দেবাশিস পাঠক
পেশায় শিক্ষাব্রতী , নেশায় সত্যসন্ধানী। শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘকাল, সংবাদপত্র ও দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমে সম্পাদকীয় বিভাগে কাজও করেছেন অনেকদিন। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বহু ছাত্রপাঠ্য বইয়ের লেখক। খবরের কাগজের উত্তর-সম্পাদকীয় আর রবিবারের পাতায় মাঝেমধ্যেই দেখতে পাওয়া যায় তাঁর লেখা। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম অগ্রণী প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদকীয় বিভাগে কর্মরত। ‘হিংসার উৎসব’ নরওয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কালচার লিটারেচার অ্যান্ড পাবলিকেশনের পক্ষ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ বাংলা বই ২০১১’ পুরস্কার পেয়েছে। মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার পেয়েছেন ওই বছরেই। ‘চৈতন্য অন্তর্ধান রহস্য’ বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত ২০১৬-তে। ঈশ্বরবিশ্বাসী অথচ যুক্তিবাদী । ভালোবাসেন স্রেফ বই পড়তে আর ভালোমন্দ খেতে।

দরজাটা খুলে গেল। খোলাই ছিল। ভাবতেও পারিনি খোলা থাকবে। সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিলাম। এত সহজে খুলে গেল দেখে খানিকটা ঘাবড়েই গেলাম। তবে কি সেবারের মতো এবারও কেউ রয়েছে দরজার বাইরে?

চৌকাঠ পেরোলাম। তাজা বাতাস এসে ধাক্কা দিল চোখেমুখে। সেইসঙ্গে আবায়ার নীচের দিক ধরে কেউ যেন টানল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে কাকুতি, “আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে একটু হাওয়া পাব বলে…”

চোখ বন্ধ রেখেছিলাম। খুলে বুঝলাম কেউ কোথ্থাও নেই। নীচের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, হাওয়ার দমকে দরজাটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আর তাতেই আটকে গেছে আবায়ার নীচের একটা কোণা।

এটুকু বোঝা ইস্তক ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছি আমি। কোনদিকে যাব বুঝে পাচ্ছি না। তবু চিৎকার তো দূর অস্ত, টুঁ শব্দটুকুও করছি না। নিঃশ্বাসের শব্দটুকুও যেন কারও কানে না যায়। ইসলামিক স্টেটে তো অনেক দেখেছি। বুঝেছিও অনেক। আমার অভিজ্ঞতা আমাকে চুপ করে থাকতে শিখিয়েছে। চুপ মানে একদম চুপ। নিঃসীম নৈঃশব্দ্যে আত্মসমর্পণ।

Banglalive-8

সেটা ছিল ২০১৪র আগস্ট মাস। আইসিস, মানে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা দখল নিয়েছিল আমাদের গাঁয়ের। মাস দুয়েক অবরোধের পর একেবারে ঢুকে পড়েছিল কোচোতে। কোচো একটা ছোট্ট ইয়েজদি গ্রাম। উত্তর ইরানের সিঞ্জর পাহাড়ের দক্ষিণেআমরা মুসলমান নই, খ্রিস্টানও নই, ইয়েজদি। একেশ্বরবাদী। কুরমাঞ্জি কুর্দিশ ভাষায় কথা বলি। ময়ূর ফেরেস্তা, মেলেক তাউসের উপাসক আমরা। সেই আমাদের গ্রামে।

Banglalive-9

আমি মোবাইলে ফোন করেছিলাম মাস্টারজিকে। আমাদের স্কুলের মাস্টারমশাই। কোচোর নন, মসুলের মানুষ। ইয়েজদি ইরানি নন, সুন্নি আরব। ওঁর নম্বরটা লেখা ছিল আমার একটা স্কুলের বইয়ের পেছনের মলাটে। ইসমাইল ওর ফোনটা এনেছিল। তাতেই টিপলাম মাস্টারজির নম্বর।

মেরহবা উস্তাদ মহম্মদ।

একেবারে চোস্ত আরবিতে সম্ভাষণ।

কে বলছেন?

ওপ্রান্তের আওয়াজে অপরিচিত শীতলতা।

আমি নাদিয়া বলছি। নাদিয়া, উস্তাদজি। কোচো থেকে।

আমি তখন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি।

নাদিয়া! কী ব্যাপার?

মাস্টারজির গলাটা কেমন যেন অধৈর্য শোনাল।

মাস্টারজি! আমাদের স্কুলটাকে নাকি লাল রং করে দেওয়া হয়েছে! সত্যি? আর আমার ভাইঝি বাসো। চিনতে পারছেন উস্তাদজি? ওকে ধরে নিয়ে গেছে আইসিস জঙ্গিরা। নিয়ে গেছে তেল অফরে। এটুকু কেবল জানতে পেরেছি আমরা। গাঁ ছাড়ার উপায় নেই আমাদের। ওরা আমাদের গ্রামেও ঢুকে পড়েছে। সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কেউ পালাবার চেষ্টা করলেই তাকে জানে খতম করে দেওয়া হবে। আপনি শুধু বাসোর খবর যদি একটু জোগাড় করে দেন

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেললাম। ওপারে তখন অপার নীরবতা। বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী হয়েছে। আইসিস জঙ্গি, মানে দায়েশরা মাস্টারজির গলায় ছুরি ধরেছে? নাকি উনি আমার কথাগুলো শুনতেই পাননি? টাওয়ারের গণ্ডগোল? ফোনের সিগন্যাল কথা বলার মাঝখানে চলে গিয়েছে? না কি ইসমাইলের ফোনের ব্যালেন্স ফুরিয়ে গিয়েছে? এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই ওদিক থেকে মাস্টারজির গলা ভেসে এল। কিন্তু সে এক অন্যরকম গলা। কয়েক মাস আগেও আমরা যাঁর কাছে পড়তাম, আমরা যাঁকে চিনতাম, ইনি যেন তিনি নন। অন্য কে‌উ, অচেনা অজানা কেউ। অনেক দূর থেকে আসা শব্দের মতো ভেসে এল সেই কণ্ঠস্বর। প্রায় ফিসফিসানি একটা আওয়াজ।

তোমার ভাইঝিকে নিয়ে চিন্তা কোরো না। ওরা ওকে ধর্ম বদলাতে বলবে। যদি বদলায়, কেউ না কেউ ওকে বিয়ে করে নেবে

সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, কেউ নেই, কিছু নে‌ই, সূর্য নিভে গেছে। এতদিন ধরে ইসমাইলের মোবাইলটাকে মনে হত একটা অবলম্বন। মনে হত, ওটাকে ভরসা করা যায়। চরম বিপদে পড়লে ওটাকে আঁকড়ে বিপদ থেকে ওতরানো যায়। কিন্তু সেদিন মনে হয়েছিল, ওটা কোনও কাজের নয়। বেবাক ফালতু প্লাস্টিকের তৈরি একটা জিনিস। ইসমাইল আমার মুখচোখ দেখেই সব বুঝে গেল। মাস্টারজির উদ্দেশে একটা নোংরা গালি দিল রাগে আর ক্ষোভে। তার পর গভীর হতাশায় বলে উঠল, “কত ডাকছি। ডেকেই চলেছি। কোনও শালা সাড়াই দিচ্ছে না।” সেই প্রথম বুঝতে পারলাম, ডাকলেও ভরসার লোক যে সাড়া দেবেই, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

আর চিৎকার করেছিলাম সেদিন, যেদিন আমাদের বাসে তোলা হয়েছিল। আমাদের মানে কোচো গাঁয়ের মেয়েদের। দায়েশদের হুকুম মেনে গাঁয়ের সব মেয়েদের একটা জায়গায় জড়ো হতে হয়েছিল। সবাইকে এক এক করে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল, ধর্মান্তরিত হতে ইচ্ছুক কি না। বাকিদের মতো আমিও মাথা নেড়ে আপত্তি জানিয়েছিলাম। ওরা বলল, “তবে বাসে ওঠ।” বাসটা বেশ বড়োসড়োই ছিল। প্রায় চল্লিশটা সিটের সারিপ্রতিটিতে ছজন করে বসতে পারে। আমাদের ওপর নজরদারি করার জন্য ছিল আবু বাতাত। লম্বা, সাটপাট চেহারা। বয়স ৩০৩৫ বছরের আশেপাশে। বাসের মধ্যে পায়চারি করতে করতে ও শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল। নোংরামি করছিল। শুধু আমার সঙ্গে নয়। প্রায় সবার সঙ্গে। প্রথম প্রথম চকিতে। তার পর আস্তে আস্তে সময় বাড়াচ্ছিল। হাত দিয়ে চেপে ধরার জায়গাগুলো বদলে যাচ্ছিল। সবাই সহ্য করছিল। আমিও। দাঁতে দাঁত চেপে। একবার, দুবার, আরও বেশ কয়েকবার। মনে পড়ে যাচ্ছিল মায়ের কথা। যেখানেই যাই না কেন, মা বের হওয়ার ঠিক আগে একবার দেখে নিতেন পোশাকআশাক ঠিকমতো পরেছি কি না। কোথাও এতটুকু বেচাল আছে কি না। কতবার মা বলেছে, “জামার বোতামগুলো ঠিক করে লাগাও নাদিয়া। নইলে সবাই তোমায় বেহায়া বলবে যে” আর সেদিন ওই জঙ্গিটার বেহায়াপনায় আমার আব্রু আহত হচ্ছিল মুহূর্মুহূ। সিঁটিয়ে বসে থাকতে থাকতে আচমকা সহ্যের বাঁধ গেল ভেঙে। গলায় সব শক্তি জড়ো করে চেঁচালাম। বাসের ভেতরকার অস্বস্তি জড়ানো নীরবতা মুহূর্তে ভেঙে খানখান। হঠাৎ বাকি মেয়েরাও চেঁচাতে শুরু করল। তারস্বরে। আবু বাতাত হকচকিয়ে গা থেকে হাত সরিয়ে নিল। ড্রাইভারটা ছিল তুর্কি। সেও থতমত খেয়ে জোরে ব্রেক কষল। বাসটা থেমে গেল। খানিকক্ষণ পর আবু বাতাত চেঁচিয়ে উঠল, “চুপ। একদম চুপ।” চিৎকার থামল না। থামার কোনও লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল না। আমি তখন বেপরোয়া। কী করবে আমায়? মেরে ফেলবে? ফেলুকআমি আর ভয় পাই না। গ্রামের পুরুষদের তো ওরা মেরেই ফেলেছে। আমাকেও বড়জোর মেরেই ফেলবে। আমি তখন মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি।

বাসটা থামতেই সামনের সাদা গাড়িটাও গেল থেমে। নেমে এল নাফা। সোলাঘ থেকে আসা জঙ্গি। আমাদের বাসে উঠে এল। আমার বুকের ভেতর তখন দিদ্রিম দিদ্রিম। জঙ্গি হতে পারে। নিষ্ঠুর হতে পারে। নামাজী মুসলমান তো বটে। মেয়েদের ইজ্জত নষ্ট হচ্ছে জানলে নির্ঘাৎ ব্যবস্থা নেবে। “কে শুরু করল এসব চেঁচিমিচি? কে?” বাসে উঠেই নাফা জিজ্ঞেস করল। আবু বাতাত আঙুল তুলে আমাকে দেখিয়ে দিল। আর কারোকে কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমি হুড়মুড়িয়ে বলতে শুরু করলাম।

তোমরা আমাদের বাসে তুলেছ। উঠেছি। কোথায় নিয়ে যাচ্ছ, কেন নিয়ে যাচ্ছ, জিজ্ঞেসও করিনি। কিন্তু ওই লোকটা ক্রমাগত অসভ্যতা করে চলেছে

আবু বাতাতকে দেখিয়ে আমি বলে গেলাম লোকটা ঠিক কী কী করছিল আমার সঙ্গে। আমাদের সঙ্গে। এতটুকু লজ্জা পেলাম না। একবারের জন্যও দ্বিধা করলাম না।

নাফা সব শুনল। আমি বলা থামানোর পর খানিকক্ষণ নীরবতা। নাফা চুপ। গর্জে উঠল আবু বাতাত, “অসভ্যতা! তোদের সঙ্গে! তোরা জানিস না কেন তোদের এখানে আনা হয়েছে? সত্যি জানিস না?” তার পর আমার ঘাড় ধরে আমাকে সিটে বসিয়ে দিল। বন্দুকের নল ঠেকিয়ে দিল আমার কপালে। আমার আশেপাশের মেয়েরা তখন ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছে। আবু বাতাত বলে উঠল, “চোখ বন্ধ করেছিস কী গুলি চালিয়ে দেব।” অগত্যা খোলা চোখে দেখলাম, নাফা বাস থেকে নেমে যাচ্ছে। নামার আগে একবার ঘাড়টা ঘোরাল। এবার নিশ্চয় নাফা আবু বাতাতকে সতর্ক করে দেবে। মেয়েদের সঙ্গে সহবতের প্রাথমিক পাঠ মনে করিয়ে দেবে।

আমি জানি না তোমরা কী ভেবে রেখেছ। যদি না জান তবে জেনে রাখ। তোদের সাবায়া করব বলে এনেছি। সাবায়া। বুঝলি। ঠিক যা বলছি তাই করবে। না হলে ভুগতে হবে ।

সাবায়া’ একটা আরবি শব্দ। একবচন ‘সাবিয়া’। মানে ‘যৌন দাসী’। সেই প্রথম শব্দটাকে আমার সম্বন্ধে ব্যবহার হতে শুনলাম। সেই প্রথম টের পেলাম, চিৎকার করে সাড়া পেলেই যে কাঙ্ক্ষিত ফল পাব, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।

এখন তাই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছি। হাঁফের শব্দটাও চেপে রেখে।

দৌড়। দৌড়। পায়ে আমার হাজি সলমনের দেওয়া চটি। পুরুষদের চটি। হাজি ওটাই দিয়েছিল। হাজি সলমনই প্রথম আমাকে ধর্ষণ করেছে। রাতের দাসী বাজার থেকে ওই আমাকে প্রথম কিনেছিল। দিন নেই রাত নেই, আমার ওপর অত্যাচার করত। শ্রম আর শরীর, দুটোই দিতে হত ওকে। ওই আমাকে চাবুক মেরে সারা গায়ে পিঠে ফালা ফালা করে দিয়েছিল। সেই দাগ এখনও লাঞ্ছনার চিহ্ন হয়ে দগদগ করছে আমার শরীরে।

সেদিন হাজি সলমনের বাড়িতে অনেক লোক। নীচের তলায় ওদের সবাইকে চা করে দিয়েছিলাম। তার পর হাজি আমাকে ওপরে, মানে দোতালায় পাঠিয়ে দিল। বাড়িটা দোতালা বটে, তবে বেজায় উঁচু নয়। মসুলের বাড়িগুলো এরকমই হয়। জানালার নীচে ইঁটের তৈরি সিঁড়ির মতো ধাপ। ওগুলো বেয়ে নামতে পারলে একেবারে বাগানেবেশ কিছুদিন ধরে প্ল্যানটা মাথায় ঘুর ঘুর করছিল। জানালা থেকে বাগান। আর গার্ডদের চোখে ফাঁকি দিয়ে বাগানটা একবার পেরোতে পারলেই আমার মুক্তি আলোয় আলোয়। ভেবেছিলাম সেদিনটাই উপযুক্ত সময়। সবাই নীচের তলায় ব্যস্ত। এটাই মোক্ষম সুযোগ। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম। যে গার্ডটা রোজ বিকেলে বাগানে টহল দেয়, তাকে দেখতে পেলাম না। চোখে পড়ল একটা তেলের টিন বাগানের পাঁচিলে কাত হয়ে হেলে আছে। মনে মনে ঠিক করলাম ওটাকেই সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করব, টপকাব বাগানের পাঁচিল। নিকাব নেই। তাতে কী হয়েছে? সন্ধে নামছে । রাস্তাঘাটে লোকের ভিড় কমছে। কেউ অত খেয়াল করার আগেই কারোকেনাকারোকে পেয়ে যাব যে আমাকে বাঁচাবে এই নরপিশাচ জঙ্গিদের কবল থেকে। এরকম নানা হিসেবের আনাগোনা মনের কন্দরে। এর মধ্যে অন্তর্বাসে গুঁজে নিলাম মায়ের রেশন কার্ডটা। আমার নাগরিকত্বের একমাত্র প্রমাণ। বাকি সবকিছু পড়ে রইল। খোলা জানলা দিয়ে একটা পা বাড়ালাম। ভীষণ সতর্কভাবে। তারপর আর একটা। তারও পর জানলা দিয়ে গলিয়ে দিয়েছিলাম শরীরটা। মাথা আর হাতপা তখনও ভেতরেপা দিয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করছি সিঁড়ির ধাপ। এমন সময় গুলির শব্দ। পুরুষকণ্ঠে চিৎকার, “ভেতরে যাও।“ তড়িঘড়ি সারা শরীরটা গুটিয়ে ঘরের ভেতর। মেঝের ওপর পড়েছি কি পড়িনি, খুলে গেল ঘরের দরজাটা। হাজিকিছু বোঝা বা কৈফিয়ৎ দেওয়ার আগে সপাং সপাং চাবুকের বাড়ি। লাফ মেরে বিছানায়। কাতরাচ্ছি। কাতরাতে কাতরাতে কম্বল গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলাম। তাতে কী? হাজি সলমন মেরেই চলল। মেরেই চলল। কম্বল খুলে নিল। পোশাকের আস্তরণটুকুও। নগ্ন শরীরতার ওপরেই সপাং সপাং। এতক্ষণ চেঁচাচ্ছিল হাজি সলমন। আচমকা চাবুক মারা থামাল। তারপর অতি ভদ্র, মাখন মোড়া গলায় বলল, “তোকে বলেছিলাম নাদিয়া, পালানোর চেষ্টা করলে আমার চেয়ে খতরনক আর কেউ হবে না। এবার সেটা টের পাবি।“ বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল হাজি। তখনও যন্ত্রণায় ককিয়ে চলেছি। ঘরে ঢুকল তিন জন। মোর্তেজা, ইয়াহায়া আর হোসাম। হাজির তিন রক্ষী। ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। এক এক করে। ছিঁড়েখুঁড়ে খেল আমাকে। প্রথমে আটকানোর চেষ্টা। তার পর হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ। ওদের গায়ের জোরের কাছে হার মানা। কোচোতে আমার আঙুলে একটু ছ্যাঁকা লাগলেও আমি চিৎকার করে কাঁদতাম, “মা! খয়রি, ভাই আমার!” ওরা ছুটে আসত। শুরু করে দিত শুশ্রূষা আর সান্ত্বনা। মসুলেও, নির্যাতিতা হতে হতে, কাঁদতে কাঁদতে, আমি ওদের ডাকছিলাম। ডেকেই যাচ্ছিলাম। কেউ ছুটে এল না। বুঝলাম আমার চেনা দুনিয়াটা ভেঙেচুরে গেছে। আমি এখন কেবল অশ্রুমুখী। জানাই ছিল। তবু সেদিন আরও ভালো করে টের পেয়েছিলাম।

তাই আজ আমার চুপদৌড়। শব্দহীন দ্রুতি। জানি না কোথায় যাব, কোন দরজায় কড়া নাড়ব ? প্রতিদিন মসুলে লোক মরছে। কেউ বিরোধিতা করলেই জঙ্গিরা খতম কয়ে দিচ্ছে। ইয়েজদি মেয়েদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। মসুলে সুন্নি মুসলমানদের বাস। কিন্তু কেউ টুঁ শব্দটিও করছে না। চুপচাপ সবকিছু মেনে নিচ্ছে। এই যেখানে রোজকার স্বাভাবিকতা, সেখানে কে আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসবে? এ শহরে এসেছি আবু মুয়াওয়ার হাত ধরে। হাজি সলমন ওর কাছে আমাকে বেচে দিয়েছে। দিনের পর দিন লোকটা আমার ওপর অত্যাচার করেছে। সকাল বিকেল রাত্রি, কোনও সময়ের বাছ বিচার করেনি। বাড়িতে না থাকলে বন্ধুদের, সাথীজঙ্গিদের ঢুকিয়েছে আমার ঘরে। আজ আচমকা সুযোগ পাওয়ামাত্র পালিয়েছি। এই অচেনা, স্রেফ নামটুকুজানা শহরে। জঙ্গি শাসিত মসুলে। নরক থেকে বাঁচার সুযোগ মেলার আশায়।

এরই মধ্যে সূর্য অস্ত গেল। ঘণ্টা দুয়েক কেটে গিয়েছে। আর ছোটার ক্ষমতা নেই। পায়ে টান ধরেছে। যন্ত্রণা করছে। একটা বড়ো সবুজ রঙের দরজার সামনে দাঁড়ালাম। কাঠ নয়, ধাতুর তৈরি দরজা। দুবার ধাক্কা দিলাম। সেকেণ্ডের মধ্যে দরজাটা খুলে গেল। একজন লোক দাঁড়িয়ে। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। “কে?” কোনও উত্তর না দিয়ে ঢুকে গেলাম। ভেতরে একটা বাগান। বাড়ির সবাই সেখানে বসে। চা খাচ্ছে, ঘরোয়া আড্ডা দিতে দিতে।

দয়া করে আমাকে বাঁচান। আমার নাম নাদিয়া। নাদিয়া মুরাদ। সিঞ্জরের মেয়ে। দায়েশরা আমাকে এখানে সাবিয়া করে নিয়ে এসেছে। আমার পরিবারের সকলকে ওরা মেরে ফেলেছে। বলতে বলতে চোখ পড়ল লোকগুলোর ওপর। মুখে দাড়ি। পরনে ঢিলেঢালা কালো পাজামা। মেয়েদের পোশাকও রক্ষণশীল মুসলমান ঘরনার। ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতরটা। এরাও আইসিস সমর্থক নয়ত! মনে হওয়া মাত্র চুপ করে গেলাম।

সেই বাড়িতেই আশ্রয় জুটল। ওই সন্দেহভাজন মানুষগুলোই পরম স্নেহে কাছে টেনে নিলেন। পরে জেনেছি, ওঁরাও সুন্নি মুসলমান। বুঝেছি, ধান্দাবাজ ধর্মান্ধ স্বার্থসচেতন দুনিয়াতেও মানবিকতার ধারা, সংবেদনশীলতার ঢেউ চুপিচুপি প্রবহমান থাকে। প্রকট না হলেও তা শুকিয়ে যায় না। ফুরিয়ে যায় না। ওই বাড়ির ছেলে নাসির আমাকে মুসল থেকে বের করে আনে। ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিদের কবজায় থাকা এলাকা থেকে প্রথমে কুর্দিস্তানে, সেখান থেকে জার্মানিতে আসি আমি। তার পর, ২০১৫র নভেম্বরে আমি যাই সুইৎজারল্যান্ডে। রাষ্ট্র সংঘের সংখ্যালঘু ফোরামের সভায়। সেই প্রথম কয়েকশ মানুষের সামনে তুলে ধরলাম ছবিটা। যে ছবিটা বাদবাকি দুনিয়ার তেমনভাবে জানা ছিল না, সেই ছবিটাই অকপট করলাম আমি। সব বললাম। সব্বার কথা। আইসিস জঙ্গিদের কবল থেকে পালাতে চাওয়া যে বাচ্চাগুলো ডিহাইড্রেশনে মারা পড়েছে, তাদের কথা। পাহাড়ের কোলে যে পরিবারগুলো আটকে আছে আজও, তাদের কথা। যে হাজার হাজার নারী ও শিশু এখনও আইসিস জঙ্গিদের হাতে বন্দি, নিত্য নির্যাতনের শিকার, তাদেরও কথা। আমার ভাইপো মালিকের মতো যে দেড় হাজারের কাছাকাছি কিশোরদের জঙ্গিরা বন্দি করে রেখে জেহাদি হওয়ার ট্রেনিং দিচ্ছে, তাদের কথাও। আমার কথা, আমার কষ্ট, আমার কান্না তো আলাদা কিছু নয়ওদের সবার কথা, কষ্ট, কান্নারই একটা টুকরোমাত্র। জার্মানিতে আসার আগে জানতামই না রোয়ান্ডা নামে কোনও দেশ আছে। এখন জেনেছি সেখানেও মেয়েদের নির্যাতিতা হতে হয় স্রেফ যুদ্ধবাজদের শক্তি ফলানোর তাগিদের কারণে। বুঝেছি, আমার কাহিনি কিংবা আমার মতো ইয়েজদি মেয়েদের কাহিনি, কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়এ এক নিত্য সত্য, ঘটমান বর্তমান। একটা বিরাট অশ্রুনদীর শাখামাত্র।

বিশ্বাস করুন, আমি এতকিছু জানতে, বুঝতে, বলতে, বোঝাতে চাইনি। এত এত লোকের সামনে লজ্জা, রাগ আর জেদের কথা বলব বলে বক্তৃতার মঞ্চে ওঠার কথা কল্পনাও করিনি। গাঁয়ের মেয়ে আমিজঙ্গিদের কবলে পড়ার আগে কোনওদিন গ্রামের বাইরে পা দিইনি, দেখিনিকো কোনও বড়ো শহর। ক্লাস ইলেভেন পাস করেছিলাম। টুয়েলভের পড়া তৈরি করছিলাম। ভেবেছিলাম, বিউটিসিয়ানের কোর্স করে একটা সাঁলো খুলব। ব্যস, এইটুকুই।

এখন আমার চাওয়াগুলো বদলে গিয়েছে। আমি চাই, যারা আমাকে, আমার মতো ইয়েজদি মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, তাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতেআমি চাই, ওদের সবাইকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আদালতে টেনে আনতে। ন্যায় বিচার পেতে। আমি চাই, দেশে দেশে মেয়েদের ওপর অত্যাচারকে লড়াইয়ের হাতিয়ার করা বন্ধ হোক। আর আমি চাই, আমার মতো জীবনকাহিনি যেন আর কারও না হয়। এ ব্যাপারে আমি শেষতমা হতে চাই।

# দায়েশ: ‘আলদাওলা আলইসলামিয়া আলইরাক আলশাম’এর সংক্ষিপ্ত রূপ। আরবি ভাষায় ইসলামিক স্টেট বা আইসিস নামক জঙ্গি সংগঠনের নাম।

[তথ্য সূত্র: ‘ দ্য লাস্ট গার্ল’; নাদিয়া মুরাদ; ভিরাগো (২০১৭)]

আরও পড়ুন:  পরীক্ষা যখন নকলি কাঁথার মাঠ

NO COMMENTS