রবিঠাকুরের এঞ্জিনিয়ারিং

rabindranath tagore engineering

চেনা কবি — অচেনা রবি ( ৯ )

শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনা করতে যাবার আগে রবীন্দ্রনাথ তিনবার শিলাইদহে গিয়েছিলেন। ১৮৭৫ সালের ৬ ডিসেম্বর, অর্থাৎ চোদ্দ বছর বয়সে দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে বোটে করে শিলাইদহ যান এবং ২২ ডিসেম্বর ফিরে আসেন কলকাতায়। এরপর মহর্ষি জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে জমিদারি দেখাশোনার ভার দিয়ে হিমালয় চলে যান। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন শিলাইদহে, তখন তিনি ভাই রবিকে শিলাইদহে ডেকে নিলেন। ‘ছেলেবেলা’য় এই প্রসঙ্গে কবি লিখেছিলেন,
“…তিনি ( জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ) নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন — ঘর থেকে এই বাইরে চলাচল এ একটা চলতি ক্লাসের মতো। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন, আমার ছিল আকাশে বাতাসে চরে-বেড়ানো মন, সেখান থেকে আমি খোরাক পাই আপনা হতেই।…”
১৮৭৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাই কিশোর রবি জ্যোতিদাদার ডাকে সাড়া দিয়ে শিলাইদহে পৌঁছে গেলেন। সেদিনের শিলাইদহের স্মৃতি লিখেছিলেন এমন করে,
“…পুরোনো নীলকুঠি তখনো খাড়া ছিল। পদ্মা ছিল দূরে। নীচের তলায় কাছারি, উপরের তলায় আমাদের থাকবার জায়গা। সামনে খুব মস্ত একটা ছাদ, ছাদের বাইরে বড়ো বড়ো ঝাউগাছ, এরা একদিন নীলকর সাহেবের ব্যবসার সঙ্গে বেড়ে উঠেছিল।…”
নির্জনতা প্রিয় কবির পদ্মাপারের এই উন্মুক্ত প্রকৃতি যেন তাঁকে আকুল করে তুলেছিল। একের পর এক কবিতা রচিত হল।
“…একলা থাকার মন নিয়ে আছি। ছোটো একটি কোণের ঘর, যত বড়ো ঢালা ছাদ তত বড়ো ফলাও আমার ছুটি। অজানা ভিন্ দেশের ছুটি, পুরোনো দিঘির কালো জলের মতো তার থই পাওয়া যায় না। বউ-কথা-কও ডাকছে তো ডাকছেই, উড়ো ভাবনা ভাবছি তা ভাবছিই। এই সঙ্গে সঙ্গে আমার খাতা ভরে উঠতে আরম্ভ করেছে পদ্যে।…”
সেই সময়ের চিত্র ‘জন্মদিন’ কবিতায় লিখেছিলেন,

“পুরাতন নীলকুঠি দোতলার ‘পর
ছিল মোর ঘর।
সামনে উধাও ছাত —
দিন আর রাত
আলো আর অন্ধকারে
সাথীহীন বালকের ভাবনারে
এলোমেলো জাগাইয়া যেত,
অর্থশূন্য প্রাণ তারা পেত…”

কবিতার খাতা তো নিত্যনতুন কবিতার ছন্দে ভরে উঠছে, এদিকে এই নির্জনবাসকালে রবীন্দ্রনাথের হঠাৎ একদিন এক অদ্ভুত খেয়াল চাপল মাথায়। তিনি সেই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন,
“…জীবনে..একবারই এঞ্জিনিয়ারিং করতে নেবেছিলুম।…তার পর থেকে যন্ত্রে হাত লাগানো আমার বন্ধ, এমন-কি, সেতারে এসরাজেও তার চড়াই নি।…”
কবির জীবনে এই এঞ্জিনিয়ারিং করার ইতিহাসটি বড়ো মজার।
সেই সময়ে শিলাইদহে থাকাকালীন হঠাৎই এই সখটি হয়েছিল। এই সময়ে কুঠিবাড়িতে মালিরা রোজ এসে ফুলদানিতে ফুল সাজাত।এই ফুল দেখে রবীন্দ্রনাথের সখ হল ফুলের রঙিন রস দিয়ে কবিতা লিখলে কেমন হয়। নির্ভয়ে জ্যোতিদাদাকে বললেন তাঁর এই বিচিত্র সখের কথা। জ্যোতিদাদা বরাবরই ছোট ভাইটিকে নানাভাবে প্রশ্রয় দিতেন, কবি সে কথা খুব ফলাও করে স্বীকার করেছিলেন ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায়,
“….তিনি আমাকে খুব-একটা বড়ো রকমের স্বাধীনতা দিয়েছিলেন; তাঁহার সংস্রবে আমার ভিতরকার সংকোচ ঘুচিয়া গিয়াছিল। এইরূপ স্বাধীনতা আমাকে আর -কেহ দিতে সাহস করিতে পারিত না; সেজন্য হয়তো কেহ কেহ তাঁহাকে নিন্দাও করিয়াছে। কিন্তু প্রখর গ্রীষ্মের পর বর্ষার যেমন প্রয়োজন, আমার পক্ষে আশৈশব বাধানিষেধের পরে এই স্বাধীনতা তেমনি অত্যাবশ্যক ছিল।…শাসনের দ্বারা, পীড়নের দ্বারা, কানমলা এবং কানে মন্ত্র দেওয়ার দ্বারা, আমাকে যাহা-কিছু দেওয়া হইয়াছে তাহা আমি কিছুই গ্রহণ করি নাই।…জ্যোতিদাদাই সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে সমস্ত ভালোমন্দর মধ্য দিয়া আমাকে আমার আত্মোপলব্ধির ক্ষেত্রে ছাড়িয়া দিয়াছেন, এবং তখন হইতেই আমার আপন শক্তি নিজের কাঁটা ও নিজের ফুল বিকাশ করিবার জন্য প্রস্তুত হইতে পারিয়াছে।…”
এক্ষেত্রেও সেদিন জ্যোতিদাদার প্রশ্রয় বাদ যায়নি। তবে ভাইয়ের এই সখের কথা শুনে মনে মনে হাসলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ছুতোর ডেকে পাঠিয়েছিলেন কুঠিবাড়ির দালানে। ছুতোর কসরৎ করে একটা ফুল পেষার কল তৈরি করে দিল জমিদার-তনয়ের জন্য। কল তো তৈরি হল ফুলের রস নিকোনোর। কিন্তু তাতে কি কাজ সারা হবে? কাঠের বাটিতে ফুল ভরা হল। তারপর সেই ভরা ফুলের উপর দড়ি বাঁধা নোড়া যতই পিষে রস বের করুক না কেন, তা শেষে কাদা হয়ে যায়।
ফলে কিশোর রবীন্দ্রনাথ সেদিন চরম হতাশ হয়েছিলেন। কেননা সেই সখ তাঁর আর পূরণ হয়নি। জীবনে এই একবারটিই তিনি এঞ্জিনিয়ারিং করতে আসরে নেমেছিলেন।এবং চূড়ান্ত ব্যর্থ হন। কে জানে হয়ত এই চরম ব্যর্থতাই বাকি জীবনে তাঁকে যেকোনো যন্ত্রের থেকেই দূরে সরিয়ে রেখেছিল ! সারাজীবন তিনি কত যে গান গেয়েছেন, লিখেছেন, তাতে সুর দিয়েছেন অথচ তিনি যে কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানতেন এমন কোনো জোরালো তথ্য কিন্তু তাঁর জীবন ইতিহাসে পাওয়া যায় না।
‘রবীন্দ্রস্মৃতি’ গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে ইন্দিরা দেবী একবার লিখেছিলেন,
“…আমার অনেক সময় আশ্চর্য বোধ হয় যে, রবিকাকা কখনো কোনো যন্ত্র বাজানোর দিকে মনোযোগ করেন নি। যদিও পিয়ানোয় বসে বসে এক আঙুল দিয়ে ঠুকে গানে সুর বসানোর চেষ্টার কথা মনে পড়ে।…”
ব্যস্ ওইটুকুই। এছাড়া আর কোনো কথা জানা যায় না। ইন্দিরা দেবীর এই কথাটিকেই যেন কবি একবারে সরল সহজভাবে স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘তার পর থেকে যন্ত্রে হাত লাগানো আমার বন্ধ’।।

[ গ্রন্থঋণঃ ছেলেবেলা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জীবনস্মৃতি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবিজীবনী ১ম, ২য় ও ৩য় খন্ড – প্রশান্তকুমার পাল
রবীন্দ্রজীবনী ১ম খন্ড – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
রবীন্দ্রস্মৃতি – ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী
শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ – শচীন্দ্রনাথ অধিকারী
শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ – প্রমথনাথ বিশী
কবির আবাস ১ম খন্ড – সুরঞ্জনা ভট্টাচার্য ]

পীতম সেনগুপ্ত
প্রাক্তন সাংবাদিক। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত। ষোলো বছর বয়স থেকে কলকাতার নামী পত্রপত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি। ছোটোদের জন্য রচিত বেশ কিছু বই আছে। যেমন 'বিশ্বপরিচয় এশিয়া', 'ইয়োরোপ', 'আফ্রিকা' সিরিজ ছাড়া 'দেশবিদেশের পতাকা', 'কলকাতায় মনীষীদের বাড়ি', 'ঐতিহাসিক অভিযান', 'শুভ উৎসব' ইত্যাদি। এছাড়া বর্তমানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা গবেষণার কাজে নিবেদিত। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 'রবীন্দ্র-জীবনে শিক্ষাগুরু' এবং 'রবীন্দ্র-গানের স্বরলিপিকার'। পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here