কৃষ্ণ রাজেশ্বরী মিত্র
শোভাবাজার রাজবাড়ীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা | জার্নালিজম-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর | পেশা ও নেশা লেখা | বিশ্বাস করেন যুক্তির থেকে হৃদয়ের জোর বেশি | তাই লেখার মাধ্যমে হৃদয় ছুঁয়ে যাবার স্বপ্ন দেখেন নিরন্তর |

দৈর্ঘ্যে প্রস্থে রথটি হয়তো বিশালাকার নয়‚ কিন্তু বয়স আড়াইশো বছর পেরিয়ে গেছে | রাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর যা তৈরি করিয়েছিলেন এখনও সেই রথই শোভাবাজার রাজবাড়ির ঠাকুরদালানে শোভা পাচ্ছে | শ্রী শ্রী গোপীনাথ যে বাড়ির কুলদেবতা‚ সেখানে শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ক সমস্ত উৎসবই যে পালন করা হবে সে তো স্বাভাবিক | কিন্তু এ বাড়ির রথে জগন্নাথের জায়গায় অধিষ্ঠান করেন নারায়ণ শিলা | তাঁকেই নীলমাধব মনে করে পরিবারের সদস্যরা রথযাত্রা উৎসব পালন করে থাকেন |

Banglalive

ঠাকুরদালানে রথ স্থাপন করে কুলপুরোহিত রথ এবং রথে অধিষ্ঠিত দেবতার পূজা আরম্ভ করেন | পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে নানারকম উপাচার সহযোগে পুজো শুরু হয় | আনারস আর কাঁঠাল‚ সময়ের এই দুই ফল তো ভোগ দিতেই হবে ‚ দেবতার পুজো করতে গিয়ে রথের সারথি আর বাহক‚ অশ্বদের ভুললে চলবে কেন ? তাই তাদের জন্যে ভোগ দিতে হয় ভেজানো ছোলা | ঘোড়ার প্রিয় খাদ্য যে ! সেই রাজা মশাইয়ের কাল থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিবারের প্রত্যেক সদস্য পরম ভক্তির সঙ্গে এই রথ টেনেই শ্রীধামে রথ টানার পুণ্য অনুভব করে চলেছেন |

তখনকার দিনে পুরুষদের যে কোনও বিখ্যাত জায়গায় রথ টানতে যাওয়ায় কোনও বাধা ছিল না | কিন্তু মহিলারা চাইলেই নিজেদের ইচ্ছে মতো পুণ্য অর্জনে বেরনোর সুযোগ পেতেন না | রাজা নবকৃষ্ণ সেকথা বুঝেছিলেন | বাড়ির মহিলা এবং শিশুরা যাতে রথ টানার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত না হয়‚ ঘরোয়া আকারে এই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করার সেটাও হয়তো একটা কারণ ছিল | কিন্তু রাজার কাজের পেছনে কী যুক্তি ছিল সে বিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে‚ বাড়ির সবাই এই রথযাত্রা উৎসব ঘিরে কী পরিমাণ আনন্দ অনুভব করে থাকে সেই গল্পেই ফিরে আসা যাক |

এই বাড়ির সব পুজোই ভোর ভোর শুরু হয় এবং বেলা বাড়ার আগেই শেষ হয় | রথও তার ব্যতিক্রম নয় | তাই সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ে মায়ের তাড়া খেতে খেতে তৈরি হয়ে ঠাকুরদালানে হাজির হয়ে যেতে হত ঠিক সময়ে | বড় বড় আনারস কাঁঠাল দেখে একটু একটু লোভও হত | কিন্তু প্রথমে পুজো তারপর রথ টানা‚ তারপর প্রসাদ বিতরণের পালা | অতএব ধৈর্য ধরা ছাড়া কোনও উপায় থাকত না |

আরও পড়ুন:  ছিলেন গভীর রাত-ঘুমে‚ হঠাৎ সিলিং থেকে গায়ের ওপর খসে পড়ল ছ'ফুটের বোয়া!?

পুজো শেষ হলে বড়রা আমাদের হাতে রথের দড়ি তুলে দিতেন‚ যেমন আমরা এখন আমাদের পরের প্রজন্মের হাতে যত্ন করে দড়িটা ধরিয়ে দিয়ে থাকি | রথ টানার মধ্যেও দারুণ মজা | মায়েরা রথ মাহাত্ম্য অনেক বোঝালেও ছোটদের মধ্যে ভক্তির স্রোতের থেকে উত্তেজনার স্রোতের প্রভাব থাকে অনেক বেশি‚ যার ফলে রথ এগিয়ে চলে বেশ দ্রুত গতিতে |

সাত বার দালানের মধ্যে ঘোরার পর রথ এসে থিতু হয় যেখান থেকে চলা শুরু হয়েছিল‚ তার বিপরীত প্রান্তে | আগামী সাত দিনের জন্যে এটাই তখন হয় আমাদের নারায়ণরূপী জগন্নাথের মাসির বাড়ি | রথ টানা সমাপ্ত হলে সেই দিন আমরা বাড়ির সদস্যরা নারায়ণ শিলাকে স্পর্শ করার অধিকার পাই | লাইন করে দাঁড়িয়ে ওই দিব্য শিলা স্পর্শ করে অঙ্কে ভাল মার্কস চাইব‚ না ঘোড়ায় চড়া কোনও রাজপুত্তুর চাইব‚ আসল সময়ে সব গুলিয়ে যেত | তাই বোধহয় স্বয়ং নারায়ণও ঠিক বুঝে উঠতে পারতেন না কী আশীর্বাদ দিলে তা ভক্তের মনে ধরবে | এখন হয়ত চাইবার বিষয় বদলে গেছে | কিন্তু সেই গুলিয়ে যাওয়া রোগটা আজও রয়ে গেছে |

সপ্তম দিন‚ উল্টো রথে একই পদ্ধতি অনুসরণ করে রথ ফিরে আসে তার প্রথম অবস্থানে | উল্টোরথ এই বাড়িতে আরও একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয় আরেকটা কারণে | ওই দিন শোভাবাজার রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমার কাঠামো পুজো হয় | কাঠামো বলতে বাঁশ দিয়ে তৈরি মা দুর্গার ডান পায়ের কাঠামোর পুজো করা হয় ওই বিশেষ দিনটিতে | তাই রথ উৎসব শেষ মানে‚ দুর্গা পুজোর ঢাকে কাঠি পড়ে গেল | সেই কাঠির ঘা শুধু ঢাকে কেন‚ ছোট বড় সকলের মনের কোণায় কোণায় আগমনীর সুর বাজিয়ে দেয় | ছোটদের চোখের দিকে তাকালেই সেই সুর শুনতে পাওয়া যায় | আর আমরা বড়রা সেটা সযত্নে নিজেদের হৃদয়ের কোনও চোরাকুঠুরিতে তালা বন্ধ করে রেখে দিয়ে মনোনিবেশ করি আমাদের ছুটন্ত কর্মজীবনে |

আরও পড়ুন:  সর্বনাশ ! মিস্টার বিন-এর ' চলে যাওয়ার ' খবরে ক্লিক করে বসেছেন নাকি !

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য‚ শ্রীক্ষেত্রে নব কলেবর অনুষ্ঠানের প্রভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে এবছর পরিবারেরই এক শিল্পী-সদস্যের তুলির টানে আবার নতুন তরুণ রূপে সাজছে সেই আড়াইশো বছরের পুরনো রথ |

(পুনর্মুদ্রিত)

3 COMMENTS