বিতর্ক অনর্থক, অশ্বিন যা করেছে বেশ করেছে

1169

আইপিএল মানেই যেন বিতর্ক। চার, ছয়, স্ট্রাইক রেট, চিয়ার লিডার ইত্যাদির সঙ্গে মিলেমিশে গিয়েছে বিতর্কের ছোঁয়াও। ম্যাচ গড়াপেটার মতো ভয়ানক অপরাধের পাশাপাশি মাঠের মধ্যেও এমন সব ঘটনা ঘটেছে যা থেকে রীতিমতো বারুদের গন্ধ পাওয়া গেছে। প্রথম বারের আইপিএলে হরভজনের সপাট থাপ্পড় খেয়ে শ্রীসন্তের কান্না মনে আছে? অথবা বিরাট কোহলি-গৌতম গম্ভীর বিবাদ? আউট হয়ে ফেরার পথে কোহলি এমন কিছু বলেছিলেন যা শুনে গম্ভীর ছুটে এসেছিলেন। মারামারি লাগার জোগাড়। নেহাত দিল্লির রজত ভাটিয়া সামলে নিয়েছিলেন, নাহলে ব্যাপারটা আরও খারাপ দিকে গড়াত। ওয়াংখেড়েতে শাহরুখ খানের সঙ্গে নিরাপত্তা কর্মীদের ঝামেলার কথাটাও মনে করুন। এবারের আইপিএলে এখনও পর্যন্ত তেমন বিতর্ক না থাকলেও কিংস ইলেভেন পঞ্জাবের অধিনায়ক রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি।

তা অশ্বিন করেছেন কী? তিনি বল করতে এসে থমকে গিয়ে নন স্ট্রাইকিং প্রান্তে ক্রিজের বাইরে থাকা জস বাটলারকে রান আউট করেছেন। আউটের এহেন পদ্ধতি নাকি খুব একটা খেলোয়াড়োচিত নয়! জয়পুরের সোয়াই মান সিংহ স্টেডিয়ামের ওই ঘটনাই এবারের আইপিএলে সবচেয়ে আলোচিত। বলা যায় সমালোচিত।

ঘটনার পর বেশ কিছুদিন কেটে গেলেও বিতর্কটা এখনও থিতিয়ে যায়নি। ক’দিন আগে রাজস্থান রয়্যালসের সঙ্গে কিংস ইলেভেন পঞ্জাবের ফিরতি ম্যাচের আগেও মিডিয়া যেভাবে খেলাটাকে বাটলার বনাম অশ্বিন বলে দেগে দিল তা থেকে পরিষ্কার, বিষয়টা কেউই সহজে ভুলতে রাজি নয়। হয়তো এই বিতর্ক অশ্বিনকে পরবর্তী দিনগুলোতেও তাড়া করবে।

অশ্বিন অবশ্য ‘মাঁকড়ীয়’ পদ্ধতিতে রান আউট করে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নন। তিনি খেলাশেষে সাংবাদিক সম্মেলনে বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর অভিমত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন। বলে দেন, যা করেছেন তা খেলার নিয়ম মেনে। আর খেলার নিয়ম মেনেই তিনি যখন তা করেছেন তখন সেটাকে ‘অখেলোয়াড়চিত’ কেন বলা হবে?

কোনও সন্দেহ নেই অশ্বিনর কথায় ক্ষুরধার যুক্তি রয়েছে। অথচ প্রশ্ন উঠছে, ক্রিকেট খেলার একটা স্পিরিট আছে। এভাবে আউট করায় কি সেটাই বিপন্ন হল না? এর উত্তর কিন্তু বেশ কয়েক দশক আগেই দিয়ে গিয়েছিলেন এক ভদ্রলোক। কী বলেছিলেন তিনি? ‘প্রাক্তন’ হওয়ার পরে তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে সোজাসাপটা ভাষায় নিজের মত জানিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, এমনভাবে আউট করায় কোনও অন্যায় নেই। বরং বোলারের হাত থেকে বল ছাড়ার আগে যখন নন স্ট্রাইকার ক্রিজ ছেড়ে খানিকটা বেরিয়ে যাচ্ছে, সে-ই অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে। ক্রিকেট সুরসিক মাত্রই জানেন, সেই বইয়ের নাম ‘ফেয়ারওয়েল টু ক্রিকেট’ আর সেই বইয়ের লেখক স্বয়ং স্যার ডন ব্র্যাডম্যান। হ্যাঁ, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বিনু মাঁকড়েরই। মাঁকড় ১৯৪৭-এর অস্ট্রেলিয়া সফরে ওই কায়দায় দু’ দু’বার আউট করেছিলেন অজি ক্রিকেটার বিল ব্রাউনকে। সেই থেকেই এই ধরনের রান আউটকে ‘মাঁকড়ীয়’ পদ্ধতিতে আউট করা বলা শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়া মাঁকড়কে একহাত নিয়েছিল। কিন্তু ব্র্যাডম্যান সমর্থন করেছিলেন মাঁকড়কেই।

অথচ ব্র্যাডম্যানের মতো করে নির্মোহ ও যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখতে চাননি তাঁর দেশেরই আর এক কিংবদন্তি শেন ওয়ার্ন। সর্বকালের সেরা লেগস্পিনার টুইটারে জানিয়েছেন, খেলায় জেতা-টেতা পরের ব্যাপার। সবার আগে খেলাটার স্পিরিট।

‘বায়বীয়’ এই স্পিরিটের পক্ষে যাঁরা ওয়ার্নের মতোই সওয়াল করছেন, পাশে দাঁড়াচ্ছেন ওয়ার্নের, তাঁরা তুলে আনছেন কোর্টনি ওয়ালশের নাম। ১৯৮৭ বিশ্বকাপের শেষ ওভারে পাকিস্তানের সেলিম জাফর প্রায় ক্রিজের মাঝখান পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। অথচ বল তখনও ওয়ালশেরই হাতে। ওয়ালশ জাফরকে আউট না করে ক্রিজে ফিরিয়ে আনেন। ম্যাচটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিততে পারেনি। কিন্তু প্রশংসার বন্যা বয়ে গিয়েছিল তাঁর এমন কাণ্ড দেখে। অশ্বিনের রান আউট করা দেখে অনেকেরই মনে পড়ে গিয়েছে ওই ঘটনার কথা।

লোকজন বলাবলি করছে, ওয়ালশ যা পেরেছিলেন, তা কেন করলেন না অশ্বিনও? অথচ তাঁরা ভুলে গেলেন আমাদের দেশের এক কিংবদন্তি অলরাউন্ডারের কথা। কপিলদেব রামলাল নিখাঞ্জ কিন্তু ক্রিকেট ময়দানে ওয়ালশ নন, অশ্বিনের পথই অবলম্বন করেছিলেন।

১৯৯২-৯৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়েছিল ভারত। ২৩ বছরের নির্বাসন ভেঙে আবারও আন্তর্জাতিক ময়দানে প্রোটিয়াসরা। সেবারের সিরিজের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিরিজটা মোটেই বন্ধুত্বের আবহে খেলা হয়নি। তার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল কপিলের করা ‘মাঁকড়ীয়’ রান আউট। ম্যাচটা ছিল পোর্ট এলিজাবেথের সেন্ট জর্জেস পার্কে। সিরিজের দ্বিতীয় সেই ম্যাচে পিটার কার্স্টেন ছিলেন নন স্ট্রাইকার প্রান্তে। বল করতে এসে কপিল দেখতে পান পিটার অনেকটা বাইর। তিনি বেল ফেলে দেন। আম্পায়ারও আঙুল তুলে জানিয়ে দেন আউট। চূড়ান্ত অসন্তুষ্ট হন পিটার। গজগজ করতে করতে তিনি মাঠ ছাড়েন। সেই সময় স্ট্রাইকার ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক কেপলার ওয়েসেলস। কপিলের অভিযোগ, এরপর নাকি রান নেওয়ার সময় কপিলের হাঁটুর নীচে ব্যাট দিয়ে মারেন কেপলার! কপিলের অভিযোগ অবশ্য প্রমাণ করা যায়নি। কেননা ঘটনার কোনও ভিডিও ফুটেজ ছিল না। কোনও ক্যামেরাই নাকি তাক করা ছিল না ওইদিকে। এমন আশ্চর্য কথার উত্তরে অনেকেই দাবি করেন, ইচ্ছে করেই নাকি ফুটেজ সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আজও সেই বিতর্ক মেটেনি।

অশ্বিনের ঘটনায় কপিল দেব মুখ খুলেছেন। জানিয়েছেন, অশ্বিন যা করেছেন খেলার নিয়ম মেনেই তো করেছেন। ব্যাটসম্যান অসততার সঙ্গে রান চুরি করতে গিয়েছিলেন, অথচ কাঠগড়ায় তো‌লা হচ্ছে বোলারকে! কপিলের এহেন বিস্ময় প্রকাশের মধ্যে নিশ্চয়ই প্রচ্ছন্ন ছিল ছাব্বিশ বছর আগের সেই ইতিহাস। তিনি অনুভব করেছিলেন অশ্বিনের মনের ভেতরের অব্যক্ত যন্ত্রণা— যা করেছি খেলার নিয়ম মেনে। তাহলে কেন এমন বিতর্ক?

ক্রিকেট ইতিহাস ঘাঁটলে ওয়ালশের পাশে বসানোর মতো নাম পাওয়া যাবে। পাশাপাশি কপিল, অশ্বিনের পাশে বসানোর মতো নামও মিলবে। তাহলে কেন অশ্বিনের গায়ে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে ‘অখেলোয়াড়োচিত’ লেবেল? সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ মনে করিয়ে দিয়েছেন ট্রেভর চ্যাপেলের কথা। ১৯৮১ সালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের ওয়ানডে-তে শেষ বলে কিউয়িদের জেতার জন্য দরকার ছিল ৬ রান। অজি অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল সহোদর ট্রেভরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ‘আন্ডারআর্ম’ বল করতে। ট্রেভরও ছুটে এসে বলটাকে গড়িয়ে দিয়েছিলেন। জিতে গেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ভর্ৎসনার ঝড় বয়ে যায় দুই চ্যাপেল-ভাইয়ের উদ্দেশ্যে। অশ্বিনের ঘটনায় কেউ কেউ খুঁচিয়ে বের করেছেন ক্রিকেটের সেই কালো অধ্যায়।

কেউ আবার বলছেন ডগলাস জার্ডিনের মস্তিষ্কপ্রসূত বডিলাইন বোলিংয়ের কথা। লারউড-ভোস নামের দুই পেসার অজি ব্যাটসম্যানদের শরীর লক্ষ্য করে বল করে হইহই ফেলে দিয়েছিলেন। সেই সিরিজের কথা কে না জানে! খোদ ব্র্যাডম্যানও ওই বোলিংয়ের বিরুদ্ধে নিজের ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ খেলা খেলতে পারেননি। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে দু’টোই খেলার নিয়ম মেনে ঘটানো হলেও প্রথমটা কুৎসিত অসৌজন্যের পরিচয়। নির্লজ্জের মতো ব্যাটসম্যানকে তুলে মারার সুযোগ না দিতে চেয়ে বল গড়িয়ে দেওয়া। দ্বিতীয়টা একেবারেই ক্ষুরধার ট্যাকটিক্স। ব্র্যাডম্যান ততদিনে ‘অতিমানব’ হয়ে উঠেছেন। তাঁকে সামলাতে এমনই ‘চাল’ চালতে হয়েছিল জার্ডিনকে। সেই সময় তুমুল বিতর্ক হলেও পরে কিন্তু ক্রিকেট গবেষকরা মেনে নিয়েছেন জার্ডিনের সেদিনের উদ্ভাবনকে। যা পরবর্তী সময়ে অনুসরণ করেছে বহু দল।

আসলে জার্ডিন জিততে চেয়েছিলেন। এবং সেটা খেলার নিয়ম মেনে। অশ্বিনও তাই চেয়েছেন। বাটলার ৪৩ বলে ৬৯ করে ফেলেছিলেন। তাঁকে আউট করাটা তাই নিতান্তই দরকার ছিল পঞ্জাবের। সেই কাজটাই করেছিলেন পঞ্জাব অধিনায়ক। বাটলার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে অন্যায় সুবিধা নিলেন, অথচ বিতর্কে জড়ালেন অশ্বিন!

বাটলার ‘পুরোনো পাপী’। তিনি এর আগেও এমন আউট হয়েছেন। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ড-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে ক্রিকেট আইনের ৪১.১৬ নম্বর ধারা ভঙ্গ করে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন বাটলার। বোলার সচিত্র সেনানায়কে থমকে গিয়ে বেল ফেলে দেন।

ওইভাবে আউট হয়েও শিক্ষা নেননি বাটলার। জয়পুরের ম্যাচে ওই ঘটনা ঘটবার আগে ওই ওভারেই বল ডেলিভারি হওয়ার আগেই তিন বার ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে যান তিনি। এরপর অশ্বিন তাঁকে আউট করবেন না তো কী করবেন? তিনি যা করেছেন বেশ করেছেন।

ঘটনার পরে কলকাতা পুলিশ সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা চমৎকার বার্তা দিতে চেয়েছে শহরবাসীকে। সেই ক্যাচলাইন যেন বাটলারের কাণ্ডজ্ঞানহীনতাকেই নতুন করে স্পষ্ট করে তুলেছে— ‘ক্রিজে হোক বা রাস্তায়/ আগে বেরোলে পস্তায়’।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.