গঙ্গা-দূষণের ভয়াবহতা – নিরাপদ নয় দক্ষিণেশ্বর

‘বহতি ধারা – নির্মল পানি’-র দিন বোধহয় ফুরালো। অতি সম্প্রতি কলকাতার একটি নামজাদা দৈনিক সংবাদপত্রে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে – তার পরিপ্রেক্ষিতেই এমন মন্তব্যের অবতারণা। সংবাদে প্রকাশ – অন্যান্য সমস্ত রাজ্যের মধ্যে আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই নাকি গঙ্গা-দূষণের পরিমাণ সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। ন্যাশনাল মিশন ফর ক্লিন গঙ্গা প্রকল্পের প্রযুক্তি-অধিকর্তা জানাচ্ছেন যে পশ্চিমবঙ্গের একাধিক এলাকাতেই গঙ্গার দূষণ সহনশীলতার মাত্রা ছাড়িয়েছে। তিনি এও জানিয়েছেন যে, বিশেষভাবে এই দূষণের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হতে পেরেছে – মহাতীর্থ দক্ষিণেশ্বরের স্নান-ঘাটটিতেই। এর কারণ হিসাবে তিনি নির্দিষ্ট করে বালিখাল ও সংলগ্ন অন্যান্য সেচখালগুলির দিকেই আঙ্গুল তুলতে চেয়েছেন। প্রসঙ্গত, দক্ষিণেশ্বরের খুব কাছেই বালিখাল এসে গঙ্গায় মিশেছে এবং কলকাতা ও তৎসংলগ্ন এলাকার একাধিক উচ্ছেদ হওয়া খাটালের অধিকাংশই বর্তমানে এই বালিখাল (যা কিনা ডানকুনি অবধি বিস্তৃত) তার দুই-তীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে অবস্থান করছে। এমতাবস্থায়, খাটালগুলির বর্জ্যপদার্থ সমূহ বিনাবাধায় প্রথমে বালিখাল এবং পরে গঙ্গায় এসে মিশতে পারছে। নদীদূষণের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞেরা বলেন, প্রতি ১০০ মিলিলিটার জলে সহনশীল অবস্থায় সর্বাধিক ৫০০-সংখ্যক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে। উল্লেখ্য যে, এই ধরণের ব্যাকটেরিয়ার প্রধান উৎসই হলো মানুষ বা অন্যান্য পশুর প্রাকৃতিক বর্জ্যসমূহ। বালিখাল ও সংলগ্ন খালগুলির দূষণের কারণে, দক্ষিণেশ্বর স্নানঘাটে এই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে প্রতি ১০০মিলিলিটার জলে ২ লক্ষ ৪০ হাজার। চিকিৎসকেরা বলছেন এর ফলে স্নানার্থীদের পেটের অসুখ থেকে চর্মরোগ এমনকি আরও নানারকমের অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। সংবাদে প্রকাশ যে, এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী-মহোদয় তাঁর অবগতির কথা জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেবার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি এও জানিয়েছেন যে, বিশেষভাবে বালিখালের জন্যই একটি জল-পরিশোধন কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনাও তাঁরা ইতিমধ্যেই সেরে ফেলেছেন, তবু অর্থের কারণে যার বাস্তবায়ন এই মূহুর্তেই সম্ভব হচ্ছে না।

গঙ্গা-দূষণ কোনও নতুন বিষয় নয়। তবু, বারেবারেই এমন কিছু কিছু পুরানো বিষয়কেই বোধকরি পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন – তাতে সামান্য সামান্য করে হলেও সচেতনতা-বৃদ্ধি সম্ভব। প্রাকৃতিক অপ্রাকৃতিক বর্জ্যসমূহ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় শোধন না করেই যদি নদীতে ফেলা হয়, তবে তার থেকে দূষণ অবশ্যম্ভাবী। একটি বেসরকারি পরিবেশ-সংস্থার রিপোর্টে দেখলুম যে তারা দাবি করেছে, হুগলী জেলার চন্দননগর শহরে, নদীতে ফেলবার পূর্বে সে এলাকার মাত্রই ১০% প্রাকৃতিক বর্জ্যের শোধন করা হয়ে থাকে। সারা দেশে প্রতিদিনে, আনুমানিক ৭০০কোটি লিটার বর্জ্য-দ্রব্য গঙ্গায় বিসর্জিত হয় – আর এই বিপুল বর্জ্য-দ্রব্যের ৪৮%-এর যোগানদার আমাদের পশ্চিমবঙ্গ, একলাই একাধারে। সেই ৪৮%-এর মাত্রই ৪২% হলো পরিশোধিত বর্জ্য-দ্রব্য, আর বাকিটুকু মা-গঙ্গাই জানেন। একথা ঠিক যে, কানপুর-উত্তরপ্রদেশের ট্যানারিগুলি গঙ্গার যে বিপুল দূষণ ঘটিয়ে থাকে প্রতিবছর, আমাদের রাজ্য বোধকরি অতটাও নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারেনি। তবু, সচেতনতা যদি তৈরী না হয়, অবস্থার অবনতি সময়ে অপেক্ষা কেবল। গবেষকেরা বলছেন, অশোধিত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক বর্জ্যপদার্থসমূহ, যা কিনা শহরগুলির নিকাশি-নালার মাধ্যমে নদীতে গিয়ে মেশে, সেটিই গঙ্গাদূষণের অন্যতম প্রধান কারণ।

এটিও ভাববার বিষয় যে, অর্থের ঘাটতির কথা বলে – সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যে যুক্তি দিচ্ছেন সেটিও একেবারে উড়িয়ে দেবার মতো নয়। নদী-বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের নিকাশিবর্জ্য-দ্রব্যের সম্পূর্ণ পরিশোধনের পরিকাঠামো তৈরীতে সম্ভাব্য খরচ দাঁড়াতে পারে প্রায় সাড়ে তেরো হাজার কোটি টাকা। এরজন্য দরকার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও তার রূপায়ণ, যুক্তিহীন কূটকচালিতে সময় নষ্ট করলে মা গঙ্গার গঙ্গাপ্রাপ্তিই ত্বরান্বিৎ হবে কেবল। নদী-তীরবর্তী বেআইনি ও দূষণ-সৃষ্টিকারী শিল্পগুলিকে বন্ধের বিষয়ে সরকার এবং নাগরিক সমাজকে দ্বিগুণ সচেতনতার সঙ্গে সচেষ্ট হতে হবে। গঙ্গা-দূষণ নিয়ে এই উদ্বেগ একেবারেই নতুন নয়। সর্বপ্রথম ১৯৮৬তে, তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী গঙ্গা-দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে উদ্যোগী হন। তাঁর আমলেই, নিকাশি নালাগুলির সঙ্গে নদীর যোগাযোগকে বিচ্ছিন্ন করে, নিকাশিদ্রব্যের পরিশোধন ও পুনর্ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিলো। পরবর্তীতে ২০০৯এ প্রকল্পটির সঙ্গে আরো কিছু নতুন পরিকল্পনাকেও যুক্ত করা হয়। ২০১৪এ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসবার পরেও বেশ কিছু ঘোষণা এবং অর্থবরাদ্দের ঘটনাও ঘটেছে। তবু, তাতে মা গঙ্গার দূষণ কমেনি, বরং ক্ষেত্রবিশেষে বৃদ্ধিও পেতে পেরেছে। নদী-বিশেষজ্ঞেরা এও জানাচ্ছেন যে, বর্তমানে নিকাশিদ্রব্য পরিশোধনে যে প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে থাকে – তাতে পূর্বোল্লিখিত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার সম্পূর্ণ শোধন হয় না। কাজেই সে সমস্ত প্রযুক্তিকে কাজে লাগালেও, কার্যক্ষেত্রে যে কতটুখানি সাফল্য আসতে পারবে – সে বিষয়েও তাঁদের একাংশ যথেষ্টই সংশয়গ্রস্ত।

নদী-বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, নদীর মূল প্রবাহকে বারেবারে বাধা দেওয়ার কারণেও – নদীর বর্জ্য-দ্রব্যকে ফিরিয়ে দেবার ক্ষমতা কমেছে। তথ্য বলছে, কানপুর অবধিও পৌঁছানোর আগেই, গঙ্গার ৯০% জল সেচকার্যে বিভিন্ন দিকে বইয়ে দেওয়া হয়ে থাকে। নদীর স্বাভাবিক গতির বিরুদ্ধে তাকে বইতে বাধ্য করা, নদীতীরবর্তী এলাকাগুলিতে মাত্রাতিরিক্ত দূষণ ও ভৌমজল-নিষ্কাশন, যার কারণে ভৌমজলের মাধ্যমেও দূষিত পদার্থের নদীতে মেশা – এবং সর্বোপরি বিশ্ব-উষ্ণায়ন নদীর মৃত্যুকেই ডেকে আনছে কেবল। প্রতি বছরেই, এই বিশ্ব-উষ্ণায়নের কারণে গঙ্গোত্রী হিমবাহের দৈর্ঘ্য কমছে গড়ে প্রায় ২০মিটার। প্রতিটি মূহুর্তেই, যেন একটি নিঃশব্দ মৃত্যুর অভিমুখে আজ আমাদের প্রিয় গঙ্গাকে বইতে দেখতে হচ্ছে। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে প্রতিদিনের আগত পুণ্যার্থীর সঠিক সংখ্যা আমার জানা নেই, তবে তা যে বেশ কয়েক হাজার – তা অনুমান করে নেওয়াই যায়। এর একটি বড় অংশই যে প্রতিদিন মন্দির-পার্শ্বের স্নান-ঘাটটিতে স্নান করে থাকেন সে বিষয়েও আমরা নিশ্চিত হতে পারি। অথচ কি ভীষণ মাত্রায় যে গঙ্গার ওই অংশটুকুতে দূষণ ছড়িয়েছে – সে খবর এখন প্রকাশিত। স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে, ফলপ্রসূ পরিকল্পনা ও তার রূপায়ণের অপেক্ষায় থাকলাম।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.