“অসমর্থ হোনে পর ভি আপকি সেবামে মৈ দো চার বাত হিন্দিমে বোলুংগা!!…” – রবীন্দ্রনাথের সেই দুঃসাহসী ভাষণ…

464
শিল্পী - গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

চেনা কবি অচেনা রবি ()

শুধু কি কবি!! তা কেন, কত বিচিত্র যে তাঁর কাজের ক্ষেত্র, সেই বিষয়েও গভীর গবেষনা হতে পারে।

অল্প বয়স থেকেই জোড়াসাঁকোর বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে ব্রাহ্মসমাজের নানাবিধ উৎসবে যোগ দিতে হত। এ ছিল যেন অলিখিত এক নিয়মের বেড়াজাল। জীবনে যিনি নিয়মতে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এসেছেন বরাবর সেই তিনিই কিন্তু পিতার আদেশকে অমান্য করেননি।

ছেলেবেলা’য় নিয়মের কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘নিয়মের শেখা যাদের ধাতে নেই তাদের শখ অনিয়মের শেখায়।’ আসলে জীবন গড়ার নিয়মানুবর্তিতায় তিনি ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা বা প্রার্থনাকে কখনও দূরে সরিয়ে দেননি। ধীরে ধীরে একদিন তাঁকেই আচার্যের আসন অলংকৃত করতে হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁর কাব্য এবং সংগীত বিদ্দজন সমাজে সমাদর পেতে শুরু করেছে। সভাসমিতি থেকে কবিতা পাঠ ও গান শোনানোর অনুরোধ আসছে। যে কবি বাড়ির তেতলার ছাদের ঘরে দাদা বৌদিদের দরবারেই শুধু গান এবং কবিতা চর্চায় মগ্ন থাকতেন, তিনি এখন বাইরে। অথচ এই রবিকে নিয়েই তাঁর বালক বয়সে ওই বাড়ির লোকজনদের কত দুশ্চিন্তা ছিল!! একদিন তো তাঁর বড়দিদি, সৌদামনীদেবী বলেই ফেললেন, ‘আমরা সকলেই আশা করিয়াছিলাম বড়ো হইলে রবি মানুষের মতো হইবে, কিন্তু তাহার আশাই সকলের চেয়ে নষ্ট হইয়া গেল।’ রবীন্দ্রনাথ নিজেও স্বীকার করেছেন, বলেছেন, ‘আমি বেশ বুঝিতাম, ভদ্রসমাজের বাজারে আমার দর কমিয়া যাইতেছে…!’

সেই বালকের বয়স যখন চোদ্দ বছর, বৃহত্তর জনসমাজের সামনে সেই প্রথম রবীন্দ্রপ্রতিভা বিকাশের ডাক এল। কলকাতায় তখন হিন্দুমেলার নবম বার্ষিক অধিবেশন বসেছে। তৎকালীন সার্কুলার রোড়ের পার্সিবাগানে বসেছিল এই মেলা। অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে বালক রবীন্দ্রনাথ একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন। ‘হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত’এ যোগেশচন্দ্র বাগল এই প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, ‘এবারেই সর্ব্বপ্রথম কিশোর রবীন্দ্রনাথ সাধারণ সমক্ষে দাঁড়াইয়া ‘হিন্দুমেলার উপহার’ শীর্ষক স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করেন॥’

সেই শুরু। এরপর কবিকে জনমোহিনী চাহিদা আর ঘরে বন্দী করে রাখতে দেয়নি। কবিতাপাঠ থেকে গান, গান থেকে বক্তৃতা সবেতেই তাঁর অনায়াস বিচরণ উপভোগ করেছেন শ্রোতারা। রীতিমতো দাবি রেখেছেন তাঁর প্রতিভার অফুরান ভান্ডারে। আর তিনি বিলিয়েছেন তা অকাতরে। কবিতা বা গানের কথার চর্চা হয়েছে যত না, তাঁর বক্তৃতার কথা জনসমাজে ততটা মুখরিত হয়নি। অথচ তাঁর মতো বাগ্মী এদেশে কজনাই বা আছেন কিংবা ছিলেন। তাঁকে অনর্গল বক্তৃতা দিতে হয়েছে দেশে বিদেশের নানা পথে প্রান্তরে, এবং নানা কারনে। জানা যায় কখনও সখনও বক্তৃতা এতই দীর্ঘ হত যে তা দু ঘন্টা সময়ও অতিক্রম করে যেত। অথচ কখনওই সেই দীর্ঘ ভাষণ বিষয়চ্যূত হত না। বাঁধন ছিল ততটাই মজবুত।

আজ তাঁর একটি ব্যতিক্রমী ভাষণের গল্প হোক।

১৯২০ সালের কথা।। চৈত্র মাস।।

দীর্ঘ ৪২ বছর পর কবি আবার আমেদাবাদ সফরে গেছেন।। তাঁর এবারের সফরসঙ্গী ক্ষিতিমোহন সেন, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ অনেকেই।।

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় রবীন্দ্রজীবনী গ্রন্থে এই সফর প্রসঙ্গে লিখেছেন,

বোম্বাই স্টেশনে একটা অভ্যর্থনার ঝড় পার হইয়া দিনটা শহরে কাটাইয়া রাত্রির ট্রেনে কবি সদলে আহমদাবাদ যাত্রা করিলেন। সেখানে তাঁহারা অম্বালাল সরাভাইএর অতিথি।অম্বালালের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ভক্ত ছিলেন।আহমদাবাদে পৌঁছিবার পরদিন, Easter Friday ( ২ এপ্রিল ১৯২০ ) গুজরাট সাহিত্যসম্মেলন; কবি তাঁহার ভাষণ ইংরেজিতেই পাঠ করেন।…”

এখানে গান্ধিজির আমন্ত্রণে কবি সদলবলে সবরমতী আশ্রমেও গেলেন একদিন।। আশ্রমের ছাত্ররা, শিক্ষকেরা কবিকে যথাযোগ্য সম্মাননা জানিয়ে সংবর্ধনা দিলেন।। আমেদাবাদে দিনকয়েক কাটিয়ে কবি সেখানকারই দেশীয় রাজ্য, ভাবনগরের উদ্দেশ্যে স্পেশাল ট্রেনে চেপে রওনা দিয়েছিলেন।। ভাবনগরের বৈষ্ণবসমাজের ভজনগান খুবই বিখ্যাত ছিল সেসময়ে। ভক্তনারীদের কন্ঠে মীরাবাঈয়ের ভজন ও সর্বদেহের ছন্দ কবিকে অপার আনন্দ দিত বলে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন।

সেখানেই ৬ এপ্রিল কবিকে কাঠিওয়াড়ের ভাবনগরে একটি জনসমাবেশে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রণ এবং অনুরোধ করা হল। কবি সেই আমন্ত্রণ রক্ষাও করেন। সেখানে বৈষ্ণব ভাবশিষ্য ও শিষ্যাদের মাঝে কবি একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যাকে এককথায় অভিনব বলা যেতে পারে।।

সেদিন তিনি এভাবে বলতে শুরু করেন..

আপকী সেবামে খড়া হোকর বিদেশীয় ভাষা কহুঁ য়হ হম্ চাহতে নহী!! পর জিস্ প্রান্তমেঁ মেরা ঘর হৈ বহাঁ সভামে কহনে লায়েক হিন্দি কা ব্যবহার হৈ নহী!! মহাত্মা গান্ধী মহারাজকীভী আজ্ঞা হৈ হিন্দিমে কহনেকে লিয়ে!! যদি হম্ সমর্থ হোতা তব ইসসে বড়া আনন্দ ঔর কুছ হোতা নহী!! অসমর্থ হোনে পর ভি আপকি সেবামে মৈ দো চার বাত হিন্দিমে বোলুংগা!!…”

সাহসের বলিহারী!!

কারণ এটাই ছিল কবির বৈচিত্রেভরা জীবনের প্রথম হিন্দিতে বক্তৃতা!!

হিন্দিতে তিনি সে সভায় আরো বলেছিলেন

“…সারী রাহমে আপ্সভোঁকা সমাদরকা স্বাদ পাতে পাতে হম্ আয়ে হৈঁ!! হরেক স্টেশনমে বালবৃদ্ধবনিতা হমকো সৎকার কিয়ে হৈঁ!! মেরা ঘটতো পূর্ণ হোনেকো চলা হৈ, পর্ পূর্ণ ঘটসে আবাজ নিকলনে চাহতী নহী!! তৌভী নিঃশব্দমে য়ানে খামোশ রহকর আপকী প্রীতিকা অর্ঘ্য গ্রহণ করূঁ ঐসী অসভ্যতাভী সহ সকূঁ কিস্ তরহ সে??..”

ভাবা যায় রবীন্দ্রনাথ হিন্দিতে বক্তব্য রাখছেন!! যদিও উপস্থিত শ্রোতাদের এই বক্তৃতা শোনার পর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সেকথা আজ আর জানা যায় না!! এই হিন্দি ভাষণের সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকৃত অনুলেখনটি ১৩৩১ এর পৌষ সংখ্যা শান্তিনিকেতনপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল!!

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.