কয়েকশো বছরের এই হিরে নাকি ব্রহ্মামূর্তির চোখের মণি‚ যা দিয়েও প্রেয়সীকে পাননি রুশ অভিজাত

2166

টাওয়ার অফ লন্ডনে কোহিনুর নিয়ে আমাদের হাহুতাশ শেষ হওয়ার নয় | কিন্তু ক’জন ভারতবাসী জানে‚ যে
সুদূর রাশিয়াতেও আছে একটি মহামূল্যবান হিরে‚ যা কোনও এক সময়ে ছিল ভারতেরই | কোহিনুর যেমন ব্রিটিশ রাজমুকুটের‚ এই হিরেও রুশ রাজপরিবারের | কোহিনুরের থেকেও আকারে বড় এই হিরের নাম ওর্লোভ ডায়মন্ড |

১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে এই হিরে উপহার পেয়েছিলেন রাশিয়ার ক্যাথরিন দ্য গ্রেট | উপহার দিয়েছিলেন তাঁর প্রেমিক কাউন্ট গ্রেগরি ওর্লোভ | রাশিয়ান রাজদণ্ডের ঐশ্বর্য এই হিরে | ১৯১৮ সালে রুশ বিপ্লবের আগে অবধি এই হিরকখচিত রাজদণ্ড নিয়মিত ব্যবহৃত হতো | কর্তৃত্বের প্রতীক ও চিহ্নস্বরূপ | 

১৮৯.৬২ ক্যারাটের ওর্লোভ হিরে পাওয়া গিয়েছিল গোলকোন্ডা খনিতে | আরও বহু জগৎ বিখ্যাত হিরের আকর এই গোদাবরী নদীর বদ্বীপের এই খনি | তবে এখনও ইতিহাস প্রামাণ্য তথ্যে নীরব | যে তথ্য বলবে কী করে এই হিরে ভারত থেকে রাশিয়া চলে গিয়েছিল | 

পরিবর্তে আছে একটি প্রচলিত গল্প | সেই গল্প বলে এই হিরে আসলে ব্রহ্মাদেবের মূর্তির চোখের একটি মণি | সপ্তদশ শতাব্দীতে সেই মূর্তি ছিল তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীর শ্রীরঙ্গমের রঙ্গনাথস্বামী মন্দিরে | 

কথিত‚ এক দুর্যোগের রাতে মন্দিরে হানা দিয়ে ওই হিরে চুরি করে পালায় এক ফরাসি অভিযাত্রী | তারপর সেকালের মাদ্রাজে ওই হিরে হাতবদল হয় দু হাজার পাউন্ডে | কিনেছিল এক ইংরেজ ক্যাপ্টেন | সে-ই ওটিকে নিয়ে যায় ইউরোপে | তবে এসবের কোনও ভিত্তি নেই | ঐতিহাসিকদের দাবি‚ এই গল্প জড়ানো হয়েছে যাতে হিরের দাম অনেক বাড়ে |  

যে তত্ত্বে অনেক ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন‚ তা হল এই হিরে আসলে দ্য গ্রেট মুঘল ডায়মন্ডের অংশ | সেই হিরের কথা সবিস্তার লিখে গেছেন জঁ ব্যাপ্তিস্ত ত্রাভার্নিয়ের | ফরাসি এই রত্ন ব্যবসায়ী সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষ চষে ফেলেছিলেন | মুঘাল কোষাগারে তিনি দেখেছিলেন ৭৮৭ ক্যারাটের একটি বিশাল হিরে | উনি তার নাম দিয়েছিলেন দ্য গ্রেট মুঘল ডায়মন্ড | সম্রাট শাহজাহানকে এই হিরে উপহার দিয়েছিলেন গোলকোন্ডার প্রসিদ্ধ রত্ন বণিক মীর জুমলা | যিনি পরে গোলকোন্ডার প্রধানমন্ত্রী বা শাসক হয়েছিলেন |

যদিও সূত্রপাত ছিল তিক্ত | একবার মীরজুমলার তলব হয়েছিল মুঘল দরবারে | সম্রাট শাহজাহানের মনোরঞ্জনে নজরানা হিসেবে মীরজুমলা সঙ্গে নিয়েছিলেন বহু মূল্যবান রত্ন | তার মধ্যে একটি ছিল ওই বিশাল হিরে | তাভারনিয়ের লিখেছেন‚ শাহজাহান ওই হিরে কাটিয়েছিলেন ইতালির ভেনিসের বিখ্যাত ডায়ামন্ড কাটার বা হিরেকার অর্তেন্সিও বোর্গিয়ো-কে দিয়ে | সে সময় অর্তেন্সিও ছিলেন দিল্লিতেই | কিন্তু তাঁর কাজ একটুও মনে ধরেনি সম্রাটের | তিনি মজুরির সব টাকা ফেরত নিয়েছিলেন | উপরন্তু জরিমান আদায় করে ওই ভেনেশিয়ানকে পত্রপাঠ দিল্লি থেকে বহিষ্কার করেছিলেন | নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর সাম্রাজ্যেই যেন ওই বিদেশির মুখ আর দেখা না যায় |

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যরাজ নাদির শাহ-এর দিল্লি লুঠতরাজ অবধি ওই হিরে ছিল মুঘল কোষাগারে | মুঘলদের আরও অসংখ্য রত্নরাজি অলঙ্কারের সঙ্গে ওই হিরে পাড়ি দিয়েছিল ভারত ছেড়ে পারস্যে | লুটেরার তলোয়ারের আগায় বন্দি হয়ে | ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে আবার ঠিকানাবদল হিরের | হত্যা করা হল নাদির শাহকে | মুঘলদের হিরে গিয়ে পড়ল এবার এক আফগান সেনার হাতে | সে তাকে নিয়ে গেল বসরা বা আজকের ইরাকে | বিক্রি করে দিল এক আর্মেনিয়ান রত্ন ব্যবসায়ী গ্রিগরি সফরাসের কাছে | সে সময় ইস্তাম্বুল‚ ইস্পাহান ও ভারতের সমৃদ্ধ শহরে ছড়িয়ে ছিল আর্মেনিয়ানরা | তারাই নিয়ন্ত্রণ করত রত্ন ব্যবসা | ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে রত্ন কেনাবেচা করত তারা |

ক্যাথরিন দ্য গ্রেট রুশ সম্রাজ্ঞী ছিলেন সে সময় | তাঁর রাজ রত্নকার ছিলেন একজন আর্মেনীয় | সেই রত্নকার জানতে পারলেন তাঁরই স্বজাতি সফরসের কাছে আছে ভারতের মহামূল্যবান হীরক | সম্রাজ্ঞী কিনতে চাইলেন ওই রত্ন | কিন্তু সফরাস যা দাম হাঁকলেন‚ তা সম্রাজ্ঞীরও নাগালের বাইরে | তাই হিরে কেনা আর হল না | কিন্তু হিরে তো তাঁর কাছে আসবে বলে পণ করেছে | কাউন্ট গ্রিগোরিয়েভিচ ওর্লোভ ছিলেন অভিজাত পুরুষ ও ক্যাথরিনের প্রেমিক | তিনি তৎকালীন বাজারমূল্যে ৪ লক্ষ রুবল দিয়ে ওই হিরে কিনে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে উপহার দিলেন প্রেয়সী ক্যাথরিনকে | শোনা যায় সম্রাজ্ঞীর তরফে এর রিটার্ন গিফ্ট বা ফিরতি উপহার ছিল একটা প্রাসাদ !

এইভাবে মুঘলদের হিরে হয়ে গেল ওর্লোভ ডায়মন্ড | ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে তা বসল রুশ রাজদণ্ডে | রুশ বিপ্লব উত্তর সময়ে এই হিরে চলে এল সোভিয়েত ডায়মন্ড ফান্ডে | এখন এর নাম রাশিয়ান ডায়মন্ড ফান্ড | এই ফান্ডের অন্তর্গত হিসেবে মুঘলদের রাজকোষ থেকে লুঠ হওয়া বিশাল সেই হিরে এখন আছে ক্রেমলিনে‚ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় | খুব কম জনই জানেন এর ভারতীয় শিকড়ের কথা |


তবে এই হিরে দিয়েও ওর্লোভ প্রেয়সীকে পাননি | ক্যাথরিনের স্বামী জার তৃতীয় পিটার সেনা অভ্যুত্থানের জন্য বেশিদিন রাজ্যশাসন করতে পারেননি | তাঁর মৃত্যুর পর ক্যাথরিন কিন্তু ওর্লভের হননি | বরং হিরে পেয়েও তিনি তাঁর থেকে মুঘ ঘুরিয়ে যুবরাজ গ্রিগোরি পটেমকিনের হাত ধরেছিলেন |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.