নোনতা পানি

(যেখানে এখন শুধুই মর্টার, মেশিনগান আর ব্যালেস্টিক মিসাইলের ঝলকানি, সেখানে ছিল বার্লি আর বরবটির সবুজ ক্ষেত !পেট্রোলিয়াম লুঠেরাদের আকাশ থেকে ছুঁড়ে দেওয়া বোমাবর্ষনে যে জনপদ এখন ধ্বংসস্তুপ, সেই ধ্বংসস্তুপের তলায় আরো কয়েক মিটার মাটির নীচে ডুবে আছে আরো অনেক শতাব্দীর পুরনো ভাঙা খিলান , মুখ থুবড়ে পড়া গম্বুজ ,কলোসিয়াম , আম্ফিথিয়েটার ! ইটের গাঁথনি, ব্যাসল্টের তৈরি, মার্বেল পাথরে নির্মিত, রূপোয় মোড়া, স্বর্নখচিত, রোমান মূর্তিস্ট্যাচুসমাধি,বাইজেন্তাইন প্রাসাদ স্থাপত্য ! বারুদের ধোঁয়ায় সমাচ্ছন্ন যে চবুতরায় হয়তো আর মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই আরো কয়েকশো শহরবাসীকে খুলে আমকোতল করা হবে, সেই চবুতরায় একদিন জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার আসর বসত! এদেশে প্রতি সপ্তাহের শেষদিনে প্রকাশ্য বাজারে ৮৫০ বছর বয়সী ভূমিকন্যাদের দাঁড়িপাল্লায় তোলার ফতোয়া বলবত হলো এই তো সেদিন, যৌনদাসী হিসাবে, ইন্টারনেটে আর দেওয়াল পোস্টারে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে! সে দেশের আব্বাজানের দিলএ তার সন্ততিদের জন্য যে দরদ তা শুধু অন্নপূর্নার জন্য গিরিরাজের মনখারাপের সঙ্গে তুলনীয়! যে দেশের প্রত্ননাম আসিরিয়া! আপনাদের সামনে হাজির সুপ্রাচীন সিরিয়ার দুর্লভ লোকগল্পের টাটকা বাংলা অনুবাদ, ভালবাসায় আর কারুণ্যে  চিরনতুন!)

অনেক অনেক দিন আগেকার কথা, সিরিয়ার দক্ষিণে জর্ডন সীমান্ত ঘেঁষা সয়েদাউ তখন ছিল রমরম ব্যবসা বানিজ্য আর হইহই জীবনযাত্রার উচ্ছল এক শহর!  শেহির আল সয়েদাউ থেকে উত্তরপথে মাত্র ২৫ কিলোমিটার গেলে কোরেদান (গ্রাম) আতিল! রাস্তার দুধারে  সুপ্রাচীন রোমান সভ্যতার প্রত্নচিহ্ন! এখানে সেখানে আগাছায় ঢাকা মাটির ঢিবির নিচ থেকে উঁকি মারছে মাটি পুড়িয়ে গোলাকার ইট দিয়ে তৈরি দেওয়ালের ধ্বস্ত অবশেষ ! ভাঙা খিলান,মুন্ডু কাটা ব্যাসল্ট মূর্তি ,ছাদহীন কলোসিয়াম, গম্বুজ, স্তম্ভ, আম্ফিথিয়েটার ! সেই রাস্তায় হেঁটে চলেছে আনবার আতিল ইবনা! আতিল গ্রামের সন্তান আনবার মিঞা! আনবার হলো চাষার বেটা চাষা ! আতিল থেকে সে চলেছে বহুদূরের কানবাত গ্রামে! সঙ্গে সুজনিতে বাঁধা শুকনো ফল, শুকনো নোনতা মাংস আর রুটি!  কাঁধে পশুচামড়ার ভিস্তিভরা পানি! ভোরবেলা পথে বের হবার আগে আনবার মিঞার বিবি ধরে-বেঁধে গুছিয়ে সব দিয়ে দিয়েছে !

বিশাল মাটি ঢাকা ভগ্নস্তুপগুলোকে পাশে রেখে ধুলোওড়া রাস্তায় চড়া রোদে একা একা হাঁটতে হাঁটতে মিঞা আনবারের বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল বিবিজানের দরদভরা মুখখানা! গতরাতে খানার টেবিলে বসে তার চোখে পানি দেখেছিল মিঞা! ব্যাপারটা এরকম ঘটেছিল যে, অনেকদিন পর বিবিজান নারকেলের ক্কাথ আর গোলমরিচ দিয়ে ভেড়ার মাংস রেঁধেছিল, যে রান্নাটা তার হাতে বড্ড ভালো খোলে ! ছোটবেলায় আনবারের দুই মেয়ে তো আম্মার হাতের ভেড়ার গোস্ত খাবার জন্য একেবারে পাগল হয়ে যেত! তা প্রায় সাতবছর হয়ে গেল আনবার মিঞার বড়মেয়ের বিয়ে হয়েছে বহুদূরের কানবাত গ্রামে !আর তার দু’বছরের মাথায় ছোটমেয়ের বিয়ে হয়ে গেল আল মাসলাখে ! সেও অনেক দূর! তার পর থেকে, গত পাঁচ বছরে মেয়েদের মুখ দেখা তো দূরস্থান, তাদের একটা খবর পর্যন্ত আসেনি কোরেদান আতিলে ! গতরাতে বিবিজানের চোখের পানির ইতিহাস হলো এই! কিন্তু একজন সাচ্চা ইমানদার পুরুষমানুষ কেমন করে সহ্য করতে পারে তার বিবির চোখের পানি! আনবার মিঞা তো তখন নিজের মনে মনে বিড়বিড় করছিল ‘কান্না একদম বারন !পুরুষমানুষের চোখের পানি হারাম !একদম কাঁদব না!’

আনবার যখন কানবাত গ্রামে তার বড়মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে  পৌঁছলো, ততক্ষনে অনেক নক্ষত্রে ঢেকে গেছে রাতের আকাশ, কাকজ্যোত্স্নায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর! এতদিন পরে হঠাত আব্বাকে দেখে নেচে-কুদে-হেসে-কেঁদে-লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে ঠিক কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না বড়মেয়ে ! বড় জামাইটিও ভারী ভদ্র-সভ্য-সজ্জন আর কঠোর পরিশ্রমী এক চাষা !আনবারকে দেখে সেও খুশি হয়েছে কম না !খানাপিনার তরিবত শুরু হয়ে গেল! চাঁদের আলোর নীচে বসে তারা পান করল খেজুরের তাড়ি! খাবার বলতে একটাই পদ – ঘি দিয়ে পাক করা আস্ত একটা দুম্বা! সারারাত বাপ  মেয়ের কথা আর যেন ফুরোয় না! ভোরের দিকে জামাই বাবাজীবন যখন নাক ডাকতে শুরু আনবার তার মেয়েকে কাছে ডেকে চাপা গলায় শুধলো –  ‘সত্যি করে বল তো মা কেমন আছিস তুই? আমার কাছে কিন্তু কিছু লুকোসনা!’

‘আব্বা! ভোরের আলোয় পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ চারদিকটা একবার ঠাওর করে দেখ! বলতো, কী দেখতে পাচ্ছ?’- বলল মেয়ে!

‘কী আবার দেখব ! ক্ষেত,জমি, চাষের মাঠ চারদিকেই তো তাই !’

‘আব্বা! ওই জমিতে আমরা যব, বার্লি, তরমুজ, বরবটি আরো কত কী যে ফলাই! ফসল ভালো হলে আমরা ভালো থাকি! আর ফসল ভালো হয় বৃষ্টি ভালো হলে! তুমি ওপরওলার কাছে প্রার্থনা কর, এ মরসুমে যেন ভালো বৃষ্টি হয়!’

খুব ভোরে বড়মেয়ের শ্বশুরবাড়ির দেশ মানে কোরেদান কানাবাত থেকে ছোটমেয়ের বাড়ি আল মাসলাখের দিকে রওয়ানা দিল আনবার মিঞা! হাঁটাপথে ১৪ ঘন্টা! মনে মনে একটা কথাই শুধু জপ করে চলেছে –  ‘ইয়া আল্লাহ! এ মরসুমে যেন আকাশ থেকে ভালো বৃষ্টি পড়ে! হে আল্লা! বৃষ্টি যেন পড়ে!’

nonta-pani-bangla-galpo আল মাসলাখ আধাশহর! বাড়িগুলো ব্যাসল্ট পাথরে তৈরি! দরজায় দরজায় কারুকার্যময় অর্ধচন্দ্রাকৃতি খিলান! বাড়ির গায়ে আঙুরলতার আলপনা খোদাই করা! ছোটমেয়ের ঘর অব্দি পৌছতে পৌঁছতে সন্ধে ঢলে পড়েছে! আব্বাকে দেখে ছোটমেয়ের তো আনন্দের আতিশয্যে অবাক হয়ে দম আটকে যায় আর কী! ছোটজামাই কুমোরের ছেলে কুমোর! যেমন আমুদে তেমন মেহমান নওয়াজ! রাতের ভোজে মস্তবড়  গায়ে নক্সা আঁকা গলা উঁচু মাটির কলসী বোঝাই আঙুরের মদ এনে হাজির করল! মেয়ের নিজের হাতে নাকি চোলাই করা! আর তার সঙ্গে বাতাবিলেবুর রস মাখানো ঝলসানো ভেড়ার মাংস! খানা-পিনা চলল প্রায় মাঝরাত অব্দি! ছোটমেয়ের শ্বশুর, যিনি ছিলেন নিজের সময়ের নামকরা একজন মৃৎশিল্পী, তিনি  বেদুইন- দোতারা হাতে  মর্মস্পর্শী একটা গান ধরলেন!  কথাগুলো ভারী মনে ধরল মিঞার –

“মিশব ধুলোয়, তার আগেতে সময়টুকুর সদ-ব্যভার
ফুর্তি করে নিই না কেন ? দিন কয়েকেই সব কাবার
পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাব মৃত্যুপারের কোন সে দেশ
নাইকো শরাব বা সুর সেথায় , সেই অজানার নেইকো শেষ ”

গান আর আঙুরের মদ যখন ফুরোলো ততক্ষনে রাত খতম! বেরিয়ে পড়ার আগে ছোটমেয়েকেও সেই একই প্রশ্ন শুধলো আব্বাজান, বাপের মনের গভীর থেকে উঠে আসা প্রশ্ন – ‘সত্যি করে বলতো মা, কেমন আছিস?’

মেয়ে বাবার হাতটা ধরে ফেলল – ‘আব্বাজান, আম্মাকে বোলো তোমাদের ছোটমেয়ে ভালো আছে! শুধু একটা কথা, এখানে দাঁড়িয়ে যে দিকেই তাকাও না কেন, তুমি শুধু দেখতে পাবে কাঁচা মাটির ছাঁচ, হরেক কিসিমের পাত্র, কলসী, মূর্তি! আজ যদি আকাশে কড়া রোদ ওঠে তবে ওগুলো ভালো শুকোবে! ভালো দাম পাব, আর তাতে আমরাও ভালো থাকব! কিন্তু যদি বৃষ্টি পড়ে তবে মাটি গলে যাবে, ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে সব! তুমি আল্লার কাছে দোয়া কর এ মরসুমে যেন বৃষ্টি না পড়ে !’

পরদিন যখন  আতিল গ্রামে ফিরে এল আতিল গ্রামের সন্তান আনবার, আর তার বিবিজান ছলছলে জিজ্ঞাসু চোখ নিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে তার কাছে ছুটে এল, আনবার শুধু এটুকুই বলতে পেরেছিল যে, ‘বৃষ্টি পড়ুক বা না পড়ুক আমাদের চোখের পানি পড়বেই !’

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.