙে | সে দড়াম শব্দে বন্ধ করে দেয় ট্যাক্সির দরজা | গর্বীর দিকে তাকিয়ে বলতে চায়, নামবে না, সে কোনওমতেই নামবে না, বাড়ি যাবে না, অন্য কোথাও চলে যাবে …) ব্যাপারটা বুঝতে বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগে গর্বীর এবং যতটুকু সমর্থ হয় সে রঘুবীর চৌধুরীকে দিয়ে কথা বলাতে তাতেই হতবাক হয়ে যায় | দরজা ভেঙে কেউ বাড়িতে যদি ঢুকেও থাকে, যদি চুরি হয়ে থাকে, যদি ডাকাতি হয়ে থাকে বা তারও বেশি কিছু, কল্পনার অতীত কিছু তাহলেও রঘুবীরদা পালিয়ে যেতে চাইছেন কেন বোধগম্য হয় না তার! সে প্রায় জোর করে নেমে পড়ে ট্যাক্সি থেকে রঘুবীরদাকে নিয়ে | ‘এমনও তো হতে পারে আপনি দরজা ভাল করে বন্ধ করেননি | বৃষ্টিতে, হাওয়ায় খুলে গেছে | আর যদি কেউ ঢুকেও থাকে আপনার তো দেখা দরকার!’ গর্বী টানতে থাকে রঘুবীরকে বাড়ির দিকে | ‘আমি বুঝতে পারছি না আপনি কি করতে চাইছেন রঘুবীরদা? আপনার বাড়ি থেকে আপনি কেন পালিয়ে যাবেন? কিসের ভয় আপনার? চলুন, আমি আপনার সঙ্গে ঢুকছি | দেখুন কি হয়েছে!’ ভয়ার্ত চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে রঘুবীর চৌধুরী তার দিকে | দেখে মনে হয় লোকটাকে বোবায় ধরেছে | জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেচনা বোধ হারিয়ে জড়ভরত | সম্পূর্ণ অচেনা একটা মানুষ! বৃষ্টির মধ্যে নির্জন রাস্তায় ভয় পাওয়া খরগোশের মতো দেখায় রঘুবীরকে | গর্বীর ক্ষণিকের জন্য বিশ্বাস জন্মায় এ তো পাগলই — লোকে যা বলে, নইলে কেউ এ মত আচরণ করে? সে বলে, ‘ঠিক আছে, আপনি দাঁড়িয়ে থাকুন বাইরে, কোথাও যাবেন না, আমি ঢুকছি!’

‘না, কোথাও যাবো না!’ ফিসফিস করে বলে ওঠেন রঘুবীরদা | এবং নিজে এগোতে পেছন পেছন আসতে দেখে গর্বী রঘুবীরদাকে | সে ঢোকে ভেতরে, দাঁড়ায়, নিঃস্তব্ধ অন্ধকার বাড়ি | দরজা দিয়ে ঢুকেই এক পাশে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি, সে বলে, ‘রঘুবীরদা, আলোর সুইচ কোথায়?’ গর্বী শুনতে পায় উত্তেজিত নিঃশ্বাসের এলোমেলো পতন, প্রায় তার গায়ের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন রঘুবীর সেই দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও কি নিদারুণ ভীরুতা, ‘কোথায়?’
‘এদিকে!’
‘জ্বালুন!’

আলো জ্বলে ওঠে সিঁড়ির, ‘কোনদিকে যাব? দোতলায়?’ ভিজে চুপসে যাওয়া মানুষটা আস্তে আস্তে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায় দেওয়ালে, দেখে মনে হয় একটু বসতে চাইছে, শরীরটা ছেড়ে দিতে চাইছে কিছুর ওপর, গর্বী শক্ত করে ধরে রঘুবীরের হাত | ‘কেউ নেই রঘুবীরদা! দরজার তালাও ভাঙেনি কেউ, দরজাটা বন্ধ করে দিন | পুরো বাড়িটা একবার ভাল করে দেখে নিই? আপনি দোতলায় থাকেন?’

সদর দরজা বন্ধ করে গর্বী রঘুবীরকে নিয়ে উঠে আসে দোতলায়, সামনেই ডাইনিং স্পেশ, আলো জ্বালতে জ্বালতে পুরো বাড়িটা আলোকিত হয়ে ওঠে একসময় | কিচেন, টয়লেট, বেডরুম যথাসম্ভব তল্লাশি করে গর্বী রঘুবীরকে নিয়ে | দেখে আর তাকায়, কেউ নেই! নিজের মতো করে সে বুঝতে পারে ছিমছাম সাজানো বাড়িটা এতক্ষণ এই ভাবে পড়েছিল, কেউ ঢোকেনি, কেউ অ্যাবিউস করেনি বাড়িটাকে, শুধু রঘুবীর চৌধুরীর হতাশা কিছুটা গ্রাস করে রেখেছে তার বাসস্থানকেও |
‘নাউ হোয়াট?’ প্রশ্ন করে গর্বী রঘুবীরকে |
‘ছাতের দরজাটা?’ মলিন মুখে বলে ওঠে রঘুবীর |
‘কোনদিকে? দেখে আসছি!’
দেখে এসে মাথা নাড়ে সে, ‘কিচ্ছু নেই, বন্ধ, ভেতর থেকে বন্ধ, তালা দেওয়া!’

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.