গলনাঙ্ক

195

পর্ব ৩

তার বুকটা ধড়াস ধড়াস করছিল, সে কোনদিনও উঁ্চু থেকে পড়ে যায়নি, তবু পড়ে যাওয়ার অনুভ্ুতি স্বপ্নে সম্প্ুর্ণ জানা হয়ে গেছিল রঘুব্িরের

সেদিন তার ক্লাস ছিল একটাই | আড়াইটে নাগাদ ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস | তখন সদ্য় শেষ হয়েছে ফার্স্ট ইয়ারের সেকেন্ড সেমেস্টার | ইউনিভার্সিটিতে বর্ষশেষের ছুটির আবহ | সেদিন রঘুব্ির ফার্স্ট ইয়ারকে দেখিয়েছিল জাঁ জেঁের ’সং অফ লাভস’ | তারপর ক্লাসরুমে ফিরে জেঁ্নে সম্মন্ধে কথা বলতে শুরু করল সে | জেঁ্নে তার ’ আওয়ার লেডি অফ ফ্লাওয়ারস’ পুরোটাই লিখেছিলেন জেলে বসে | ফরাসি কারাগার | স্বত, গড়িয়ে পড়তেন বিছানায় , পরের দিন আবার ওই একই পদ্ধতিতে পরবর্ত্ি অধ্য়ায় রচনা করতেন তিনি | জেঁ্নের ’ থিভস জার্নাল’ প্রসঙ্গে উঠে এল পার্ি বৃত্তান্ত | জেঁ্নের প্রবর্তিত ’আদারনেস’ প্রসঙ্গে উঠে এল সমকাম্ি আন্দোলনের কথা | এই ভাবে যখন ক্লাস নিতে নিতে রঘুব্ির কিঞ্চিত রিল্য়াক্সড, ভুলে ভুলে যাচ্ছে ভোরের স্বপ্নটাকে তখনই হঠাৎ তার চোখ পড়ল মোহরের দিকে

সে যখন পড়ায় তখন ক্লাসের ভেতর পায়চারি করতে থাকে ক্রমাগত | চেষ্টা করে ছাত্রছাত্র্িদের মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করতে, সচরাচর রঘুব্ির অয়্াভায়েডই করে মানুষের চোখ দুটোকে, কারও মুখোমুখি দাঁ্ড়িয়ে কথা বলতে গেলে নিজের চোখের ফোকাস কোন এক অদ্ভুত প্রক্রিয়ায় ঝাপসা করে ফেলে রঘুব্ির্ | এই অবস্থায় চোখ, নাক, মুখ ভাসা ভাসা হয়ে যায় সাম্মুখের মানুষটার্ | সে মনে করে মানুষের চোখ এক অতি বিপজ্জনক জিনিস্ | কিছু কিছু চোখ কেমন ভয়ং্কর, অনেক দ্ুর থেকেও ওই চোখের দৃষ্টি এফোঁ্ড় ওফোঁ্ড় করে দিতে পারে মানুষকে | কিছু কিছু চোখ বন বিড়ালের মত ঝাঁ্পিয়ে পড়ে গায়ের ওপর কিং্বা গাড়ির ালোর মত ঘষে দিয়ে চলে যায় শর্ির, যেন খুনটা করার সময় কেমন লেগেছিল চব্বিশ ঘন্টা সে কথাই ভাবছে, াজ যেমন কাল যেন ঠিক তেমন নয়, পানাপুকুরের মত সবুজ

এমনকি নিজের চোখ সম্পর্কেও বেশ অস্বস্তি াছে রঘুব্িরের্ | ায়নার সামনে নিজের চোখের দিকে বেশিক্সণ তাকাতে ভয় হয় তার্ |

সেদিন পড়াতে পড়াতে হঠাৎ মোহরের চোখে চোখ পড়ে গেল তার্ | সঙ্গে সঙ্গে শর্িরে যেন ছ্য়াঁ্কা লাগল রহুব্িরের্ | শিউরে উঠল সে | ত্িক্স্ন হুল বিঁ্ধিয়ে দেওয়ার মত করে মোহর তাকিয়ে াছে তার দিকে — রঘুব্িরের মনে হল এই মেয়েটি তার ছাত্র্ি নয়, এক অজ্ঞাতপরিচয় নার্ি যে নরকের ঢাকনা খুলে তার ফাঁ্ক দিয়ে তাকাচ্ছে তার দিকে এবং নিজের ভৌত, কুৎ্সিত ভার চাপিয়ে দিতে চাইছে তার ওপর

মোহর মেয়েটা লম্বায় তার মাথায় মাথায়, সাপের মত হিলহিলে একটা ব্য়াপার াছে মোহরের মধ্য়ে | রণজয়দার বাড়ির পার্টিতে মোহর তাকে টয়লেটে ঢুকে এসে জড়িয়ে ধরে ছিল াচমকা | সে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, সাপের তুলনাটা তখনই মাথায় াসে তার্ | র্ুপোলি সাপ, মোহরের গায়ের রং র্ুপোলি, মনে হয় বালিতে গড়াগড়ি খেয়ে উঠে এসেছে | ত্বকের মধ্য়ে াটকে গেছে অভ্রের কণা, চিকচিক করছে | ছোট ছোট চুল, ছোট ছোট চোখ — চোখে ধ্য়াবড়ানো কাজল, সেই কালো কাজলের মধ্য়ে থেকে কটা মনি চিরচির শব্দ তুলে তাকিয়ে থাকে

ইউনিভার্সিটির পুরোনো পাপ্ি মোহর, ইং্লিশ অনার্স করে ফিল্ম স্টাডিজ পড়ছে | এখানকার ঘাঁ্ৎ ঘোঁ্ৎ সব জানা | কাউকেই ভয় পায় বলে মনে হয় না — সন্ধে নামলে ক্য়াম্পাসের ানাচে কানাচে ছেলেমেয়েরা মেক াউট করেই, ফ্য়াকাল্টিরা দেখেও দেখে না সে সব, নিজের রাস্তায় অন্য়মনস্ক হেঁ্টে চলে যায়্ | তবু একদিন সেন্ট্রাল লাইব্রেরির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রঘুব্ির দেখেছিল মোহর একটা ছেলের কোলের ওপর বসে ছেলেটাকে জাপটে ধরে চুমু খাচ্ছে | তখনো সন্ধের াড়াল নামেনি পুরোপুরি, ক্য়াম্পাসে প্রচুর লোকজন, তাও হয়ল রঘুব্ির গায়ে মাখত না বিষয়টা — কিন্তু ওই অবস্থায় মোহর তাকে হাত নাড়াতে সে যারপরনাই সং্কুচিত বোধ করেছিল

ক্লাসে মোহরের চোখে চোখ পড়া মাত্র ভয় পেয়ে সে চোখ সরিয়ে নিতে গেল ার তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ঝিলের ওদিকে বিল্ডিং পার করে এক চিলতে াকাশে | সে দেখল াকাশটা কালো হয়ে যাচ্ছে, পৃথিব্ির একদিকের দরজা বন্ধ হয়ে গেল যেন্ | সে স্বচক্সে দেখতে পেল দিন কিভাবে ফুরিয়ে যায়্ | ার উঠে াসে রাত মাটি ফুঁ্ড়ে কালো ক্য়াসেলের মত

একেই কি বলে কাউন্টার রেভোলিউশন অফ থট

রঘুব্ির চরম ভয় পেল্ | ার একবার ভয় পাওয়া মানেই তারপর শুধু ভয় পাওয়া, কারণে অকারণে ভয় পাওয়া, পায়ে পায়ে ভয়ং্কর জড়িয়ে যাওয়া ভয়ের, তখন নিজের ছায়ার পেছনে লুকোনোর ব্য়র্থ চেষ্টা

অনর্গল কথা বলতে বলতে মাঝপথে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল রঘুব্ির্ | ঠোঁ্ট শুকিয়ে গেল তার্ | তখন ার্টস, ক্য়াম্পাসের রাস্তায় ালো জ্বলে উঠছে, কাউকে কিছু না বলে, কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জ্য়াকেটটা তুলে নিয়ে ব্ির পায়ে বেরিয়ে এল সে ক্লাসরুম ছেড়ে | তারপর ছেলেমেয়েদের জটলা ভেদ করে এগোল্ | চারপাশে হাসি, ঠাট্টা, হুল্লোড়, কথার খোঁ্য়াড়, মোটরবাইকে মেয়েদের বসিয়ে হুসহুস করে চলে যাচ্ছে চেনা অচেনা মুখ, মিলনের ক্য়ান্টিন রেনোভেটেড হচ্ছে | সেখানে বাঁ্শের একটা অদ্ভুত খাঁ্চা দাঁ্ড়িয়ে, তাতে চড়ে বসে পা দোলাচ্ছে উদ্ভিন্ন যৌবনবত্ি একটি মেয়ে | তার লো রাইজ জিনস, “It’s a bottom as could held the world up, it is.” বরং ভয় পাওয়ার সময় এতেও াতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে রঘুব্ির, ওরা ডোপ করছে নিশ্চই | এই সব পরিচিত হুটোপাটি সন্তর্পণে অতিক্রম করে সে াস্তে াস্তে হেঁ্টে গেল উইমেনস, তারপর াবার ঘুরে সেন্ট্রাল লাইব্রেরি | ওদিকের মাঠে প্রচণ্ড শোরগোল, ইঞ্জিনিয়ারিং্-এর ছেলেরা ফুটবল খেলছে | ভিড় করে সবাই দেখছে সেই খেলা | রঘুব্ির স্থির করতে পারল না ভিড়ে দাঁ্ড়ালে ারও বেশি ভয় করবে কিনা তার্ | নাকি ফাঁ্কা ফাঁ্কা | মানুষজন নেই — এই অবস্থাটাই তার পক্সে অধিকতর ভয়ের্?

অনেকটা সময় কেটে গেল তার ফুটবল খেলা দেখে | ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রঘুব্ির দেখল সাতটা বাজে | ভ্িষণ ঠাণ্ডা পড়েছে শহরে | চারপাশে কুয়াশার াস্তরণ্ | গরম পোশাকে াপাদমস্তক নিজেদের ঢেকে ফেলেছে সবাই | কেউ কারও সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে গিয়েও মুষড়ে পড়ছে ঠাণ্ডায়্ | ফেরার পথে সে দেখল ক্য়াম্পাস অনেকটাই নির্জন হয়ে এসেছে | যারা জোড়ায় জোড়ায় বসে রয়েছে তারা একে অন্য়ের তলপেট, বুক ছুঁ্য়ে াছে সোয়েটারের ভেতর হাত ঢুকিয়ে

তখনই, চার নম্বর গেটের কাছে পৌঁ্ছতে তার সামনে কোথা থেকে এসে উদয় হল রিপন, বলল, , আপনার হাত কাঁ্পছে

তাকিয়ে দেখল রঘুব্ির, তার শর্ির থেকে বেরিয়ে আসা দুটো লম্বা ডাঁ্টি কাঁ্পছে থরথর করে | ভয় পেলেই তার হাত কাঁ্পতে থাকে এভাবে | সে সন্গে সন্গে হাত দুটো জ্য়াকেটের পকেটে চালান করে দিল, , বাট ইটস ফাইন

রিপনের মাথা নিচু, চোয়াল ঝুলে আছে বুকের কাছে, কালো জ্য়াকেটের ভেতর থেকে উঁ্কি মারছে রিপনের গলার হারটা, একটা কাঠের লকেট, লকেটটা নরখুলির মতো দেখতে | রঘুব্ির চোখ সরিয়ে নিল লকেটটা থেকে তাড়াতাড়ি, এক মাথা ঝাঁ্কড়া চুল চোখ্-মুখ ঢেকে দিয়েছে, ছোটখাটো চেহারা, গায়ের রং কালো, চোখের কোণে ঠোঁ্টের প্রান্তে সব সময় নেশার জড়তা, ভাবলেশহ্িন মুখ, কথা বলার সময় হার্ডলি চোখে তুলে তাকায় | দিনের মধ্য়ে চব্বিশ ঘন্টাই নেশা করে থাকে রিপন্ | ক্লাসেও আসে নেশা করে |

ভোর থেকে ভয় পেতে পেতে রঘুব্ির ক্লান্ত | তখন রিপনকে দেখা মাত্র একটা প্রশ্ন করে বসল সে,

রিপন অবাক হল না | বলল, , আপনি আমাদের সন্গে যেতে পারেন্ |

এক মুহ্ুর্ত ভাবলে সে, তারপর বলল,

চার নম্বর গেটের সামনে এখন অনেক ছেলেমেয়ে | বাঁ হাতে একটা ভেঙেচুরে যাওয়া চায়ের স্টলের স্ট্রাকচার্ | তারই পাশে ফুটপাতে বসেছিল দু, বলল,

রঘুব্ির মাথা নেড়ে জানাল সে যাবে | এই সময় সে মাছিদের কথা ভাবছিল, মাছিরা কত অকুতোভয় এটাই বারবার মনে ভেসে উঠছিল তার্ | মুরগি বা মাছের দোকানে সে দেখে কুকুরগুলো শুয়ে থাকে পায়ের ওপর মুখে রেখে | চোখ দুটো জোর করে বন্ধ করে রেখে আর রক্তাক্ত বডির ওপর ক্রমাগত ঝাঁিপিয়ে পড়তে থাকে মাছিগুলো | যখনই ভ্িষণ ভয় তার, ইচ্ছে হয় মাছি হয়ে যেতে, ভয়ের ওপর, ধারাল আতঙ্কের ওপর ঝাঁ্পিয়ে পড়তে |

কাছে গিয়ে মুখগুলো চিনতে পারল রঘুব্ির — রক্তিম, তেজু, মৈনাক

রক্তিম বলল, “রঘুদা আপনি?

রিপন বলল,

উসখুশ করে উঠল ছেলেগুলো, , আপনি আমাকে সন্গে বসে খাবেন্? খুব চাপের ব্য়াপার

রিপন গম্ভ্ির গলায় বলল,

এই সব কথাবার্তার মধ্য়েই রাস্তা পার হয়ে বেন্গল ল্য়াম্পের দিকে হাঁ্টতে লাগল সবাই | রিপন পাশে পাশে হাঁ্টছিল রঘুব্িরের্ | কিছুটা যাওয়ার পর পুকুরটা বাঁ হাতে রেখে ভাঙা পাঁ্চিলের মধ্য়ে দিয়ে কোম্পানি এরিয়ায় ঢুকে পড়ল ওরা | রিপন বলল,

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.