যুদ্ধকাল্িন

187

হ্রদের জলকে মরকতমণির মতো মনে হয় | শ্িত শেষ হয়ে আসছে | গাছের ঝরা পাতা উড়ে উড়ে এসে পড়ছে হ্রদের জলে | একটু আগেই একটা ট্রেন সামনের ব্রিজের ওপর দিয়ে ঝমঝম শব্দ তুলে চলে গেল | আর তারপর একটা ভেজা হাওয়া বইতে শুরু করল | তখনই ভেসে এল এক নার্িকন্ঠ, ‘ কেমন আছো?’ কিছুক্সণ চুপ থেকে সে আবার বলে উঠল, ‘বেঁ্চে আছো তো?‚’

পুরুষকন্ঠে উত্তর শোনা গেল, ‘ ক্ি করে জানলে এই মুহ্ুর্তে ঘুমনোর জন্য় আমি তোমার হাঁ্টুর ওপর মাথা রেখেছি?

নার্িকন্ঠ , আমি তোমার কফিন |

পুরুষটি কোনও উত্তর দিল না | নার্িটির আর্তকন্ঠ ভেসে এল, ‘বেঁ্চে আছো? আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?’

এবার পুরুষকন্ঠ কথা বলে উঠল, ‘ আচ্ছা, তুমি কি এক স্বপ্ন থেকে আর এক স্বপ্নের ভিতরে জেগে ওঠো?’

নার্িকন্ঠ …তুমি বেঁ্চে আছো তো?

পুরুষকন্ঠ

নার্িকন্ঠ
পুরুষটির হা-ক্লান্ত স্বর বলে উঠল, ‘ জানি না | কিন্তু মৃত্য়ু ঠিক সময়ে আসবে |’

নার্িকন্ঠ , পুরোপুরি মরে যেও না |
পুরুষকন্ঠ
নার্িকন্ঠ
পুরুষকন্ঠ , তাহলে ক্ি হবে?

এরপর আর কিছু শোনা গেল না | শুধু ভেজা হাওয়া আর পাতা ঝরার শব্দ ঘুরে বেড়াতে লাগল হ্রদের ওপর |

– আমরা কোথায়?
– আপনার ফ্ল্য়াটে |
– রোজ তুমি একই কথা বলো | আর আমি…আমি তো যুদ্ধক্সেত্রে ঘুমিয়ে পড়ি, যুদ্ধক্সেত্রেই জেগে উঠি |
– চারপাশে তো যুদ্ধই চলছে |
– তাহলে তুমি রোজ মিথ্য়ে কথা বলো কেন?
– মিথ্য়ে কথা?
– ওই যে বললে, আমার ফ্ল্য়াটে রয়েছি |
– আমি মিথ্য়ে কথা বলি না
– কেন?
– জানি না |
– হুঁ্ | এবার আমার নামটা বলো |
– আমি কি আপনার খেলার পুতুল?
– মানে?
– রোজ সকালে উঠে আপনার নাম আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে কেন?
– আমি ভুলে যাই, তুমি জানো না? তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো না, তাই না? কতবার তোমাকে বলেছি, আমি ঘুমোতে পারি না | কথার পর কথার স্রোত আমার মাথার ভিতরে বয়ে যায় — কারা যে কথা বলে, বুঝতেও পারি না — তুমি কেন বিশ্বাস করো না বসুধা, সকালে উঠে নিজের নাম আমার মনে পড়ে না |
– কফি খাবেন্?
-কিন্তু আমার নাম —
– সুত্ির্থ – সুত্ির্থ দাশ্ |
– ক্ি আশ্চর্য
– এবার কফি করে আনি?
– তুমি বোসো, আমিই আজ কফি বানাব্ | তুমি রোজ কফি বানিয়ে নিয়ে আনো | বানানোর সময় কফির গন্ধটা আমি যে কতদিন পাই না | আজ এই গন্ধটা আমার খুব দরকার্ | আরশোলা-ইঁ্দুরের মতো ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছি আমি, বসুধা | নিজের পায়ে দাঁ্ড়ানোর জন্য় কফির গন্ধটা খুব দরকার্ |
– একেবারে পাগল আপনি |
– যে-হাত কফি বানাতে পারে না, সে ক্ি করে কবিতা লিখবে বলো তো? ডাক্তাররা কতবার আমাকে বলেছে, এত কফি খাবেন না, সিগারেট খাবে না | আমি হেসে বলেছি, , সিগারেট খায় না, তারা কবিতাও লেখে না |, প্রত্য়েক বাড়ির কফির স্বাদ্-গন্ধ আলাদা | তুমি যে কফি বানাও, তার স্বাদ আমার কফির চেয়ে আলাদা | কেন জানো? আমি এক, আর তুমি অন্য় এক আত্মা | আবার মায়ের বানানো কফির স্বাদ একরকম, আর বন্ধুদের বানানো কফি অন্য়রকম | প্রত্য়েকের বানানো কফি আলাদা আলাদা |
– আমাকে আজ কফি বানাতে দিলেন না কেন?
– দেখলাম, কফি বানাতে ভুলে গেছি কিনা | যদি ভুলে যেতাম, বুঝতাম, আমি মরে গেছি |
– এই শুনুন – উ
– হুঁ্ |
– ক্ি?
– এক সেকেন্ড আগেও জানা যায়নি, আরও দুটো বাড়ি ভেঙে পড়বে | বসুধা – বসুধা –
– আপনি এমন করছেন কেন? ক্ি হয়েছে আপনার্?
– আমরা দুজনে কি সত্য়িই বেঁ্চে গেছি?
– তাহলে কথা বলছি ক্ি করে?
– হয়তো অনেক আগে আমরা এসব কথা বলেছিলাম, এখন শোনা যাচ্ছে | তুমি জানো না, নক্সত্রের মৃত্য়ুর কোটি বছর পরে তার আলো পৃথিব্িতে এসে পৌঁ্ছয়?
– আমরা কি নক্সত্র?
– তুমি ঠিক জানো, আমরা বেঁ্চে আছি?
– আপনি বুঝতে পারছেন না? আমি আপনাকে ছুঁ্য়ে আছি |
– হুঁ্ | শহরটা তো প্রায় শেষ হয়ে গেছে | তাহলে আমরা বেঁ্চে আছি ক্ি করে?
– জানি না |
– দেখো … দেখো …
– এমন করছেন কেন?
– তুমিও কেমন জানি না বলতে শিখে গেছ | তোমার চারপাশে যখন যুদ্ধ চলছে, পরিচিত ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ছে, মৃতের স্ত্ুপের ওপর জমে উঠছে আরও গভ্ির মৃতের স্ত্ুপ, কখন তোমার বাড়ি ভেঙে পড়বে, তুমি জানো না, কখন তোমাকে ঘর থেকে টেনে নিয়ে জমিতে গর্ত খুঁ্ড়ে পোড়ানো হবে, জানো না, কখন তোমার ভাই-বোনদের দু, তখন তো তোমার কাছে দুটো শব্দই পড়ে থাকে,
– যুদ্ধের এতগুলো দিন তো দাঁ্তে দাঁ্ত চিপে থেকেছেন আপনি | আমি যখন ভেঙে পড়েছি, আপনি বলেছেন, রোজকার কাজ ঠিক ঠিক করে যাও, শুধু টিকে থাকাটাই আমাদের জয়, আর বেশি কিছু নয়, আপনিই তো আমাকে বারবার বলেছেন, সেই গানটা একবার গাও |
– কোন গান্?
– নদ্ি নদি কোথাও যাও, বাপ্-ভায়ের বার্তা দাও
নদ্ি নদ্ি কোথাও যাও, স্বাম্ি-শ্বশুরের বার্তা দাও |
– আমরা মরে গেছি, বসুধা |
– কবে?
– এই যুদ্ধের কোনও এক দিনে |
– তাহলে আমরা কে?
– যুদ্ধক্সেত্রে জন্ম নেওয়া প্রেত্ |
– কফি খাবেন্?
– বোসো | এখন থেকে আমিই কফি বানাব |
– না‚ এবারের কফিটা আমিই বানাব | কফি বানানোর গন্ধ তো আমারও ভাল লাগে |

– বসুধা কফি বানাতে গেছে | এবার আপনার সন্গে কথা বলা যায় | বসুধা আমার বউ নয়, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন্ | না, ওর সন্গে সহবাসের সম্পর্কও নয় আমার্ | আমার চেয়ে অন্তত পঁ্চিশ বছরের ছোট | তাতে যে সহবাস হতে পারে না, এমন নয় | কিন্তু ওর সন্গে আমার যে ক্ি সম্পর্ক, তা আমি এখনও বুঝতে পারিনি | গোপনে যখন আমি নিজের দেশে এসে ঢুকে পড়ি, পুরোনো বন্ধুরা আমাকে আশ্রয় দেয় | এই দেশ ছেড়ে আমাকে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল, এবার সরাসরি আমাদের জন্য় কিছু লেখো, বন্দুকের মুখে দাঁ্ড়িয়ে যাতে তোমার লেখাই আমরা বলে যেতে পারি | নির্বাসনে একের পর এক দেশে তাড়া খেতে খেতে তখন আমার লেখার মতো ক্সমতা নেই | তাই বসুধাকে আমার কাছে পাঠানো হল, আমি যা বলব, সে লিখে যাবে | একেক দিন বসুধাকে আমার কথা বলি, সে লেখে, কিন্তু আমার তা পছন্দ হয় না, বসুধারও ভাল লাগে না | সে বারবার বলে, আপনি তো কবিতা লেখেন্ | কিন্তু এসব ক্ি বলছেন, সে বলে | তাহলে আমার কথা ক্ি?

– নিন্‚ কফি খান্ |
– বসুধা, তুমি কি আজ আমার কথা লিখবে?
– ক্ি বিষয়ে বলবেন্?
– রাষ্ট্রের জন্ম, গণতন্ত্র, সন্ত্রাসবাদ, আফজল গুরুর ফাঁ্সি …
– কবিতা লিখবেন না?
– লিখব?
– আর এখন
– আমার ন্িরবতাকে লিখছি |
– তার মানে, আমরা শুধু বন্দুকের আওয়াজ শুনব? টিভিতে-রেডিওতে ফাঁ্সির খবর শুনব?
– বন্দুক্-টিভি — এসবের আওয়াজ আমার কথার চেয়েও শক্তিশাল্ি |
– তাহলে আপনার কাজ ক্ি?
-শুধু নিজেকে ধরে রাখা, বসুধা | আ, ক্ি অপ্ুর্ব কফি | তোমার আঙুল কফির শর্িরে গান গাইছে |
– আমরা যুদ্ধে জিতব?
– জানি না | নিজেকে ধরে রাখাই এখন জয়, বসুধা |
– আবার কবে কবিতা লিখবেন্?
– বন্দুকের আওয়াজ যখন আর শোনা যাবে না | আমার ন্িরবতা ভেঙে জেগে উঠবে এতদিন ধরে জমে থাকা সব কন্ঠস্বর্ | যখন নিজের ভাষা খুঁ্জে পাব |
– আপনার তাহলে এখন কোনও ভ্ুমিকা নেই?
– না | কবিতায় এখন আমার কোনও ভ্ুমিকা নেই | কবিতার বাইরে, এই শহরের নাগরিক আর লড়াকুদের মধ্য়ে আমাকে খুঁ্জে পেতেও পারো তুমি |

হ্রদের জল মরকতমণির মতো সবুজ্ | ঝরা পাতারা তার বুকে সাঁ্তার কাটছে | তখন স্ুর্যাস্ত আসন্ন | ভেসে এল নার্িকন্ঠ,
কিছুক্সণ পরে পুরুষকন্ঠে উত্তর শোনা গেল, , এই মুহ্ুর্তে ঘুমোবার জন্য় আমি তোমার হাঁ্টুর ওপর মাথা রেখেছি?
নার্িকন্ঠ
পুরুষকন্ঠ ফিসফিস করে বলে,
একটি পাখি চিৎ্কার করতে করতে উড়ে যায় | নার্িকন্ঠ বলে,
ভেজা হাওয়ায় পুরুষটির কন্ঠস্বর ভাসতে থাকে‚ … লক্স … কোটি … তুমি আমাকে যতবার জন্ম দেবে, মাতৃভাষা |

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.