বাংলালাইভ রেটিং -

Banglalive

যে বইয়ের গল্প থেকে প্রথম এই ‘প্যাডম্যান’ ছবি তৈরির প্ল্যান, সেটা লিখেছিলেন অক্ষয় কুমারের ঘরণী এবং একদা-অভিনেত্রী টুইঙ্কল খান্না। বইয়ের নাম ‘দ্য লিজেন্ড অব লক্ষ্মী প্রসাদ’, ছোটগল্পের বই। মোট চারটে গল্প ছিল সেটায়, তার একটা হল ‘দ্য স্যানিটারি ম্যান অফ স্যাকরেড ল্যান্ড’। তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরের অরুণাচলম মুরুগানন্থম-এর জীবন সেঁচে নেওয়া হয়েছিল সেই গল্পের নির্যাস।

বইটা ছাপা হয়ে বের হয়েছিল ২০১৬ সালের শেষদিকটায়। যে কথাগুলো লিখলাম, একটু নেট সার্ফ করলেই সেগুলো দেখতে পাবেন আপনি।

কিন্তু যেটা নেট সার্ফ করে চট করে খুঁজে পাবেন না, সেটা হল, টুইঙ্কল ছাপার অক্ষরে অমন একটা কাজ করে বসার বছর আড়াই আগেই বাংলা ভাষায় আস্ত একটা বই বেরিয়ে গেছিল মেয়েদের ঋতুস্রাবের দুঃখ-কষ্ট-অভিজ্ঞতা নিয়ে।

‘এগারোয় পা – মেয়েদের অন্তরঙ্গ কথা’ ছিল সেই বইয়ের নাম। ‘গাঙচিল’ সংস্থার বই, প্রথম ছাপা হয় এপ্রিল, ২০১৪। শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত আর অহনা বিশ্বাসের সম্পাদনায় সেই সংকলনে সব লেখারই বিষয় ছিল, সমাজের নানা স্তরের নানা মেয়ের ঋতুকালীন অভিজ্ঞতার কথা। কী যন্ত্রণা আর অস্বস্তি পোয়াতে হয় তাঁদের মাসের ওই দিনগুলোয়। কী ভাবে অন্ধ সংস্কারে আটকে থাকা সমাজ ওই সময় তাঁদের শেকলে বেঁধে রাখে। 

এবং এই কাহানির সবচেয়ে বড় টুইস্ট হল এইটে যে, ওই সংকলনে লেখার জন্যে বাংলার নামী-দামি লেখিকাদেরও অনুরোধ করা হয় তখন। কিন্তু লেখাপত্তরে নিজেদের যতই তাঁরা ‘আধুনিকা’ সাজিয়ে বাজার গরম রাখুন না কেন, এই বিষয়টা নিয়ে লেখার কথা শুনে পিছিয়ে যান তাঁদের প্রায় সবাই। প্রস্তাবে তাঁরা ‘বিমুখ’ হন তো বটেই, আর ‘অনেকে মুখে কিছু না বললেও মনে মনে আমাদের বেহায়া ভাবছেন’ বইয়ের ভূমিকা লিখতে গিয়ে এই কথাগুলো লিখছেন সম্পাদক শর্মিষ্ঠা (পৃষ্ঠা ১৪)।

এই লেখিকারা ঠিক কারা, সৌজন্যের খাতিরে সেই নামগুলো বইয়ের কোথাও নেই। তবে বইয়ের পাতা উলটোলে এক নবনীতা দেবসেন ছাড়া আর কোন নামী লেখিকাকে খুঁজে পাবেন না আপনি কোথাও।

‘প্যাডম্যান’ দেখতে বসে ভাবছিলাম সেই লেখিকাকুলের কথা। মনে হচ্ছিল ডেকে বলি যে, ভাই আপনারা তো কেউ আর সেই অজ পাড়া গাঁ’র আনপড় সব ঘরের গিন্নি নন। নেকাপড়া আর ফেমিনিজমের পতাকা উড়িয়ে নিত্যি দিন আপনারা তো ইদিক-সিদিক যান। কিন্তু তবু কিনা সেই আপনাদেরও মনের মধ্যে আজও এত বিশ্রী ট্যাবু ঠাসা?

অবিশ্যি ট্যাবু শুধু ওই মহিলাকুলেরই নয়, বেশিরভাগেরই মনের মধ্যে ঠাসা। ’১৪ সালে ওই বইটা বেরল, তারপর আসুন ’১৫ সালের মার্চে। যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সেই ছাত্র আন্দোলন মনে পড়ছে কি ভাই? স্যানিটারি প্যাডে আন্দোলনের শ্লোগান লিখে ক্যাম্পাসে এদিকে ওদিকে আটকে দেওয়ার ধুম? খেয়াল আছে তো, সেটা নিয়েও চতুর্দিকে তখন কেমন ছিছিক্কার ছিল? 

সেখান থেকে সোজা কাট টু প্রেজেন্ট সময়ে আসুন। বুঝতে পারবেন, ওই সব ট্যাবুর গালেই ‘প্যাডম্যান’ যেন ঠাস করে মারা চড়।

সেদিন যারা ‘স্যানিটারি প্যাড’-এর নামে মূর্ছা যেত, আজ তারাই দেখুন দাঁত কেলিয়ে হাতে ‘প্যাড’ বাগিয়ে ফেসবুকে আর টুইটারেতে ছবি শানাতে বিজি।

না শানিয়ে যাবেটা কোথায় বলুন? আমির কিংবা আলিয়া অবধি যখন ‘প্যাড’ হাতে ছবি দিচ্ছে, তখন সেটাই তো ইন-থিং হয়ে গেছে! মডার্ন বাঙালি অমনি নিজের স্ট্যান্ড না পালটে পারে? 

এই ফাঁকে অক্ষয় কুমারকেও খেয়াল করে দেখুন একবার প্লিজ। একটা সময় লোকটা করত একের পর এক ধুমধুমাকার অ্যাকশনের ফিলিম। লোকটার নামই তখন হয়ে গেছিল ‘খিলাড়ি’ কুমার বলে। সেই ঝাড়পিট করা ‘খিলাড়ি’ কুমার এখন কিনা এই ছবিতে নিজের প্যান্টের তলায় লুকিয়ে পড়ছে মেয়েদের পোশাক – প্যান্টি!

সেই প্যান্টির মধ্যে সেট করে রাখা থাকছে লোকটার নিজের হাতে বানানো স্যানিটারি প্যাড! আর ওর সঙ্গে একটা নল দিয়ে লাগানো থাকছে পশুর রক্তে ভরা একটা ফুটবলের ব্লাডার, যেখান থেকে পলকে পলকে একটু একটু করে রক্ত এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে সেই লুকনো প্যাড, লুকনো প্যান্টি!

আসুন সিনেমার ওই সিনটায়, যেখানে নিজের আনাড়ি হাতে তৈরি প্যাড ঠিকভাবে কাজ না করায় হিরোর প্যান্ট এবং প্যান্টি ভিজিয়ে চুঁইয়ে আসছে ব্লাড, আর ধবধবে পোশাকখানা মাখামাখি হচ্ছে টুকটুকে রক্ত রঙের দাগে! লজ্জায় মুখ লুকোতে জনবহুল রাস্তার মাঝখান দিয়ে দৌড় দিচ্ছে হিরো, তারপর মান বাঁচাতে ঝাঁপ মারছে পাশে নদীর জলে গিয়ে।

এরপরেও ট্যাবু না ভাঙলে আর ভাঙবে কীসে, বলুন?

ছবিটা ভাল না খারাপ, সে তো অনেক পরের কথা ভায়া। ছবিটা নিয়ে জানতে গিয়ে প্রথম যেটা ধাক্কা মারে, সেটা তো এ ছবির সাবজেক্ট! মনে হবে,সংস্কারের এই অন্ধ ভারতে হলটা কী করে এমন একটা ছবি?

তারপর ছবির ডিরেক্টরের নামটা শুনবেন যখন, তখন অবশ্য গোটা বিষয়টা সহজ হবে একটু। ডিরেক্টরের ফিল্মোগ্রাফি তো আগেও সব শকিং ছবিতে ভরা!

আর. বালকি-র আগের ছবির সবকটাই তো হচ্ছে গিয়ে স্থানু গামবাট সমাজটাকে কোন না কোন ভাবে ঝটকা দেওয়ার ছবি।

যেমন, প্রথম ছবিটাতেই ৬৪ বছরের এক প্রৌঢ় মানুষের সঙ্গে বছর চৌত্রিশের যুবতী নায়িকার প্রেম। প্লেটোনিক কোন ব্যাপার নয়, এর মধ্যে বিয়ে আছে, শরীর আছে, আর আছে দোকানে লজ্জার মাথা খুইয়ে ‘বুড়ো’ মানুষটার কনডোম কিনতে যাওয়ার সিন! নিজের সমান এজের একটা কাউকে এটা বলতে যাওয়ার সিন, যে ভাই, আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই। ‘চিনি কম’ (২০০৭) দেখতে গিয়ে যত মজা, ধাক্কার চোট তার চেয়ে কম ছিল না কো কিছু।

পরের ছবি ‘পা’ (২০০৯)। মনে আছে তো, সেখানে রিয়্যাল লাইফ ছেলেকে কাস্ট করলেন বাবার ভূমিকায় আর রিয়্যাল লাইফ বাবাটিকে কাস্ট করলেন ছেলের ভূমিকায়? আলোচনার মূলস্রোতে তুলে আনলেন ‘প্রোজেরিয়া’ নামে একটা প্রায়-অজানা রোগ।

এর ছয় বছর পর তৈরি হল ‘শামিতাভ’ (২০১৫), যেখানে আবার আরেক রকম পাঞ্চ! একজনের শরীরে অন্য কারুর কণ্ঠস্বর জুড়ে হিন্দি ছবির বক্স অফিসের যুদ্ধ জেতার স্টোরি!

এর ঠিক পরের বছর ‘কি অ্যান্ড কা’ (২০১৬)। পুরুষ-নারী রোল রিভার্সালের গল্প। যদি খুঁটিয়ে দ্যাখেন, দেখতে পাবেন ‘প্যাডম্যান’ ছবির বীজ আসলে ওই ছবিটার মধ্যেই ছিল। ওই ছবিতেই তো দুঃখ পেয়ে পুরুষ হিরোর দুচোখ বেয়ে জলের প্লাবন নামে। বাইরের দুনিয়ায় চাকরি কিংবা বেওসা করার হ্যাপা না পুইয়ে রান্না আর ঘর গুছোনতেই ছবির পুরুষ হিরোর তাবৎকালের স্বস্তি!

ওই ছবির ‘কবীর’ নামের ছেলেটাকে মিলিয়ে দেখুন এই ছবির ‘প্যাডম্যান’ লাক্সমিকান্ত চৌহানের (অক্ষয় কুমার) সঙ্গে, দেখুন মিল পাচ্ছেন কিনা।

দেখবেন, কবীরের মতো এই লাক্সমিরও টপ প্রায়োরিটি হল সংসার আর বৌ। সেই প্রায়োরিটি এমন একটা লেভেলে গিয়ে পৌঁছয় যে ওর বৌ ওকে কাকুতি মিনতি করে বলতে থাকে, ঋতুস্রাবে ইউজ করা কাপড়ের টুকরো নিয়ে মাথা ঘামানোটা ‘ঠিক’ দ্যাখায় না ছেলেদের। ‘আউরত কি পায়ের কি বিচ মে কিঁউ ফাঁসে হ্যায় আপকে জান?’

বৌ-বোন-মা সবাই তখন ‘পাগল’ ভাবছে লাক্সমি-কে। ‘বহেনকো কোই অ্যায়সি চিজ দেতা হ্যায় কেয়া?’ লাক্সমি-র থেকে উপহারে ‘প্যাড’ পেয়ে ঝাঁজিয়ে উঠছে বোন। আর মাঝরাতে পাশের বাড়ির রজঃস্বলা কিশোরী মেয়ের বারান্দায় যখন উঁকি দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে লাক্সমি, সবাই ওকে ভাবছে সেক্স ম্যানিয়াক আর পাগল আদমি বলে। হ্যাঁ, ওঁর ‘ভিশন’টা  সমাজ-সংসারে বুঝতে পারছে না কেউ!

সত্যিকারের পুরুষ হয়ে ওঠার জন্যে পুরুষদের যে নিজের ‘মধ্যে’ থাকা মেয়েটিকে ঠিক ভাবে জাগিয়ে তুলতে হয়, এরকম একটা ডায়ালগও রয়েছে এই ছবির একটা সিনে।

‘কি অ্যান্ড কা’-র কবীরের সঙ্গে ওই প্যাডম্যানের ফারাক বলতে এইটে যে সেই কবীরের বৌ ছিল আলট্রা মডার্ন ‘কিয়া’। আর এই লাক্সমির বৌ হল আনপড় গাঁওয়ার গায়ত্রী (রাধিকা আপ্তে)। এটুকু বাদ দিলে দেখুন, এই লাক্সমিও বৌ ছেড়ে চলে যাবে শুনে চোখের জলে ভাসে, আর ফুরসৎ পেলে এই লাক্সমিও মেতে ওঠে রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটা কিংবা নদীর ঘাটে বসে কাপড় কাচার কাজে। ঘর ঝাঁট দেওয়া বা ঘর মোছার কাজ কী ভাবে গুছিয়ে সারতে পারে লাক্সমি, এ ছবিতে দ্যাখান হয়েছে সেটাও।

আরেকটা ব্যাপার দেখুন। ছবির ফার্স্ট হাফের বড় একটা অংশ জুড়ে লাক্সমির নাদান ঘরেলু বৌ গায়ত্রী থাকলেও, ছবির সেকেন্ড হাফে দেখবেন তাঁর জায়গা কিন্তু খুবই কম। সেই জায়গাটা এসে নিয়ে নিচ্ছে অন্য একটা শহুরে মেয়ে – পরী ওয়ালিয়া (সোনম কাপুর)। মেয়েদের স্যানিটারি প্যাড তৈরির লড়াইটাতে লাক্সমি পাশে পাচ্ছে নিজের মা বৌ বা বোনকে নয়, অনাত্মীয়া এই পরী মেয়েটিকেই।

লাক্সমি’র তৈরি প্যাড প্রথম নিজের শরীরে ধারণ করছে পরী, তারপর পরীর উদ্যোগেই তো ওর দিল্লি গিয়ে রাষ্ট্রপতির পুরস্কার নেওয়া, বা বিদেশ বিভুঁইতে পাড়ি জমিয়ে ইউনাইটেড নেশন্‌সে বক্তৃতা দিয়ে আসা।

ছবিতে দেখতে পাবেন দুজনের লিপ টু লিপ কিস, বা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দুজনে একঘরে থাকার সিন। সে সময় দুজনে ‘সেক্স’ করেছিল কিনা, তার হিন্ট নেই কোথাও। কিন্তু ছবির এই অংশে ‘পরী’ যেন লাক্সমি-র বৌয়ের মতোই প্রায়। বৌয়ের মতোই বিহেভ করছে, জামা গুঁজে দিচ্ছে প্যান্টে, ঘুমনোর সময় মুখ হাঁ হয়ে গেলে যত্ন করে বুঁজিয়ে দিচ্ছে হাঁ। এখন এই লাক্সমি আর পরীকে যদি একটা ইউনিট বলে ভেবে নিতে পারেন, তাহলে দেখবেন, দুজনের এই কম্বিনেশন প্যাটার্নটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে কাট-পেস্ট পুরো সেই ‘কিঅ্যান্ড কা’-র মতোই ঠিক!

ছবি দেখতে বসে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছিল দূর দেশের এক গ্রাফিক ডিজাইনারের কথা। রোমানিয়ার টিমি পল। জানেন কিনা জানি না, ঋতুস্রাবের বিষয় নিয়ে তিনিও একটা ধাক্কা দিয়েছেন ভাল। ন’মাস ধরে নিজের ঋতুস্রাবের রক্ত দিয়ে তিনি এঁকেছেন গর্ভস্থ এক শিশুর ছবি। ছবিটার নাম দিয়েছেন, ‘দ্য ডায়রি অফ মাই পিরিয়ড’। তারপর সেটা আপলোড করেছেন ফেসবুকে। লিখেছেন ‘ওয়ান ড্রপ অফ এক্সপেরিমেন্ট অ্যান্ড আই রিয়্যালাইজ দ্য বিউটি অফ দ্য পেন, দ্য ভ্যালু অফ দ্য পিরিয়ড, ফার্টিলাইজিং মাই হোল বিইং’।

ছবি দেখতে দেখতে কী কনট্রাস্ট, বাপরে বাপ! নিজের শরীর নিয়ে নিঃসংকোচ টিমি আর তার পাশে ধরুন এ ছবির ওই গায়ত্রীর কথা! বর স্যানিটারি ন্যাপকিন বানিয়ে দেওয়ার পরেও যে লোকলজ্জার ভয়ে  কাঁপতে কাঁপতে বরকে জিজ্ঞেস করছে, কেউ দেখে ফ্যালে নি তো আপনাকে এটা বানাতে?

তবে প্রশংসাটাই সব নয়, এ ছবির জন্য কিছু সমালোচনাও আছে!

এত ভাল একটা বিষয় নিয়ে তৈরি ছবি, কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না, তামিলনাড়ুর গল্পটাকে টেনে হিঁচড়ে মধ্যপ্রদেশে এনে ফিট করতে গেলেন কেন বালকি? ছবি বানানোর আগে কোন মার্কেট সার্ভে করে কি দেখতে পাওয়া গেছিল যে তামিলনাড়ুর কনটেক্সটে এরকম কোন ছবি বানালে প্যান ইন্ডিয়া বক্স অফিসে সেটা ধ্বসে যেতে পারে দ্রুত?

আরও কী মনে হচ্ছিল জানেন? তামিলনাড়ুর যে লোকটা স্যানিটারি প্যাড নিয়ে সত্যি এরকম একটা ফাইট দিয়েছিল, বক্স অফিসে দাঁও মারার জন্যেই কি সেই অরুণাচলম মুরুগানন্থম-এর যুদ্ধ লড়ার গল্পটাকে পুরে দেওয়া হল পেলব একটা প্যাকেজে? ছবির মাঝে মাঝেই দেখনসুখ সব নাচ-গানের জোয়ার চলছে ঠিক আছে, কিন্তু তাই বলে অচেনা শহরে রাতের বেলা হঠাৎ করে পরী ওয়ালিয়া নামের মেয়েটির ঋতুস্রাব শুরু হবে আর তখন বেছে বেছে সে কিনা সামনে পাবে সেই লাক্সমিকেই? যে আবার তখন কিনা হন্যে হয়ে ঘুরছে কোন মেয়েকে দিয়ে নিজের তৈরি স্যানিটারি প্যাড পরখ করিয়ে দ্যাখার জন্যে?

চরম লেভেলে এই সমাপতন যে হতেই পারে না, তা নয়। কিন্তু স্ক্রিপ্টে এমনটা ঘটতে দেখলে মনে হয় লেখকের পেন নড়বড় করছে, বা লেখার মতো জুতসই কিছু খুঁজে পাচ্ছেন না বোধহয়। তাই কোনমতে গোঁজামিল দিয়ে প্লট এগোনোর চেষ্টা করছেন হয়তো।

একটা মানুষের সত্যি জীবন নিয়ে ছবি করছেন, তখন এমন হবেটা কেন, বালকি?

ঠিক যেমন আরেকটা সুপার কাকতালীয় ব্যাপার হল, ছবির শেষদিকে যখন লাক্সমিকে কিস করতে যাবে পরী। বেছে বেছে ঠিক সেই সময়েই বহুকাল আগে ছেড়ে চলে যাওয়া বৌ ফোন করলো ওকে আর মাঝপথে থমকে গেল কিস? এত টেলর-মেড মোমেন্টস থাকলে সিনেমার যে তাল কেটে যায়, ভাই!

বা ধরুন ইউনাইটেড নেশন্‌স-এ লাক্সমি-র সেই বক্তৃতা দেওয়ার সিন। একটা লোক, ভাল ইংরেজি বলতে পারে না, তবু ট্রান্সলেটরকে সরিয়ে দিয়ে ভেঙে ভেঙে নিজেই বলার মরিয়া চেষ্টা চালাবে পুরোটা? কেন, তাতে হাততালি বেশি পাওয়া যাবে বলে? বালকি এই ব্যাপারটা ছবিতে রেখেছেন বেশ করেছেন, কিন্তু দশ মিনিট ধরে টানা এই সেশন না দ্যাখালেই পারতেন। নারী কত মহান আর পুরুষেরা আসলে কত দুবলা, এই গোছের ক্লিশে তোষামুদি শুনতে শুনতে একটা সময়ের পর হাই উঠতে পারে!

আর একটা কথা বলুন আমায়। পিরিয়ড চলার দিনগুলোয় একটা মেয়েকে কোন অসুবিধের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সেটা লাক্সমি বুঝতে পারল বিয়ের পরে এসে? অথচ গল্পে দ্যাখান হচ্ছে, ওর নিজের দিদি আর বোনও রয়েছে দিব্যি! তা’ তাদের সঙ্গে এক বাড়িতে এক সঙ্গে বড় হয়েও তাদের কারুর দুঃখে ওর মথিত হল না প্রাণ?

ছবিতে সরাসরি ডিল করা হয়েছে শুধু একটা ধর্মসম্প্রদায়ের মেয়েদের নিয়ে। কিন্তু ভারতে তো অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও আছেন। তাঁদের বিষয়ে ছবিটার কী স্ট্যান্ড? ছবি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ওই জোনে ঢুকতে গেলে বোধহয় তুবড়ে ভেঙে যাবে বালকির ক্যামেরা। গাঙচিলের বইটা যেমন এক্সট্রিম লেভেলে স্টাডি করে এক ডাক্তারকে দিয়ে এটা অবধি লিখিয়ে নিয়েছে যে, ‘একটি ধর্মসম্প্রদায়ের মেয়েরা প্রত্যেকবার মাসিকের পরে ওই জায়গাটা পরিষ্কার করে কামিয়ে ফেলে।…[কিন্তু] গোপনাঙ্গের চুল বা pubic hair–ও মলদ্বার, মূত্রদ্বার ও যোনিদ্বারকে কিছুটা হলেও সুরক্ষা দেয়। সুতরাং সে দিক থেকে দেখতে গেলে pubic hair কামিয়ে ফেলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ভাবা যেতে পারে’ [‘এগারোয় পা’, পৃষ্ঠা ৮০-৮১]। বালকি সেখানে জাস্ট ‘ওঁরা তো ফুচকা অবধি মুখ ঢাকা দিয়ে খান, ফুচকাকে লজ্জা পান বোধহয়’ মার্কা একটা লঘু মশকরা করে দ্রুত অন্য সিনে ধাঁ।

এইটে হচ্ছে ছবির আরেকটা উইকনেস। যে ছবিটা একটা ট্যাবু ভাঙার সাহস দ্যাখাতে গিয়ে নিজেই কিন্তু ঢুকে পড়ছে অন্য কয়েকটা সোশ্যাল ট্যাবু-র মধ্যে। যে, থাক বাবা, এটা দ্যাখাব না, কারুর ভাবাবেগে আঘাত লাগে যদি। কি থাক, ওটা দ্যাখাব না, বক্স অফিসের বিজনেসখানা গুবলেট হয় যদি।

বারবার মনে হচ্ছিল, কেমন হত, বালকি যদি একদম সেই অরুণাচলম মুরুগানন্থম-এর পুরো লড়াইটা হুবহু তুলে আনতেন স্ক্রিনে? যেখানে ওঁকে লড়তে হবে একলা। গান গেয়ে ঘাম মুছিয়ে দেওয়ার জন্যে পাশে সুন্দরী পরী ওয়ালিয়া, মানে সোনম কাপুরের চিহ্ন থাকবে না কোন!

একটা কথা খেয়াল রাখুন, অরুণাচলম মুরুগানন্থম-এর কিন্তু প্রচুর সমালোচনাও হয়। সবচেয়ে বড় যে ইস্যুটা ওঠে, সেটা হল, ওঁর বানানো প্যাডের কোয়ালিটি এত খারাপ যে ওই গুলো ইউজ করার চেয়ে গ্রাম দেশের ময়লা কাপড়ই ভাল। আর একটা লজিক দেওয়া হয় এখানে যে, হঠাৎ করে প্যাডের জন্যে হিড়িক তোলার আছেটাই বা কী এত, হাজার হাজার বছরের এই মানব সভ্যতায় ‘প্যাড’ বলে ব্যাপারটা তো এই সেদিন সবে এল!

এই সিনেমার কোথাও এর কোন উত্তর নেই। উলটে ছবি যখন শেষ হচ্ছে, তখন অরুণাচলম মুরুগানন্থম লোকটা তো প্রায় পুজোর ঠাকুর যেন। স্ক্রিন জুড়ে ওঁর অ্যাত্ত বড় ছবি।

হল থেকে বেরিয়ে আসছি, খটকা এবং প্রশ্নগুলো তাই খচখচাচ্ছে মনে। বিনোদনের একটা প্যাকেজ হল ঠিকই, কিন্তু ভাইটাল অনেক কিছুই ছবি থেকে যে বাদ পড়ে গেল স্যর!

আরও পড়ুন:  শক্তি কপূর ও শিভাঙ্গীর 'কিসমত' কানেকশন‚ ভিলেনের রিয়েল লাইফ রোম্যান্টিক লাভ স্টোরি

NO COMMENTS