বিধবাবিবাহ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ‚ বিদ্যাসাগরকে খুনের চেষ্টাও হয়েছিল !

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৯৮ তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে পুনর্মুদ্রিত হল এই নিবন্ধ—-আজ প্রথম পর্ব |

                                          বিদ্যাসাগর ও বিধবা

প্রায় মধ্যরাত | রাস্তাঘাট শুনশান | সংস্কৃত কলেজে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর | কাছেই বাদুড়বাগানে তাঁর বাড়ি | হেঁটেই ফিরছেন তিনি | এসে গেছেন ঠনঠনিয়ার কালীমন্দিরের কাছে | আর একটু এগোলেই তো বাড়ি পৌঁছে যাবেন |

         হঠাৎ একদল দুর্বৃত্ত এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে | থমকে দাঁড়ালেন বিদ্যাসাগর | বুঝতে পারলেন‚ এরা ভাড়াকরা খুনি | তাঁকে খুন করার জন্যে ওঁত পেতে আছে লোকজনহীন অন্ধকার রাস্তায় |
         বিদ্যাসাগর জানেন‚ একদিন না একদিন হয়তো তাঁকে খুন হতেই হবে | ভয় নেই তাঁর মনে | তিনি গলা ছেড়ে হাঁক দিলেন‚ কইরে ছিরে‚ সঙ্গে আছিস তো ?

         বিদ্যাসাগরের পিছনে অন্ধকারের মধ্যে এসে দাঁড়াল এক পাহাড়ের মতো মানুষ | বলা যেতে পারে লোহার পর্বত | মাথায় লাল পাগড়ি | হাতে লাঠি | বনবন করে সেই লাঠি ঘুরিয়ে দিল এক হুঙ্কার | ভাড়াটে খুনিরা এমন লেঠেল জন্মে দেখেনি | ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল তারা | চলে গেল মন্দিরের আড়ালে | বিদ্যাসাগর হনহন করে হেঁটে বেঁকে গেলেন বাড়ির পথে | লাঠি হাতে সেই পাহাড় ঠিক তাঁর পিছনেই |

         বিদ্যাসাগর তাকালেন পিছন ফিরে |পাহাড়ের মতো মানুষটির দিকে তাকিয়ে বললেন‚ শ্রীমন্ত‚ তুই না থাকলে খুন হয়ে যেতাম রে |

         — বাবু‚ আমাকে ‘ছিমন্ত‘ বলে ডাকবেন না | ‘নজ্জা করে‘ | ‘ছিরি‘ বলেই ডাকবেন বাবু | আমি থাকলে আপনাকে খুন করবে কে ?

         শ্রীমন্ত বা ছিরিকে পুত্র ঈশ্বরের ‘বডিগার্ড‘ নিযুক্ত করে কলকাতায় পাঠিয়েছেন পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় | ছিরি বীরসিংহ গ্রামের জেলে সর্দার | তার মতো লেঠেল সারা গ্রামে নেই | ঠাকুরদাস তাঁর পুত্রের দেহরক্ষী হিসেবে ঠিক লোককেই বেছেছেন | ঠাকুরদাস জেনেছেন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ঈশ্বরকে খুন করতে চায় কলকাতার কিছু ধনী হোমরাচোমরা হিন্দু | তাঁদের উস্কে দিয়েছে কিছু প্রাচীনপন্থী সংস্কারাচ্ছন্ন পণ্ডিত | কিন্তু কেন এরা বিদ্যাসাগরের রক্ত চাইছে ? কী তাঁর অপরাধ ?

কিছু হিন্দুর মতে তাঁর অপরাধটি ভয়ঙ্কর‚ ক্ষমার অতীত ! অনেক তর্ক – বিতর্কের শেষে‚ অনেক বিরোধী সভাসমিতির যুক্তি গুঁড়িয়ে দিয়ে‚ ১৮৫৫-র ২৬ জুলাই মাত্র ছত্রিশ বছরের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শেষ পর্যন্ত পাশ করিয়েছেন হিন্দু বিধবাবিবাহ আইন ! এই ‘Hindu Widow’s Remarriage Act‘ তো হিন্দুসমাজকে রসাতলে পাঠাবে ! ভেঙে পড়বে হিন্দুসমাজ | অতএব খুন করো বিদ্যাসাগরকে |  

         এতদিন তো হিন্দুবিধবা ছিল দাসীর দাসী | সংসারে‚ সমাজে তার নিজের জায়গা বলে কিছুই নেই | হয়তো দশ বছর বয়েসেই বিধবা হয়েছে সে | আগে তো তাকে তার স্বামীর সঙ্গে চিতায় উঠতেও হত | কোনও কুলীন ব্রাহ্মণ সেই দশ বছরের মেয়েকে হয়তো বিয়ে করেছে সত্তর বছর বয়েসে | কুলীন ব্রাহ্মণের বউ হওয়া কি চাট্টিখানি কথা ? তারপর যেই মরল সেই বুড়ো বর‚ তারই সঙ্গে চিতায় পুড়ল তার বালিকা বা কিশোরী বউ | রামমোহন রায় সাধ্বী স্ত্রীর সহমরণ বন্ধ করে তো এক সর্বনাশ করলেন হিন্দুসমাজের | এরপর আর এক সর্বনাশ করলেন বিদ্যাসাগর !বিধবার বিয়ে ? কী লজ্জা‚ কী লজ্জা !

          কেমন এই হিন্দু বিধবা ? ধরা যাক তার বয়েস বারো | তার স্বামী যেই মরল‚ অমনি কেড়ে নেওয়া হল তার সব সাজসজ্জা | নিভিয়ে দেওয়া হল তার সব শখ‚ আহ্লাদ‚ আনন্দ | তার মাথা কামিয়ে নেড়া করে দেওয়া হল | তার গা থেকে কেড়ে নেওয়া হল সমস্ত গয়না | তাকে পরানো হল পাড়হীন সাদা থান | তাকে বলা হল‚ সংসারের একপাশে সরে থাকবে তুমি‚ পুরুষের চোখের আড়ালে | সারা জীবন ধরে তোমাকে তোমার বৈধব্যপাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে | সারা জীবনের জন্যে দণ্ডিত তুমি | কেন এই দণ্ড ? কারণ হিন্দুশাস্ত্রে এ-কথাই আছে |

প্রাচীন পণ্ডিতদের বিধান | কোনও প্রশ্ন করা চলবে না | কী সেই বিধান ? একাদশী করবে‚মাছ-মাংস খাবে না | এখনকী সেই সব নিরামিষও খাবে না‚ যাতে রক্ত গরম হতে পারে | বেশির ভাগ দিন যেন উপোস করেই থেকো | বাড়ির কেউ যেন বিধবাকে খেতে না দেখে | যত কম খাবে‚তত রক্তের জোর কমবে | যত রক্তের জোর কমবে‚তত পুণ্য বাড়বে‚অনাচার হ্রাস পাবে | এসব নাকি শাস্ত্রে আছে | বলে গেছেন স্বয়ং মনু‚ স্বয়ং পরাশর |

—কে বলল এসব শাস্ত্রে আছে ? প্রমাণ করুন আপনারা কোথায় আছে এই কথা যে বিধবার বিয়ে দেওয়া যাবে না ? হুঙ্কার দিলেন ছত্রিশ বছরের মহাপণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |

— এত বড় স্পর্ধা বিদ্যাসাগরের ! হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে আস্ফালন ? 
বিদ্যাসাগরের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন‚ কাশীনাথ তর্কালঙ্কার‚ রামতনু তর্কসিদ্ধান্ত‚ জগদীশ্বর বিদ্যারত্ন‚ জানকীজীবন ন্যায়রত্ন‚ মহেশচন্দ্র চূড়ামণি‚ গোবিন্দকান্ত বিদ্যাভূষণ‚ আনন্দচন্দ্র শিরোমণি !এই গোঁড়া পণ্ডিতেরা নস্যাৎ করে দিতে চাইলেন ঈশ্বরকে ! কিন্তু মহাপণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র যে খুঁজে পেয়েছেন পরাশরের সেই অমোঘ উক্তি‚ যা তাঁর তুরূপের তাস |

পণ্ডিতেরা নামলেন বিদ্যাসাগরের নামে অপপ্রচার আর বিদ্রূপের পথে | একদিকে তাঁকে খুন করার চেষ্টা | অন্যদিকে তাঁকে পদে পদে অপমান | কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেন এই গান‚ যা গাইবে কলকাতার বাঙালি মেয়ে —

             এমন সুখের দিন কবে হবে বল লো কবে হবে বল

             এতদিনে যাবে যত বিপক্ষের বল দিদি বিপক্ষের বল | |

             বাধিয়াছে দলাদলি লাগিয়াছে গোল

             বিধবার বিয়ে হবে‚ বাজিয়াছে ঢোল | |

এই সময় দাশরথি রায় বিদ্যাসাগরকে কটাক্ষ করে একটি পালাও লিখলেন | সেই পালা আজও পড়লে বোঝা যায় বিদ্যাসাগর কাদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন‚ প্রায় একা —

                 ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামক

                 তিনি কর্তা বাঙালির

                 তাতে আবার কোম্পানির

                 হিন্দু কলেজের অধ্যাপক |

      কিন্তু কাণ্ড করলেন বটে শহরের কিছু ধনী ও পণ্ডিত হাত মিলিয়ে ! তাঁরা তাঁতিদের দিয়ে স্পেশাল শাড়ি বুনিয়ে শাড়ির পাড়ে লিখে দিলেন বিধবাবিবাহ-বিরোধী ছড়া ! আর সেই শান্তিপুরী-শাড়ির নাম দিলেন ‘বিদ্যাসাগর-পেড়ে-শাড়ি !‘এমনই একটি শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়ির মেয়ে | তার শাড়ির পাড়ে জ্বলজ্বল করছে এই গান —

             আর কেন ভাবিস লো সই‚ ঈশ্বর দিয়েছেন সই

             বিধবা রমণীর বিয়ের লেগে যাবে ধুম |

( এরপর আগামী সংখ্যায়)

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
তাঁর কর্মজীবন শুরু ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে স্কটিশ চার্চ কলেজে | তারপর তিনি আজকাল সংবাদপত্রে যুক্ত হন সহকারী সম্পাদক রূপে | সেখান থেকে সহকারী সম্পাদক রূপে আনন্দবাজার পত্রিকায় | বর্তমানে তিনি যুক্ত সংবাদ প্রতিদিন-এর সঙ্গে | তবে এখন তাঁর প্রধান পরিচয় সাহিত্যিক হিসেবে | তাঁর বেস্টসেলার বইগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণসখা বিবেকানন্দ ( দু খণ্ড)‚ কাদম্বরী দেবীর সুইসাইড নোট‚ রবি ও সে ‚ আমি রবি ঠাকুরের বউ‚ রবি ও রাণুর আদরের দাগ‚ নায়ক রবি ( ১ ম খণ্ড)‚ দ্বারকানাথ থেকে রবীন্দ্রনাথ; ঠাকুরবাড়ির গোপনকথা‚ প্লাতা নদীর ধারে; রবীন্দ্র-ওকাম্পোর প্রণয়কথা | সম্প্রতি ‘রাধা ও রবি’, ‘স্বামী’-সহ একাধিক সংগ্রহে সমাদৃত হয়েছে তাঁর ভাষ্যপাঠ |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here