গলায় জুঁইয়ের মালা‚ সাদা ধুতি চাদরে দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ সেদিন খাঁটি বাঙালি রূপ ধরেন

গলায় জুঁইয়ের মালা‚ সাদা ধুতি চাদরে দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ সেদিন খাঁটি বাঙালি রূপ ধরেন

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

তীব্র গরম আর কালবৈশাখীর ঝগড়ায় শেষ পর্যন্ত জয় গরমের হলেও এই লড়াইটার কারণেই বৈশাখ মাসটা যেন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে | আমরা বঙ্গ সন্তানেরা সারা বছর বাংলা মাসগুলোর উপস্থিতি ভুলে থাকলেও চোদ্দই অথবা পনেরোই এপ্রিল যে পয়লা বৈশাখ হয় সেটা ভুলি না |

দুর্গা পুজোর মত বড়সড় ব্যাপার না হলেও একটু ছোট মাপে‚ মানে চৈত্র সেলের সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে গড়িয়াহাট‚ হাতিবাগান চষে ফেলে আমরা নতুন জামাকাপড় দেওয়া-নেওয়ার কারবার চালাই |

এসি মেশিন ছাড়া একমাত্র জুঁই‚ বেলের সুগন্ধই বাংলার গরমের ভ্যাপসানিটা শরীর মন থেকে কিছু মুহূর্তের জন্যে হলেও ভ্যানিশ করে দেবার ক্ষমতা রাখে | আর এই ঘর্মাক্ত দিনগুলোয় শেষ পাতে কাঁচা আমের চাটনি চেটে যা আরাম তার তুলনা কোনও কিছুর সঙ্গেই চলে না |

আজকের বিজ্ঞাপন-মোড়া পৃথিবীতে পয়লা বৈশাখ কীভাবে কাটাতে পারেন তার অনেক ফিকির আপনি পাবেন | কিন্তু আমরা চেষ্টা করব এই বাংলার আদি অকৃত্রিম পয়লা বৈশাখ উদযাপনের সুরটা ধরার | আর পুরনো কথা বলতে গেলে আমার হাতের পাঁচ শোভাবাজার রাজবাড়ির গপ্পো তো আছেই |

বহু বাঙালি পরিবারের মতো এই পরিবারেও বছরের প্রথম দিনটি শুরু হয় স্নান করে নতুন জামা কাপড় পরে ঠাকুর প্রণাম দিয়ে | রাজ পরিবারের সমস্ত সদস্য সেদিন তাঁদের কুলদেবতা শ্রী শ্রী গোপীনাথ জীউর চরণে প্রণাম জানিয়ে তাঁর আশীর্বাদ প্রার্থনা করে নতুন বছরের শুভারম্ভ করে থাকেন | এ প্রথা আজকের নয় | বহু আগে থেকে চলে আসছে |

দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণ সেদিন খাঁটি বাঙালি রূপ ধরেন | শ্বেতশুভ্র ধুতি আর চাদর গায়ে দিয়ে জুঁই বেলের মালা পরিহিত বংশীধারীর রূপ ভক্তের চোখে সেদিন আরও বেড়ে যায় | এছাড়া ওই দিন নারায়ণ শিলাকে প্রদক্ষিণ করা এবং তাঁকে মরসুমি ফল নিবেদন করারও চল আছে |

এই বংশের শেষ ‘রাজা’ উপাধিধারী পুরুষ গোপেন্দ্র কৃষ্ণ দেবের অশীতিপর নাতনির মুখে গল্প শুনেছি‚ একে রাজা, আবার তৎকালীন কায়স্থসভার প্রধান হওয়ার কারণে বছরের প্রথমদিন তাঁর ঠাকুরদার কাছে দেখা করতে সমাজের তাবড় মানুষেরা নানা উপহার নিয়ে আসতেন |

এছাড়া আসতেন প্রত্যেক জমিদারির দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নায়েবরা | সমস্ত বকেয়া খাজনা মিটিয়ে বছরের প্রথম দিন আবার নতুন খাতা খোলা হত | নতুন অর্থনৈতিক বছর শুরু করার এই প্রক্রিয়ার পোশাকি নাম ছিল পুণ্যাহ | আর এই সমস্ত অতিথিবর্গের আপ্যায়নের জন্য রাজবাড়িতে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হত | রাজামশাইয়ের আমলের পরেও পয়লা বৈশাখের খাওয়া দাওয়ার বিশেষ চল ছিল | কিন্তু তখন বিশেষ অতিথি হতেন বাড়ির সব জামাই |

ভাল খাওয়া দাওয়া ছাড়া সে সময়কার ছোটদের একটা প্রধান আকর্ষণ ছিল‚ এই যে সেদিন বড়দের প্রণাম করলে আশীর্বাদের সঙ্গে একটি করে টাকার কয়েন পাওয়া যেত | ঠাকুমার কথায়, সারা দিন ধরে বড়দের প্রণাম করে যা খুচরো হাতে আসত তা নিয়ে কী করা যায় ভেবে কচিকাঁচার দল দিশেহারা হয়ে পড়ত |

রাজামশাইয়ের হুকুম ছিল‚ পয়লা বৈশাখের দিন বিকেলে তাঁর নাতি নাতনিদের যেন শহরের হাওয়া খেতে নিয়ে যাওয়া হয় | আগে কোচোয়ান‚ পিছনে সহিস আবার সঙ্গে একজন বাড়ির গুরুজন নিয়ে জুড়িগাড়ি চেপে তাই তারা শহরের হাওয়া খেতে বেরোত |

তবে সব বাইরের আনন্দই বাড়ির পুরুষ অথবা ছোট সদস্যদের ভাগে পড়ত | মহিলা সদস্যদের জন্য গোপীনাথ জিউর চরণে প্রণাম করতে ঠাকুরবাড়ি যাওয়া অথবা কদাচিৎ কালীঘাট বা অন্য কোন দেবস্থানে যাওয়ার সুযোগ ঘটত | নয়ত হেঁশেলে ঢুকে রান্নায় হাত লাগানো বা রান্নার তদারকি করেই তাঁদের মন শান্ত রাখতে হত | খাওয়াদাওয়ার পর পুরুষদের তোলা ঢেঁকুরের শব্দ ও ছোটদের ‘আরও চাই’ দাবির মধ্যে থেকে নিজেদের তারিফ নিজেদেরই খুঁজে নিতে হত |

গোপীনাথ প্রণাম‚ নারায়ণ প্রদক্ষিণ ছাড়াও আবহমান কাল ধরে এ বাড়িতে যেটা হয়ে আসছে সেটা হল ঝারা | পয়লা বৈশাখের একদিন আগে থেকে শুরু হয়ে সারা বৈশাখ মাস ধরে তুলসী মঞ্চে গঙ্গা জলের ধারা ঝরান হয় | অর্থাৎ একটা পাত্র থেকে অবিশ্রান্ত জলের ধারা তুলসী গাছের ওপর ঝরে পড়ে | খেয়াল রাখা হয় কখনও যেন মুহূর্তের জন্যেও জল ঝরা বন্ধ না হয় |

সময় যেন আজকাল নদীর স্রোতের থেকেও দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে | রাজা রাজড়ার দিন গিয়ে এখন সবাই সাধারণ মানুষ | তাই সেদিনের বাহ্যিক আড়ম্বর আজ আর নেই | খোলস বাদ দিয়ে যা পড়ে আছে তা হল সাবেকি কিছু বাঙালিয়ানা‚ কিছু রীতি রেওয়াজ যা এখনও পরিবারের মানুষগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে | সারা পৃথিবীর বিভিন্ন কোণায় এই রাজ পরিবারের মানুষেরা আজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন | কিন্তু কাছে থাকুন বা দূরে‚ পয়লা বৈশাখের দিন সকালে উঠে চর্মচক্ষে অথবা মনের চোখ দিয়ে শ্রী শ্রী গোপীনাথ জিউর দর্শন ও তাঁর চরণে প্রার্থনা জানাতে আজও কারও ভুল হয় না |

(পুনর্মুদ্রিত)

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।