ক্রীতদাস দাসীদের জীবন্ত ঘুঁটি সাজিয়ে লুডোর আদি সংস্করণ খেলা হতো মুঘল দরবারে

3632

জনপ্রিয় ইন্ডোর গেম লুডোর ইতিহাস লুকিয়ে আজ থেকে চোদ্দশ বছর আগে | খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই খেলার নাম ছিল পঁচিশি | এরপর মধ্যযুগেও জনপ্রিয়তা বজায় ছিল এই খেলার | এর আর একটি রূপ হল চৌপর বা চৌসর | যাকে তৎসম শব্দে আমরা চিনি অক্ষক্রীড়া নামে | এই পাশাখেলাতেই কৌরবদের কাছে সর্বস্ব হারিয়েছিলেন যুধিষ্ঠির | অবশ্য তারও অনেক আগে হরপ্পা সভ্যতায় পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির ডাইস অথবা ছক্কা | ঋকবেদেও আছে এই খেলার উল্লেখ | এরই কাছাকাছি আরও একটি খেলা ছিল অষ্টপদ নামে | গৌতম বুদ্ধ একেবারেই পছন্দ করতেন না এই ধরণের ইন্ডোর বোর্ড গেম | নিজে তো খেলতেনই না | কোনও বৌদ্ধ মহাবিহার ও মঠেও এর প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল |

তথাগত বুদ্ধ অষ্টপদ খেলার বিপক্ষে থাকলেও মুঘল সম্রাট আকবর খুবই পছন্দ করতেন চৌপর | আবুল ফজল-এর আইন-ই-আকবরি পড়লে মনে হবে যেন এই খেলার প্রতি আসক্ত ছিলেন আকবর | তার প্রমাণ ফতেপুর সিক্রির বাইরে বিশাল চৌপর-ছক | প্রমাণ মাপের সেই ছকের চারধারে খেলতে বসতেন আকবর ও তাঁর সভাসদরা | তবে তাঁদের খেলার ঘুঁটি ছিল ক্রীতদাস ও ক্রীতদাসীরা | খেলুড়েদের নির্দেশে ঘর বা চৌখুপ্পি বদল করত তারা | দৈত্যাকৃতি সেই বোর্ড এখনও বিস্তৃত ফতেপুর সিক্রিতে | শুধু নেই সেদিনের খেলোয়াড় ও জীবন্ত ঘুঁটিরা |

তবে আকবরের মতো চৌখস ও বিচক্ষণ সম্রাট শুধু মনোরঞ্জনের জন্য এই খেলা খেলতেন বলে মানতে নারাজ গবেষকরা | তাঁদের মতে‚ এই খেলার মাধ্যমে সভাসদদের পরখ করতেন সম্রাট | কার কেমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা‚ মাপতেন | মুঘল হারেমেও এই খেলা ছিল তুমুল জনপ্রিয় | মুঘলদের প্রতিপক্ষ রাজপুত দরবারেও চৌপরের কদর ছিল বেশ | পাশাপাশি‚ সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীর হিমাচলি পাহাড়ি চিত্রকলাতেও চিল চৌপর খেলার নিদর্শন | 

চৌপর যদি হয় অভিজাত নীলরক্তের অবসর বিনোদন‚ তবে এর আমজনতা সংস্করণ ছিল পঁচিশি | মূলত জুয়া‚ এই খেলা হতো অর্থের বিনিময়ে | একান্তই অর্থ না থাকলে ব্যবহার করা হতো কড়ি | এই খেলায় সর্বোচ্চ স্কোর করা যেত পঁচিশ | তার থেকেই নামকরণ পঁচিশি | ঔপনেবেশিক শক্তিও এই খেলাকে ছাড়ল না | নিজের মতো করে নিল | ইউরোপীয়ান শক্তি ভারতে যত ঘাঁটি শক্ত করল‚ তত দেখা দিল পঁচিশির পশ্চিমী সংস্করণ | ব্রিটিশ সংস্থা জাক অ্যান্ড সন্স বাজারে আনল নতুন ইন্ডোর বোর্ড গেম‚ ‘পটচিশি’ | ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন সংস্থা নিয়ে এল খেলা‚ ‘ পরচিসি ‘ | এই ইন্ডোর গেমসের একচেটিয়া বাজার ছিল সে দেশে | ১৯৩৫ সালে ইন্ডোর গেম ‘মোনোপোলি’ আসার অবধি একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল পরচিসি-র | আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই দুটি খেলা বিক্রি হতো ‘ দ্য গেম অফ ইন্ডিয়া ‘ বলে |  

ক্রমে এল পটচিশির সহজ সংস্করণ | লাতিন শব্দের প্রভাবে তার নাম হল ‘ লুডো’ | অর্থাৎ ‘আমি খেলি’ | আটের বদলে চৌখুপ্পি হল চার | আরও একটি পরিবর্তন হল | পটচিশি ছিল প্রাপ্তবয়স্কদের অবসরযাপন | লুডো হয়ে গেল ছোটদের খেলা | বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ফ্রান্স ও জার্মানিতে বিপুল জনপ্রিয় হল এই ইন্ডোর গেম | নতুন অবতারে লুডো ভারতে এল ১৯৫০ সাল নাগাদ | যে দেশ থেকে এর যাত্রা‚ সেখানেই ফিরে এল সেটি | অথচ আমরা খুব কম জনই জানি চৌপর-এর নাম | যে খেলা ছিল রাজারাজড়াদের বিনোদন‚ যার ফলাফলের উপর নির্ভর করত রাজপরিবারের মালিকানা‚ সেই খেলা এখন ছোটদের সময় কাটানোর উপকরণ | অবশ্য অনলাইনে হলে তা বড়দেরও প্রিয় বটে |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.