সুমের থেকে সোনাঝরা ইনকার আঁতুড়ঘরে শোনা গেছে সদ্যোজাত সভ্যতার প্রথম কান্না

রইল এমন কিছু সভ্যতার কথা যা মানবজাতির বুকে বিপ্লব এনেছিল এবং পৃথিবীর ইতিহাসে যা আজও অমলিন হয়ে রয়েছে।

* মেসোপটেমিয়া সভ্যতা- মনে করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৫০০ অব্দের মধ্যে এই সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল। এবং এই সভ্যতার হাত ধরেই মানুষ সভ্য সমাজ সৃষ্টি করেছিল। মেসোপটেমিয়া সভ্যতাতেই মানুষ কৃষিকাজ আবিষ্কার করে এবং চাষাবাদের জন্য গৃহপালিত পশুর লালন-পালন শুরু করে। বর্তমানে ইরাক বা তৎকালীন ব্যাবিলন, সুমার এবং অ্যাসিরিয়াতে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল।

* সিন্ধু সভ্যতা- খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০-১৯০০ অব্দের মধ্যে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। সিন্ধু সভ্যতাকে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বব্যাপ্তি সম্পন্ন সভ্যতা বলা হয়ে থাকে। সিন্ধু নদের তীরে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই সভ্যতা গড়ে ওঠার জন্য এর নাম হয়েছিল সিন্ধু সভ্যতা । এই সভ্যতায় অনেক অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রযুক্তি আবিষ্কার করা হয়েছিল যার নিদর্শন ওই অঞ্চলে আজও দেখতে পাওয়া যায়।

* মিশরীয় সভ্যতা- বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন সমৃদ্ধ একটি সভ্যতা হল মিশরীয় সভ্যতা । খ্রিস্টপূর্ব ৩১৫০-৩০ অব্দ পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। মরুভূমি-বেষ্টিত মিশরের বুকে প্রাণ সঞ্চার করেছিল মিশরের নীলনদ। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার ঐতিহ্য হল পিরামিড, ফ্যারাওদের মমি, স্ফিংক্স -এর ভাস্কর্য যা আজও মানুষের মনে বিস্ময় জাগায় । খ্রিস্টপূর্ব ৩১৫০ অব্দে ফ্যারাওদের শাসনে মিশরে উচ্চ এবং নীচু দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। মিশরের ইতিহাসকে বিভিন্ন যুগ ও সাম্রাজ্যে ভাগ করা হয়েছে যেমন- প্রাচীন সাম্রাজ্যের ব্রোঞ্জ যুগ, মধ্য সাম্রাজ্যের ব্রোঞ্জ যুগ এবং আধুনিক সাম্রাজ্যের ব্রোঞ্জ যুগ।

* মায়া সভ্যতা- মায়া সভ্যতার সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ৯০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সভ্যতায় মানবজাতি অনেকদিক থেকে উন্নতি লাভ করেছিল । একসময় এই সভ্যতার জনসংখ্যা ১৯ মিলিয়নে এসে দাঁড়িয়েছিল । এই সভ্যতার যুগেই প্রথম ক্যালেন্ডার আবিষ্কার হয়েছিল । ৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাঁরা নিজস্ব অক্ষর তৈরি করে যার সাহায্যে তাঁরা পাথরের গায়ে খোদাই করে নিজস্ব ক্যালেন্ডার এবং সূর্যঘড়ি্ তৈরি করেছিল । মায়ানদের মত অনুসারে, পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে ৩১১৪  খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১১ই আগস্ট দিনটি থেকেই তাদের ক্যালেন্ডার শুরু হয় এবং শেষ হয় ২১ই ডিসেম্বর, ২০১২ সালে । মায়ানদের তৈরি পিরামিড নাকি মিশরের পিরামিডের থেকেও আকারে বড় ছিল। কিন্তু মায়ানদের আচমকা অন্তর্ধান রহস্য আজও অধরা।

* চৈনিক সভ্যতা-  খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০- ১০৪৬ পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তার লাভ করেছিল। প্রাচীন চৈনিক সভ্যতা যা হান চিন নামেও পরিচিত । চৈনিক রাজবংশগুলি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, বলে শেষ করা কঠিন । চিনের প্রাচীন গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, চিনে প্রথম সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল সিয়া রাজবংশ । এরপর থেকে চিনে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজবংশের আবির্ভাব ঘটে। সর্বশেষ ক্যুইং রাজবংশের হার ধরে চিনের রাজবংশের পতন হয়। এই সময়কালে চৈনিক সভ্যতায় বারুদ, কাগজ, ছাপাখানা, মদ, কম্পাস প্রভৃতি আবিষ্কার আজও বিস্ময় জাগায়।

* গ্রিক সভ্যতা – নিঃসন্দেহে বলা যায় এই এই সভ্যতাই মানবসভ্যতায় সবথেকে বেশি পরিবর্তন এনেছিল। আধুনিক জ্যামিতি, পদার্থবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যার সূত্রপাত ঘটেছিল প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায়। এই সভ্যতার ইতিহাস এতটাই বিস্তৃত যে, গবেষণার সুবিধার জন্যে ইতিহাসবিদরা এই সভ্যতাকে কয়েকটি যুগে বিভক্ত করেছেন। এর মধ্যে জনপ্রিয় হল, আর্কাইক, ক্ল্যাসিক্যাল, হেলেনেস্টিক । প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার হাত ধরেই জন্ম নিয়েছিল আজকের গণতন্ত্রের ধারনা। সেইসঙ্গে প্রাচীন অলিম্পিকের ধারণারও উদ্ভব হয়েছিল এই সময়ে।  পিথাগোরাস, আর্কেমেডিস, সক্রেটিস প্লেটো, এরিস্টটল, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর মতো বিখ্যাত মানুষের অবদান আজও ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

* পারস্য সভ্যতা- একসময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল পারস্যদের। মিশরের দক্ষিণাঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রিসের খানিকটা অংশ হয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত তাদের দখলে ছিল। পারস্যের সম্রাটরা রাজ্যপাট পরিচালনায় এবং সামরিক দিক থেকে খুবই সক্রিয় ছিল। মাত্র ২০০ বছরের শাসনে তাঁরা দুই মিলিয়ন বর্গমাইল অঞ্চল দখল করেছিল। এর আগে ৫৫০ খ্রিস্টপূর্বে পারস্যের অধিবাসীরা আলাদা আলাদা অঞ্চলে আলাদা আলাদা শাসকের অধীনে বসবাস করত। পরবর্তীকালে রাজা দ্বিতীয় সাইরাস ( যিনি সাইরাস দি গ্রেট নামে পরিচিত ) ক্ষমতায় আসার পর পারস্যের সমস্ত শহরগুলোকে একত্রিত করে একটি সাম্রাজ্য গঠন করেন।  আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট-এর কাছে  পরাজিত হয়ে পারসিয়ানদের পতন ঘটে।

* রোমান সভ্যতা- রোমান সাম্রাজ্য পত্তনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু কাহিনি ও উপকথা। তবে ক্ষমতার শীর্ষে এসে রোম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভূখন্ডে নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। বর্তমানে ভূমধ্যসাগর এবং তার আশেপাশের দেশগুলো রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জুলিয়াস সিজার, ট্রোজান এবং অগাস্টাস-এর মতো পৃথিবীর সেরা শাসকদের উত্থান-পতনের সাক্ষী এই রোমান সভ্যতা। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে রাজ্যের পরিধি বিস্তার লাভ করলে রাজ্যপরিচালনা কঠিন হয়ে ওঠে। তাই ছয় প্রজন্ম রাজতন্ত্রের পর রোমানরা রাজ্য পরিচালনার ভার নিজেদের হাতে তুলে নেয়। তখন তাঁরা রাজ্য পরিচালনার জন্য ‘সেনেট’ কাউন্সিল গড়ে তোলে। সৃষ্টি হয় প্রজাতন্ত্রের। উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের বর্বরদের হাতে পরাক্রমশালী রোমান সাম্রাজ্যের অবসান হয়।

*  অ্যাজটেক সভ্যতা- উত্তর আমেরিকায় ইনকারা  যখন সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পায় ঠিক তখনই  অ্যাজটেকদের আগমন ঘটে। বর্তমানে মেক্সিকোতে তারা তিনটি বৃহৎ গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে তিনটি আলদা শহর টেনোচটিটলান, টেক্সোকো, টিলাকোপোন। পরবর্তীকালে তিনটি শহরকে একত্রিত করে মেক্সিকো উপত্যকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মায়া সভ্যতার যে শতাব্দীতে পতন ঘটে সেই শতাব্দীতে অ্যাজটেকদের উত্থান ঘটে। টেনোচটিটলান শহর ছিলো তাদের প্রধান সামরিক ঘাটি, যেটি তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।  ১৫০০ শতাব্দীরর দিকে অ্যাজটেকরা তাদের ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছায়। ৫২১ শতাব্দীতে স্পেনীয়রা অ্যাজটেকদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পরে এবং এই যুদ্ধে অ্যাজটেকদের পতন ঘটে।

* ইনকা সভ্যতা- কলম্বাস-পূর্ববর্তী যুগে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য ছিল ইনকা। বর্তমানের ইকুয়েডর, পেরু, চিলি-তে তাদের সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ইনকা সভ্যতার পুরনো স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যে, এমনকী, মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যেও সোনার ব্যবহার চোখে পড়ত। শোনা যায়, পেরু এবং বলিভিয়ার মাঝামাঝি আন্দিজ পর্বতের শীর্ষে অবস্থিত এক হ্রদের গভীরে ইনকারা ডুবিয়ে রেখেছিল তাদের সব সোনা। যদিও বহু অনুসন্ধানের পর সেই সোনার খোঁজ মেলেনি।  সোনার শহর ‘এল ডোরাডো’-র জনশ্রুতি চালু হয়। স্পেনের নাবিক ফ্রান্সিসকো পিজারোর হাতে ধ্বংস হয় ইনকা সভ্যতা। যে সভ্যতার গরিমাময় সাক্ষ্য বহন করছে মাচুপিচু |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here