বাংলা সাহিত্যে পাঁঠার মাংস : খুরে খুরে দণ্ডবৎ

mutton in Bengali literature

বুজরুগেরা তো কবেই বেঁধে দিয়ে গেছেন শ্রেষ্ঠ খাদ্যের সংজ্ঞা-

‘কচি পাঁঠা বৃদ্ধ মেষ
দধির অগ্র ঘোলের শেষ।’

পেলেন কি তাঁর মধ্যে মুরগির কোন ডাক শুনতে?

‘মাংসই হচ্ছে সব চেয়ে উপাদেয়, পুষ্টিকর আর জনপ্রিয় খাদ্য, এই মত মহাভারতে স্বীকার করা হয়েছে- এটা মাংসপ্রিয় জাতির তরফের কথা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও শেষ কথা হিসাবে বলা হয়েছে যে অহিংসার আদর্শের প্রতি লক্ষ্য রেখে মাংস বর্জন করাই সঙ্গত।’

তবে যাঁরা পাঁঠার লোভে দুর্গাপুজো করেন, দাঁত পড়ে গেলে যাঁদের পুজো বন্ধ করে দিতে হয়, এই অহিংসার আদর্শ তাঁদের জন্যে নয় বলা বাহুল্য। হাই ব্লাডপ্রেসার, সুগার, কোলেস্টেরলে , দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবেও তাঁদের চারপেয়ে ভক্তি অক্ষুণ্ণ থাকে।

প্রাচীন অনার্য জাতির মধ্যে গৃহপালিত হাঁস মুরগি পায়রা প্রভ্রৃতি পাখির মাংস খাবার চল ছিল। তারা যেমন চাষের কাজে বলদ ঘোড়া ব্যবহার করত না, তেমনি গরু ছাগল ভেড়া এসব খাওয়ার চলও তেমন ছিল না। এসব এল আর্যদের কাছ থেকে। আর আর্যরা সেই পশু খাবার আগে হোম করে আরাধ্য দেবতাদের নিবেদন করত। এটা হয়তো মাংস খাওয়াকে সমাজের অনুমোদিত করার একটা কৌশল।

‘ভারতে হিন্দু আমলে যে মাংস রাঁধার পদ্ধতি ছিল, তার বিশেষ বর্ণনা পাওয়া যায় না। মাংসে মশলা ব্যবহারের কথা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আছে।… মাংস রান্নার অনেক কিছুই আমরা পেয়েছি পর্তুগিজ ফরাসি, ডাচ আর ইংরেজদের কাছ থেকে। ডাচেদের poespas হয়েছে আমাদের পিসপাস -ভাতে মাংসে পাক করা, ঘি দেওয়া মশলা কেসর দেওয়া পোলাও নয়। আমরা ইংরেজি চপ কাটলেট নাম নিয়েছি, কিন্তু পদ্ধতিটা শিখেছি পর্তুগিজদের কাছ থেকে। ইংরেজি চপ কাটলেটে মাংসকে কিমা করে রাঁধা হয় না, হাড়শুদ্ধ পাঁজরার মাংসই এতে ব্যবহার করা হয়।

(ভারতবাসীর আহার, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়)

এ তো গেল সার্বিক ইতিহাসের কথা। কে না জানে প্রত্যেক মানুষের আবার নিজস্ব খাওয়ার ইতিহাস থাকে। আর সে ইতিহাসের যেমন স্বাদ তেমনি ঝাঁঝ।

আমার ছোটবেলায় রবিবারের দুপুর আর মাংসভাত ছিল একেবারে উত্তম সুচিত্রা জুটি। আর সে মাংস বলাই বাহুল্য পাঁঠার মাংস, যারে কয় মাটন। অনেক হেঁসেলে মুরগি ঢুকত না তো বটেই, যাদের ওসব বাছবিচার ছিল না, তারাও মুরগির স্বাদে তেমন অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। হলেও সেসব দেশি মোরগ, আস্ত মুরগি এনে উঠোনে বা পেছনের বাগানে কাটা হত, রাঙ্গাকাকা বা ফুলমামা জাতীয় কেউ কেউ মুরগি কাটায় দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন, আর মুরগি ছাড়ানোর এই বীভৎসতার জন্যেই হয়তো বাড়ির মহিলারা অনেকেই মুরগির মাংস খেতেন না। অর্থাৎ পাঁঠার মাংসের সার্বজনীননতা ও গরিমা কোনকালেই মুরগির মাংসের ছিল না। তাই শ্রাবন্তী মজুমদারের মোহময় কণ্ঠে ‘ সারা গায়ে তেল মাখার সময় তো রোজ পাওয়া যায় না, তাহলে উপায়? স্নানের পর এক মগ ঈষৎ উষ্ণ জলে কয়েক ফোঁটা নারকেল তেল মিশিয়ে গায়ে ঢালুন, দেখবেন সমস্ত ময়লা দূর হয়ে ত্বক একদম ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে’ শুনতে শুনতে গরগরে লাল বা কখনও পেঁপে দেওয়া হাল্কা যে মাংসের ঝোল খেতাম সেটা এক এবং অদ্বিতীয় পাঁঠার মাংস।

‘চার আনার মাংস আনলেই আমাদের চলে যেত। মা একসময় রান্নাবান্না কিছুই জানতেন না। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির মহিলা সমিতির মুখপ্ত্র ঘরে বাইরে পড়ে সুন্দর সুন্দর রান্না শিখেছিলেন। মা দারুণ সুস্বাদু মাংসের ঝোল রাঁধতেন। মাংস খাওয়ার পর আমরা ভাইবোন ভালো করে হাতটা ধুতাম না, পরের দিন স্কুলে বন্ধুদের হাতের মাংসের গন্ধ শোঁকাতাম। আমরা যে মাংস খেয়েছি বোঝানোর জন্যে।

মাছবাজার দুটোর পাশেই দুটো বিখ্যাত খাসি মাংসের দোকান। তবে ছোট বাজারের দিকের খাসি মাংসের দোকানটাই বেশি বিখ্যাত ছিল। সকালে যখন বাজারে যেতাম একসঙ্গে তিনটে চারটে চামড়া ছাড়ানো খাসি ঝোলানো আছে দেখতাম। খাসি মাংসের মেটেতে ছিল লোভ। যদিও মাংসের সঙ্গে চর্বি দেওয়া হত, তবুও আর একটু দেওয়ার কথা আমরা বলতাম।

সেই সময় বাজারে কোন মুরগির মাংসের দোকান ছিল না। বেশির ভাগ লোক খাসির মাংস খেত। ’

(আত্মস্মৃতিচারণ, বিপ্লব মাজী)

আর বাসি মাংসের ঝোলের স্বাদ যে কী অপূর্ব সেটা বাঙালি মাত্রই জানে।

‘মাংসের ঝোল অবশ্য যত বাসি আর যতবার ফোটানো ততই মজে অপূর্ব স্বাদ, ওটা রান্নাঘরের বেদ বাইবেলেই লেখা।’ (অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার/যশোধরা রায়চৌধুরী)

শোনা যায় রাজা রামমোহন রায় নাকি আস্ত একটা পাঁঠা খেতে পারতেন, স্বামী বিবেকানন্দ যখন নরেন নামে নেহাতই স্কুল বালক, তখন নাকি নিত্য স্কুল থেকে ফিরে পাঁঠার মাথার ঘুগনি দিয়ে বেশি না, মাত্র গণ্ডা চারেক রুটি সাবাড় করতেন অক্লেশে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে বাংলার মনীষা আর মাংসের যোগাযোগ অতি ঘনিষ্ঠ। সেখানে মুরগি দাঁড়াতে পারে?

তবে হ্যাঁ, সেসময় মুরগির মাংসের বেশ একটা রোম্যান্টিক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ভাবমূর্তি ছিল। সাঁওতাল পরগ্ণায় হাওয়া বদল করতে যাবার উদ্দেশ্যই ছিল সস্তায় এন্তার মুরগি খেয়ে খাওয়া বদল। নির্জন ডাকবাংলায় কিংবা জরিপের কাজে গহন বনে কাজে যাওয়া বাঙালিরা মুরগির কদর বুঝত। বর্মা মুলুকে এক কাঠ গুদামের মালিক তার চাকরের বামনাই ভেঙ্গেছিল ওই মুরগি দিয়েই। সে ভারি মজার গল্প।

‘ সে নিজে তো মাছ-মাংস ছোঁবেই না, আমি স্টোভে নিজের মতো রেঁধে খেলেও নাক সিঁটকোবে, নানা রকম আপত্তিকর মন্তব্য করবে। কদিন আর সহ্য করা যায় বলুন?

শেষটা এক দিন দুটো মোটাসোটা মুরগি নিয়ে ওর রান্নাঘরে ঢুকলাম। ও হাঁ হাঁ করে তেড়ে এল। আমি বললাম ‘এ দুটোকে কাট’ ও বলল ‘প্রাণ থাকতে নয়।’ আমি তখন পায়ের চটি খুলে ওকে আগাপাশতলা পেটালাম। ও বলল ‘কাটছি! কাটছি!’

কাটা হয়ে গেলে বললাম ‘এবার রাঁধ’ ও বলল ‘কিছুতেই না’ আমি চটি খুলতেই বলল ‘রাঁধছি! রাঁধছি!’ রান্না হয়ে গেলে দু-ভাগ করে বললাম ‘অর্ধেকটা তুই খা’ ও বলল ‘মেরে ফেললেও না’ আমি তখন আবার চটি খুললাম, ও –ও সঙ্গে সঙ্গে থালা টেনে নিয়ে খেতে বসে গেল।

পর দিন কিছু বললাম না। ভাবলাম একটু একটু করে সইয়ে নিতে হবে। কিন্তু সেদিন ব্যাটা নিজের থেকেই মুরগি কিনে এনে কেটেকুটে রেঁধে বেড়ে দুভাগ করে বড় ভাগটি নিজের জন্যে তাকে তুলে রেখে দিল। সেই ইস্তক খাওয়া-দাওয়া নিয়ে আর কোন অসুবিধা হয়নি’

(খেরোর খাতা, লীলা মজুমদার)

স্টিমার যাত্রায়ও মুরগির জুড়ি ছিল না সেটা সত্যি। খালাসিদের হাতের প্রাণকাড়া কারি রান্নার গন্ধে সৈয়দ মুজতবা আলির একবার মনে হয়েছিল গোটা স্টিমারটাই একটা আস্ত মুরগি, যার পেটের মধ্যে তাকেই রান্না করা হচ্ছে। (নোনাজল)

তবে যাই বলুন, পাঁঠার মাংসের কৌলীন্য, স্বাদ বা গ্ল্যামার মুরগির কাছ থেকে আশা করাই অন্যায়। এ যেন ডোভার লেন সঙ্গীত সম্মেলনের সঙ্গে পাড়ার জলসার তুলনা। কারণ পাঁঠার মাংস শুধু একটা খাদ্য নয়, তা একটা উৎসব, যে উৎসবে শৈশবে সামিল হয়েছেন আমার আপনার মতো অনেকেই।

‘মউলুদ্দিন কাকা খাসি কাটে। স্কুলে একটা খাসি নিয়ে এসে আগে খরিদ্দার ঠিক করে, কে কে মাংস নেবে। তারপরে খাসি কাটে। বাবা মউলুদ্দিন কাকাকে বলে রেখেছে মাসে একবার করে মাংস দিয়ে যেতে। কোনদিন মাংস আনল মার পছন্দ হল না। বলে – তুমি সিনার মাংস দাওনি কেন? নেব না’ বলে ফিরিয়ে দেয়। আমরা মনখারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। বাবা এলে বলি- ‘মউলুদ্দিন কাকা মাংস এনেছিল, মা ফিরিয়ে দিয়েছে।‘

বাবা মাকে বলে বাচ্চারা মাংস খাবে, ফিরিয়ে দিলে কেন?’ মা রাগ করে বলত-‘সবাইকে মাংস দেবার পর শেষের খারাপ মাংসটা নিয়ে হাজির। চর্বিতে ভরতি। ওকে কে নেবে?’

যেদিন মাংস হয় আনন্দ ধরে না। মাংস কাটার জন্য বাড়িতে একটা লম্বা গোল কাঠ থাকত। মউলুদ্দিন কাকা মাংস কুচিয়ে দিত না। কুচিয়ে দিলে কেউ নেবে না। বাবা কিংবা বাড়ির লোকজনের কেউ কাঠটা ধুয়ে কাটারি দিয়ে মাংস কুচায়। আমরা দাঁড়িয়ে দেখি। ওদিকে ঝি শিলে বেশি বেশি মশলা পিষে থালায় সাজিয়ে রাখে। কুচনোর পর তেলমশলা মাখিয়ে শিকেয় তুলে রাখে। রাতে বড় বড় আলু দিয়ে বাবা রান্না করতে বসে। এদিকে আমাদের দেরি সয় না। ঘুম এসে যায়। হাঁড়িতে মাংস ফুটছে। তার গন্ধ নাক দিয়ে টানি আর ঘর-বার করি। অবশেষে রান্না হয়। খেতে বসি। মাংস যাই হোক, সবার আলু ঝোল আর মেটে চাই। দু-টুকরো মাংস, একটুকরো মেটে আর আলু , ঝোল দিয়ে তৃপ্তি সহকারে খাই।’

(নোনাজমিন, অমিতা পট্টনায়ক)

এমনি একটা চমৎকার বর্ণনা আছে অনিল ঘড়াইয়ের একটি উপন্যাসে। আর মাংস রান্নার সে উৎসব শুধু নিজের ঘরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না , তার ভাগ পেতেন পড়শিরাও।

‘খেতে ভালবাসতেন দুই বন্ধু, খাওয়াতেও। একবার যোগীন সরকার এক সের মাংস কিনেছিলেন। দুই বাড়িতেই গিন্নিরা রাঁধতেন। যোগীন সরকারের স্ত্রী মাংস কুটে , ধুয়ে, নুন-হলুদ মাখিয়ে ঢাকা দিয়ে একটু ভেতরের দিকে গেছেন। গিরীশ শর্মা সেই সুযোগে হাঁড়িসুদ্ধ কাঁচা মাংস তুলে এনে, গিন্নিকে বললেন, ‘এটা খুব ভালো করে রাঁধ তো দেখি’

মেজদিদি চমৎকার রাঁধতেন। তিনিও সঙ্গে সঙ্গে খুব ভালো করে মাংস রেঁধে, উনুনের পাশে ঢেকে রেখে, চান করতে গেলেন। এর একটু বাদেই তাঁর বড় ছেলে গিরীশ শর্মাকে একটা চিরকুট দিয়ে গেল। তাতে লেখা ছিল, ‘তোমরা বাড়িসুদ্ধ সকলে আজ দুপুরে আমাদের বাড়িতে খাবে। শুনলাম দুষ্কৃতকারীরা তোমাদের রান্নাঘরে হামলা দিয়েছে।’ তারপর মধুরেন সমাপয়েৎ।

(খেরোর খাতা, লীলা মজুমদার)

তবে বেশ কয়েকশো বছর আগে, বন্য প্রাণি সংরক্ষণের নামও যখন কেউ শোনেনি, তখন হরিণের মাংস পাল্লা দিত পাঁঠার মাংসের সঙ্গে। প্রাচীন সাহিত্যে তার বর্ণনা পাচ্ছি তো বটেই, বছর পঞ্চাশ আগেও সে খুব বিরল ছিল না, এমন নমুনাও মিলছে।

‘ধনিয়া সলুপা বাটি দারচিনি যত
মৃগমাংস ঘৃত দিয়া ভাজিলেক কত’

(দ্বিজবংশী দাস)

‘কচি ছাগ মৃগ মাংসে ঝালঝোল রসা
কালিয়া দোলমা বাগা সেকচী সামসা’

(ভারতচন্দ্র)

‘বাবা মহা খুশি। ডাল আর শুকনো আলু আর নিজের হাতে মারা হরিণের মাংস খেয়ে খেয়ে অরুচি ধরে গেছিল।‘

(খেরোর খাতা/ লীলা মজুমদার)

‘নোনা নৈশ বাতাসের চল্লিশ মাইল দূরে সুন্দরবন- এই জায়গাটা যেন সেই বাঘের জঙ্গলের ঘুমন্ত কিনারা। এইখানে একদিন হরিণের মাংস খেয়েছিলাম- চর্বির চিহ্নহীন টগবগে দৌড়বাজ লাল মাংস।‘

(অক্ষয় মালবেরি, মণীন্দ্র গুপ্ত)

বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের সেরা রান্নাকেন্দ্রিক উপন্যাসের বিখ্যাত হাজারি ঠাকুর অসাধারণ পাঁঠার মাংস রাঁধতে পারত।

‘হাজারি ঠাকুর মাংস রাঁধিবার একটি বিশেষ প্রণালী জানে, মাংসে একটুকু জল না দিয়া নেপালী ধরনের মাংস রান্নার কায়দা সে তাহাদের গ্রামের নেপাল-ফেরত ডাক্তার শিবচরণ গাঙ্গুলীর স্ত্রীর নিকট অনেকদিন আগে শিখিয়াছিল’ (আদর্শ হিন্দু হোটেল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

তবে সে হচ্ছে প্রেসার কুকারের আগের যুগ। প্রেসার কুকার যখন আসেনি, তখন হাঁড়ি বা কড়াতেই মাংস রাঁধা হত, আর অনেক সময় সুসিদ্ধ হবার জন্যে তাতে ফেলে দেওয়া হত পেঁপে। সাধনা মুখোপাধ্যায়ের রান্নার বইয়ে ‘রোববারের আলু পেঁপে দেওয়া মাংসের ঝোল’ নামে একটি পদ পাচ্ছি।

পরে পাঁঠার মাংস রান্নার একটি অবিচ্ছেদ্য অংগ হয়ে গেল প্রেসার কুকার। আমার ছোটবেলার রোববার গুলো ঘুরঘুর করত প্রেসার কুকারের পাশেই। ওইদিন খিদেও একটু বারবার পেত, তাই দুপুরে পেট পুরে মাংস ভাত খাওয়ার পর বিকেল চারটে না বাজতে বাজতেই পাঁউরুটি দিয়ে মাংসের ঝোল খেতেই হত। বরাত ভালো থাকলে রাতেও লুচি মাংস জুটে যেত। মনে রাখতে হবে লুচি মাংস কিন্তু বাঙালির খাদ্য ইতিহাসে একটা কাল্ট ফিগার। আর ইয়ে মানে মুরগিপ্রেমীরা জেনে রাখুন, এখানে লুচির সঙ্গে মাংস মানে কিন্তু পাঁঠার মাংসই। যাই হোক, একবার প্রেসারে মা ছোলার ডাল সেদ্ধ করেছিল। সেবার আমি ইন্দ্রপ্রস্থের দুর্যোধনের মতো প্রেসারে মাংস রান্না হয়েছে ভেবে খুলে দেখে বেজায় নাকাল হয়েছিলাম। তবে প্রেসার কুকার আর পাঁঠার মাংস নিয়ে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক কাহিনীটি লিখেছিলেন none other than তারাপদ রায়।

‘কুকারে রাতের মাংস রান্না হয়েছে। সুঘ্রাণে সমস্ত বাড়ি ভরে গেছে। আমরা সবাই খেতে বসেছি, শুধু ভাত আর মাংস খাওয়া হবে। পাতে ভাত দিয়ে আমার স্ত্রী মাংস দিতে যাবে, কিন্তু কিছুতেই প্রেসার কুকার আর খুলতে পারেন না। আমি, বিজন দুজনে তাঁকে সাহায্য করতে গেলাম কিন্তু কি করে যে প্রেসার কুকারের ঢাকনার প্যাঁচ এমনভাবে আটকে গেছে কিছুতেই কিছু বোঝা যাচ্ছে না।’

তো প্রথমে ডাকা হল পাড়ার এক পিসিমাকে। তিনি এলাকায় সর্বপ্রথম এই যন্ত্র ব্যবহার করেন, তাই। তিনি ব্যর্থ হওয়ায় বিজন চলে গেলেন ট্যাক্সি করে কালিঘাট থেকে নাকতলা। রাত এগারোটা নাগাদ এক প্রেসার কুকার খোলায় বিশেষজ্ঞকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে এলেন।

‘তিনি রান্নাঘরে ঢুকে প্রেসার কুকারটার চারপাশে ঘুরতে লাগলেন, তারপর একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে চক্ষু নিবদ্ধ করে কুকারটা কোলে তুলে নিলেন। এরপর শুরু হল হ্যান্ডেলকে ক্লকওয়াইজ আর পাত্রকে অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ঘোরানোর পালা। এইরকম চলতে চলতে একসময় প্রেসার কুকারের হাতল তারাপদর হাত থেকে ছিটকে ভদ্রলোকের থুতনিতে লাগল।। তিনি অতর্কিতে আহত হয়ে কুকারটি ফেলে দিলেন, সেটা পড়ল তাঁরই পায়ের ওপর।’

কাহিনীটি শেষ হয় এইভাবে- ‘সেদিন রাতে আমরা নুন-তেল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম এবং সেও রাত দেড়টায়’

(কাণ্ডজ্ঞান, তারাপদ রায়)

তৃষ্ণা বসাক
যাদবপুর বিশববিদ্যালয় থেকে বি.ই‚ এম.টেক | সরকারি মুদ্রণসংস্থায় প্রশাসনিক পদ‚ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিদর্শী অধ্যাপনা তাঁর লেখনীকে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে | গল্প‚উপন্যাসের পশাপাশি ছোটদের জন্য কল্পবিজ্ঞান লিখে থাকেন নিয়মিত |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here