পীতম সেনগুপ্ত
প্রাক্তন সাংবাদিক। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত। ষোলো বছর বয়স থেকে কলকাতার নামী পত্রপত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি। ছোটোদের জন্য রচিত বেশ কিছু বই আছে। যেমন 'বিশ্বপরিচয় এশিয়া', 'ইয়োরোপ', 'আফ্রিকা' সিরিজ ছাড়া 'দেশবিদেশের পতাকা', 'কলকাতায় মনীষীদের বাড়ি', 'ঐতিহাসিক অভিযান', 'শুভ উৎসব' ইত্যাদি। এছাড়া বর্তমানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা গবেষণার কাজে নিবেদিত। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 'রবীন্দ্র-জীবনে শিক্ষাগুরু' এবং 'রবীন্দ্র-গানের স্বরলিপিকার'। পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

চেনা কবি — অচেনা রবি ()

আমাদের শিশুকালে ভোগবিলাসের আয়োজন ছিল না বললেই হয়। মোটের উপরে তখনকার জীবনযাত্রা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি সাদাসিধা ছিল। তখনকার কালের ভদ্রলোকের মানরক্ষার উপকরণ দেখিলে এখনকার কাল লজ্জায় তাহার সঙ্গে সকলপ্রকার সম্বন্ধ অস্বীকার করিতে চাহিবে। এই তো তখনকার কালের বিশেষত্ব, তাহার ‘পরে আবার বিশেষভাবে আমাদের বাড়িতে ছেলেদের প্রতি অত্যন্ত বেশি দৃষ্টি দিবার উৎপাত একেবারেই ছিল না।”

Banglalive

এই কথাগুলি উনিশ শতকের কথা।স্মৃতিচারণ করেছেন জোড়াসাঁকোর ছয় নং বাড়ির জগদ্বিখ্যাত বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বুড়ো বয়সে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে নিজের ‘জীবনস্মৃতি’র ‘ঘর ও বাহির’ পর্ব শুরুই করেছিলেন এমনভাবে। পড়তে পড়তে জানতে ইচ্ছে হতেই পারে কেমন ছিল সেই আমলের জীবন এবং এই বাড়ির ছেলেমেয়েদের আটপৌরে জীবনের সৌখিনতা। 

Banglalive

 তাঁর ‘ছেলেবেলা’য় জানা যায় এমন কথা,

Banglalive

আমি জন্ম নিয়েছিলুম সেকেলে কলকাতায়। শহরে শ্যাকরাগাড়ি ছুটছে তখন ছড় ছড় করে ধুলো উড়িয়ে, দড়ির চাবুক পড়ছে হাড়বেরকরা ঘোড়ার পিঠে। না ছিল ট্রাম, না ছিল বাস, না ছিল মোটরগাড়ি। ….যাঁরা ছিলেন টাকাওয়ালা তাঁদের গাড়ি ছিল তকমাআঁকা, চামড়ার আধঘোমটাওয়ালা; কোচবাক্সে কোচমান বসত মাথায় পাগড়ি হেলিয়ে, দুই সহিস থাকত পিছনে, কোমরে চামর বাঁধা, হেঁইয়ো শব্দে চমক লাগিয়ে দিত পায়েচলতি মানুষকে। মেয়েদের বাইরে যাওয়াআসা ছিল দরজাবন্ধ পাল্কির হাঁপধরানো অন্ধকারে, গাড়ি চড়তে ছিল ভারী মজা। রোদবৃষ্টিতে মাথায় ছাতা উঠত না। কোনো মেয়ের গায়ে সেমিজ পায়ে জুতো দেখলে সেটাকে বলত মেমসাহেবি।…”

Banglalive

সেই সময় এবং মেয়েদের পোশাকের সামান্য নমুনা পাওয়া গেলেও তাঁর ‘ছেলেবেলা’য় ছেলেদের কথা তেমন খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই ছেলের ছেলেবেলার পোশাকের কথা জানা যায় বরং ‘জীবনস্মৃতি’র পাতায়। 

আসলে একথা আজ সবাই জানে যে ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের শৈশব কাটত চাকরদের অধীনেই। চাকরদের অনুশাসনে তাদের ভাগ্যদেবতা নির্ভর করতেন। ফলে অনাদরের একটা প্রমাণ অনেকের লেখাতেই পাওয়া যায়। অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে উদাসীনতাই দেখাতেন। তাঁদের নাগাল পাওয়াই দূরের ছিল। খাওয়ানো, পরানো, বা সাজানোর জন্য বাড়তি কোনো বালাই ছিল না বললেই চলে।

স্মৃতিচারণ এ ব্যাপারে যে সাক্ষ্য দেয় তা হল,

কাপড়চোপড় এতই যৎসামান্য ছিল যে এখনকার ছেলের চক্ষে তাহার তালিকা ধরিলে সম্মানহানির আশঙ্কা আছে। বয়স দশের কোঠা পার হইবার পূর্বে কোনোদিন কোনো কারণেই মোজা পরি নাই। শীতের দিনে একটা সাদা জামার উপরে আর একটা সাদা জামাই যথেষ্ঠ ছিল।আমাদের চটিজুতা একজোড়া থাকিত, কিন্তু পা দুটা যেখানে থাকিত সেখানে নহে। প্রতি পদক্ষেপে তাহাদিগকে আগে আগে নিক্ষেপ করিয়া চলিতাম; তাহাতে যাতায়াতের সময় পদচালনা অপেক্ষা জুতাচালনা এত বাহুল্য পরিমাণে হইত যে, পাদুকাসৃষ্টির উদ্দেশ্য পদে পদে ব্যর্থ হইয়া যাইত।…”

অবাক হতে হয় এই স্মৃতিচারণ পড়তে গিয়ে। বিশ্বাস করতে খটকা লাগে। রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ শ্রীপ্রশান্তকুমার পাল জানাচ্ছেন বুড়ো বেলায় ছেলেবেলার স্মৃতি রোমন্থনে সেই ছেলের নিশ্চয়ই অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল হয়েছিল। ঠাকুরবাড়ির হিসেবের খাতা ক্যাশবইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি দেখেছেন, তাতে লেখা, ‘রবিবিন্দ্রবাবুর ইজের ১২টা’ বারো আনাতে কেনা হয়েছিল ১৮৬৫ সালের ৬ জানুয়ারি। আবার ওই বছরই এপ্রিল মাসের ১৯ তারিখে ক্যাশবই জানাচ্ছে, ‘রবীন্দ্রবাবুর পিরান ১২টা’ দু টাকা দশ আনায় হয়েছে। মজার ব্যাপার তার আগের মাসেই অর্থাৎ মার্চ মাসের ৩০ তারিখে ওই ক্যাশবই লিখেছে, ‘রবিইন্দ্রনাথবাবুর ১২টা পীরান’ খাতে খরচ লেগেছে পাঁচ টাকা সাড়ে পাঁচ আনা। এত অল্প সময়ের মধ্যে শুধু সেই ছেলে, রবীন্দ্রনাথের জন্যই এতগুলি পিরান এবং ইজের কেনা হয়েছিল। এবং অবশ্যই আটপৌরে ও পোশাকী দু রকমেরই জামাকাপড় অন্তত দাম দেখে তো সেটাই বোঝা যায়। আর শীতের পোশাক?? সে খবরও ক্যাশবই থেকে মেলে। ১৮৬৮ সালে শীতের দিনে জানুয়ারি মাসের  ২৬ শে ক্যাশবই থেকে জানা যায়, সোমেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ এবং সত্যপ্রসাদের জন্য বনাতের ( পশুলোমজাত পশমের বস্ত্র ) চাপকান তৈরি হয়েছিল। 

ছেলেবেলায় নিজের পোশাক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আর বিশেষ কিছু বলে যাননি। তবে প্রথমবার বিলেত যাত্রাকালে তাঁর পোশাকের বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর জন্য ছটা সাদা জোব্বা, একটা চাপকান, এবং কাশ্মীরি পেন্টালুন তৈরি করানো হয়েছিল। এমনই টুকরো টুকরো করে কবির ড্রেসের কথা জানা যায়। যেমন বিয়ে করার কেমন সাজ ছিল তার একটা আভাস পাওয়া যায় জোড়াসাঁকোর পাঁচ নং বাড়ির ছেলে অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথায়। রবীন্দ্রনাথ তখন রীতিমত কবি হিসেবে খ্যাতিলাভ করেছেন। 

গায়ে হলুদ হয়ে যাবার পর আইবুড়োভাত হয়েছিল কবির। তখনকার দিনে ছয় নং বাড়ির কোনো ছেলের গায়ে হলুদ হয়ে গেলেই পাঁচ নং বাড়িতে তাকে নেমতন্ন করে আইবুড়োভাত খাওয়ানো হত। সেই মত খুব ধূমধাম করে খাওয়ানো হয়েছিল সেদিন রবীন্দ্রনাথকে।

পিসিমারা রবিকাকাকে ঘিরে বসেছেন, এ আমাদের নিজের চোখে দেখা। রবিকাকা দৌড়দার শাল গায়ে, লাল কী সবুজ রঙের মনে নেই, তবে খুব জমকালো রঙচঙের। বুঝে দেখো, একে রবিকাকা, তায় ওই সাজ, দেখাচ্ছে যেন দিল্লির বাদশা!…”

এহেন রবীন্দ্রনাথের সর্বজনপরিচিত ড্রেসটি কেমন করে তাঁর অঙ্গে উঠে এসেছিল সেই কাহিনিটিও কম চমকপ্রদ নয়। ঠাকুরবাড়ির পুরুষেরা একসময়ে লম্বা কোট এবং পিরালি পাগড়ি পরতেন। রবীন্দ্রনাথকেও সেই পোশাকে দেখা গেছে। কিন্তু  শেষ পর্যন্ত জোব্বাই লম্বা কোটকে পরাস্ত করে তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিল। উনিশ শতকের গোড়ায় একবার এই অভিজাত বাড়িতে জাপানি শিল্পীরা এসেছিলেন। সেদিন তাঁদের পরনে ছিল কিমোনো জাতীয় পোশাক। এই পোশাকটি পাঁচ নং বাড়ির ছেলে গগনেন্দ্রনাথের নজর কাড়ে। শিল্পী বলে কথা! এই পোশাকটিকে কী করে, কোন ছাঁচে ফেলে দেশীয় রূপ দেওয়া যায় তিনি ভাবতে শুরু করলেন। একটার পর একটা নকশা কাটতে কাটতে শেষে একটি নকশাকে তিনি নিজেই ঠিক করলেন। একেবারে ভিনদেশী ফ্যাশনের সঙ্গে বাঙালিয়ানার মিশেল যেন। গগন ঠাকুর জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ব্যবহৃত সেই লম্বা কোট এবং পাগড়ি একদমই পছন্দ করতেন না। তখন পাশের চিৎপুরের দর্জিপাড়া থেকে ফতেহউল্লা নামে এক দর্জি ওস্তাদের সাহায্যে জাপানি পোশাকটির মতই নিজের নকশায় দুটি নতুন পোশাক তৈরি করিয়ে নিলেন। পোশাকদুটি তৈরি হয়ে এলে চটজলদি ভাই অবনীন্দ্রনাথ এবং সমরেন্দ্রনাথকে ডেকে পোশাকদুটি পরিয়েই ছাড়লেন। ব্যস্, অবন ও সমরকে এমন অভিনব ও নতুন পোশাকে দেখে রবীন্দ্রনাথ খুবই আকৃষ্ট হন। এতটাই আকৃষ্ট হন যে তখনই কবিও গগনেন্দ্রনাথ ও ফতেহউল্লার শরণাপন্ন হন। এবং বিশেষ ধরনের জোব্বা ও টুপি গড়িয়ে নেন।তারপর থেকে সেই পোশাকেই তিনি সর্বত্র স্বচ্ছন্দ এবং পরিচিত হন। এরপরে অবশ্য জাপানি কিমোনো ব্যবহার কবি নিজের মত করে করেন। কিমোনোর সঙ্গে তিব্বতীদের বাকুর মিশ্রণে জোব্বা তৈরি করেও পরেছেন। পাহাড়ি কিংবা বাউলদের পোশাকেরও মিশ্রণ রবীন্দ্রনাথের পোশাকে দেখা যায়। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিশেলে পোশাক তৈরি ও নির্বাচনে তিনি পটু শুধু নয়, নিপুণও ছিলেন। পরবর্তীকালে পোশাকে তিনি এমনই স্টাইল আনেন, যেখানে জোব্বার হাতা, কলারের ধরন, জোব্বার বোতাম, জোব্বার দৈর্ঘ্য সবেতেই নতুনত্ব ছিল।তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম ড্রেস ডিজাইনার হলেন ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, তাঁরই ভাইপো, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।

গত পর্বের লিঙ্ক – https://banglalive.com/why-did-rabindranath-tagore-stop-using-shree-before-his-name/

আরও পড়ুন:  দেখতে মানুষের মুখের মতো, বিরল প্রজাতির মাকড়সা নিয়ে হইচই এলাকা জুড়ে!

NO COMMENTS