পূজা, প্রেম এবং রবীন্দ্রনাথ

1191

শিরোনাম দেখে নিশ্চয় কেউ কেউ ভাবছেন, আমি দীর্ঘ কোনও প্রবন্ধ ফাঁদতে বসেছি দীর্ঘ এবং গুরুগম্ভীর | সেখানে পূজা পর্যায়ের সঙ্গে প্রেম পর্যায়ের গানের তুল্যমূল্য অলোচনা করা হবে | বিভিন্ন গানের রেফারেন্স আসবে | পূজা পর্যায়ের কোন গানে প্রেম ঢুকেছে, প্রেমের কোন গানে উঁকি মেরেছে পূজা…থাকবে তার ব্যাখ্যা | সঙ্গে টীকা | রবীন্দ্রগবেষকদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি | এতে প্রমাণ হবে, এই বিষয়ে আমার বিস্তর জ্ঞান | আর সবার শেষে থাকবে সাহায্য নেওয়া বইয়ের লম্বা তালিকা | যত বড় না প্রবন্ধ তার থেকে সেই তালিকা অবশ্যই লম্বা হতে হবে | প্রবন্ধ কতটা গুরুতর তা প্রবন্ধের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে বইয়ের তালিকা কতটা লম্বা তার ওপর |

না, এমন কিছু হবে না | কারণ, আমি কোনও গুরুগম্ভীর লেখার মধ্যে নেই | আক্ষরিক অর্থেই আমি আজ পুজো এবং প্রেম নিয়ে একটা ঘটনা বলতে চাই | সেই ঘটনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যুক্ত ছিলেন | সুযোগ থাকলে তাঁকে সাক্ষী রাখতাম | হায়রে, সেই সুযোগ নেই | সেই কারণেই লেখার শিরোনাম দিয়েছি পূজা, প্রেম এবং রবীন্দ্রনাথ | অন্য কারণে নয় |

পুজোয় প্রেম নতুন কোনও বিষয় নয় | দুর্গাপুজোর সময় প্রেম কে না করেছে? আমাদের স্কুলের অঙ্ক স্যার ছিলেন সুশীল মহাপাত্র | পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কঠিন এবং উদ্ভট পাটিগণিত অকাতরে বিতরণ করে ছাত্রমহলে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন | সেই সঙ্গে তিনি ছিলেন একজন দাঁত কিড়মিড় মানুষ | ছাত্রদের মাথা চিবোনোর জন্য সবসময় দাঁত কিড়মিড় করতেন | তেলহীন ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুলে সেই দাঁত কিড়মিড় লাগত ভয়ঙ্কর | ক্লাস টেনে পড়ি | পুজোর সময় বাবার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোই | সপ্তমী বা নবমীর সন্ধেবেলা হাতিবাগানের এক প্যান্ডেলে গিয়ে আঁতকে উঠলাম | সুশীল স্যার না? হ্যাঁ সুশীল স্যারই তো | লম্বা চুল আর বড় টিপের এক সুন্দরী মহিলার হাত ধরে স্যার হাঁটছেন আর খুব হাসছেন | মানুষটাকে চেনাই যাচ্ছে না | গায়ে চকরাবকরা শার্ট | পায়ে চকচকা পয়েন্টেড সু | মাথার তেল চকচকে চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো | আমি তো হাঁ | পুজোর ছুটির পরে স্কুল এসে ঘটনা বললাম | এঁচোড়ে পাকা ভোম্বল বিজ্ঞের মতো বলেছিল, ‘ও কিছু না | ও হল পুজোর প্রেম | সবাই করে |’ প্রেম | সুশীল স্যারের প্রেম | আমাদের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল | তারপর থেকে আমার বিশ্বাস, সুশীল স্যারের যদি হতে পারে পুজোর সময় সবার প্রেম হয় |

বত্রিশ-তেত্রিশ বছর আগের কথা | সবে কলেজে উঠেছি | পাড়ার পুজো নিয়ে দারুণ হইচই করছি | সকাল হতে না হতে প্যান্ডেলে | বাড়ি ফিরছি মাঝরাতে | পাড়ার পুজো যে একেবারে বিরাট বড় কিছু ছিল এমন নয় | ছিমছাম পুজো | তখন পুজোয় এরকম বেমক্কা খরচাপাতির ব্যাপার ছিল না | সকালে অঞ্জলি দিয়ে প্রসাদ, বিকেলে আরতি, ধুনুচি নৃত্য | সেই সঙ্গে কাঠের চেয়ারে বসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আড্ডা | এই আড্ডাই ছিল সবথেকে ইম্পর্ট্যান্ট | পাড়ার এবং পাড়ার আত্মীয় পরিজন সবাই আসত | বয়স বুঝে একেকটা আড্ডার জোন | বড়রা একদিকে, ছোটরা একদিকে | আমরা মেজোরা আরেকদিকে | শুধু বয়স নয়, ছেলেমেয়েরাও আলাদা | তার মধ্যেই ইতিউতি তাকানো | একটু হাসি, একটু ইশারা | একটু মান অভিমান, একটু আশা | চটপট যে যার মতো প্রেমিক-প্রেমিকা বেছে নাও | সপ্তমীর সকালের মধ্যে পছন্দ-অপছন্দ কমপ্লিট কর | দুপুর থেকে প্রেম শুরু | পুজোর প্রেম | সেই প্রেম চলত টানা কালীপুজো পর্যন্ত | তারপর হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসে যাও | মোটামুটি এই ছিল সিস্টেম | সবার ক্ষেত্রে সিস্টেম কাজ করত না | যেমন আমাদের তপজ্যোতি পছন্দ করে বসল অরিত্রিকে, কিন্তু অরিত্রি কিছুতেই পাত্তা দিল না | আমরা তপোজ্যোতিকে বললাম, ‘তপু যা, সরাসরি বলে ফেল | তপজ্যোতি লজ্জা পেল | আমরা জোর করলাম | তপজ্যোতি কয়েক পা এগিয়েও পিছিয়ে গেল | আমরা গাল দিলাম | লাভ হল না | তপজ্যোতি মুষড়ে পড়ল আরও | সপ্তমীর সকাল গড়িয়ে যায় যায় | পুজোর প্রেমের বেলা যে যায় | বিরহে উচাটন তপজ্যোতি এবার রণেভঙ্গ দেয় | প্যান্ডেলের আড়ালে ছিল গান বাজানোর ব্যবস্থা | মাইকের গান | তপু সেখানে গিয়ে দায়িত্ব নিল | দুটো কী তিনটে হাবিজাবির পরই শুরু হল রবীন্দ্রসঙ্গীত | আজও সেই গান মনে আছে | ‘ নয় এ মধুর খেলা … তোমার আমায় সারাজীবন সকাল সন্ধেবেলা … |’ আমার পাশে বসেছিল কালু | রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ে তার কোনও আইডিয়া নেই | ছলছল চোখে বলল, ‘আহারে,তপুটা স্যাড সঙের ক্যাসেট চালাচ্ছে | প্রেমে ধাক্কা খেয়েছে | গান শেষ হতেই দেখি মেয়েদের জোন থেকে ঝপাং করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে অরিত্রি | গনগনে গলায় বলল, ‘এত সুন্দর গানটা থামালো কেন? কে থামাল? মাইকের ওখানে কে রয়েছে? কোন গাধা?’ তারপর হেঁটে গেল গটগটিয়ে | মিলিয়ে গেল প্যান্ডেলের আড়ালে | ‘গাধার’ সন্ধানে | আমরা চোখ ছানাবড়া করে বসে রইলাম | তারপর পর পর সাতবার ‘নয় এ মধুর খেলা’ বাজলো, তপজ্যোতি আর অরিত্রি আড়াল থেকে বেরোল না |

তখন ভেবেছিলাম, ওই গান নির্ঘাৎ প্রেমের | পরে জেনেছিলাম, না ওই গান পূজা পর্যায়ের | কী আশ্চর্য!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.