কয়েকশো বছরের এই হিরে নাকি ব্রহ্মামূর্তির চোখের মণি‚ যা দিয়েও প্রেয়সীকে পাননি রুশ অভিজাত

টাওয়ার অফ লন্ডনে কোহিনুর নিয়ে আমাদের হাহুতাশ শেষ হওয়ার নয় | কিন্তু ক’জন ভারতবাসী জানে‚ যে
সুদূর রাশিয়াতেও আছে একটি মহামূল্যবান হিরে‚ যা কোনও এক সময়ে ছিল ভারতেরই | কোহিনুর যেমন ব্রিটিশ রাজমুকুটের‚ এই হিরেও রুশ রাজপরিবারের | কোহিনুরের থেকেও আকারে বড় এই হিরের নাম ওর্লোভ ডায়মন্ড |

১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে এই হিরে উপহার পেয়েছিলেন রাশিয়ার ক্যাথরিন দ্য গ্রেট | উপহার দিয়েছিলেন তাঁর প্রেমিক কাউন্ট গ্রেগরি ওর্লোভ | রাশিয়ান রাজদণ্ডের ঐশ্বর্য এই হিরে | ১৯১৮ সালে রুশ বিপ্লবের আগে অবধি এই হিরকখচিত রাজদণ্ড নিয়মিত ব্যবহৃত হতো | কর্তৃত্বের প্রতীক ও চিহ্নস্বরূপ | 

১৮৯.৬২ ক্যারাটের ওর্লোভ হিরে পাওয়া গিয়েছিল গোলকোন্ডা খনিতে | আরও বহু জগৎ বিখ্যাত হিরের আকর এই গোদাবরী নদীর বদ্বীপের এই খনি | তবে এখনও ইতিহাস প্রামাণ্য তথ্যে নীরব | যে তথ্য বলবে কী করে এই হিরে ভারত থেকে রাশিয়া চলে গিয়েছিল | 

পরিবর্তে আছে একটি প্রচলিত গল্প | সেই গল্প বলে এই হিরে আসলে ব্রহ্মাদেবের মূর্তির চোখের একটি মণি | সপ্তদশ শতাব্দীতে সেই মূর্তি ছিল তামিলনাড়ুর তিরুচিরাপল্লীর শ্রীরঙ্গমের রঙ্গনাথস্বামী মন্দিরে | 

কথিত‚ এক দুর্যোগের রাতে মন্দিরে হানা দিয়ে ওই হিরে চুরি করে পালায় এক ফরাসি অভিযাত্রী | তারপর সেকালের মাদ্রাজে ওই হিরে হাতবদল হয় দু হাজার পাউন্ডে | কিনেছিল এক ইংরেজ ক্যাপ্টেন | সে-ই ওটিকে নিয়ে যায় ইউরোপে | তবে এসবের কোনও ভিত্তি নেই | ঐতিহাসিকদের দাবি‚ এই গল্প জড়ানো হয়েছে যাতে হিরের দাম অনেক বাড়ে |  

যে তত্ত্বে অনেক ঐতিহাসিক বিশ্বাস করেন‚ তা হল এই হিরে আসলে দ্য গ্রেট মুঘল ডায়মন্ডের অংশ | সেই হিরের কথা সবিস্তার লিখে গেছেন জঁ ব্যাপ্তিস্ত ত্রাভার্নিয়ের | ফরাসি এই রত্ন ব্যবসায়ী সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষ চষে ফেলেছিলেন | মুঘাল কোষাগারে তিনি দেখেছিলেন ৭৮৭ ক্যারাটের একটি বিশাল হিরে | উনি তার নাম দিয়েছিলেন দ্য গ্রেট মুঘল ডায়মন্ড | সম্রাট শাহজাহানকে এই হিরে উপহার দিয়েছিলেন গোলকোন্ডার প্রসিদ্ধ রত্ন বণিক মীর জুমলা | যিনি পরে গোলকোন্ডার প্রধানমন্ত্রী বা শাসক হয়েছিলেন |

যদিও সূত্রপাত ছিল তিক্ত | একবার মীরজুমলার তলব হয়েছিল মুঘল দরবারে | সম্রাট শাহজাহানের মনোরঞ্জনে নজরানা হিসেবে মীরজুমলা সঙ্গে নিয়েছিলেন বহু মূল্যবান রত্ন | তার মধ্যে একটি ছিল ওই বিশাল হিরে | তাভারনিয়ের লিখেছেন‚ শাহজাহান ওই হিরে কাটিয়েছিলেন ইতালির ভেনিসের বিখ্যাত ডায়ামন্ড কাটার বা হিরেকার অর্তেন্সিও বোর্গিয়ো-কে দিয়ে | সে সময় অর্তেন্সিও ছিলেন দিল্লিতেই | কিন্তু তাঁর কাজ একটুও মনে ধরেনি সম্রাটের | তিনি মজুরির সব টাকা ফেরত নিয়েছিলেন | উপরন্তু জরিমান আদায় করে ওই ভেনেশিয়ানকে পত্রপাঠ দিল্লি থেকে বহিষ্কার করেছিলেন | নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর সাম্রাজ্যেই যেন ওই বিদেশির মুখ আর দেখা না যায় |

১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পারস্যরাজ নাদির শাহ-এর দিল্লি লুঠতরাজ অবধি ওই হিরে ছিল মুঘল কোষাগারে | মুঘলদের আরও অসংখ্য রত্নরাজি অলঙ্কারের সঙ্গে ওই হিরে পাড়ি দিয়েছিল ভারত ছেড়ে পারস্যে | লুটেরার তলোয়ারের আগায় বন্দি হয়ে | ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে আবার ঠিকানাবদল হিরের | হত্যা করা হল নাদির শাহকে | মুঘলদের হিরে গিয়ে পড়ল এবার এক আফগান সেনার হাতে | সে তাকে নিয়ে গেল বসরা বা আজকের ইরাকে | বিক্রি করে দিল এক আর্মেনিয়ান রত্ন ব্যবসায়ী গ্রিগরি সফরাসের কাছে | সে সময় ইস্তাম্বুল‚ ইস্পাহান ও ভারতের সমৃদ্ধ শহরে ছড়িয়ে ছিল আর্মেনিয়ানরা | তারাই নিয়ন্ত্রণ করত রত্ন ব্যবসা | ভারতের বিভিন্ন রাজদরবারে রত্ন কেনাবেচা করত তারা |

ক্যাথরিন দ্য গ্রেট রুশ সম্রাজ্ঞী ছিলেন সে সময় | তাঁর রাজ রত্নকার ছিলেন একজন আর্মেনীয় | সেই রত্নকার জানতে পারলেন তাঁরই স্বজাতি সফরসের কাছে আছে ভারতের মহামূল্যবান হীরক | সম্রাজ্ঞী কিনতে চাইলেন ওই রত্ন | কিন্তু সফরাস যা দাম হাঁকলেন‚ তা সম্রাজ্ঞীরও নাগালের বাইরে | তাই হিরে কেনা আর হল না | কিন্তু হিরে তো তাঁর কাছে আসবে বলে পণ করেছে | কাউন্ট গ্রিগোরিয়েভিচ ওর্লোভ ছিলেন অভিজাত পুরুষ ও ক্যাথরিনের প্রেমিক | তিনি তৎকালীন বাজারমূল্যে ৪ লক্ষ রুবল দিয়ে ওই হিরে কিনে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে উপহার দিলেন প্রেয়সী ক্যাথরিনকে | শোনা যায় সম্রাজ্ঞীর তরফে এর রিটার্ন গিফ্ট বা ফিরতি উপহার ছিল একটা প্রাসাদ !

এইভাবে মুঘলদের হিরে হয়ে গেল ওর্লোভ ডায়মন্ড | ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে তা বসল রুশ রাজদণ্ডে | রুশ বিপ্লব উত্তর সময়ে এই হিরে চলে এল সোভিয়েত ডায়মন্ড ফান্ডে | এখন এর নাম রাশিয়ান ডায়মন্ড ফান্ড | এই ফান্ডের অন্তর্গত হিসেবে মুঘলদের রাজকোষ থেকে লুঠ হওয়া বিশাল সেই হিরে এখন আছে ক্রেমলিনে‚ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় | খুব কম জনই জানেন এর ভারতীয় শিকড়ের কথা |


তবে এই হিরে দিয়েও ওর্লোভ প্রেয়সীকে পাননি | ক্যাথরিনের স্বামী জার তৃতীয় পিটার সেনা অভ্যুত্থানের জন্য বেশিদিন রাজ্যশাসন করতে পারেননি | তাঁর মৃত্যুর পর ক্যাথরিন কিন্তু ওর্লভের হননি | বরং হিরে পেয়েও তিনি তাঁর থেকে মুঘ ঘুরিয়ে যুবরাজ গ্রিগোরি পটেমকিনের হাত ধরেছিলেন |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

pakhi

ওরে বিহঙ্গ

বাঙালির কাছে পাখি মানে টুনটুনি, শ্রীকাক্কেশ্বর কুচ্‌কুচে, বড়িয়া ‘পখ্শি’ জটায়ু। এরা বাঙালির আইকন। নিছক পাখি নয়। অবশ্য আরও কেউ কেউ