কাঁচা পলাশপাতায় সোনামুগের খিচুড়ি‚ মরকত সবুজ শুঁটি‚ হাঁসের ডিমের টুকটুকে কুসুম আর সরবাটা ঘি

640

আজকাল বঙ্গে শীতের আগমন বেশ একটা দেবদূত আসার মত ব্যাপার | তিনি আসছেন খবর হয়ে গেছে | কাড়া-নাকাড়া বাজছে | আমলকির ডাল থেকে টুপটাপ খসছে শুকনো পাতা | ভোররাতে ঘাসের ডগায় জমছে হিরের কুচি | আমরাও তৈরি হচ্ছি |

রঙচঙে সোয়েটার‚ ন্যাপথালিনের গন্ধলাগা কম্বল‚ বক্সখাটের পেটের ভিতর থেকে বের করে রোদ খাওয়ানো হচ্ছে | ওমা ! কোথায় কী ! হঠাৎ শোনা গেল কোন সাতসাগরের ওপার থেকে নাকি ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড়ের দস্যু | তার হাতে রণসাজ তুলে দেওয়ার জন্য বঙ্গোপসাগরে অপেক্ষায় বসে সেথো নিম্নচাপ | ব্যাস‚ দেবদূত মশাই অমনি ভয়ে সারা | পাততাড়ি গুটিয়ে আশ্রয় নিলেন একেবারে হিমালয়ের কন্দরে | লেপ-কম্বল ফিরে গেল পুরনো ঠিকানায় | টুপি-মোজা- সোয়েটারকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে ফিরতে হল সুতির জামার নিরাপদ আশ্রয়ে |

আমাদের ছোটবেলায় শীতের কিন্তু এত বাহানা ছিল না | সে আসবে জানতাম | আসতও সময়মত‚ সদর্পে এবং সদম্ভে | গাছে গাছে কচিপাতা গজানো শুরু হলে বিদায়ও নিত নিতান্ত অনিচ্ছায় | যদিও সেসময় শীতের শুরুটা ছিল আমার কাছে ভারী দুঃখের | তখন থাকতাম শিল্পশহর বার্নপুরে | রাঢ় অঞ্চল | ঠান্ডা-গরম দুটোই সেখানে জাঁকিয়ে পড়ে | কালীপুজো পেরোতে না পেরোতেই হাওয়ায় হিমেল আমেজ | দিনের বেলায় ঘন নীল আকাশ‚ সন্ধে নামতেই কালোর ওপর জরির ফুল বসানো ওড়নায় সেজে ওঠে | ভোররাতে পায়ের কাছে ভাঁজ করে রাখা দিদিমার তৈরি নরম কাঁথাখানা টেনে নিয়ে গায়ে দিলে সুন্দর ওম হয় |

দিন যত এগোয়‚ শীতের কামড় ততই শক্ত হতে থাকে | বাজারে এসে যায় বড় বড় সাদা ফুলকপি‚ ঘন সবুজ বাঁধাকপি‚ টুকটুকে টোম্যাটো‚ লম্বাটে বেগুন | টিফিনের বাক্সের সঙ্গে জুড়ি বাঁধে বড়সড় কমলা | রাতে খাবার সময় বাটিতে ঘন দুধের সঙ্গে গুড় মিশিয়ে মা রেখে দেন পাতের পাশে | কিন্তু এতসব জিভে জল আনা ব্যাপার-স্যাপার সত্বেও মন তো দুঃখে ভারাক্রান্ত | শীত মানেই যে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা | সারা বছরের পড়াশোনার চূড়ান্ত হিসেব-নিকেশ | সুতরাং প্রবল ঠাণ্ডাতেও রাত পর্যন্ত কম্বল মুড়ি দিয়ে বই নিয়ে বসে থাকা | আবার ভোর না হতেই হি-হি করে কাঁপতে কাঁপতে সোয়েটার গায়ে চাপিয়ে অঙ্ক কষা | সে বড় কঠিন সময় | একতাই রক্ষা | পরীক্ষাটা শেষ হয়ে যেত মোটামুটি ডিসেম্বরের পনেরো তারিখের মধ্যে | আর রেজল্ট বেরোত পঁচিশের পরে | মাঝের ওই দুটো সপ্তাহ এককথায় যাকে বলে স্বর্গীয় আনন্দে ভরপুর |

বেশিরভাগ বছরেই ওই সময়টায় অন্তত দিন দশেকের জন্য আমরা চলে যেতাম আমাদের পৈতৃক বাড়ি‚ দুর্গাপুরের কাছে গ্রামে | সেখানে থাকাটা আবার অন্যরকম মজা | পুরনো দিনের দোতলা বাড়ি | রোদ ভাসাভাসি বারান্দায় মেলে দেওয়া টুকটুকে লাল লেপ | সামনে-পিছনে মস্ত বাগান | ঠাকুমার সখ ছিল গাছপালার | শীতের সময় বাগান ভরে থাকত নানা রঙের মরসুমি ফুলে | পিছনের সবজি বাগানে শিম‚ বিন‚ ফুলকপি‚ বাঁধাকপি‚ মুলো‚ গাজর‚ ধনেপাতা সবই হতো | সকালবেলা আমার কাজ ছিল একখানা ছোটমাপের ঝুড়ি নিয়ে বাগান থেকে সবজি পেড়ে আনা | পাতার ভিতর থেকে বেছে বেছে তাজা শিম আর বিন ছিঁড়ে আনা‚ কিংবা নধর টোম্যাটো‚ কচি ধনেপাতা তোলার জন্য কী আনন্দ‚ তা যে নিজে না করলে বোঝানো কঠিন |

শীত মানে তো সবারই স্কুলের ছুটি | পড়াশোনার পাট নেই | তাই আমাদের আশপাশের কাকা-জেঠাদের বাড়িতেও নানা তুতো ভাইবোনেরা এসে উপস্থিত | সবাই মিলে একটা বিরাট দল | সারাদিন হৈচৈ | সন্ধের পর ঘরে বসে আড্ডা | সঙ্গে মুড়ি আর ফুলকপি কিংবা ধনেপাতার বড়া | মাঝে মাঝে আমার এক ঠাকুমা দু-তিন রকম সব্জি সেদ্ধ করে চটকে তার সঙ্গে আধবাটা মটর ডাল মিশিয়ে একটা বড়া করতেন | সব্জির সঙ্গে কাঁচালঙ্কাও থাকত নিশ্চয়ই | ঝাল হতো বেশ | কিন্তু খেতে অনবদ্য | মুখে হুসহাস শব্দ করতে করতে সেই ডালের বড়া খাওয়ার দৃশ্যটা মনে পড়লে আজও আমার হাসি পায় |

এখন যেমন শীত মানেই‚ দল বেঁধে খাবার-দাবার নিয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া | তখন ব্যাপারটা ঠিক সেরকম ছিল না | গ্রামের দিকে তো নয়ই | তবে বনভোজন একটা হতো | বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ঢেউ খেলানো মাঠে | চারপাশে ছোট-বড় পলাশের গাছ | বুনো কুলের ঝোপ | আর বেশ কয়েকটা চওড়া পাতাওলা ফলসা গাছ | সেই মাঠেই বসত আমাদের বনভোজনের আসর | আগের দিন চাঁদা তোলা হত | তারপর সকাল সকাল তিন-চারজন ভাইবোন মিলে বাজারে যাওয়া | সঙ্গে থাকত আমাদের বাড়ির পুরোন কাজের লোক ভক্তিদা | টিফিনের জন্য সিঙাড়া জিলিপিও তখনই কিনে ফেলা হতো | তারপর জিনিসপত্র নিয়ে সোজা ফলসাতলায় |

মেনু একদম ফিক্সড | খিচুড়ি আর হাঁসের ডিমের ডালনা | রান্নার দায়িত্ব ভক্তিদার | কারণ ঠাকুমার কড়া হুকুম‚ উনুনের ধারে ছোটরা কেউ যাবে না | তাই আমরা সবাই জোগাড়ে | তবে আলু আর মটরশুঁটির খোসা ছাড়ানো ছাড়াও আর একটা কাজ আমাদের থাকত | সেটা হল খাওয়ার জন্য পাতা বানানো | ওই ছোট-বড় পলাশ গাছ থেকে পাতা ভেঙে এনে‚ সেই পাতা কাঠি দিয়ে জুড়ে বানানো হত খাওয়ার প্লেট | খাওয়ার আগে অবশ্য সেই প্লেটগুলো গামলার জলে ডুবিয়ে ভাল করে ধুয়ে নেওয়া হতো |

কাঁচা পলাশ পাতার গাঢ় সবুজ রঙের প্লেট | তার ওপর হালকা হলুদ মুগ ডালের খিচুড়ি | গোবিন্দভোগ চালের গলে যাওয়া দানার পাশে উঁকি মারছে মরকত সবুজ শুঁটি | খিচুড়িতে দেওয়ার আগে ফুলকপিটা হালকা করে ভেজে নেওয়া হয়েছে বলে তার রঙে একটা হালকা বাদামি পালিশ | সবাই সার দিয়ে ঘাসের ওপর বসেছি | পিসিমণি একটা বাটি নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে আছে | সরবাটা ঘি পাঠিয়ে দিয়েছে ঠাকুমা | সবার পাতে এক চামচ করে দেবে | ডালনার ডিমটা ভাঙলেই শীতের সূর্যের মত আদর আর ওম মেশানো টুকটুকে কুসুম |

সেই সময় ভাই-বোনদের সঙ্গে গল্প-খেলা এসবের ফাঁকেও একটা দায়িত্ব আমার থাকত | ডিসেম্বর মানে পৌষ মাস | এসময়ই আমন ধান ওঠে | তখন তো ছিলই‚ এখনও আমন ধানই হল আমাদের এই রাজ্যের প্রধান ফসল | ধান কেটে মাঠে জড়ো করা হত | তারপর গরুর গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে আসা হত বাড়িতে | বাড়িতেই ঝেড়ে পাথানো হত মিল-এ | ভোরবেলা থেকেই তাই গ্রামের রাস্তায় ধানবোঝাই গাড়ির ক্যাঁচকোঁচ শব্দ শোনা যেত | আমাদের বাড়িতেও বাগানের একটা অংশ ছিল খামার | মানে সেখানেই ধান কেটে এনে আঁটিগুলো সাজিয়ে রাখা হতো | ধান তোলার আগে অবশ্য পুরো জায়গাটাই ভাল করে ঘাস চেঁছে‚ গোবর-মাটি দিয়ে নিকিয়ে পরিষ্কার করে রাখত কমলাপিসি |

ধান বেশ কিছুটা উঠে গেলে শুরু হত ঝাড়ার কাজ | একটা লম্বাটে পাটার ওপর ধানের আঁটিগুলোকে আছাঢ় দিলে দানা আর খড় আলাদা হয়ে যেত | খড়ের আঁটি সরিয়ে রাখা হত একপাশে | আর পাটার নিচে জমে উঠত সোনালি ধানের স্তুপ | চাষ হত ভাগে | অর্ধেক যে জমি চাষ করছে তার | অর্ধেক জমির মালিক‚ মানে ঠাকুমার | তাই ধান ঝাড়ার পর ভাগ হতো | তখন ঠাকুমার পাশে বসে সেই ভাগের হিসেব আমি লিখে রাখতাম ছোট্ট একখানা খাতায় | ঠাকুমা মারা যাওয়ার পর অন্যান্য অনেক জিনিসের সঙ্গে হিসেবের খাতাটাও ছিল বাতিলের দলে | আমি সেটা নিয়ে এসে রেখেছিলাম নিজের বাক্সে |

স্কুলের পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে আসার পর আমার শীতের ধারণাটা আস্তে আস্তে বদলে গেল | কলকাতার শীতে তো আর কামড় নেই | এখানে শীত অনেক বেশি সৌখিন‚ মোলায়েম | ঠিক যেন ভোরের কুয়াশা আর হিমেল আমেজের পরতের ভিতর রঙচঙে আহ্লাদী পুরভরা পাটিসাপ্টা | মুখে দিলে গলে যায় | কলকাতার শীত মানে‚ আলমারির ওপরের তাকে তুলে রাখা ভারী সিল্ক‚ তসর আর জারদৌসি শাড়িদের বার করে আনা | হালকা একখানা পশমিনা শাল গলায় জড়িয়ে নিউইয়ার্স ইভের পার্টি | ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বেঞ্চে বসে মনের সুখে কমলালেবু খাওয়া | দোকানের শো-কেস জুড়ে নলেনগুড়ের জলভরা‚ কাঁচাগোল্লা আর জয়নগরের মোয়ার দাপাদাপি |

শীতের কলকাতায় জাঁকিয়ে ঠান্ডা এখন আর পড়ে না অনেকদিন | কিন্তু হেমন্তের শহর মজে যায় উৎসবের আবহে | দীপাবলির হাত ধরে আসে চলচ্চিত্র উৎসব‚ রকমারি মেলা‚ গানের আসর‚ বড়দিন‚ নতুন বছরের মাতামাতি সব কিছুর পর একেবারে বসন্তের দোরগোড়ায় বাৎসরিক বই নিয়ে হৈচৈ-এর শেষ | শীতের অভাব পুষিয়ে দেয় আমোদ | রঙচঙে সোয়েটার না পরলেও মন রঙিন হতে অসুবিধা হয় না | আসলে মানিয়ে নেওয়া‚ আপসে যাওয়াই তো মানুষের অভ্যাস |

পৃথিবীর উষ্ণায়ন কিংবা এলনিনো‚ এসব শব্দের সঙ্গে আমরা এখন পরিচিত | তাই ক্রমশ অপরিচিত হয়ে ওঠা শীত না আসলেও আমরা এখন আর দুঃখ পাই না তেমন | শুধু পৌষের কোনও দুপুরে রোদে পিঠ দিয়ে বসে পুরনো জিনিস ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে ঠাকুমার হিসেবের খাতাখানা চোখে পড়লে‚ সেই সোনালি ধান আর খড়ের আঁটির সুবাস মাখা শীতের জন্য বড্ড মন কেমন করে আমার |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.