শান্তমিঠে পান্নালাল ও Rap সেহগল

তখন ডিডি মেট্রো চ্যানেলে ‘সুপারহিট মুকাবলা’ জমকে হিট। হল কী, আড্ডায় আমার এক আধুনিক বন্ধু কথায় কথায় খানিক অবহেলা মিশিয়ে বলেছিল, হ্যাহ্‌, ছাড় ছাড়। ওইসব ঠাকুর-ফাকুর নিয়ে পান্নালালের শ্যামাসঙ্গীত, মাআআ মাআআ ডাক, ওসব আর চলে না। এখন সব ফাস্ট, Raপিড। এখন দিল ধড়কে মেরা দিল ধড়কে।

‘ঠান্ডা ঠান্ডা পানি’ নামক একটি গানের ক্যাসেট বের হয়েছে তখন বাবা সেহগলের। ওঁর তৃতীয় ক্যাসেট। প্রথম দুটির খোঁজ শুরু হয়, যখন এই তৃতীয় ক্যাসেট সুপারডুপার হিট হয়। মার্কিনী গায়ক ভ্যানিলা আইস-এর গান ‘আইস আইস বেবি’ ঢঙে বাবা সেহগলের এই ‘ঠান্ডা ঠান্ডা পানি’ ভারতীয় Rap সঙ্গীত জগতে এক ধামাকা এন্ট্রি! রেকর্ড হিট। এই ক্যাসেটের আরেক জনপ্রিয় গান – দিল ধড়কে মেরা দিল ধড়কে।

আড্ডায় ফিরি। আমি কিঞ্চিৎ বুড়োটে স্বভাবের হলেও বয়সধর্ম বলে তো একটা কথা আছে। চ্যালেঞ্জ করেছিলাম বন্ধুকে – অর্থাৎ মাতৃতে গেলে পাব না পান্নালালের ক্যাসেট, তাই তো? “মাতৃ” ক্যাসেটের খুব চালু দোকান ছিল।

বন্ধুটিও গলায় জোর ফুটিয়ে জানিয়েছিল যে দোকানে পাওয়া যাবে না। হয়ে যাক বাজি। সেদিনের আড্ডার জনা সাত-আট বন্ধু মিলে হইহই করে মাতৃতে গিয়ে ‘শ্যামাসঙ্গীতের ক্যাসেট আছে?’ মুখ থেকে খসানো মাত্রই তারা এক গাদা ক্যাসেট তাক থেকে পেড়ে, তার মধ্যে অনেকগুলোই শোকেসে সাজানো ছিল, কাউন্টারে মেলে ধরেছে আমাদের সামনে।

চমৎকার সামাল দিয়েছিল আমার বন্ধুটি। এসব স্টক তুলেছে এখন, সামনে কালীপুজো না? ক্যাসেট কোম্পানির চাপ থাকে। সাজিয়ে রাখতে হয়।

যেন আগে কখনো শুনিনি শ্যামাসঙ্গীত, জিজ্ঞেস করেছিলাম কাউন্টারের লোকটিকে, এত থেকে বাছতে পারব না। গোটা দুয়েক কিনব। কোনগুলো ভালো, চলে বেশি, তুমিই দেখে দাও না দাদা। অবলীলায় পান্নালালকেই আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। আজও তা নামিয়ে রাখতে পারলাম না।

পান্নালালের গানের জীবন শুরু হয় মাত্র সতেরো বছর বয়সে। ছত্রিশ বছর বয়সে স্ত্রী-সন্তান রেখে তিনি আত্মহননের পথ নেন। শেষের বছরগুলিতে এক অদ্ভূত অবসাদ তাঁকে গ্রাস করে। তাঁর মনে হতে থাকে তিনি মা কালীর কৃপা থেকে বঞ্চিত। মা কালী তাঁর ধনুদাদাকে (বিশিষ্ট গায়ক ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য) দেখা দেন, কই তিনি তো দেখা পান না। কী দোষ তিনি করলেন? মা হয়ে কেন সন্তানের সঙ্গে এমন করছেন? হাহাকার ওঠে, ‘আমি সকল কাজে পাই যে সময়, তোমারে ডাকিতে পাইনে’।

এ নিছক ভায়ে-ভায়ে ঈর্ষা? তা তো নয়। শোনা যায়, উভয়ত পিতাপুত্রসম ভালোবাসা স্নেহশ্রদ্ধা ছিল। তা ছাড়াও, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যর গানের জগতে ব্যাপ্তি তো অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। তিনি সিনেমার গান, সিনেমার বাইরে বেসিক গান, আধ্যাত্মিক গান এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, কীর্তন, ভজন মায় শাস্ত্রীয়সঙ্গীতেও নিজের ছাপ রেখে ফেলেছেন ততদিনে। আর পান্নালাল শুরু বাংলা বেসিক গান দিয়ে করলেও দ্রুত পুরোপুরি অধ্যাত্মসঙ্গীতে সমর্পন করে দেন নিজেকে। আর ঠাকুরের দেখা পাওয়া, ঈশ্বরদর্শন এই সবই তো ঘটে মানসপটে। তাহলে কী কারণে এত গভীর অবসাদ? উত্তর অজানা।

আবার একটু বাবা সেহগলে ফিরি। কী করছেন বাবা এখন? গান তো গাইছেনই। কিন্তু গান তো ক্রমে প্রকৃত অর্থে নিরাবয়ব হয়ে উঠেছে। আগে যাকে গ্রামোফোন রেকর্ডে, ক্যাসেটে, সিডিতে ধরা যেত, সে তো এখন ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে উঠে লিঙ্করূপে দিকে দিকে বিরাজিত। প্রযুক্তির অতি-উন্নতিতে অতীতের একনিষ্ঠ কাজ করে যাওয়া হালফিল মুশকিল বইকী! তাই গানের পাশাপাশি তিনি, বাবা সেহগল, টিভি-শো উপস্থাপনা আর হিন্দি সিনেমাতে অভিনয় তো অনেক বছর আগেই করেছিলেন। পরে পরে টেলি-সিরিয়ালে অভিনয় করেন, বিগ বসের আখড়ায় ঢুকেছিলেন। আস্তে আস্তে বলিউডের তুখোড় প্রতিযোগিতার বাইরে পা রাখেন তামিল-তেলুগু-কন্নড় সিনেমার বিশাল জগতে। সেখানে সেই সেই ভাষায় অনেক প্লে-ব্যাক করেন। এখনও করছেন। এমনকী বাংলা গানও গেয়েছেন বাবা সেহগল। অঙ্কুশ-নুসরত অভিনীত ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া কপি-পেস্ট বাংলা সিনেমা ‘খিলাড়ি’তে ‘হার্টবিট’ গান গেয়েছেন তিনি। এক বড়োসড়ো বাজেটের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের তেলুগু সিনেমা ‘রুদ্রমাদেবী’র মাধ্যমে তিনি দক্ষিণী বড় পর্দায় অভিনয়ের জগতে পা রেখেছেন এক বছর হল। অচিরেই আরেক তেলুগু সিনেমা ‘ওভারডোজ’-এ প্রধান নেগেটিভ চরিত্রে তিনি আবির্ভূত হতে চলেছেন। শুভেচ্ছা থাকুক, বাবা সেহগলের অভিনয়জীবন সুমধুর হোক।

বাবা সেহগলের জন্মের চার মাস পরে পরেই সেই ১৯৬৬-র মার্চে চলে গেছেন তিনি, পান্নালাল, এবং আমাদের রোজকার প্রখর তাপিত সত্তায় শান্তিবারি সিঞ্চন করে যাচ্ছেন আজও, তাঁর গান দিয়ে। পান্নালালের গান আজও চলে। এত দ্রুতির এই সময়েও, এই সোশ্যাল সাইট কাঁপানো, মল-মালটিপ্লেক্স আর নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির হাঁকানো আবহেও আপনি ইন্টারনেটে শ্যামাসঙ্গীত সার্চ করলেই অতি সহজে পান্নালালের গানের লিঙ্ক পেয়ে যাবেন। বাবা সেহগলকেও পাবেন, কিন্তু তাঁর শুরুর দিনের প্রখরতা কমেছে। র‍্যাপসঙ্গীত জগতে ভিড় বেড়েছে। মিকা সিং, ইয়ো ইয়ো হানি সিং, হরদ কউর আরও কত নাম সেখানে। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনওভাবেই একজনকে বড় করে দেখানো নয়। তা করতে হলে অপরজনকে ছোট করতে হয়, যা নিতান্ত অমানবিক, অপেশাদার। কেবল দুটি সঙ্গীতব্যক্তিত্বকে পাশাপাশি রেখে পারিপার্শ্বিকের নিরিখে কিছু বক্তব্য, কিছু তথ্য তুলে ধরার প্রচেষ্টা মাত্র। আশ্চর্য হই ভেবে, পান্নালালের সঙ্গীতজীবন মাত্র উনিশ বছরের, তিনি চলে গেছেন পঞ্চাশ বছর আগে, কিন্তু জনপ্রিয়তায় এখনও মুখর। এদিকে বাবার ছাব্বিশ বছর হয়ে গেল কাজের জগতে! যুগধর্ম তাঁকে শুধু সঙ্গীতকেই নিজধর্ম করতে দিল না।

বাঙালির কালীপুজো কমেনি। দীপান্বিতা শ্যামাকালীপুজো ছাড়াও গরমকালটা জুড়ে তার এই মঙ্গলবার ওই পাড়ায় তো ওই শনিবার এই পাড়ায় কালীপুজো ঘুরেফিরে ভালোই চলে। আর প্রতি কালীপুজোয় অন্যান্য  গায়কগায়িকাদের সরিয়ে মাইকে যখন পান্নালাল বেজে ওঠে, পরিবেশটাই বদলে যায়। সুমনের ‘ছিল পান্নালালের শান্ত মিঠে গলায় বুকের বাস্তুভিটে শান্তি পেত’ সতত সত্য উচ্চারণে সামনে হাজির হয়, অতি সাদামাটা পোশাকে, অত্যন্ত ঋজু ভঙ্গিমায়। আমরা, শ্রোতারা স্বখাতসলিলে ডুবে মরা বই অন্য পথ পাই না যে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।