শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত সূর্যোদয়

শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত সূর্যোদয়

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

লকডাউন চলছে।

সামনের দশ-পনেরোটি দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আমাদের দেশের মানুষের কাছে। কিন্তু লকডাউন যে ভাবে হচ্ছে, তাতে কিছু ফল পাওয়া গেলেও, যে উদ্দেশ্যে লকডাউন সেই উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সাধিত হবে কিনা, বলা যাচ্ছে না। কতকগুলি সিদ্ধান্ত নিতে ইতিমধ্যেই দেরি হয়েছে। যেমন কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ছিল অন্তঃর্দেশীয় যাত্রীবাহী বিমান পরিবহন আরও আগে বন্ধ করা। একটি দু’টি রাজ্যে এখনও লকডাউন হয়নি। এটিও সঠিক কাজ হচ্ছে কিনা, সময়ই উত্তর দেবে আর সে উত্তর কিন্তু ভয়ংকর এক বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে আমাদের। যেভাবে বেছে বেছে কেবলমাত্র কতকগুলি পুরশহরে লকডাউন করা হল, তার মাশুলও গুণতে হতে পারে। লকডাউন মানে হওয়া উচিত ছিল কমপ্লিট লকডাউন। যা কিছু দেখছি আর শুনছি তা থেকেই এই ভয় লাগছে যে, গ্রামগুলিতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তেই পারে।

যে শহরে আমি থাকি, সেই শহরে গুজব ছড়িয়েছে যে, অন্য রাজ্য থেকে আসা জনা পনেরো শ্রমিক নাকি গায়ে জ্বর নিয়ে লুকিয়ে রয়েছে। পুলিশ তাদের খুঁজছে। যদি এ খবর নিছকই গুজব হয়, তাহলে চিন্তার কিছু নেই। পুলিশ প্রশাসনই এর সত্যতা বলতে পারবে। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষদের যা মানসিকতা, তাতে অন্য রাজ্য থেকে এসে গায়ে জ্বর বা সর্দি-কাশি নিয়ে স্রেফ কোয়ারেনটাইনে থাকার অহেতুক ভয়ে কেউ কেউ ডাক্তার না-দেখিয়ে লুকিয়ে থাকতেই পারেন। হাসপাতালে হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার জন্য লম্বা লাইন পড়েছে এটা যেমন ঠিক, তেমন অনেকেই যে প্রয়োজন থাকলেও পরীক্ষা করাচ্ছেন না—এটাও সত্যি। সকলের সচেতনতার মাত্রা এক নয়। আর যদি কেউ আত্মগোপন করতে চান, তাহলে সেই আত্মগোপনের জন্য এই মুহূর্তে উপযুক্ত জায়গাগুলি হল গ্রাম। কে বলতে পারে এঁদের হয়তো অনেকেই ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছেন গ্রামে! যেহেতু গ্রামে লকডাউন নেই, তাই এঁদের মধ্যে কেউ কেউ করোনা ভাইরাস শরীরে বহন করলে, গ্রামে সংক্রমণ ছড়াতে বেশি দেরি হবে না!

একথা বললে, এখন অনেকেই বলতে পারেন যে, অহেতু আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছি। এইসব হাইপোথিসিসের দরকার নেই। কিন্তু আতঙ্ক যে অহেতুক নয়, তার একটা প্রমাণ দিই। একটি টিভি চ্যানেল দেখাল যে, ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকরা লকডাউন শুরু হয়ে যাওয়ার পরে অনেকেই ধর্মতলায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাঘুরি করছিলেন আর তারপর এঁদের অনেককেই বাস বোঝাই করে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদে। আশা করব যে, এই সমস্ত শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে এবং তারপরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। খবরটিতে দেখানো হয়নি যে, এঁরা মুর্শিদাবাদের কোথায় গেছেন। এঁদের অনেকেরই বাড়ি গ্রামে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এঁদের কি গ্রামে যেতে দেওয়া হয়েছে? জানতে ইচ্ছে করছে। যে সমস্ত পুরশহরগুলিতে লকডাউন চলছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই শহরগুলির লাগোয়া গ্রামেও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে যে-কেউ চলে যেতে পারেন। লকডাউন দীর্ঘদিন ধরে চললে, দিন-আনি-দিন-খাই-তে অভ্যস্ত ঠিকা শ্রমিকদের একটা অংশের মধ্যে দু’পয়সা রোজকার করার জন্য এই প্রবণতা বাড়তেই পারে।

কাজেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কেন অন্তত সাতদিন গ্রাম-শহর নির্বিশেষে গোটা দেশজুড়ে লক ডাউন হবে না? আমাদের দেশের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসচেতনতা যদি উপযুক্ত মানের হত, তাহলে হয়তো এখনই এই পদক্ষেপ না-নিলেও চলত। কিন্তু, দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি যে, বাস্তব অন্য কথা বলছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে তাই কড়া হতেই হবে। হ্যাঁ, এর ফলে হয়তো আর্থিক ক্ষতি হবে বিপুল। কিন্তু তা নিশ্চয়ই প্রাণহানির চেয়ে বড় ক্ষতি নয়!

যে সমস্ত শহরে লকডাউন চলছে, সেখানেও যাঁরা স্রেফ আড্ডা দিতে বা মজা দেখবেন বলে ঘোরাঘুরি করছেন এখনও, তাদের জরিমানা বা জেল (বা প্রয়োজনে দু’টোই) করতেই হবে।

কালোবাজারি রোখা আর একটা বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের বড় বড় শিল্পপতিরা সকলে মিলে যে এখনও করোনা নিয়ে তেমন কোনও পদক্ষেপ নেননি এটাও বেদনার। দীর্ঘদিন লকডাউন চললে সমাজের একটি অংশের মানুষেরা কেবল দরিদ্র বলেই বেঁচে থাকতে গেলে প্রয়োজনীয় যে ন্যূনতম খাবার দরকার সেটিও পাবেন না। এঁদের প্রতি সরকারের, আমাদের মতো সহ-নাগরিকদের যেমন দায় থাকবে, তেমনই দায় থাকা উচিত এই সব শিল্পপতিদেরও। লকডাউন চলা শহরগুলিতে বাজার-হাট এবং মুদিখানার দোকান বা  স্পেন্সার, বিগ বাজারের মতো মলগুলিতেও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো উচিত। টিভিতে দেখা গেছে যে, বেশ কিছু বয়স্ক মানুষ বাজারের থলে নিয়ে বাজারে ঘুরছেন। লকডাউনের পরেও রাজ্যের বেশ কয়েকটি বাজারে ভিড় রয়েছে ভালই। এই ভিড়কে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কিছু ব্যবস্থা সরকারকে নিতেই হবে।

একইসঙ্গে আরও একটি ব্যবস্থা নিতে পারলে ভাল হয়। যেসব অশীতিপর মানুষ একাই থাকেন বা স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে ‘একাই’ থাকেন (আমাদের দেশে এই অংশের মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়) তাঁদের অনেকেই অনলাইনে অত্যাবশকীয় পণ্য কিনতে পারবেন না। এঁদের অন্তত বাজার এবং ওষুধ কেনার জন্য কোনও সরকারি বা বেসরকারি হেল্প লাইন চালু করা যায় কি না দ্রুত তা ভাবতে হবে। নইলে এই মানুষগুলির অনেকেই বাজারে যাবেনই। এতে পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হতে পারে।

শেষে একটা কথা। তরুণদের একটা অংশ মনে করছে যে, এই বিপদ থেকে তারা মুক্ত। আমি যে শহরে থাকি সেই শহরে প্রেমিক-প্রেমিকাদের আদর্শ মিলনস্থল  “কৃষ্ণসায়র পার্ক” বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার সামনে মুখে মাস্ক পরে এক ছাত্রী তার পুরুষবন্ধুকে নিয়ে একটি ছবি তুলে পোস্ট করেছে সোশাল মিডিয়ায়। এই বার্তা দিয়ে যে, তারা করোনাকে একদমই মানে না। এটা হয়তো আরও অনেকেরই মনে হচ্ছে যে, এইরকম করলে বেশ একটা উলটো পথে হাঁটা যাবে। দারুণ একটা বিপ্লব করা যাবে। শোনো ভাই প্রেমিক-প্রেমিকারা, এই সময়টা ঠিক বিপ্লবের সময় নয়। পার্ক থাকবে, পার্কের আলো-আঁধারিও থাকবে, যদি এখন বিপ্লবের নামে স্বেচ্ছায় জীবনে অন্ধকার ডেকে না আনো। ইতিহাস সাক্ষী, অতি-উৎসাহে ঘটানো বিপ্লবগুলি মানবসভ্যতার বদ্ধ-গৃহে পরম সূর্যোকরোজ্জ্বল বাতাস এনে দিতে পারেনি। বরং কিছু নিয়মকানুন যদি আমরা সকলে মিলে মেনে চলি কটা দিন, তবেই শাশ্বত রাত্রির বুকে অনন্ত সূর্যোদয় দেখা যাবে।

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

19 Responses

  1. লিখতেই হল। গোটা দেশজুড়ে দ্রুত পুরো লকডাউন চালু হওয়া দরকার। এবং এক্ষুনি। তাই না অমরদা?

  2. লিখতেই হল। গোটা দেশজুড়েই লকডাউন চালু হওয়া দরকার এবং এক্ষুনি। তাই না অমরদা?

  3. অংশুমান দা খুব ভালো লাগলো।
    আমাদের গ্রামেও কয়েকজন আছে, পুলিশ ওদের বাইরে বেরোতে বারণ করেছে।তবু তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি বলতে গেছিলাম কয়েকজন কে নিয়ে।বাড়ির লোকেরা গালি গালাজ করছে।

  4. গোটা দেশ-এই লকডাউন হল। পুলিশে খবর দাও, প্রয়োজনে।

  5. Asole society niye jara antorik,antorik manob sovvotar probaho niye,jara prokito samaj jibi tader a rakom akulata moy sachetanota asha savabik apni sudhu tow angshuman non poribortinsil samajer kichu parogacha,andho biswas, kusanaskarke protihato kore sovvotake agiy ni jabar ak ananno pranjol protiva ja inbuild.asha kori a rakam lekhoni anupranitow korbay ai projonmer asonkho samaj korbo ke. Upoher din arakom bhabnar dharabahikata. Valo thakun barander talitay noy,wunmukto hridoyer marmoparsi chetoner,manoner batabrikkhow hoye.

  6. শিল্পপতিদের কোনোরকম সাড়াশব্দ নেই এই পরিস্থিতিতে। এটা একটা খুব ভালো দিক মনে করালেন। মানুষের মনে রাখা উচিত পরবর্তী কালে।

  7. পূর্বানুমান বা ভবিষ্যৎদর্শন – দ্রষ্টা হিসেবে আপনি যে কতটা সঠিক, একদিন দেরিতে লেখাটি পড়ে বুঝতে পারলাম। মুগ্ধ হলাম।

  8. কী বলি বলুন। সত্যিই দুশ্চিন্তায় আছি।

  9. তা নয়। কিন্তু এই কথাগুলো খুব মনে হচ্ছিল।

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।