নাগরিকত্ব বিল কি নিছক রাজনৈতিক হাতিয়ার?

NRC controversy

১৯৮৩ সালে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সরকার নিয়ে আসেন The Illegal Migrants (Determination by Tribunal ) (IMDT) Act যার সাহায্যে মূলত বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সনাক্ত করা হয়। দেশের অন্যত্র The Foreigners Act, 1946 দ্বারা বিদেশী বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সনাক্তকরণ হলেও IMDT প্রযোজ্য ছিল মূলত আসামের জন্য। এই আইন মোতাবেক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে অনুপ্রবিষ্ট প্রমাণ করার দায়িত্ব ছিল প্রশাসনের। কিন্তু সংখ্যালঘু অনুপ্রবেশকারীরা আইনের ফাঁক গলে পালাবার অনেকরকম সুবিধে পাচ্ছে অভিযোগে আসু (ASSU) নেতা সর্বানন্দ সোনোয়াল সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ে ২০০৫ সালে সেটি বাতিল করান (Sarbananda Sonowal v. Union of India)। আইনটি আসামে জাতিদাঙ্গায় বিধ্বস্ত মুসলিম তো বটেই হিন্দু বাঙালিদেরও রক্ষাকবচ ছিল।

বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর শরণার্থী আশ্রয়দানের বিষয়টা প্রসারণের চেষ্টা শুরু করে। ২০১৬-র ১৫ই জুলাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল The Citizenship (Amendment) Bill, 2016 নিয়ে এসে ১৯৫৫-র নাগরিকত্ব আইন (Citizenship Act, 1955) সংশোধন করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সংজ্ঞা বদলে শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীদের ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার রাস্তাটা সহজ করতে চায়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান পরিব্রজীরা যদি বৈধ অনুমতি ছাড়াও ভারতে এসে থাকে, তাহলেও তাদের মানবতার খাতিরে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। পাকিস্তানে শিয়া ও আহমদিয়া মুসলিমরাও বিপন্ন হলেও তাদের কথা ২০১৬-র নাগরিকত্ব বিলে উল্লেখ নেই। কারণ হয়তো কে শিয়া কে আহমদিয়া এগুলো নির্ধারণ করা যেমন দুঃসাধ্য, তেমনি কোনও শাখাই নাশকতার প্রবণতামুক্ত নয়। নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ অনুযায়ী বৈধ অনুমতি নিয়ে ভারতে এসে কেউ যদি কমপক্ষে ১১ বছর বাস করে, একমাত্র তাহলেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে, নতুবা নয়। ২০১৬-র বিল অনুযায়ী নাগরিকত্ব লাভের জন্য ভারতে একটানা বসবাসের মেয়াদ ১১ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করা হয়, এবং বৈধ অনুমতির ব্যাপারটাও শিথিল করা হয়। ২০১৪-য় সাধারণ নির্বাচনের প্রচার কালেই ভারতীয় জনতা পার্টি একথা ঘোষণা করেছিল। ঠিক নাগরিকত্ব না হলেও শরণার্থী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব নীতিগতভাবে ২০১৩-য় আসামের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈও মেনে নেন। “This will mean a central law for those who were forced to leave their homes. It will be on the lines of political asylum,”

তবে সমস্যা কোথায়? না বিলটি আইনে পরিণত হলে ধর্মের ভিত্তিতে কিছু পরিব্রজী নাগরিকত্ব লাভে বাড়তি সুবিধা পাবে, যা নাকি সংবিধানের ১৪নং ধারার সমানাধিকারের নীতির পরিপন্থী। উপরন্তু Foreigners Act, 1946 এবং the Passport (Entry into India) Act, 1920 অনুযায়ী ভারত সরকার দেশ ও ধর্ম না দেখে যে কোনও অনুপ্রবেশকারীকেই কারায় নিক্ষেপ কিংবা ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারত, যা বিলটি বলবৎ হলে আর করা যাবে না। শুধু তাই নয়, এই বিল পাস হলে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-র আগে উক্ত তিন দেশ থেকে আসা সমস্ত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টানরা আইনি বা বেআইনিভাবে মাত্র ছ বছর ভারতে কাটাতে পারলেই আইনত নাগরিত্বের আবেদন করতে পারবে। আবেদন গ্রাহ্য হবে কিনা, সে তো অন্য প্রশ্ন, দীর্ঘসূত্রী প্রক্রিয়া। কিন্তু মেরা ভারত মহানের মহান ধর্মনিরপেক্ষতা চোট খাবে, আর সংখ্যালঘু ভোট প্রত্যাশী বিরোধীরা চুপ করে থাকবে, তাই হয়? এটা ছিল তাদের প্রাথমিক যুক্তি যা বর্তমানে ৩৬০ ডিগ্রী ঘুরে গেছে।

বিরোধীরা গেল। এবার স্বরোধীদের বক্তব্য দেখা যাক। আসামের আসাম গণ পরিষদ, আসু নেতা-কর্মী থেকে সাধারণ অসমীয়াবাসী – সবাই একযোগে এই আইনের বিরোধিতায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শরণার্থী না অনুপ্রবিষ্ট, বিপন্ন কি সম্পন্ন – এসব দেখার দরকার নেই। আসাম আর কোনও বহিরাগতকে বরদাস্ত করবে না; বরং শরণাগতদেরও বহিষ্কার করবে। আসামে বিজেপি-র জোটসঙ্গী অগপ বিল পাস হলে জোট ভেঙে দেওয়ার হুমকি আগেই দিয়েছিল। সেই সুরে সুর মেলায় ‘ছাত্র-কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতি’ (Krishak Mukti Sangram Samiti and students), এমনকী কিছু এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও। একে তো জনমানচিত্র নষ্ট হচ্ছে; তার ওপর ‘জাতীয় নাগরিক পঞ্জি’ (NRC) অনুযায়ী যেখানে ১৯৭১-এর ২৪ মার্চের মধ্যরাতের পর যারা ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিল, তাদের চিহ্নিত করার কথা, সেখানে ২০১৪-র ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুপ্রবেশের অনুমতিসীমা বাড়ালে প্রকৃত ভারতীয়দের সনাক্তকরণের কাজটাও ব্যহত হবে – এই যুক্তিতে বিলটি প্রস্তাবিত হওয়া ইস্তক প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে। NRC-তে ধর্মের ভিত্তিতে কোনও পক্ষকে বাড়তি সহানুভূতি দেখানোর ব্যবস্থা নেই, বিদেশী মাত্রেই ঘাড় ধাক্কা নয়তো ডিটেনশন ক্যাম্প। তীব্র বিরোধিতা ধ্বনিত হয়েছে মেঘালয়ের পক্ষ থেকেও। মানবিক দৃষ্টি থেকে আনা বিলটিকে মেঘালয় সরকারের ‘dangerous’ মনে হয়েছে। ১১ জানুয়ারি বিলটি লোকসভায় পাস হওয়ার পর অগপ হুমকি কার্যকর করে প্রকৃতই জোট ভেঙে বেরিয়ে গেছে। শুধু আসাম নয় সমগ্র উত্তরপূর্ব ভারত অগ্নিগর্ভ। তাতে ধুয়ো দিচ্ছে মিডিয়ার নানা রটনা, যেমন আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ হিন্দুর সঙ্গে চাকমা ও রাখাইন বৌদ্ধরাও ভারতে ঢুকে আসামের জনমানচিত্র তছনছ করে দেবে।

কংগ্রেস, অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, তৃণমূল ও বামপন্থী শিবির সকল বিরোধীপক্ষ একজোট হয়ে মুসলিমদেরও কেন যখন তখন প্রবেশাধিকার ও নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না– এই দাবিতে নাগরিকত্ব বিলের শুরু থেকেই বিরোধিতা করে এসেছে। সম্মিলিত চাপে তাই বিলটি লোকসভায় আলোচনার পর ২০১৬-র আগস্টে জয়েন্ট পার্লামেন্টারি (সিলেক্ট) কমিটির কাছে বিবেচনার জন্য পাঠানো হয়েছিল। কমিটি বরাক ও মেঘালয়ের বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জায়গা ঘুরে ২০০ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে কথাও বলে গেছে বলে সংবাদ। কিন্তু সমগ্র বরাকে যা মুসলিম সংখ্যাধিক্য এবং বিরোধী শিবিরের যা মোল্লাতন্ত্রী তৎপরতা, তাতে অমুসলিম বাঙালিদেরও NRC-র কোপ থেকে বাঁচানো দুরূহ হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত NRC তৈরি হচ্ছে ১৯৮৫-তে আসুর সঙ্গে রাজীব গান্ধী সাক্ষরিত ‘আসাম চুক্তি’র ভিত্তিতে, IMDT-ও বাতিল হয়েছে ২০০৫-এ – দুটোই ফ্যাসিস্ট গেরুয়া দল ক্ষমতায় আসার আগে, পরে নয়। তবে আসাম গণ পরিষদ (AGP), অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ান (AASU) এদের সহায়তায় ক্ষমতায় আসা বিজেপি শাসিত আসামে ২০১৭-র পর বাস্তবে ধর্মীয় নয় ভাষাগত সাম্প্রদায়িকতাই জোরদার হয়েছে। প্রাক্তন আসু নেতা সর্বানন্দ সোনোয়াল বিজেপি-তে যোগ দিয়ে ক্ষমতায় আসা ইস্তক একের পর এক সাজানো ঘটনা ও কার্যকলাপ দ্বারা বাঙালিদের কোণঠাসা করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এই নাগরিকত্ব সংশোধন বিলকে বানচাল করতে।

এই নাটকের প্রথম অঙ্ক ২০১৭-র মার্চে চিলাপাথারের ঘটনা। অভিযোগ বাঙালি বিক্ষোভকারীরা নাকি ‘আসু’র দপ্তর অগ্নিদগ্ধ করেছিল। যেখানে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও বিনা প্ররোচনায় মার খায়, সেখানে মাত্র ৪% জনসংখ্যা নিয়ে তারা আসুর অফিস পোড়াতে পারে?! একটা পরিকল্পিত জাতগত দাঙ্গার পরিবেশ সৃষ্টি করায় শুধু আসু নয়, ইন্ধন যোগাতে অসমীয়া সংবাদ মাধ্যমগুলোও উঠেপড়ে লেগেছিল। শেষে মিথ্যে অভিযোগে উদ্বাস্তু নেতা সুবোধ বিশ্বাসকে ফাঁসানো হল। পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে এলেও আসাম পুলিস তার নাগাল পেয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন আসাম সরকারকে দুষলেও সুবোধ বিশ্বাসের পাশে দাঁড়ায়নি। দাঁড়ালে আসামের বাকি বাঙালিদের অবস্থার কী ইতর-বিশেষ হত, জানার উপায় নেই। ওদিকে অসমিয়া মিডিয়া থেকে শুরু করে অসমিয়া বাম-অবাম বুদ্ধিজীবীরা এই সাম্প্রদায়িকতা থামানোর বদলে উসকে দিলেন। বাঙালিদের ঘরবাড়ি পুড়লো আবার।

একই নাটকেরই দ্বিতীয় অংক NRC নবীকরণ কাণ্ড, যার প্রথম তালিকায় বেছে বেছে বাঙালিদের নাম তোলা হয়নি। প্রথম তালিকার প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদের প্রচারে মনে হচ্ছিল পরবর্তীতেও যাতে বাঙালিদের নাম না ওঠে তারও নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থাপনা রয়েছে। কিন্তু ২০১৮-র আগস্টের গোড়াতেই চূড়ান্ত খসড়া ও সরকারের ঘোষণায় তালিকা ভুক্তের সংখ্যাটা ১.৩ কোটি থেকে একলাফে বেড়ে ২.৮৯ কোটি হয়েছে। তবে তার পরেও বাকি ৪০.৭ লক্ষ মানুষ পড়ে আছে। যাদের ভোটে সর্বানন্দ সরকার ক্ষমতায় এল, তাদেরই ভোটাধিকার এখন সন্দেহজনক (doubtful) হয় কী করে, প্রশ্ন উঠবেই।

আসামের আভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্য যে লাগাতার বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ দায়ী, আর তার পেছনে যে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি দায়ী – এই সত্য আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বিদ্যজ্জনেরা তো বটেই, আসামের বাঙালি বামপন্থী প্রগতিশীলরাও স্বীকার না করে এক সময় শুধু ১৯শে মে নিয়ে কান্নাকাটি করেছে, আর এখন এনআরসি ও নাগরিকত্ব বিল নিয়ে গগন বিদারণ করছে। ২০১৭-য় একের পর এক বিধানসভায় গেরুয়াদের দিগ্বিজয়ের পর এই কান্নাকাটি অন্য রং ও মাত্রা নিয়েছে। এদিকে আসামের অনমনীয় বাঙালি বিদ্বেষের জেরে ‘বিজেপি সমান বাঙালি বিরোধী’– এই সমীকরণ প্রতিষ্ঠার পরিসরও তৈরি হয়েছে। প্রাক নির্বাচনী সমঝোতা ও নির্বাচনোত্তর প্রাদেশিক তাণ্ডবে তাল ঠোকায় স্বাভাবিকভাবেই অগপ (AGP), আসু (AASU) এদের চিরন্তনী বাঙালি বিরূপতার দায় বর্তেছে ভারতীয় জনতা পার্টিরর ওপর, যার কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে আসাম শাখার সাযুজ্যের চেয়ে সংঘাতই বেশি। জাতীয় নাগরিকপঞ্জির ত্রুটিপূর্ণ রূপায়ন দেখেও সেটি লাগু করার জেদটাই আপাতত শাসকদলকে পেয়ে বসেছে। অথচ এনআরসি-জাত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য ২০১৬-র নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটিকে আইনে পরিণত করায় শত্রু-মিত্র কোনও পক্ষেরই সায় নেই।

পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বহির্ভূত বাঙালির পক্ষ নিয়ে চিৎকার হচ্ছে বিস্তর, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিবাহসূত্রে আসামবাসী মহিলাদের প্রাক-বৈবাহিক নথিপত্র সরবরাহে বাংলার সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলো নাকি সাহায্য করছে না। অর্থাৎ মানুষের বিপদ নিয়ে রাজনীতি আছে, কিন্তু সেই বিপদ কাটানোর প্রচেষ্টা নেই, বরং জিইয়ে রাখার কৌশল রয়েছে। সাম্প্রদায়িক পক্ষপাতের ভিত্তিতে দাঁড়ানো এই প্রতিবাদী বঙ্গীয় রাজনীতিতে আসামে জনসাধারণ থেকে শুরু করে সবকটি রাজনৈতিক শিবির, এমনকী পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের আসাম শাখার প্রতিনিধিদের মধ্যেও প্রবল প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর জেরে অসমীয়া জাতিসত্তা আবার ঘা খেলে আশির দশকের জীয়াঢল বা নেইলি হত্যাকাণ্ডের (১৯৮৩) মতো দাবানল জ্বলে ওঠা যে সময়ের অপেক্ষা, তার ছোট্ট প্রমাণ মিলেছে ৩১ অক্টোবর ২০১৮ বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি উদ্বোধনের দিন ৫ জন বাঙালিকে গুলি মেরে হত্যার ঘটনায়।

এত চাপান-উতোরের মধ্যে জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটি (JPC) ঘুরে যে বিলটি শেষ পর্যন্ত ৮ জানুয়ারি ২০১৮ লোকসভায় পাস হল, সেটা আদৌ বিজেপি প্রস্তাবিত হিন্দু বাঙালি শরণার্থীর রক্ষাকবচ কিনা এখন আবার সেই সন্দেহ দানা বাঁধছে। JPC-র প্রস্তাবে বিলটিতে প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও উৎপীড়নের শিকার হিসাবে অমুসলিমদের কথা বারবার আলোচিত হলেও অভিযোগ, সরাসরি নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রতি নেই, শুধু বলা হয়েছে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে শাস্তিযোগ্য থাকবে না। সরকারকে সাফাই দিতে হয়েছে সংবিধানের ১৪ ও ২৫ নং ধারায় প্রদত্ত সমানাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা কোনওভাবেই ব্যাহত হবে না। ৪৩৮ পাতার দীর্ঘ রিপোর্টের ৩৮পৃষ্ঠায় কমিটির করা প্রশ্নের উত্তরে ইন্টালিজেন্স ব্যুরো জানাচ্ছে মাত্র ৩১,৩১৩ জন ব্যক্তি বিলটি দ্বারা অচিরে উপকৃত হবে (immediate beneficiary) যারা ইতিমধ্যে ধর্মীয় উৎপীড়নের জন্য পাক-বাংলাদেশ-আফগানিস্তান থেকে ভারতে আসতে বাধ্য হয়েছে ঘোষণা করে দীর্ঘমেয়াদী ভিসার জন্য আবেদন করে রেখেছে। বাকিদের পক্ষে ব্যাপারটা কঠিন হবে যদি না আগমনের পরেই তারা ধর্মীয় উৎপীড়ন (religious persecution) বা উৎপীড়নের আশঙ্কা (fear of persecution) বিষয়টি কারণ হিসাবে নথিভুক্ত করিয়ে থাকে। এখন আবেদন করতে হলে ধর্মীয় উৎপীড়ন প্রমাণ করতে হবে যা বিভিন্ন সুরক্ষা ও গোয়েন্দা এজেন্সি ও সংবাদ মাধ্যমের সূত্র থেকে মিলিয়ে দেখা হবে। অনেকেই ইতিমধ্যে অন্য কোনওভাবে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছে; সেটা বেআইনিভাবে কিনা সেটাও ট্রাইবুনাল পরখ করে দেখবে, যার সঙ্গে এই বিলের সম্পর্ক নেই। সাম্প্রতিক খবর অনুযায়ী সেই সৌভাগ্যবান ৩১,৩১৩ জনের মধ্যে ১৮৭ জন বাঙালি, যেখানে বিল বিরোধীদের দাবি ছিল একজনও বাঙালি উপকৃত হবে না। রিপোর্টের ১৮-৩৩ পৃষ্ঠা জুড়ে আছে বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দুদের স্বতঃ নাগরিকত্ব, অবৈধ অনুপ্রবিষ্টের সংজ্ঞা বদল, ‘citizenship by Naturalization’-এর জন্য ভারতে বসবাসের আবশ্যিক মেয়াদ কমিয়ে ১১ থেকে ৬ বছর করা, আসাম চুক্তির সঙ্গে সংঘাত, আসামে এনআরসি-র সঙ্গে বিবাদ ইত্যাদি নিয়ে আশঙ্কা আপত্তির দীর্ঘ আলোচনা। ফলত বিলটি তাদেরকেও সরাসরি নাগরিকত্ব দেওয়ার বদলে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার অনুমতি দিচ্ছে যা প্রয়োজনীয় ভেরিফিকেশন-সাপেক্ষ।

তাই যদি হয়, তাহলে বিরোধীদের মাথাব্যথা কিসের, আর আসামসহ উত্তরপূর্বেই বা আপত্তির ঝড় কেন? মাথাব্যথা একটাই – ৬ বছর বসবাস করলেই নাগরিকত্বের টোপ দিয়ে ২০১৯ কেন ২০২৩-এর নির্বাচনী বৈতরণীও পার করতে পারে বিজেপি। তাই যারা এতদিন মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের সমানাধিকারের দাবিতে ও হিন্দুত্ব সমান মৌলবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় শুধু উৎপীড়িত সম্প্রদায়গুলিকে নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করে এসেছে, তারাই এখন বিলটি হিন্দু বাঙালিকে বাড়তি কোনও সুবিধা দিচ্ছে না, এবং মুসলিম অনুপ্রবিষ্টদেরও বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উপায় নেই – ইত্যাদি বলে হিন্দুপ্রীতি দেখাতে উঠে পড়ে লেগেছে। লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবিষ্ট ও শরণার্থীকে রাতারাতি নাগরিকত্ব দেওয়া যে সম্ভব নয়, দিতে হবে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে – এই সহজ সত্যটা ইচ্ছাকৃতভাবেই জটিল করে তোলা হচ্ছে। যেমন নাগরিকত্বের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করতে হলে আসামে সেই আবেদন নাকচ হয়ে যাওয়াই ভবিতব্য, ৬ বছর আশ্রিত হিসাবে বসবাসকালে কোনও আইনভঙ্গের অভিযোগও উঠলেও আবেদন নাকচ হয়ে যাবে – ইত্যাদি নিয়েও প্রবল চেঁচামেচি চলেছে। অর্থাৎ আইন রূপায়নে স্থানীয় প্রশাসন কী করতে পারে অনুমান করে কেন্দ্র সরকারকে আগাম কাঠগড়ায় দাঁড় করানো! অথচ কেন্দ্র সরকার ফাঁপা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে চিৎকার করলেও, প্রতিশ্রুতি পালনে বাধ্য করাতে কেউ আগ্রহী নয়; বরং বিজেপি যাতে প্রতিশ্রুতি রাখতে না পেরে হিন্দু ভোট হারায়, তার জন্যই প্রতিনিয়ত তুমুল তৎপরতা। স্পষ্টত জাতীয় রাজনীতি থেকে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া বাম ও উচ্চাকাঙ্খী বিরোধী দলগুলির ব্যালটযুদ্ধে শক্তি সংগ্রহ ছাড়া সমস্যার প্রকৃত সমাধানের কোনও সদিচ্ছা নেই। তিন-তালাক ও নাগরিকত্ব বিল দুটি যাদের চাপে রাজ্যসভায় গতিরুদ্ধ হল, তারাই অভিযোগ তুলেছে বিলদুটি নাকি রাজ্যসভায় পেশই করা হয়নি। নাগরিকত্ব বিলের বর্তমান স্থিতি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও তাৎক্ষণিক তিন তালাক নিষেধী বিলটিকে মর্গে পাঠানোর জন্য বিরোধীদের অবদান কিন্তু কারও অবিদিত নয়।

যাইহোক, আপাতত বিজেপি এই ‘ফাঁপা’ আভিযুক্ত বিলটিকেও লোকসভায় পাস করিয়ে উত্তরপূর্বে নিজেদের রাজনৈতিক জমি যেভাবে হারাল, সেই ক্ষতি নাগরিকত্বের টোপ গেলা উত্তরপুর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালি ভোটাররা পুষিয়ে দেবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ, বিশেষত যেখানে তথ্যের স্বচ্ছতার চেয়ে বিভ্রান্তি বেশি। অতএব ভারতের নাগরিকত্ব লাভের জন্য উদ্বাস্তু হিন্দু বাঙালিদের আসাম সরকারের খামখেয়ালি এনআরসি, আর ভারত সরকার প্রতিশ্রুত অলীক নাগরিকত্বের ভরসায় অদৃষ্ট সঁপে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

তবে এতশত জটিলতায় কে যায়? তার চেয়ে আসামের বাংলাভাষী মানে ১৯শে মের ট্রাজেডি, আর সাম্প্রদায়িকতার রং গেরুয়া – এই সরলীকরণ দিয়েই তো সাংস্কৃতিক পর্যটনের পথ খোলা।

3 COMMENTS

  1. ভালো লাগলো। অনেক গবেষণা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে।

  2. অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, প্রয়োজনীয় এবং তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। লেখিকার স্বচ্ছ দৃষ্টি ভঙ্গি আর সাহসি উপস্থাপনা প্রশংসনীয়। এই ধরণের আরও লেখার অপেক্ষায় রইলাম।

  3. Ossadharon lekha anek ojana toththo jaante paarlaam. Lekhikake ei rakam lekha upohaar deoar jonno osonkkho dhonyabad

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.