ছোটদের ছবি আর ওপেনটি বায়োস্কোপ: হিসেবিদের আঁকা বাঙালির বটতলা!

‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’-এর ওই দৃশ্যটা দিয়ে এ লেখার শুরু করা যায়। মাঝবয়সিনী বৈশাখী (সুদীপ্তা চক্রবর্তী) দুরু-দুরু বুকে নিজের ছেলেকে নিয়ে গেছে তার পাড়ার ছোটদাদাবাবু মহিম হালদারের (কৌশিক সেন) কাছে। ছবিতে সরাসরি পার্টির নামটা কোথাও না করা হলেও মহিমের কথাবার্তা থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে সে সিপিএমের কর্মী, তাকে পাড়ার স্বঘোষিত মুরুব্বিও বলা যেতে পারে। সিঙ্গল মাদার বৈশাখী তার কাছে সেক্রেটারির কাজ করে। অবশ্য ছবি আরেকটু এগোলে এটাও দেখা যাবে যে, এই সেক্রেটারির কাজ করা মানে শুধু চিঠি টাইপ করে দেওয়া মার্কা কাজ নয়, নিরালা নির্জনে ছোটদাদাবাবুর শরীরে আদরের হাত বুলিয়ে তাকে দেহবিলাসের আরাম জুগনোও বটে। তবে, হোস্টেল থেকে বিতাড়িত কিশোর সন্তান ফোয়ারাকে (ঋদ্ধি সেন) যখন প্রথমবার এই বামপন্থী মহিমের কাছে নিয়ে আসে বৈশাখী, তখনও আমরা, দর্শকেরা এত কথার কিছুই জানি না। এমনকি তখন আমরা এটাও জানি না যে, ফোয়ারার বাবা মানুষটার সঙ্গে এই বৈশাখীর কখনো বিয়ে-শাদিও হয় নি। ফোয়ারা বৈশাখীর গর্ভে এসে পড়েছিল প্রি-ম্যারিটাল সেক্সের ফলে। পেট হয়ে গেছে এটা বোঝার পরে অবশ্য বৈশাখী আর নিজের প্রেমিককে বিয়ের সুযোগটুকুও পায় নি। কারণ এর অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আচমকা সেই মর্মান্তিক দুঃসংবাদটা আসে ওর কাছে– ভয়ংকর এক বাস-দুর্ঘটনায় চিরতরে চলে গেছে ওর গর্ভস্থ ভ্রূণের বাবা। সাহসিনী বৈশাখী এই সবকিছুর পরেও যে ভেঙে না পড়ে আর অ্যাবর্শন না করে সেই ভ্রূণটিকে জণ্ম দিয়ে বড় করে তোলার সাহস দেখায়, সে জন্যে তো তাঁর অবশ্যই বেশ কিছু কুর্ণিশ প্রাপ্য। অবিশ্যি সেই কুর্নিশ দেবার আগে এটা জানানো জরুরী যে ফোয়ারার সঙ্গে মহিম হালদারের প্রথম মোলাকাতের দৃশ্যটা দিয়েই কেন এ লেখার শুরু হল।

শুরু হল তার কারণ, এই দৃশ্যে ফোয়ারার হাতে তুলে দেওয়া মহিমের প্রথম উপহারটি যেন বড় বেশি ব্যঞ্জনাময়, বড্ড তাৎপর্যবাহী। উপহারটি আর কিছুই নয়, একটা সস্তার বাইনোকুলার। এই সিনেমায় যাকে বলা হয় ‘দূরবীন’। ফোয়ারার হাতে দূরবীনটা তুলে দিতে গিয়ে সোজাসাপটা ভাষায় তার উপযোগিতাটাও খুলে বলে মহিম। এ হল সেই যন্ত্র, যেটা চোখের সামনে ধরলে মনে হয় দূরের সবকিছু বুঝি কাছে চলে এসেছে। তবে ঠিক এইসময়ে কার্যকরী অ্যালার্মটাও শুনিয়ে রাখে মহিম, এটাও বলে দেয় যে এই মনে হওয়াটা নিছক চোখের ভ্রম মাত্র। যতই দূরবীন লাগান হোক না কেন, দূরের জিনিস আসলে কিন্তু দূরেই রয়ে যায়, কদাচ কাছে আসে না। প্রথমটা এই সংলাপ শুনতে হয়তো বেশ মামুলি লাগে, কিন্তু তারপর যেন একটা সময় বুকের একটা কোথাও গিয়ে ধাক্কা দিতে থাকে কথাগুলো আর মনে হতে থাকে শুধু অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ই নয়, কৌশিক গাঙ্গুলীর চৌদ্দ নম্বর ছবি ‘ছোটদের ছবি’ও আসলে ওই দূরবীন দিয়ে দেখা দূরের দৃশ্যের মতো। ছবি দেখতে গিয়ে পলকের জন্যে এমন বিভ্রম তৈরি হয় বটে যে, ছবির শরীর জুড়ে সাজানো দৃশ্যমালাগুলো হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে – কিন্তু অনতিবিলম্বেই টের পাওয়া যায় সেই সব কিছু আসলে রয়ে গেছে স্পর্শের বাইরে –এক আশ্চর্য অসেতুসম্ভব দূরত্বে।

নব্বই দশকের ঠিক মাঝামাঝি সময়টাকে নিয়ে তৈরি অনিন্দ্যের ছবির উপজীব্য বিষয় কিন্তু শুধু এক মধ্যবয়সী সুন্দরী আর তাঁর কানীন সন্তান নয়। এদের দুজনকে প্লেটের (কিংবা প্লটের) মাঝবরাবর রেখে অনিন্দ্য আসলে আমাদের সামনে সাজিয়ে দেন আস্ত ৯৫ সালটাকেই। বা, বলা ভালো গোটা প্রাক-ইন্টারনেট, প্রাক-কেবল টিভি-র যুগটাকেই। তাই রাস্তার অচেনা পথচারী মোবাইলের ইনকামিং কলে পয়সা কাটার নামে রেগে চিড়বিড়োন। তাই শহরজুড়ে হঠাৎ এক সকালবেলা গুজবের দুধ খেতে থাকে গণেশঠাকুর। তাই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে চোখে কালো চশমার ফিল্টার লাগিয়ে হিরের আংটি খোঁজে ম্যাংগো পিউপল। প্রাক্তন ফুটবলার গোপেশ্বর ভৌমিকের (রজতাভ দত্ত) মেধাবী ছেলে বিদেশে গিয়ে ‘অ্যাপল’ কোম্পানির চাকরি করে শুনে প্রতিবেশীর ঘোর কাটে না। বিদেশ-বিভূঁইতে গিয়ে কাশী বোস লেনের বাঙালি যুবা স্প্যানিশ মেয়ের সঙ্গে থাকছে শুনে আঁতকে উঠে বাঙালিনী মায়ের প্রথমেই মনে পড়ে যায় সেই মেয়ের শৌচ-অভ্যেসের কথা। এটা হলো গিয়ে সেই সময় যখন পাড়ার লাজুক কিশোরীর প্রেমে পড়ে তার স্কুলব্যাগে কাঁচা হাতে লেখা প্রেমপত্র গুঁজে দিত সসংকোচ কিশোর – সিনেমা দেখতে গিয়ে ওর হাতের ওপর হাত রাখতে গেলেই বুক ধড়াস ধড়াস করত, মোবাইলে লুকিয়ে ওর গোপনাঙ্গের ছবি তুলে নিয়ে সেটা নেটে শেয়ার করার স্মার্টনেস কল্পনার উলটো পিঠে ছিল। এমন একটা টাইমস্কেপে লেপটে থাকা এই মানুষগুলোকে সিনেমার পর্দায় চলতে-ফিরতে দেখে তাই এটা মনে না হয়ে পারে না যে, খালি চোখে সিনেমা দেখছি না – আসলে চোখের ওপর দূরবীন লাগিয়ে দেখছি যেন বহু দূরের কিছু।

সেখান থেকে এবার আসুন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের নতুন ছবি –’ছোটদের ছবি’র কথায়। এই ছবিতে অনিন্দ্যের ছবির মতো কোন টাইম-ট্র্যাভেল নেই বটে, কিন্তু এই ছবি বানানোর সময়েও পরিচালকের চোখ থাকে সেই দূরবীনেই। সমাজের কুলীন মার্গের স্থায়ী বাসিন্দা – দক্ষিণ কলকাতার পশ আবাসনের কৌশিক এই ছবিতে তাঁর দূরবীনে ধরেন সেই মানুষগুলোকে, কপালদোষে যাঁদের উচ্চতা একটা বয়সের পর আর বাড়ে নি – তাই সভ্য সমাজ এখন যাঁদের ‘বেঁটে বামন’ বলে চেনে। দু-মুঠো খাবার জোগাড়ের জন্যে সার্কাসে নিজের জীবন বাজি রেখে ট্র্যাপিজের খেলা দেখান যে মানুষগুলো, আর তারপর হাত ফসকে মাটিতে আছড়ে পড়ে কোমর ভেঙে অসহায় চোখে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শেষটা নিজের বামন-কন্যাটির ব্যাগে রাখা ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে সুইসাইড করেন নিঃসাড়ে, তাঁরা কি সত্যি আদৌ মানুষ? এই সিস্টেম কি তাঁদের কাউকে মনুষ্যপদবাচ্য বলে ভাবে? মোম-পালিশ করা শুভ্র নাগরিক সুন্দরীকে যেদিন সাত তারা হোটেলের পার্টিতে চ্যাপলিন-সেজে আসা দুস্থ ভাড়াটে মানুষটির কঙ্কালসাড় চেহারা দেখে নিষ্ঠুর খিল্লিতে হেসে উঠতে দেখেছিলাম, (তিনি বলেছিলেন – ও মা গো, তোমরা জাস্ট একবার দেখে যাও, এই হাড়গিলে চ্যাপলিনটা কি দুর্ভিক্ষের দেশ থেকে এসেছে?) তখনই সত্যি টের পেয়েছিলাম যে, ট্রেনে ট্রেনে আরশোলা মারার বিষ ফেরি করে বেরানো বামন মেয়ে সোমা যেমন মানুষ নয়, পার্টিতে চ্যাপলিন সেজে আসা এই পুরুষটিও তেমন মানুষ নয় – ওরা সবাই ভিনগ্রহের জীব – আর সে গ্রহ আমাদের থেকে এত দূরে, যে সেদিক পানে দেখতে হলে আমরা যারা এসি রুমে থাকি-টাকি, আর হপ্তা শেষেগলায় দু-পাত্তর ঢালি-টালি, সেই তাদের দূরবীন ছাড়া গতি নেই।

অনিন্দ্য আর কৌশিক দুজনেই দূরবীন হাতে ছবি করেছেন, আর আশ্চর্য কাকতালীয় যে, দুজনের ছবিই হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ছোটদের ছবি’! একজনের ছবিতে যখন ‘ছোট’ শব্দের মানে দৈর্ঘ্যে ছোট মানুষদের গল্প, অন্যজনের ছবিতে তখন ছোট মানে সত্যি সত্যি বয়সে ছোট মানুষগুলোর জীবনগাথা। অনিন্দ্যের ছবির শরীর লেপটে থাকে উত্তর কলকাতায় – শ্যামপুকুর থানার কাছে দেশবন্ধু বাই লেনে। কিমাশ্চর্যম যে কৌশিকও ক্যামেরা কাঁধে পৌঁছে যান সেই উত্তর কলকাতাতেই – বাগবাজার আর কুমোরটুলির গলিঘুঁজিতে। দুটো ছবিতেই যে ছোট (দৈর্ঘ্যে বা বয়সে) মানুষ-মানুষীর ভালবাসা পেয়ে হারানোর চেনা-আখ্যান, সেটা দেখে আর অবাক হই না, বরং সবচেয়ে বড় চমকটা খাই দুই পরিচালকের বিশেষ কিছু দৃশ্যভাবনার সাদৃশ্যটা দেখে। খেয়াল করে দেখুন, দুটো ছবিতেই সাবান জলে বুদবুদ তৈরির আমুদে খেলা আর সেই খেলা ছবির অভ্যন্তর থেকে বেরিয়ে সটান পৌঁছে যাচ্ছে ছবির পোস্টারেও! ভাবতে পারছেন?এই লেখার সঙ্গে থাকা দুটো ছবির পোস্টারে একঝলক তাকালে আপনারও হয়তো জানতে ইচ্ছে হবে – মোটে এক সপ্তাহের ফারাকে রিলিজড দুটো ছবির পোস্টার-ভাবনাতেও এমন মিল কি নিছক কাকতালীয়?

বছরের পর বছর ধরে সংবাদ বেওসায়ীর কাছে কালি-কলম-মন বন্ধক রাখতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠে একসময় আর থাকতে না পেরে সিনেমায় সমর্পণ করছেন নিজের জীবন, এমন উদাহরণ ভারতে তো বটেই, এই ছোট্ট কলকাতাতেও নেহাত কম না। পূর্ণেন্দু পত্রী আনন্দবাজারে কাজ করার পাশাপাশি ছবি তৈরির দুনিয়ায় হাত মকশো করার কথা ভেবেছিলেন একসময়, তাই তৈরি হয়েছিল ‘স্বপ্ন নিয়ে’ (১৯৬৬), ‘স্ত্রীর পত্র’ (১৯৭২), ‘ছেঁড়া তমসুক’ (১৯৭৪) কিংবা’ছোট বকুলপুরের যাত্রী’র (১৯৮১) মতো ছবি। ক্রিয়েটিভিটির খিদে হয়তো মিটেছিল, কিন্তু কমার্শিয়াল সাকসেস যে পান নি, সেটা তো ছবির নামগুলোয় একবার চোখ রেখেই বুঝতে পারছেন। আনন্দবাজারের চাকরি ছেড়ে বাংলা মার্কেটে ছবি করতে নেমেছিলেন সুব্রত সেনও। প্রথম ছবির মুখ্য ভূমিকায় অপর্ণা-কন্যা কঙ্কনাকে নিয়ে একসময়বাজারে হৈ-চৈও ফেলেছিলেন নেহাত মন্দ না। কিন্তু গোড়ার সেই ‘এক যে আছে কন্যা’ (২০০১) ছাড়া এঁর তৈরি আর কোনও ছবিই বক্স অফিসের আশীর্বাদ পেয়েছে বলে জানা নেই। ডুবে গেছে ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ (২০০২), ‘নীল নির্জনে’ (২০০৩), ‘হঠাৎ নীরার জন্যে’ (২০০৪), ‘বিবর’ (২০০৫), ‘কয়েকটি মেয়ের গল্প’ (২০১২) কিংবা ‘সাদা ক্যানভাস’-এর (২০১৪) মতো ছবি। আজকাল পত্রিকার একসময়ের কর্মী অনিকেত চট্টোপাধ্যায় কিন্তু এখন পুরো সময়ের ফিল্মমেকার। ‘ছ-এ ছুটি’ (২০০৯), ‘বাই বাই ব্যাংকক’ (২০১১), ‘গোড়ায় গণ্ডগোল’ (২০১২), ‘মহাপুরুষ ও কাপুরুষ’ (২০১৩) কিংবা ‘জানলা দিয়ে বৌ পালালো’-র (২০১৪) মতো ছবি একটার পর একটা বানিয়ে যাবার দৌলতে ইন্ডাস্ট্রি এখন অনিকেতকে কমেডি ফিল্ম-মেকার বলেই চেনে। সাংবাদিকের পেশা ছেড়ে ছবি বানাতে আসা মানুষজনের তালিকা অবশ্য এখানেই পুরো শেষ নয়। এই তালিকায় আছেন আজকাল-এর সৌগত রায়বর্মন, দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের প্রতীম দাশগুপ্ত কিংবা এই সময় কাগজের শোভন তরফদারও। সৌগতের তৈরি দুখানা ছবির দুখানাই (‘৯০ ঘণ্টা’ আর ‘তবে তাই হোক’) শোচনীয় ভাবে ফ্লপ হবার পরে সৌগত এখন আবার ফিরে গেছেন লেখালেখির দুনিয়ায়। প্রতীমের প্রথম ছবি ‘পাঁচ অধ্যায়’ মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ারপর পরের প্রযোজক খুঁজে পেতে প্রতীমকে প্রায় যেন যুদ্ধ লড়তে হয়েছে একদফা। আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে তৈরি শোভনের ছবি ‘সেলফি’ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে দেখান হলেও কমার্শিয়ালি কবে রিলিজ করবে, জানা নেই কারুর।

সাংবাদিকদের ছবি তৈরির গল্প এতটাবিশদে শোনালাম শুধু এইটুকু বোঝানোর জন্যে যে ঠিক কোন মাটিতে দাঁড়িয়ে জীবনের প্রথম সিনেমা নিয়ে খেলতে নামলেন সংবাদ প্রতিদিনের কর্মী অনিন্দ্য। অনিন্দ্যকে অবশ্য শুধু মিডিয়া-কর্মীর অভিধায় বেঁধে রাখা মুশকিল। ‘চন্দ্রবিন্দু’ ব্যান্ডের অন্যতম প্রধান গায়ক অনিন্দ্য গান লেখেন, সুর করেন, এর আগে কাজ করেছেন সিনেমা-টেলিভিশনেও। এমন একজন বহুমুখী প্রতিভার মানুষ জীবনের প্রথম ছবি বানাতে গিয়ে ঠিক কোন বিষয়টাকে তাঁর ছবির জন্যে বেছে নেবেন, সেটা নিয়ে কৌতূহল ছিল তীব্র। ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ রিলিজ হবার পর দেখি অনিন্দ্যের ছবির বিষয় হয়ে উঠেছে নব্বই দশকের উত্তর কলকাতা আর সেই পুরনো পাড়ার কিছু মানুষজন। ছবি দেখতে দেখতে চোখে মুখে একটা আলতো ভাল লাগার রেশ এসে আদর করে যায় ঠিকই, আর ‘বন্ধু চল’ গানটা (শান্তনু মৈত্র) গুন গুন করে যেতে থাকে কানের মধ্যে অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু ছবি শেষ হয়ে যাবার পরেএকটা সময় মনে হতে থাকে – এ ছবি থেকে সত্যি নতুন কিছু পেলাম কি? সুমন মুখোপাধ্যায়ের ‘হারবার্ট’ (২০০৫) ছবিতেও তো একই ভাবে জ্যান্তহয়ে উঠেছিল উত্তর কলকাতা। রাজ চক্রবর্তীর ‘লে ছক্কা’ (২০১০) ছবিতে উত্তর আর দক্ষিণ কলকাতার মধ্যে শুধু তুমুল রেষারেষিই নয়, ছবির ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে ওই দুই কলকাতার মধ্যে মার-মার-কাট-কাট ক্রিকেট ম্যাচও হতে দেখেছি। অনিন্দ্যের ছবিতে ফারাক বলতে কি তাহলে শুধু এইটুকু যে উত্তরের চিত্রায়ণটা রাজের ছবির থেকে ঢেরবেশি ভালো হল (শুটিং হয়েছে শ্যামপুকুর স্ট্রিট আর এন্টালি হকি গ্রাউন্ডে) আর ওই ছবির ক্রিকেটটা এখানে বদলে হয়ে গেছে ফুটবল?

তলিয়ে ভাবতে গেলে ‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ চমৎকার সব দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে যেন একটা ফেলে আসা সময়ের অ্যালবাম সাজিয়ে বসে চোখের সামনে – তার বেশি খুব একটা কিছু নয়। জীবনের তীব্র তিক্ত বিষাক্ত সত্যিগুলোও পরিচালকের নরম আদরে যেন এখানে গেরস্থ-পোষ হয়ে ওঠে। গোপী ভগতের ক্যামেরায় হাজার একটা ছবির নিরুচ্চার রেফারেন্স যেন উঁকি দিয়ে যায় ফ্রেম থেকে ফ্রেমে। পাড়ার রাজনৈতিক মুরুব্বি মহিম হালদারকে নির্জনে আদর করে দিচ্ছে মা, একলা দুপুরে হঠাৎ যখন এটা দেখে ফেলে কিশোর ফোয়ারা, তখন শাহিদ কাপুর-তাব্বু আর কে কে মেননকে নিয়ে অল্প কয়েকদিন আগে দেখা প্রায় এমনই একটা দৃশ্য মনে না পড়ে পারে না।আর শুধু তো সেই ‘হায়দার’-ই নয়। মা আর মহিম হালদারের গোপন আদরের সিনটা হঠাৎ করে দেখে ফেলার পরে যখন ঢিল মেরে মহিম হালদারের বাড়ির কাঁচ গুঁড়িয়ে দেয় ফোয়ারা, তখন তো আবার মনে হয়, যাহ্‌ এটা কি তাহলে সেই ‘অংকুর’-এর লাস্ট সিনটা নাকি? শহরের গলিপথে তিতির-এর (সুরঙ্গনা বন্দ্যোপাধ্যায়) পেছনে যখন সাইকেলে ধাওয়া করে উচ্ছল চার নবীন কিশোর: ফোয়ারা– চরণ – কচুয়া – গোপা (ঋদ্ধি সেন – ধী মজুমদার – ঋতব্রত মুখার্জি – রাজর্ষি নাগ), তখন একেকবার তো এও মনে হয় যে এই দৃশ্যটা বুঝি সাক্ষাৎ উঠে এলো সেই বিখ্যাত ‘ম্যালেনা’ (২০০০) ছবির থেকে। তারপরেই অবশ্য্ মনে পড়ে যায় যে এগুলো ঠিক কপি নয়, আজকাল এগুলোকেই বলতে হয় ‘ট্রিবিউট’। ফোয়ারাকে ঘুম থেকে ডাকার সময় মুখের থেকে চাদর সরিয়ে ওর এক চোখ চাওয়ার দৃশ্যটা যেমন আবার সেই ‘পথের পাঁচালী’তে অপুকে ঘুম থেকে তোলার দৃশ্যটাকে ট্রিবিউট। প্রথম ছবি বানাতে বসে – নিজের ছোটবেলা আর ফেলে আসা সময়টাকে আঁকতে বসে- এইভাবে দুনিয়ার বেশিরভাগ ভালো ছবিগুলোকে সিন থেকে সিনে ‘ট্রিবিউট’ দিতে দিতে গেছেন অনিন্দ্য।

স্মার্ট বিজ্ঞাপনী কপি লেখায় অনিন্দ্যের ওস্তাদি যে কতদূর, সেটা বোঝা যায় ছবির সংলাপ একটু খেয়াল করে শুনলেই।’ডিম’-এর সঙ্গে ‘ডিম্যান্ড’, ‘পার্টি’র সঙ্গে ‘প্রপার্টি’, ‘হোস্টেল’-এরসঙ্গে ‘হোস্টাইল’, ‘হিসি’র সঙ্গে’কিসি’ কিংবা ‘টিপে টিপে টিপু সুলতান’ মার্কা কথাগুলো শুনতে বসে মনে হয়, এ কি পাড়ার পাবলিকের স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ, নাকিফার্স্ট ক্লাস এক কপি রাইটারের মুচমুচে হাতে গরম ক্রিয়েটিভিটি? এমনিতে এই ব্যাপারটায় অসুবিধেও নেই কিছু – শুধু এটুকুই বলার যে পৃথিবীর বেশির ভাগ ভাল ছবিতেই অনেক খুঁজেও এমন চালাক চালাক তাল-মিলনো সংলাপ খুঁজে বের করা মুশকিল। মজাদার সংলাপ ইক্যুয়াল টু ভালো ছবি, সিনেমার সমীকরণটা এত সরল নয় বোধহয়।

‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’-এর দুর্বলতম দিক বোধ হয় এর আখ্যানভাগ। রাজনৈতিক মাস্তানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্পোর্টসের ময়দানে লড়াই করতে নামার গল্পটা এর আগে বিস্তর সিনেমায় শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। লিস্টিটা দেব নাকি? বেশিদিন আগে যাবার দরকার নেই, শুধু গত কয়েকবছরের সিনেমার ইতিহাস উলটে দেখলেই চমকে উঠতে হবে। ২০০১ সালে হিন্দিতে ‘লগান’ দিয়ে শুরু (ভারত বনাম বৃটিশ), তারপর কিছুটা সেই রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হাঁটতেই বাংলায় ‘এগারো’ (২০১১, বাংলা বনাম বৃটিশ), তারপর ‘লে ছক্কা’ (উত্তর কলকাতা বনাম রাজনৈতিক মাস্তানি), জাস্ট এক উইক আগেই ‘লড়াই'(কুসুমডিহি একাদশ বনাম রাজনৈতিক মাস্তানি) আর এবার এই ‘ওপেনটি… ‘(পাড়া ইউনাইটেড কবচ বনাম রাজনৈতিক মাস্তানি)। ছেলেবেলার গল্প বলতে বসে এই ‘স্পোর্টস ভার্সেস রাজনীতির দুষ্টু লোক’ মার্কা ক্লিশে-হয়ে-যাওয়া কনটেন্ট ছাড়া অনিন্দ্য আর কোন কিছু খুঁজে পেলেন না? মাঝে আবার একছটাক বোমা-বিস্ফোরণও ঢুকিয়ে দিতে হল! মাতব্বর মহিম হালদারের সামনে যখন ফুটবল ম্যাচ নিয়ে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েদিচ্ছে ইরাবতী (সোহিনী সরকার), তখন আরেকটু হলে তো আমিই ওকে বলে বসতাম যে, এরকম চ্যালেঞ্জ দেওয়া-নেওয়ার খাস্তা ডায়ালগগুলো ওইসব দেব-টেবের মুখেই মানায় বেশি, তুমি প্লিজ আর ওই ছকে কথা বলতে যেও না।

‘ওপেনটি বায়োস্কোপ’ দেখতে বসে যেমন একটার পর একটা পুরনো ছবির কথা মনে পড়তে থাকে, কিছুটা একই হাল হয় ‘ছোটদের ছবি’ দেখার সময়েও। প্রায় বছর পনের আগে সেই ২০০০ সালেই এক বিরল মমতায় বাংলা সিনেমায় বামনদের এক ব্যতিক্রমী পৃথিবী নির্মাণ করেছিলেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। ছবির নাম ‘উত্তরা’। ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে সে ছবির বামন রেলওয়ে গার্ডটিকে সখেদে উত্তরাকে বলতে শুনেছিলাম –’লম্বা মানুষ তো দেখলে এতকাল। কিছু করতে পারল তারা? পৃথিবীটা বদলালো? খালি যুদ্ধ, যুদ্ধ আর যুদ্ধ।’ লম্বা মানুষদের নিষ্ঠুর পৃথিবীর উদ্দেশ্যে জবরদস্ত ঘৃণাটা তাই কৌশিক গাঙ্গুলীর ছবিতেই প্রথম ছোঁড়া হল, তেমনটা লিখতে গেলে সত্যের একটু অপলাপ হয়ে যাবে হয়তো। ‘উত্তরা’ ছবির পরতে পরতে লম্বা মানুষদের তৈরি সিস্টেমের বিরুদ্ধে গুলি-বারুদ ঠাসা। ছবির শেষে লম্বা মানুষদের চিরতরে ত্যাগ করে বামন রেলওয়ে গার্ডের হাত ধরে বামনদের গ্রামে চলে যাবার স্বপ্ন দেখতে থাকে উত্তরা। সেই স্বপ্ন সফল হবার অনেক আগেই যে তা ফের টুকরো হয়ে ভেঙে যায়, সেই ট্র্যাজিক পরিণতির কারণও তো ছিল সেই ছবির লম্বা মানুষেরাই।

বামন মানুষের সঙ্গে সহবাসের ফলে জন্মান সন্তান বামন হবে না তো? আকুল হয়ে জানতে চেয়েছিল উত্তরা। কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘ছোটদের ছবি’তেও সেই একই আশংকায় দীর্ণ সোমা ঠিক করে সে এই জীবনে আর বিয়েই করবে না। কৌ্শিকের ছবি যখন গভীর অভিমানে বলে ওঠে – এই পৃথিবীতে আর জোকারদের কোন প্রয়োজন নেই, তখন মনে পড়ে যায় যে অতগুলো বছর আগেই কিন্তু ‘উত্তরা’ ছবির আশাবাদী বামন মানুষটি ঠিক এর উলটো কথা শুনিয়েছিল উত্তরাকে। ঘর বাঁধতে চেয়েছিল সে। ‘আমার বৌ নেই, বিয়ে হয়নি। তুমি খুব ভাল। তোমার সঙ্গে বিয়ে হলে বাচ্চাগুলোও তোমার মতন ভালো হবে।’ উত্তরা শুনে বলেছিল –’তারাও তো তোমার মতন ছোট ছোট বামন হবে।’ উত্তরে বামন রেলওয়ে গার্ড –’তাই তো হবে। আমাদের গ্রামে আমরা সবাই তাই। …দাদু, ছেলে, নাতি, ঠাকুমা, মা, মাসি সবাই আমার মতো।… জানো, আমাদের গ্রামে আমরা সবাই একটা স্বপ্ন দেখি।… দেখি আশেপাশে সব আমাদের মতো বামনে ভরে গেছে। তারাই চালাচ্ছে সব… মানুষ ভালো আছে।’ বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের এই তীব্র সুররিয়ালিস্ট আশাবাদ কৌশিক গাঙ্গুলীর ছবিতে একেবারে উধাও। শুধু সেটুকুই নয়, পনের বছর আগেই যে এই বাংলায় বামনদের নিয়ে এমন মর্মস্পর্শী ছবি হয়ে গেছে, খবরের কাগজে ছাপা ‘ছোটদের ছবি’র অগুন্তি প্রমোশনাল রাইট-আপে একবারও কোথাও তার ছিটেফোঁটা উল্লেখও নেই। কী হতো উল্লেখ থাকলে? ‘ছোটদের ছবি’র ক্রেডিট কিছুটা কমে যেত বুঝি? সংবেদনশীল পরিচালক কিংবা অভিজ্ঞ প্রযোজক – কারুর তরফেই এই ব্যবহারটা ঠিক আশা করাযায় না বোধহয়।

বাংলা টিভি চ্যানেলের জন্যে একসময় পঁয়তাল্লিশ মিনিট দৈর্ঘ্যের দুরন্ত সব প্রেমের গল্প বানাতেন কৌশিক। সিরিজটার নাম ছিল ‘শুধু তোমারই জন্য’। ছোটদের ছবি দেখতে বসে ভীষণ মনে পড়ছিল সেই সিরিজটার কথা। মিনি-ছবির সেই সিরিজটারই একটা এক্সটেনশন যেন এই সিনেমা। খোকা (দুলাল সরকার) আর সোমার (দেবলীনা রায়) মেদুর ভালবাসা আর হাতে হাত ধরার উষ্ণ গল্পটাশুধু দৈর্ঘ্যেই সেই মিনি-ছবিগুলোর ডবল, আর বিশেষ কিছু ফারাক নেই।

অনিন্দ্য আর কৌশিকের দুটো ছবিই আসলে শেষ অবধি জাস্ট ভালবেসে যাবার গল্প। একেকসময় তো এও মনে হতে থাকে যে, ঘটমান কর্কশ বাস্তবটাকেও পেলব রোমান্সের মোহে আচ্ছন্ন করে দিতে নবীন পরিচালক অনিন্দ্য আর অনতিপ্রবীণ কৌশিক – দুজনেই বোধহয় একই রকম দক্ষ।

যে প্রসঙ্গ লিখে এ লেখার শুরু, ফিরে আসি আবার সেইখানেই। মায়ের সঙ্গে মহিম হালদারের ঘরে গিয়ে তার থেকে বাইনোকুলার পেয়ে প্রথমেই সেটা দিয়ে চকিতে মহিমের ঘরে সাজানো নগ্ননারী মূর্তির স্তনবৃন্ত দেখে নিয়েছিলো ফোয়ারা। এরপর সেই বাইনোকুলারটা কাজে লেগেছিল রাতের বেলায় দল বেঁধে গাছে উঠে পাশের বাড়ির দম্পতির মাঝরাতের আদর দেখায়। তবে সব আদর দেখায় তো আর একরকম মজা নেই, তাই নিরালাদুপুরে মহিম হালদারকে আদর করে দিচ্ছে মা, এটা দেখার পরে ফোয়ারা বিতৃষ্ণার চোটে দূরবীনটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল গঙ্গার জলে।

এরপরটুকু এইভাবে ভেবে নিতে ইচ্ছে হয় যে গত শতকে ফোয়ারার ফেলে দেওয়া সেই মামুলি দূরবীনটাই অধুনা কুড়িয়ে পেয়েছেন আজকের অনিন্দ্য-কৌশিকেরা। আর সেই দূরবীনেই ধরা পড়েছে ফোয়ারার মতো, খোকার মতো, সোমার মতো, শিবুদার মতো সেই প্রান্তিক মানুষগুলোর ছবি, কলকাতার এঁদো গলির এক কোণে উপেক্ষিত ফ্যাতাড়ুর মতো পড়ে থাকাটাই যাঁদের নিয়তি ছিল।

বটতলার সাহিত্যে বিম্বিত নিম্নবর্গেরজীবন নিয়ে ঋদ্ধ গবেষণা করে নামী সাহিত্য পুরস্কার জিতে নেওয়াটা এখন নাগরিক সংস্কৃতির লেটেস্ট ট্রেন্ড। নামী প্রকাশনা-সংস্থা থেকে এখন ছাপা হয় বটতলার বইয়ের সটীক সংস্করণ। ‘ন্যাড়া বটতলায় যায় ক’বার’ বা ‘বেশ্যাপাড়ার পাঁচটি দুর্লভ সংগ্রহ’-র মতো বই আর লুকিয়ে পড়ার দরকার হয় না, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব বই-ই এখন স্ট্যাটাস সিম্বলের মতো। দেখে শুনে মনে হয় সেই ট্রেণ্ডটা এবার বোধহয় সিনেমাতেও চলে আসছে। সমাজের একদম নিচু তলার মানুষদের জীবনকে মেদুর রোমান্টিক প্যাকেজে মুড়ে তৈরি সিনেমা তাই জিতে নিচ্ছে নামী চলচ্চিত্র-পুরস্কার। হিসেবি পোস্ট-মডার্ন দরদ মিশিয়ে তৈরি অনিন্দ্য-কৌশিকের এহেন স্টাইলিশ নাগরিক নিরীক্ষা এবার বক্স অফিস দখলের লড়াইতেও শেষ অবধি টিকে থাকতে পারে কিনা, সেটাই এখন দেখার।

1 COMMENT

  1. dada apni bhat ta kom din.open tee bioscope er cycle er scene aar malenar cycle scene 2 to alada,apni ki cinema follow koren na,just onyer mukhe jhal khan naki,,,jag ge

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here