মামার দোকান থেকে বিতাড়িত‚ নবীন ময়রার আজীবন কেটেছিল ভাড়াবাড়িতেই

কাশী মিত্র ঘাটের কাছে পারিবারিক ব্যবসা চিনির | কিন্তু বাড়ির কারও মুখে যেন তার একফোঁটাও নেই | অন্তত বালক নবীন আর তার স্বামীহীনা মায়ের প্রতি | একান্নবর্তী পরিবারের এক কোণায় ঠাঁই | মায়ের জঠরেই সেই শিশু পিতৃহীন | স্বচ্ছলতা না হলেও যৌথ পরিবারে খাওয়া-পরা-মাথা গোঁজার অভাব নেই ঠিকই | কিন্তু সম্মানের আছে | একরত্তি বয়সেই বুঝতে পারত নবীন‚ সংসারে তারা অনাহূত | 

বাড়ি থেকে বেরোনোর সুযোগ এল খুব তাড়াতাড়ি | আনন্দে নয়‚ বাধ্য হয়ে | পারিবারিক ব্যবসা থেকে অংশীদারী চলে গিয়েছিল কবেই | নিজের আর মায়ের অন্নসংস্থানের জন্য এ বার কিশোর নবীন কাজে লাগল | চিৎপুরে দোকান ছিল এক জ্ঞাতি মামার | সেখানেই কাজে ঢুকল নবীন | কিন্তু কদিন পরেই ভাগ্নের কাজকে অকাজ বলেই মনে হতে লাগল মামার | মোদক বেচার থেকে ভাগ্নের মন পড়ে থাকে নিত্যনতুন মিষ্টি তৈরির দিকে | এটার সঙ্গে ওটা‚ আবার ওটার সঙ্গে সেটা মিশিয়ে নতুন নতুন মিষ্টি না বানালে ভাগ্নের শান্তি নেই | 

ভাগ্নের মন নেই বিক্রিবাটায় | নতুন মিষ্টি বানাতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে বেশি | লাভের গুড় যেন সত্যি খেয়ে যাচ্ছে পিঁপড়ে | অতএব পত্রপাঠ বিদায় | মামার দোকান থেকে বিতাড়িত‚ মধুসূদন দাসের একমাত্র পুত্র  নবীন নতুন দোকান শুরু করল জোড়াসাঁকোয় | মায়ের গয়নাপত্র‚ সম্বলের অনেকটাই চলে গেল সেখানে | এক বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারিতে দোকান | অংশীদারী ভাঙল | দোকানও বন্ধ হল | কিন্তু নবীনের জেদও ভাঙল‚ কিন্তু মচকালো না | ততদিনে তিনি যুবক | নতুন উদ্যমে দোকান দিলেন চিৎপুরে‚ মামার দোকানের ঠিক উল্টোদিকে | 

ছেলের আব্দারে মা প্রায় নিঃস্ব | কিন্তু নবীন কথা দিয়েছেন তিনি সব ফিরিয়ে দেবেন | মিষ্টি বানিয়ে | তাঁর রক্তেই মিষ্টি ঐতিহ্য | বাবার দিকে পূর্বপুরুষের বাস ছিল বর্ধমানে | পরে কলকাতায় এসে চিনির ব্যবসা | মামাবাড়ি ছিল শান্তিপুরের দিকে | এবং তাঁরা ছিলেন ময়রা |

নতুন দোকান তো দিলেন নবীন | কিন্তু নতুন মিষ্টি তৈরির নেশা তো গেলই না‚ বরং আরও বেড়ে গেল | এখন তো আর কেউ বলারও নেই  যে‚ কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে | সুতরাং চালাও পানসি পরীক্ষা নিরীক্ষার জলে | 

তখন সিপাহি বিদ্রোহের পরে আরও নটা বছর কেটে গেছে | জোড়াসাঁকোয়‚ শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গুটি গুটি চলতে শুরু করল নবীন ময়রার দোকান | তিনি ততদিনে আবিষ্কার করেছেন কস্তুর পাক | কড়া আর নরম পাকের মাঝামাঝি | বেশ বিক্রি হয় সেই পাকের মিষ্টি | কিন্তু সবই যে রসহীন | অনেক ক্রেতাই আর্জি জানান‚ রসের মিষ্টান্ন থাকলে মন্দ হয় না | নবীন ময়রারও সেরকমই ইচ্ছে | বহুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন | কিন্তু সফল হচ্ছেন না | ছানার গোল্লা রসে পড়ছে | কিন্তু শেষপর্যন্ত ইচ্ছেপূরণ হচ্ছে না | করতে গিয়ে যা ছানা নষ্ট হচ্ছে‚ তা দিয়ে বরং বৈকুণ্ঠ ভোগ বানিয়ে ফেললেন নবীন ময়রা | কিন্তু যা ভাবছেন‚ তা আর হচ্ছে না |

এভাবে করতে করতেই একদিন হল | নবীন ময়রার সামনেই কড়াইয়ে জন্ম নিল রসগোল্লা | আবিষ্কারের পরে কিন্তু ভিনি-ভিডি-ভিসি হয়নি | বরং অপেক্ষা করতে হয়েছে | অবশেষে একদিন ফিটন গাড়ি এসে থামল নবীন ময়রার দোকানের সামনে |  

যাচ্ছিলেন ভগবানদাস বাগলা | রাজস্থানের চুরুর বর্ধিষ্ণু কাঠ ব্যবসায়ী | দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর নাতির গলা শুকিয়ে কাঠ | একটু জল না হলেই নয় | নিরামিশাষী পরিবার মোদকের দোকান থেকেই জল চাওয়া উপযুক্ত বলে মনে করল | বাঙালি পরিবার থেকে তো আর শুধু জল দেওয়া যায় না | সঙ্গে এল রসের মিষ্টি | সাদা নিটোল সেই মিষ্টি খেয়ে শিশু তো আত্মহারা | এমন মিষ্টি সে আগে খায়নি | তার কথায়  সেই মিষ্টি খেলেন স্বয়ং ভগবানদাসও | তিনিও ক্লিন বোল্ড | খেলেন এবং সঙ্গে কিনেও নিয়ে গেলেন প্রচুর রসগোল্লা | 

সেটা ১৮৬৮ | মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ল বাঙালির একান্ত আপন রসগোল্লা | এবং আজও অবাঙালি ক্রেতাই বেশি কেনেন রসগোল্লা | বাঙালির বেশি আকর্ষণ সন্দেশে | জানাচ্ছেন নবীনচন্দ্র দাসের উত্তরপুরুষ ধীমান দাস | তাঁদের শিরোপায় রসগোল্লার পাশাপাশি ঝলমল করছে দেদো সন্দেশ আর আবার খাবো-র পালকও | আজও প্রতিদিন বাগবাজারে সারদা মায়ের বাড়িয়ে ভোগ হিসেবে যায় দেদো সন্দেশ | তাঁর প্রিয় মিষ্টি ছিল এটি | দেদো-র নামকরণ কীভাবে হয়েছিল‚ জানা নেই | তবে আবার খাবো-র নাম দিয়েছিলেন স্বয়ং কাশিমবাজারের মহারানি | 

বাড়িতে আগত অতিথির জন্য ফরমায়েশ করেছিলেন এমন মিষ্টির যা আগে হয়নি | শুনে নবীন ময়রা কস্তুর পাকের উপরে ছড়িয়ে দিলেন এলাচ‚ সরের স্তর আর ডাবের শাঁস | নাম না হওয়া মিষ্টি গেল মহারানির কাছে | কেমন হয়েছে ? রানিমা উত্তর দিলেন‚ আবার খাবো | আজও কে.সি দাস-এর রেকাবি আলো করে থাকে আবার খাবো |

নবীনচন্দ্র দাসের বপন করা বীজ আজ কে. সি দাস নামের মহীরুহ | আপনভোলা নবীন ময়রার নেশা ছিল নতুন নতুন মিষ্টি তৈরি | সেইসঙ্গে লোককে খাওয়ানো | সংসারের হাল ছিল স্ত্রী ক্ষীরোদমণির হাতে | তিনি শক্ত হাতে ধরেছিলেন রাশ | সেই বাঁধুনি বজায় ছিল স্বামী চলে যাওয়ার পরেও | ১৯২৫ সালে প্রয়াত হন নবীনচন্দ্র দাস | আজীবন কাটিয়েছিলেন ভাড়া বাড়িতেই | তাতে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ ছিল না | নতুন নতুন সৃষ্টিতেই মজেছিলেন তিনি | স্বামীর ভাবগতিক বুঝেই পদক্ষেপ করেছিলেন ক্ষীরোদমণি | হবে না-ই বা কেন ? তিনিও যে ছিলেন ভোলা ময়রার নাতনি | 

মধ্য কলকাতায় আজ যে রসগোল্লা ভবন‚ তা তৈরি হয়েছিল ক্ষীরোদমণির তত্ত্বাবধানেই | ততদিনে ব্যবসাকে আরও মজবুত কাঠামোয় রূপ দিয়েছেন নবীনচন্দ্র দাসের একমাত্র পুত্র‚ কৃষ্ণচন্দ্র দাস | তস্য পুত্র সারদাচরণ দাস ছিলেন স্যর সি. ভি রমণের সহকারী | বাবার কথায় মন দেন পারিবারিক ব্যবসায় | বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান প্রয়োগ করেন সেখানেই | তাঁর বাবা কৃষ্ণচন্দ্র চেয়েছিলেন যথাযথ ভাবে রসগোল্লা সংরক্ষণ | ছেলে সারদাচরণ ছিলেন বাবার যোগ্য সঙ্গত | এল ক্যানবন্দি রসগোল্লা | আজকের ধর্মতলা‚ সেদিনের পুরোদস্তুর ফিরিঙ্গিপাড়ায় দোকান শুরু করলেন সারদাচরণ | দোকানের নাম হল কে.সি দাস অ্যান্ড সন্স | শালপাতার পরিবর্তে এল কেক বক্স | ঘেমো হাতের বদলে সাদা গ্লাভস শোভিত ওয়েটার | ময়রার গরম উনুন থেকে মিষ্টি এসে পড়ল সাহেবিয়ানার মোড়কে | 

জীবনভর অপমানের মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়েছিল নবীন ময়রার রস টইটম্বুর কড়াইয়ে | তাঁর ইউরেকা বাঙালির কাছে কলম্বাসের আবিষ্কারের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ | কলম্বাসের আবিষ্কৃত ভূখণ্ডেও সুরসিক বাঙালির মিষ্টিমুখ মানেই তিনি | শতাব্দীপ্রাচীন এই মধুচন্দ্রিমার মিষ্টত্ব কমাতে অক্ষম মধুমেহও |  

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here