কাজের মানুষ – কাছের মানুষ : ‘দেশভক্ত’ রবীন্দ্রনাথ!

“আজকাল আর আলখাল্লা পরি না,” সহাস্য উক্তি গুরুদেবের, “ওসব আর পরবার সাহস হয় না।” সশ্রদ্ধ চিত্তে জিজ্ঞেস করলুম, “কেন এরকমটা বলছেন ?” গুরুদেব সস্নেহনয়নে তাকালেন, “যদি ভেবে নেয় যে আমি ভোট চাইতে এসেছি … নাটক তো আর কম দেখলুম না।” রঙমেলান্তি খেলাতে স্বয়ং বিবেকানন্দকে নিয়েও একেকটা দল – দলের নেতারা সবাই, বিস্তর টানাটানি জুড়ে দিয়েছেন। কাজেই, রঙে বা পোশাকে – দাড়িতে বা টিকিতে সচেতন হতে চাওয়াটাই ভবিতব্য। প্রেতলোকে গুরুদেবেরও নিস্তার মিলছে না। এ বড় সুখের সময় নয়।

বোলপুরে হাঁটতে হাঁটতে যদি কখনও দেখেন, লম্বাদাড়ি রবীন্দ্রনাথও ভোটের দেওয়াল লিখছেন – অবাক হবেন না। ভূত বলেও ঠাওরাবেন না। জানবেন, গরমে বা জলপিপাসায় এমনটা হতেই পারে। মানুষ মাত্রেরই হ্যালুসিনেশন হয়। ভোটের বাজারে যদি, নায়ক বা নায়িকারাও ট্রাক্টর চালাতে বা খড় কাটতে পারেন – অথবা চন্দ্রিলের ভাষায়, পথচলতি মানুষের ঠোঙা থেকে টুক করে পেঁয়াজী বা ফুলুরিটা ঝেপে দিতে পারেন (কথ্য ভাষার ব্যবহারকে মার্জনা করবেন), এমতাবস্থায় রবীন্দ্রনাথই বা দেওয়াল লিখবেন না কেন ? হাজার হোক, তাঁরও তো এটা গণতান্ত্রিক অধিকার, বৈ তো নয়।

রবীন্দ্রনাথ সাচ্চা অর্থে দেশপ্রেমিক ছিলেন কি ছিলেন না, সেই নিয়েও একেকজন তর্ক জুড়তে পছন্দ করেন। এ বিষয়ে তাঁরা অনেকে আবার ‘ন্যাশনালিজম’ নাম্নী গুরুদেবের বইটিকে অথবা ‘জনগণমন’ গানটির বাকি স্তবকগুলির বক্তব্যকে কাটতে বা ছিঁড়তে উৎসাহিত হন। লক্ষণীয় যে মূল ‘ন্যাশনালিজম’ বইটিতে সংকলিত রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতাগুলির সবকটিই ইংরেজীতে রচিত – এবং সবকটিই বিদেশের মাটিতে প্রদত্ত। কেউ যদি বলেন যে – এই বক্তৃতাগুলির উপরে ভিত্তি করেই, রবীন্দ্রনাথের স্বদেশপ্রেমের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা চলে – তাহলে তো বলতেই হয়, যে রবীন্দ্রনাথ বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েও দেশের সম্পর্কে নিন্দামূলক অথবা সমালোচনামূলক বক্তব্য রেখেছেন। একটু বিচার করেই দেখা যাক নাহয়। তবে হ্যাঁ, গুরুদেব যে ঠিক আজকের সংজ্ঞানুযায়ী “দেশভক্ত” ছিলেন না – এ বলাই যায়।

‘ন্যাশনালিজম’ বইটির মূল সংস্করণের প্রথম বক্তৃতাটির কথাই কেবল উল্লেখ করতে চাইবো – যেখানে গুরুদেব বলেছেন (স্বকৃত অনুবাদে তুলে ধরলাম), “অ্যামেরিকানেরা আমাদের দেশের জাতিভেদকে নিয়ে প্রশ্ন করে যখন, তখন তাদেরকে মনে করিয়ে দিই – যে তারা তাদের দেশে, আফ্রিকান নিগ্রোদের সঙ্গে কেমনতরো ব্যবহার করে এসেছে তা কারো অজানা নয়, এবং এখনও সেভাবেই তারা তাদের বদভ্যাসকে জারি রেখে চলেছে …” এরফলে রবীন্দ্রনাথকে পরবর্তীতে যথেষ্টই আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিলো। কারণ, এধরণের বক্তৃতাগুলি দেবার পিছনে তাঁর মূল উদ্দেশ্যই ছিলো বিশ্বভারতীর প্রয়োজনে অর্থসংগ্রহ। স্বদেশের বিরুদ্ধে বিদেশী কবির এহেন সমালোচনামূলক বক্তব্য আমেরিকার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি – জাপানের মানুষও কবিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো। সেকারণেই, আগমনের দিনে জাহাজঘাটায় মানুষের ঢল নামলেও – কবি যেদিন জাপান ছেড়ে যাবেন, সেদিন কবি যাঁর বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন – তিনি ভিন্ন আর একজনও কবিকে জাহাজঘাটায় বিদায় দিতে আসেননি। এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছিলো ‘জাতীয়তাবাদী’ (নাকি ‘জাতীয়তাবাদ-বিরোধী’ ?) রবীন্দ্রনাথের। ১৯১৭সালের ঘটনা।

নিন্দুকেরা আবার ‘ঘরে-বাইরে’র প্রসঙ্গকে টেনে আনতে চাইবেন। স্পষ্টতই অসহযোগ ও বয়কট আন্দোলন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে গান্ধীর মত মেলেনি। রবীন্দ্রনাথের কাছে গড়বার মন্ত্রটিই ছিলো পূজ্য – গড়বার মন্ত্রকে না শিখেই, ভাঙবার মন্ত্রে মেতে উঠতে তিনি রাজি ছিলেন না। কাজেই সন্দীপ বা নিখিলেশের মতো দুটি চরিত্রের সৃষ্টি। অথবা ‘গোরা’তে তাঁর সরাসরি উক্তি, “দেশকে ভালো করে না জানলে পরে তাকে ভালোবাসা যায় না, আর দেশকে ভালো না বাসলে পরে ভালো করতে চাইলেও, তার ভালো করা যায় না”। এ উক্তি আর এখনকার নেতাদেরকে বোঝাবে কে ? সকলেই যে সবজান্তা মধুসূদন হয়ে বসে আছেন।

বুর্জোয়া কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন প্রথম শিলাইদহে জমিদারি পরিদর্শনে যান – সেসময়ে হঠাৎ করেই তিনি তাঁর কুঠিবাড়িতে পূর্বপুরুষদের স্মৃতিধন্য কাঠের বিশাল সিংহাসন মার্কা চেয়ারটিকে ছেড়ে, মাটিতে বসে প্রজা-কৃষকদের কথা শোনেন। নিন্দুকেরা তখন থাকলে, নিশ্চয় করে বলতেন, যে এসবই ছিলো আসলে ‘আসন্ন পঞ্চায়েত নির্বাচনকে মনে রেখে কবির জমিদারসুলভ-গিমিক’। কিন্তু দুর্ভাগ্য এটিই যে সেই হতভাগা বুর্জোয়া কবিটির স্বভাব বদলাতে পারেনি। এরপরেও যতবার তিনি মহাল পরিদর্শনে গিয়েছেন, ততবারই তিনি মানুষের কাছে এসে, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনেছেন। টিভিতে এসব দেখাতো না তখন। নেতাদের কাছ থেকে টাকা খাওয়া চ্যানেল ছিলো সব। কি বলছেন ? টিভিই ছিলো না তখন ? বালাই ষাট, তাহলেই বুঝুন কতটুকু উন্নয়ন!

১৯৩৭ বা ওইরকম সময়ে, রবিঠাকুর যখন তাঁর জীবদ্দশাতে শেষবারের মতো শিলাইদহে যান – গ্রামকে গ্রাম উজিয়ে মানুষ এসেছিলো তাদের প্রিয় ঠাকুরবাবুকে দেখতে। ফেরবার সময়ে রেলে বসে, সফরসঙ্গী অন্নদাশংকর রায়কে কবি দুঃখের সঙ্গে বলেছিলেন, “সারা পৃথিবীর মানুষ আমায় দেখলে – কেবল এরাই সেভাবে দেখলে না”। গুরুদেবের চোখে জল ছিলো কি সেদিন?

গুরুদেব নিজেই বলেছেন, শিলাইদহ-পতিসর-বাংলাদেশ – আত্রেয়ী-পদ্মা-মেঘনা-বা-বাড়ল নদীতে নৌকাবিহার করতে করতেই তিনি বাংলাকে চিনেছেন, বাংলার নিদারুণ দারিদ্রকে চিনেছেন – বাংলার সোনার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করেছেন। কতখানি সামাজিক ভাবে দূরদর্শী হলে পরে একজন গীতিকার তাঁর নোবেল পুরস্কারের টাকায় সমবায় ব্যাঙ্ক তৈরীর কথা ভাবেন ? সমবায়নীতি নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ? অথবা পল্লী-পুর্নগঠনের কাজে হাত দিয়েই ম্যালেরিয়া দূরীকরণে সচেষ্ট হন ? এইগুলিই ছিলো তাঁর ‘দেশভক্তি’র নিদর্শন। তাঁকে পতাকাও বইতে হয়নি, সভাতেও যেতে হয়নি – দেওয়াল লিখে ভোটেও দাঁড়াতে হয়নি – তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই কাজের মানুষ, কাছের মানুষ – রবীন্দ্রনাথ।

“তুমি তো আমায় নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেবে হে,” ফের সহাস্য গুরুদেব। “ভালোই তো,” আমি বললুম, “ভাবুন তো – বেশ হুডখোলা গাড়িতে চেপে বোলপুরের রাস্তায় হাত নাড়তে নাড়তে চলেছেন …” গুরুদেব হেসে ফেলেন। “এই বেশ ভালো আছি। কবিতা টবিতা লিখবো – তা নয়, আবার এই গরমে উত্তরীয় সামলিয়ে প্রচার করা! ওসব আমার জন্য নয় …”

আমি কি স্বপ্ন দেখছিলাম? তাই হবে বোধহয়। ২৫শে বৈশাখের সকালে যখন দিকে দিকে গগনবিদারী ‘এসো হে বৈশাখ’ আর ‘হে নূতন’-এর জগঝম্প বাজতে বাজতে চলেছে – আর ভোটপ্রার্থীরা গুরুদেবের ছবিওলা ব্যাজ আর ক্যালেন্ডার বিলোতে বিলোতে চলেছেন – এসময়ে আমার পেট গরম হবে না – তো আর হবে কখন? গুরুদেব আমাকে মাপ করবেন, আর তাঁকে নিয়ে টানাটানি করবো না …

তবু কোথায় যেন ফের, সেই গুরুদেবই গুনগুনিয়ে ওঠেন, “যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়বো না …” এই গানটিকেই জোর ভল্যুমে মোবাইলে চালিয়ে দিই। লাউডস্পীকার – মিটিং-মিছিল-সন্ত্রাস সমস্ত কিছুকে অবজ্ঞা করেই … আজ ১৪২৬-এর ২৫শে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন।

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়
জন্ম – ১৯৯২, কলকাতায়। ২০১৪-এ পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রনিক্স এঞ্জিনিয়রিং-এ স্নাতক, পরে আইআইইএসটি, শিবপুর থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ ২০১৬-এ। বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক। নেশা বলতে বই আর বেড়ানো। শখের তাগিদে নানারকম বিষয়ে লিখে থাকেন। পছন্দ বলতে পরিবেশ আর মানুষের গল্প বলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here