‘কার সন্তানের মা হব,আমার সিদ্ধান্ত’

58

ক্রেয়ন,চারকোল, টেম্পেরা,কাগজ,প্লাইউড, ক্য়ানভাস্—–রঙিন দুনিয়ার স্থায়ী বাসিন্দা তিনি | কিন্তু মাঝারি উচ্চতার, আদ্য়ন্ত বাঙালি চেহারার মেয়েটার জীবনভর যে এত ‘রং্বাজি’ থাকবে তা আর কে জানত! জীবনের ক্য়ানভাসে তিনি যা যা করেছেন, তাকে বৈপ্লবিক বললে হয়তো অনেক ক্লিশে লাগবে | বরং আজকের প্রজন্মের ভাষায় বলতেই পারি, এটা রং্বাজি, মাস্তানি | এবং এই তকমা কোনওভাবেই নেগেটিভ নয়্ |’রং্বাজ’-এর নাম ঈলিনা বণিক্ |

ছোট থেকেই গতে বাঁ্ধা জীবনে চলতে চাননি | পাঠভবন স্কুলেও রাগী মুখ শিক্সিকাকে ছিল না-পসন্দ্ | ক্লাস পালানোর ফাঁ্কিবাজিতে নাম না লেখালেও ভাল লাগত না স্কুলের শৃঙ্খল্ | একদিন ইং্রেজির শিক্সিকা বদলে দিলেন ঈলিনাকে | তাঁ্র সঙ্গে কথা বলার পর নতুন করে ভালবাসলেন স্কুলপাঠ্য়কে | বিশেষ করে প্রেমে পড়লেন ইং্রেজি সাহিত্য়ের্ | স্কুলের পাঠ শেষ করে বাবা-মা ঈলিনাকে পাঠালেন শান্তিনিকেতনে | ভাবলেন গুরুদেবের আশ্রম্-শিক্সায় সম্পূর্ণ হবে মেয়ের উচ্চশিক্সা | তাঁ্দের ইচ্ছেপূরণ করলেন ঈলিনা | কিন্তু অন্য়ভাবে | কাগজ্-কলমের নয়্ | শান্তিনিকেতনে পাঠ নিলেন রং্-তুলির্ | ভর্তি হলেন কলাভবনে |

কিন্তু সেখানেও প্রথমদিকে ভাল লাগত না হস্টেল জীবন্ | কষ্ট পেতেন সহবাসী, সহপাঠীদের ঈর্ষায়্ | পরে শিক্সক্-শিক্সিকাদের সাহচর্যে ভালবেসে ফেললেন লালমাটির দেশটাকে | খোলা আকাশ, মহুয়ার গন্ধ মাখা হাওয়া আর খোয়াই নদীর জলে তুলি চুবিয়ে নিলেন ঈলিনা |

ছাতিম ফুলে ঢাকা পথে হাঁ্টতে হাঁ্টতেই ১৬ বছরের কিশোরী ঠিক করে ফেললেন কোন পথে এগোবে তাঁ্র আগামী দিন্ | কোনওমতেই ৯-৫ টার চাকরি নয়্ | বরং রং্-তুলি হবে তাঁ্র জিয়নকাঠি | পরবর্তী জীবনে ইং্ল্য়ান্ডে গিয়ে গ্লাসগো স্কুল অফ আর্ট্-এও ছাত্রী ছিলেন তিনি | কিন্তু তাঁ্র জীবনে শান্তিনিকেতন এবং শিক্সা-গুরু যোগেন চৌধুরীর জায়গা কেউ নিতে পারেনি | আর এই শান্তিনিকেতনেই কলাভবনে তাঁ্র সঙ্গে সাক্সাৎ হয়েছিল এম এফ হুসেনের সঙ্গে | পেয়েছিলেন শিল্পীর স্বাক্সরিত একটি জার্মান ব্রাশ্ | সে বছরেই তিনটি সম্মান তাঁ্র শিরোপায়্ | তার মধ্য়ে একটা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নেওয়া সম্মান্ |

জীবনভর দেশ্-বিদেশে প্রদর্শনীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসেছে সম্মান্-ভূষণ্-খেতাবের অফুরান স্রোত্ | কিন্তু তবু মননে-সাজে-আচারে-ব্য়বহারে ঈলিনা আগাগোড়া বাঙালি | বাং্লামির ছোঁ্য়া তাঁ্র বাড়িতেও | বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ম্য়ান্ডেভিলা গার্ডেন্স্-এর আর পাঁ্চটা বাড়ির সঙ্গে এর কোনও তফাৎ নেই | ভুল ভাঙে ভিতরে ঢুকে | সাড়ে তিন কাঠার উপর ৭০ বছরের পুরনো এই বাড়ি ছিল ঈলিনার মাতামহ কবি যোগীন্দ্রনাথ সরকারের্ | এই বাড়ির পরতে পরতে মিশে আছে বাং্লামি আর বাঙালিয়ানা | ঈলিনার ইচ্ছেয় অন্দরসজ্জায় ঠাঁি পেয়েছে শীতলপাটি থেকে ঠাকুরের সিং্হাসন্ |

তবে এই পর্যন্তই | বাড়ির অন্দরসজ্জায় অবাধ বাঙালিয়ানা থাকলেও ঈলিনার অন্তরমহলে কিন্তু বাঙালির ভাবের ঘরে চুরির প্রবেশ নিষিদ্ধ | সেখানে তিনি গড়পড়তা বাঙালির থেকে কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে |

ছকে বাঁ্ধা জীবনে খাপ খাওয়াতে না পেরে বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসেন অনেক তরুণীই | আজকের দিনে এতে আর নতুনত্ব বা বৈপ্লবিক কিছুই নেই | এখানেই অন্য়রকম ঈলিনা | তিনি বিয়ে ভেঙেছেন এবং মা হয়েছেন্ | এবং মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেন, প্রাক্তন স্বামী নয়্ | তাঁ্র সন্তানের বাবা অন্য় পুরুষ্ | তাঁ্র যাকে পছন্দ হয়েছে তাঁ্কে তিনি নির্বাচন করেছেন সন্তানের বাবা হিসেবে | ঈলিনার কথায়, একজন মা হিসেবে তিনি পছন্দ করতেই পারেন তাঁ্র গর্ভে কার সন্তান বড় হবে |

তাঁ্র জীবনে নতুন রং লাগিয়েছে ছোট্ট তকাই | ভাল নাম অমরাবতী | মা হওয়ার অনন্য় স্বাদ আবার পেতে চান ঈলিনা | কিন্তু সেই একই পুরুষের সঙ্গে? না এই বাধ্য় বাধকতায় বিশ্বাসী নন্ | বরং, নিজের পছন্দের একাধিক পুরুষের সন্তানের মা হতে চান তিনি |

কিশোরী বেলা থেকেই মা হওয়ার ইচ্ছে ছিল ঈলিনার্ | অনেকেই বলেছিলেন, দত্তক নেওয়ার জন্য় | কিন্তু নিজের শরীরে একটা প্রাণের বেড়ে ওঠা উপভোগ করতে চেয়েছিলেন তিনি | হোক না টেস্ট টিউব বেবি | ক্সতি কী? মাতৃত্বের স্বাদ তো থাকবে ষোল আনা | সেই ইচ্ছে থেকেই আজ তিনি তকাইয়ের মা | একে নন্-কনভেনশনাল বা বোহেমিয়ানিজম্—-যাঁ্র যা খুশি বলতে পারেন্ | ঈলিনার কোনও আপত্তি নেই |

তবে ঈলিনা সামনে আনতে চান না সন্তানের জন্মদাতার নাম্-পরিচয়্ | একাই বড় করতে চান মেয়েকে | সমাজের প্রশ্ন, কৌতূহল্—-সব কিছুকে মুছে ফেলেছেন ক্য়ানভাসের অবাঞ্ছিত রং্-এর মতো | মিলিয়ে দিয়েছেন ভাস্কর্যের অনাহূত খাঁ্জের মতো | স্বেচ্ছায় সিঙ্গল পেরেন্ট হয়েছেন ঈলিনা | বাং্লামি,বাঙালিয়ানা আর রং্বাজির কোলাজ হতে চান এই শিল্পী এবং ভাস্কর্ |

এই প্রজন্মের জবালা কি এইরকমই হন?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.