বাংলালাইভ রেটিং -

লজ্জা আর গ্লানির ব্যাপারটা নিয়ে ডিটেলে বুঝতে গেলে প্রথমেই সোজা চলুন ‘রাজ়ি’ ছবির সেই সিনটায়, যেটার অভিঘাতে আমি থমকে গেছি প্রায়। দৃশ্যটা এরকম যে, বিয়ে হওয়ার পরে শ্বশুরঘর করতে পাকিস্তানে এসে পৌঁছেছে ভারতের মেয়ে সেহমত (আলিয়া ভাট)আর বরের সঙ্গে প্রথম যেদিন রাত কাটানোর কথা, সেদিন নতমুখে বর ওর শয্যা থেকে সরে গিয়ে চলে যাচ্ছে পাশের একটা ঘরে।

Banglalive

সেখানেই পুরো রাত কাটাচ্ছে ওর বর। দুটো ঘরের মাঝখানে একটা স্লাইডের মতো দরজা, সেটা টেনে ঘর দুটোকে পুরো আলাদা করে দিচ্ছিল সেই ছেলেটি, কিন্তু সেহমত-ই পুরোটা না টেনে একটু ফাঁক রাখতে বলল দরজায়।

কেন প্রথম রাতে বৌয়ের সঙ্গে শুল না পাকিস্তানের ব্রিগেডিয়ার সৈয়দ-এর (শিশির শর্মা) ছোট ছেলে ইকবাল সৈয়দ (ভিকি কৌশল)? প্রথম রাতেই ‘বেড়াল’ মারতে হয় বলে গা টেপাটেপি করে মিষ্টি মিষ্টি যে রকম সব জোকস চালাচালি হয়, সেগুলোর কোন আঁচ কি সেই ’৭১ সালের পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল না নাকি?

ও হ্যাঁ, গল্পটা আজকের নয় কিন্তুপাক্কা ৪৭ বছর আগের গল্প এটা

এবার সেই সময়টা ভেবে দেখুন একবার। ১৯৭১ সাল, মানে পাকিস্তান থেকে যাওয়া খানসেনাদের আক্রমণে তখন চুরমার হয়ে যাচ্ছে ওপার বাংলা (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান)। প্রায় পুরো দেশ জুড়ে কী হারে তখন খুন-ধর্ষণ আর নারকীয় সব অত্যাচার সেই খানসেনারা চালিয়েছিল, সেটা যে কোন নির্ভরযোগ্য ডকুমেন্টস চেক করলেই জানতে পারবেন আপনি।

ঠিক সেই সময় ওই যুদ্ধে জেতার স্ট্র্যাটেজি হিসেবেই ভারতের এই সেহমত নামে মেয়েটার গুপ্তচরবৃত্তি শুরু। লাইফ রিস্ক নিয়ে বধূবেশে সে উঠলো গিয়ে একেবারে খোদ বাঘের ঘরে, মানে পাক ব্রিগেডিয়ারের বাড়ি। সেখান থেকে গোপন সব খবর এদেশে, মানে ভারতে পাচার করবে বলে।

আর সেখানে আপনি কী দেখছেন? ওর বর আর্মি অফিসার তো কী, চরিত্রে ভগবানের মতো প্রায়! প্রথম রাতেই ওর কাছে শুতে আসছে না শুধু এই কারণ দেখিয়ে যে দুজনের মধ্যে তো সম্বন্ধ করে বিয়ে এখনও চেনাশুনো হল না ভাল করে, এভাবে সেক্স করা যায় নাকি কখনও, পাগল?

কী প্রচণ্ড ধাঁধা লাগছিল এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে ভাবতে পারবেন না আপনি। মনে হচ্ছিল, এই ছেলেটাকে যদি পাকিস্তানে স্টেশন্‌ড না করে সোজা পূর্ব পাকিস্তানে জং লড়তে পাঠিয়ে দেওয়া হত, তাহলে ওর কী রকম স্ট্যান্ড হত সেখানে? অন্য খানসেনাদের সঙ্গে ঝাঁকের কই হয়ে মিশে গিয়ে মার্ডার আর রেপ শুরু করতে শুরু করে দিত নাকি চোখের সামনে ওই সিনগুলো দেখে পাগল হয়ে যেত শকে?

শুধু একটা রাতের মামলা নয়, মেঘনা মানে এই ছবির ডিরেক্টর দেখাচ্ছেন যে রাতের পর রাত কেটে যাচ্ছে এভাবে। ইন্ডিয়া থেকে বিয়ে করে আনা নিজের সুন্দরী বৌকে ছুঁয়েও দেখছে না ছেলেটা! ব্যাপারটা কী, ছেলেটা কি ইমপোটেন্ট নাকি ওর আলাদা ভালবাসার কেউ আছে? না, সে সব কিচ্ছু না। স্পষ্ট করে আন্ডারলাইন করে দেওয়া হচ্ছে ছবিতে কারণ। ওই যে লিখেছি আগেই। ভাল করে ভাব-ভালবাসা না হলে সেক্স করা ঠিক হবে না, তাই শুতে যাচ্ছে না বৌয়ের কাছে – ব্যস, এইটুকুই মাত্র।

নিজেকে তখন নিজে এটা বলে বোঝাচ্ছি যে, ছেলেটা হল অসুরকুলে প্রহ্লাদ। ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এর (১৯২৯) সেই পল বমার যেমন ছিল। ঠ্যালায় পড়ে যাঁকে যতই যুদ্ধে যেতে হোক না কেন, মনে মনে আসলে যিনি কবি। বা সেই ‘হ্যাকশ রিজ’ (২০১৬) ছবির ডেসমণ্ড ডস, যাঁর প্রতিজ্ঞাই ছিল যে, যুদ্ধে পাঠাচ্ছ পাঠাও, কিন্তু রণক্ষেত্রে পৌঁছে গিয়েও হাতে কখনও অস্ত্র নেব না আমি।

কিন্তু এই ইকবাল তো সেরকম কেউও নয় রে বাবা। বাবা, দাদা আর এ নিজে – পরিবারের তিনটে লোকই তো খাস আর্মির লোক! এদের বাড়িটাই একটা বড়-সড় আর্মি ঘাঁটি, সেখানে মহা ইম্পরট্যান্ট সব মিটিং-টিটিং হয়। রাতে খাবার টেবিলে ভারতের বারোটা বাজানো হবে কী ভাবে, সেটা নিয়ে প্রায় খোশগল্প চলে। আর ইকবাল নিজে মাঝে মাঝে চোখ বড় বড় করে নিজের দেশভক্তি নিয়ে বৌকে জ্ঞানও তো দ্যায় খুব নিজের দেশকে মাথায় তুলে ধন্য ধন্য করে।

কী ভয়ংকর একটা গ্যাপ লাগছিল এইখানে, লিখে বোঝাতে পারবো না। ভাবছিলাম ‘দেশভক্ত’ ইকবালের সঙ্গে এত ইন্টারঅ্যাকশন হচ্ছে সেহমতের, কিন্তু সেহমত গল্পচ্ছলেও কখনও ওর কাছে খানসেনাদের অত্যাচার নিয়ে ওর কী স্ট্যান্ড সেটা জানতে চাইছে না কেন। বেশ না হয় বুঝলাম, এটা করতে গেলে ইকবাল হয়তো কশাস হয়ে যাবে বৌকে নিয়ে, সে জন্যে এটা করা গেল না আদৌকিন্তু তাহলে অন্য কোন ভাবে গল্পে ওটা দ্যাখালেন না কেন ডিরেক্টর?

পূর্ব পাকিস্তানের কথা বলেই ছবির শুরু, কিন্তু ডিরেক্টর এতদূর নিস্পৃহ যে একটা শব্দ উচ্চারণ করছেন না সে জায়গার হাল-হকিকত নিয়ে। সেখানে কী ভয়ংকর নরক বানিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান, সেটা নিয়ে ছবিতে কোন বাক্য নেই। লড়াইয়ের ফোকাসটা ধরে রাখা হয়েছে শুধু ভারত বনাম পশ্চিম পাকিস্তান বলে।

এটা নিঃশব্দ ধাক্কা নয় একটা, বলুন?

ছবির শুরুতেই একটা ঘোষণা দেখতে পাবেন যে, ছবিটা সত্যি ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। পোস্টারে তো এটাকে সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছে ‘অ্যান ইনক্রেডিবল ট্রু স্টোরি’। কিন্তু সত্যি কি তাই? ছবির শুরুতে ইংরেজিতে লেখা লম্বা ঘোষণা পড়ার সুযোগ পেলে দেখতে পাবেন, ছবিটা তৈরি হয়েছে হরিন্দর এস সিক্কার লেখা উপন্যাস ‘কলিং সেহমত’ অবলম্বনে।

এখন তো মনে এটা প্রশ্ন আসবে যে, কী ভাবে লেখা হল ‘কলিং সেহমত’ আর হরিন্দর এস সিক্কা নামে এই ভদ্রলোকই বা কে?

সংক্ষেপে বলছি তাহলে শুনুন। হরিন্দর হলেন পিরামল গ্রুপের স্ট্র্যাটেজিক বিজনেসের ডিরেক্টর। দিল্লি ইউনিভার্সিটির স্নাতক, ১৯৮১ থেকে সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছিলেন ভারতীয় নৌসেনায়। বছর বারো কাজের পর ১৯৯৩ সালে লেফটেন্যান্ট কম্যান্ডার থাকা অবস্থায় প্রি-ম্যাচিওর অবসর নিয়ে নেন সেনাবাহিনী থেকে। হালে ‘নানক শাহ ফকির’ নামে একটা ছবিও প্রোডিউস করেছেন তিনি

১৯৯৯ নাগাদ কার্গিল যুদ্ধ নিয়ে লেখালেখি করার জন্যে কার্গিল পৌঁছন ইনি। ভারতীয় সেনার ইন্টেলিজেন্সের হাল-হকিকত দেখে সেখানে যখন তিতিবিরক্ত প্রায় তিনি, তখন এক সেনা অফিসার তাঁকে শোনায় তাঁর মায়ের গল্প। এক কাশ্মীরি মহিলা, দেশসেবার তাগিদে গুপ্তচরের কাজ করতে দেশ ছেড়ে বিদেশে মানে পাকিস্তানে ঘর-সংসার শুরু করেছিলেন যিনি।

শুনে চমকে ওঠেন হরিন্দর। এ যে রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো স্টোরি!

এরপর বহু কষ্টে সেই মহিলার কাছে পৌঁছন তিনিতখনও বেঁচে আছেন সেই মহিলা, পঞ্জাবের কোন এক কোণে খুব সাদামাটা ভাবে বাসকার্যত এক গোপনচারিণী তিনি।

নিজের গোপন জীবনের কথা কবে আর কোন স্পাই এসে খুলে বলে দিতে চায়? বলতে চান নি তিনিও। অনেক অনুরোধের পর অল্প যেটুকু জানা গেছিল, সেটুকু গল্পের আকারে সাজিয়ে এই নভেল লিখতে হরিন্দরের সময় লেগে গেল আট-আটটা বছর প্রায়! আর এত কিছুর পরেও সবচেয়ে মোক্ষম দুটো জিনিষ কিন্তু অজানা রয়ে গেল সেই হরিন্দরের কাছে। এক, যে গোপন তথ্য মহিলা পাকিস্তান থেকে পাচার করতেন ভারতে, পাকিস্তানের সেই সিক্রেটগুলো পেতেন কী করে তিনি? আর দুই, মহিলা ছিলেন কাশ্মীরের এক ধনী ব্যবসায়ীর কন্যা। মেয়ের জীবন বাজি রেখে স্পাইগিরি করার জন্যে মেয়েকে শত্রুদেশে বৌ বানিয়ে পাঠাতে হঠাৎ করে ‘রাজ়ি’ হলেন কেন সেই মেয়েটির ধনী ব্যবসায়ী বাবা। (তথ্যসূত্র – ৩ মে, ২০০৮, ‘দ্য হিন্দু’ সংবাদপত্র)

হরিন্দরের লেখা উপন্যাসে কোথাও কিন্তু প্রকাশ করা হয় নি সেই মহিলার আসল পরিচয়। হ্যাঁ, ‘কলিং সেহমত’ বইটায় ‘সেহমত’ বলে যে নাম-টাম রয়েছে, সবই বানিয়ে বানিয়ে লেখা।

এখন এই ২০১৮ সালে সেই মহিলা আর ইহলোকেই নেই।

বুঝতেই পারছেন, উপন্যাসের শুধু নামগুলো না, আরও বহু কথা কল্পনা দিয়ে মেগামিক্স করে লেখামেজর যে দুটো জিনিষ নিয়ে চির-রহস্য রয়ে গিয়েছে, সে তো আগেই লিখেছি আমি। এভাবে একদফা বানিয়ে বানিয়ে লেখার পর, আবার সেই লেখা থেকে যখন সিনেমা তৈরি হল, তখন আবার ড্রামাটাইজেশনের স্বার্থে সেখানে নতুন করে বানানো

দু’ দফায় এইভাবে গল্প বানানোর পর সত্যি কথার আর কতটুকু অবশিষ্ট আছে বলুন এই সিনেমায়? যে এটা হবে ‘অ্যান ইনক্রেডিবল ট্রু স্টোরি’?

আজকে দাঁড়িয়ে এই সত্যিটা তো আর জানা যাবে না যে, সত্যি ওঁর বর মানুষটি ওরকম বাড়াবাড়ি রকম ভদ্র ছিল কিনা যে, বিয়ের পরেও ছুঁতে চাইত না তাঁকেপরিবারের বাকিদের কথায় বধূ কখনও আঘাত পেলে আলাদা করে লুকিয়ে এসে ক্ষমা চেয়ে যেত দ্রুত। যখন প্রথম ছুঁয়েছে, সেও একেবারে কবিতা-কবিতা ভাবেপায়ের গোছে গয়না পরিয়ে চলেই যাচ্ছিল, বৌ আর থাকতে না পেরে ডাকল বলে সদ্য পিতৃহারা বৌয়ের ডাকে সাড়া দিয়ে আদর-টাদর শুরু

অসাধারণ সুন্দর মেকিং হয়েছে ছবির, কী লুক আর ফিল, দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় যেন। কিন্তু আমার গ্লানি আর লজ্জা আসছিল এই কারণে যে, ছবির ভেতর ক্যারেকটারাইজেশনে কীরকম বড়-সড় সব ফাঁক।

আর এরকম ফাঁক দেখতে হচ্ছে কার ছবিতে বলুন? মেঘনা গুলজারের মতো ডিরেক্টর, এর আগে ‘তলওয়ার’-এর (২০১৫) মতো ছবি করেছেন যিনি। যাঁর বাবা গুলজারের মতো সংবেদনশীল স্রষ্টা আর যাঁর মা কিনা এই বাংলার ঘরের মেয়ে রাখী।

এই বাংলায় পাক সেনাদের কীর্তিকলাপ চেপে গিয়ে কাহিনির কেন্দ্রে থাকা পাক সেনাকে লাজুক রোমান্টিক আর দেশভক্ত বলে দেখিয়ে দিলেন তিনি!

সত্যি সত্যি কাশ্মীরের সেই অসমসাহসিনী সেই মহিলা খবরগুলো পেতেন কী করে, সেটা তো জানে না এখনও কেউ। তাই ছবিতে খবর জোগাড় করার যে প্রসেসটা দ্যাখান হল, সেটা একেবারে বাঁধা গতে ছাপাযে ঘরটায় সেনাদের বড় কর্তার মিটিং চলে, লুকিয়ে সেই ঘরে ঢুকে অডিও টুল সেট করে দিয়ে এল ছবির নায়িকা মেয়েটিতারপর নিজের ঘরে বসে লুকিয়ে লুকিয়ে শুনতে লাগল সবার আলোচনা।

সিনেমায় এসব দৃশ্য এত টানটান যে মনের মধ্যে তখন কিন্তু প্রশ্ন হবে না কোন। কিন্তু পরে ভাবতে গেলে দেখবেন যে, বাড়ি তো লোকজন আর চাকর-বাকরে ভরাএদের সবার চোখ এড়িয়ে বাড়ির প্রধান বৈঠকখানায় সবে বিয়ে হয়ে আসা বৌ লম্বা-তার-লাগানো মেশিন ফিট করছে কী করে ভাই? যদি বা সম্ভব এটা হয়ও, ঘর পরিষ্কার করতে গেলেই তো এর পুরোটা ধরা পড়ে যাওয়ার কথা।

তারপর ধরুন, ইন্টারভ্যাল হওয়ার ঠিক আগে বিশ্বাসী চাকর আবদুলকে মেরে ফ্যালার সেই সিন। আবদুলের চোখে ধরা পড়ে গেছে সেহমতের কাণ্ডকারখানা, উপায় না দেখে সেহমত এবার খুন করছে ওকে। এখন এই খুনটা কী করে দ্যাখান হল, জানেন? ঢাউস একটা মিলিটারি ট্রাকজাতীয় গাড়ি ড্রাইভ করে আবদুলের গায়ের ওপর চালিয়ে দিচ্ছে ও এবার একটা কথা বলুন আমায়, সেহমত যে এরকম সব গাড়ি চালাতে পারে, আগে কখনও শুনেছেন সেই কথা?

স্পাই হিসেবে তৈরি হওয়ার জন্যে ওকে গুলি ছোঁড়ার ট্রেনিং নিতে দেখেছি, দেখেছি মারপিট করে শত্রুপক্ষকে কাবু করার শিক্ষা নিচ্ছে ওকিন্তু ট্রাক চালানো শিখল কবে, স্বীকার করছি, মনে পড়ছে না সেটা।

আবদুল নামে এই ভৃত্যটিকে মারা হচ্ছে কখন, সেটা নিয়েও আমার মনে বিশাল একটা ধাঁধাপ্রথমে তো সিনটা দেখে মনে হচ্ছিল, বোধহয় এটা নিশুত রাতের সিন। বাড়ির মধ্যে সেহমত আর আবদুল ছাড়া জনপ্রাণী নেই, রাস্তাঘাটও প্রায় শুনশান ফাঁকা। মজা হল, পরের দিকের একটা সিনে, যখন এই মৃত্যু নিয়ে ইনটেরোগেশন শুরু হয়ে গেছে, তখন এই সময়টাকে বলা হচ্ছে ‘দের শাম’ বলে। আপনি এখান থেকে আরও শুনবেন যে বাড়ির সমস্ত চাকর-বাকর সবাই নাকি হাজির ছিল তখন, শুধু সবাই নানারকম কাজে এমনভাবে ব্যস্ত ছিল যে, আবদুলকে আর চোখে পড়ে নি কারও।

এই তথ্যগুলো শোনার পর ফের একবার আবদুলের মৃত্যু সিকোয়েন্স মিলিয়ে দেখুন, দেখবেন মুখে বলা ওই কথাগুলোর সঙ্গে সামনে দ্যাখা ঘটনাখানার সময়টাকে ম্যাচ করানো মুশকিল হবে খুব

আর একটা মজার জিনিষ বলিকাকতালীয় ব্যাপার কিনা জানি না ঠিক, কিন্তু হালের বেশ কয়েকটা ছবিতে দেখছি সেন্ট্রাল ক্যারেক্টারের স্ট্রেস বোঝাতে টপ করে তাঁকে স্নানের ঘরে ঢুকিয়ে শাওয়ারের তলায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন ডিরেক্টররা। এতে সত্যি সত্যি সেই ক্যারেক্টারের স্ট্রেস কমছে কিনা, বা রিয়্যালিটিতে সত্যি সত্যি স্নানের ঘরে ঢুকে ওইভাবে কেউ স্ট্রেস কমায় কিনা আইডিয়া নেই ভাই। তবে একটা ব্যাপার সিওর যে, জলধারার ঠিক তলায় একটা আস্ত মানুষ ওইভাবে খাড়া করিয়ে দেওয়ায় ছবির ওই সিনটা দেখতে ভাল হয়ে যাচ্ছে খুব

খেয়াল করে দেখুন, এই সেদিন অঞ্জন দত্তের ‘আমি আসবো ফিরে’তে স্বয়ং অঞ্জনকে দেখেছেন ওইভাবে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াতে। এরপর এল ‘দৃষ্টিকোণ’, সেখানে শাওয়ারের তলায় গিয়ে দাঁড়ালেন বুম্বাদা। আর এই সিনেমায় একদম সেম সিকোয়েন্স রিপিট হয়ে গেল আলিয়া ভাটকে নিয়ে!

দেখছি আর ভাবছি যে সব ডিরেক্টরের সিন-ভাবনা এখন তাহলে একই রকম কিনা।

ইয়ার্কি নয় কিন্তু। সত্যি সত্যি এ দেশের ছবিতে হিরো-হিরোইনকে বাথরুমে গিয়ে দুঃখ-যাপন করতে দ্যাখানোর শুরু অ্যাকচুয়ালি কবে, সেটা কিন্তু আলাদা একটা গবেষণার টপিকযতদূর মনে পড়ছে, বছর উনিশ আগে ঋতুপর্ণের ‘অসুখ’ (১৯৯৯) ছবিতে দেবশ্রী রায়কে নিয়ে একই ট্রিটমেন্ট ছিল! এখন দ্যাখার এটাই, তিনিই প্রথম, না তাঁরও আগে আরও অন্য কেউ আছে।

এই যে এত কথা লিখছি টানা, সেটা কিন্তু নিন্দে করছি বলে ভেবে বসবেন না প্লিজ। ধরে নিন এগুলো হল একরকমের আক্ষেপের মতোযে, আরেকটু খেয়াল রাখলে কোন লেভেলের মাস্টারপিস হতে পারতো এটা। হল না, সেটা ওই এক চুল কিছু এদিক-ওদিক দোষ হয়ে গেল বলে তাই।

যেমন ধরুন, সিনেমার শেষদিকে আপনি দেখতে পাবেন পাকিস্তানের গোয়েন্দা এজেন্সির হাতে টপাটপ করে ধরা পড়ে যাচ্ছে সাদেক আর ইমতিয়াজের মতো লোকমানে সেই রিকশাওয়ালা আর ফুলের দোকানদার, চুপিচুপি যারা এতদিন ধরে হেল্প করত সেহমতকে। কিন্তু ঠিক কোন সূত্র ধরে এদের ট্রেস করা হল, সেটা যে একদম বুঝতে পারি নি ভায়া! টানটান থ্রিলার ছবিতে সেই ব্যাখ্যা দেখার কোন ইচ্ছে হবে না, বলুন?

আর যদি এদেরকেই ধরতে পারা গেল, তাহলে সেহমত অবধি তদন্তের জাল পৌঁছতে এরপরেও অত সময় লাগল কেন?

তথ্য ঘেঁটে দেখতে পাচ্ছি, বাস্তবের সেই গুপ্তচর মহিলা কাজ করেছিলেন ইয়াহিয়া খানের নাতির শিক্ষিকা হিসেবে। কাট টু আসুন এখানে। এই ছবিতে সেহমত দেখছি নিজেকে বেশ লাগিয়ে দিয়েছে সেনাপ্রধান বেগ-এর নাতিকে গান শেখানোর কাজেকিন্তু গান শেখানোর ছলে সেনাপ্রধানের বাড়িতে ঢোকা যতটা সহজ, সেনাপ্রধানের ফাইল ঘেঁটে ঘাজ়ি অ্যাটাকের প্ল্যান ধরতে পেরে যাওয়া কি ঠিক অতটা সহজ, বলুন?

একটা সময় মনে হচ্ছিল, সিনেমায় দ্রুত সব কিছু দ্যাখাতে হবে বলে পুরো ব্যাপারটার অতিসরলীকরণ করা হয়ে গেল না তো?

মনে হচ্ছিল, ছবিটা দাঁড়িয়ে আছে অদ্ভুত এক জোনে। না এটা সলমন খানের ‘এক থা টাইগার’ (২০১২) যে হিরো-হিরোইন একাই দাঁড়িয়ে পঞ্চাশজনকে পাট পাট করে শুইয়ে দেবে সোজাআবার না এটা স্পিলবার্গের ‘ব্রিজ অফ স্পাইজ’ (২০১৫) যে, গুপ্তচর জীবনের চোরাবাঁক আর তাকে নিয়ে দরকষাকষিগুলো ন্যাংটোভাবে উঠে আসবে স্ক্রিনে

এই দুইয়ের মাঝবরাবর এটা এমন কোথাও দাঁড়িয়ে, যেখানে হাজার বিপদে ফেঁসে গিয়েও শেষ অবধি গল্পের হিরো ঠিক প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরতে পারছে দেশে। কী ভাবে, কখন, কোথায় এসব পসিবল হল, এসব প্রশ্ন-টশ্নের সেখানে কোন গুরুত্ব নেই, স্যর

ছবির একদম লাস্ট দিকে আসুন এবারসেহমত যে গুপ্তচর, সেটা তখন ধরা পড়ে গেছে পাকিস্তানি ‘এজেন্সি’টির কাছে। কিন্তু গ্রেনেড বিস্ফোরণে মৃত বোরখা ঢাকা মহিলাটি যে সেহমত নয়, সেটা ধরতে কি এরপর তাদের আর খুব বেশি সময় লাগার কথা?

ভেবে দেখুন, তারপর তারা সেহমতকে খুঁজতে চাইল না কেন কেউ? উলটে অচেনা দেশে, অবলীলায় রাস্তা চিনে সেহমত নিজেই কিনা খুঁজে পেয়ে গেল তাঁর নিজের দলের লোকজনদের ঘর? এরপর আবার সবাই মিলে বর্ডার পেরিয়ে এদেশে আসার সিন। কিন্তু দুই দেশে যখন ওই লেভেলের যুদ্ধ হচ্ছে, তখনও কি সীমান্তটা সিল করে নি কেউ? পাকিস্তান পেরিয়ে ভারত অবধি পৌঁছে যাওয়া এক গুপ্তচরের পক্ষে বুঝি তখনও অতটা সোজা?

আর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে মল-কালচার শুরু হয়ে গেছিল কিনা, সেটাও জানি না আমি। তবে এখানে দিব্যি শুনতে পেয়েছি, সেহমতের সঙ্গে একজনের মিটিং পয়েন্ট ঠিক করা হচ্ছে সেই পাক-শহরের ‘ক্রাউন প্লাজা মল’! 

আবার বলছি, এরকম সব খটকাগুলো যতটা সত্যি, এটাও ততটা সত্যি যে, যত অবিশ্বাস্যই লাগুক না কেন, ছবিটা দ্যাখার সময় মনে কিন্তু এই প্রশ্নগুলো আসতে চাইবে না আদৌ। আসবে কী করে, আপনাকে যে নেশার ঘোরে তখন পুরো ডুবিয়ে ছেড়েছে এটা

দুই পেরিয়ে তিন সপ্তাহে পড়লো এখন ছবি। উইক ডেজে মর্নিং শো-তে তবু তো দিব্যি হৈ-হৈ করা ভিড়।

একেবারে কিছু না থাকলে পরে এতদিন ধরে লোকেরা ছবিটা এমনি দেখছে নাকি!      

আরও পড়ুন:  ‘ভোগিনী’ থেকে যোগিনী’! রিয়া-র নয়া রূপান্তর?

NO COMMENTS