মাদলের বোল‚ খোঁপার ফুল আর পাখির পালকে শুরু হয় সোঁদা গন্ধমাখা নববর্ষ

134

এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনা হিসেবে একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে, এর আগে এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালন করা হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ
প্রযুক্তির প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হত।


আকবরের সময়কাল থেকেই এই পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এরপর দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে জমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এই উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হত। পরবর্তীকালে এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সব জায়গাতেই পুরনো বছরের হিসাব মিলিয়ে নতুন হিসাবে বই খোলা হত। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এই প্রথাটিই বাংলায় এখনও অনেকাংশে প্রচলিত আছে।


বাংলায় যেমন নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয়। এইদিন নানা আচার-রীতিনিতির মধ্য দিয়ে বর্ষবরণ করে বাঙালিরা। সে রকমই দক্ষিণ ভারতের কন্নড়, তেলেগু ভাষাভাষীর লোকেরা একেবারে অন্যভাবে নববর্ষ পালন করেন। কন্নড় বা তেলেগুদের নববর্ষকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘যুগাদি’। অর্থাৎ যুগ ও আদি অর্থাৎ যুগের বা বছরের শুরু। ভারতীয় পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী চৈত্র মাসের শুক্ল প্রতিপদে নতুন বছরের সূচনা, এই দিনটিকে নববর্ষ উৎসব বলা হয়। মহারাষ্ট্র এবং কোঙ্কনে এটিকে গুড়ি পড়ওয়া পরব, সম্বৎসর বলেও ডাকা হয়। দক্ষিণ ভারতে আবার এই উৎসব উগাদি নামে পরিচিত। চৈত্র নবরাত্রি মার্চ এপ্রিল মাসে বা চৈত্র মাসেই পড়ে। ভারতীয় পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী চৈত্র মাসের শুক্ল প্রতিপদে নতুন বছরের সূচনা, এই দিনটিকে নববর্ষ উৎসব বলা হয়।


অসমে পয়লা বৈশাখ পালিত হয় ‘বিহু’ নামে নববর্ষ। এটি অবশ্য পালিত হয় বছরে তিন বার। নতুন বছরে প্রথম দিনটিতে হয় বংগালি বিহু, কার্তিক মাসে হয় কাঙালি বিহু, আর মাঘে হয় ভোগালি বিহু। মণিপুরে পয়লা বৈশাখেই পালন হয় নববর্ষ। রাজস্থানে নববর্ষ পালিত হয় রামনবমীর দিন। গুজরাতে নববর্ষ হয় অঘ্রাণ মাসের প্রথম দিন। পশ্চিম দিনাজপুরের আদিবাসীরা নববর্ষ পালন করে পয়লা মাঘ। এই অনুষ্ঠানের নাম ‘মাগসিম’। মাদলের শব্দে জেগে ওঠে সাওতালপল্লীর মানুষ। প্রত্যেকেই হাতে একটি মুরগি নিয়ে হাজির হয় বট বা অশ্বত্থ গাছের তলায়। আরাধ্য দেবতাকে নিবেদন করে মুরগিটি। অনেকে আবার কচিপাতা বা ফল ও নিবেদন করে। কৃষিকাজে যুক্ত যারা তারা হাল, লাঙল ছুঁয়ে ফসল বোনার শপথ নেয়। মেয়েদের চুলের খোঁপায় থাকে রঙিন ফুল আর পাখির পালক। এরপর থাকে নিজস্ব সংস্কৃতির নাচ গান ও সেই সঙ্গে চলে খাওয়া-দাওয়াও।


পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশে মহাসমারোহে সাড়ম্বরে উদযাপিত হয় বাংলা নববর্ষারম্ভ পয়লা বৈশাখ। বাংলায় সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিন পালিত হয় চড়কপূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। এই মেলায় অংশগ্রহণকারীগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকেন। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বড়দের প্রণাম করার রীতি বহুলপ্রচলিত। বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন। গ্রামাঞ্চলে এবং কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে পয়লা বৈশাখ থেকে আরম্ভ হয় বৈশাখী মেলা। এই মেলা সমগ্র বৈশাখ মাস জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়।


বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও পৃথিবীর আরও নানান দেশে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হয়ে থাকে। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন শহরে যেমন সিডনি, মেলবোর্ন, ক্যানবেরাতে বৈশাখী মেলার মাধ্যমে পয়লা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। বিভিন্ন শ্রেণি, বিভিন্ন পেশার মানুষ নাচ-গান-খাবারের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির এ ধারাকে আনন্দময় করে তোলে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলাও অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় বিপুল পরিমাণ লোকের সমাগম ঘটে এবং প্রবাসী বাঙালিদের জন্য এটি একটি আনন্দঘন দিন। এছাড়া সুইডেনেও বিপুল উৎসাহের সঙ্গে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হয়। ইংল্যান্ডে অবস্থানকারী প্রবাসী বাঙালিরা ‘স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল’ পালন করে। এই উৎসবটি লন্ডনে করা হয়। ইউরোপে অনুষ্ঠিত সর্ববৃহৎ এশীয় বাঙালি উৎসব এটি।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.