রবীন্দ্রনাথ মা’কে কোনও গ্রন্থ উৎসর্গ করেননি!

3089

চেনা কবি অচেনা রবি ()

তেরোটি সন্তান প্রসব করার পর গর্ভে যখন তাঁর অষ্টম পুত্র এল তখন বয়স আনুমানিক ৩৫ বছর!!

এর ঠিক তেরো বছর দশমাস পর সেই অষ্টম পুত্রটিই একটি ভয়ঙ্কর রাতের কথা লিখেছিলেন,

তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল

ওরে, তোদের কী সর্বনাশ হল রে!!’… 

স্তিমিত প্রদীপের অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল, কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না!!” 

বোঝার কথাও নয়।তাঁর তখন বয়স ভারী অল্প।

সেদিনের সেই নিশ্চুপ নির্জন রাতের প্রহর পার করে যখন পূবাকাশে প্রথম আলোর চরণধ্বনি শোনা গেল, তখন বাইরের বারান্দায় এসে তিনি দেখলেন

তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপর শয়ান!!” 

তখনও তাঁর তেরো বছরের অনভিজ্ঞ চোখ বিশ্বাস করতে চায়নি সে দৃশ্যের ভয়ঙ্কর রূপটি!! 

মৃত্যূ যে ভয়ংকর সে দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না…!!”

মৃত্যূর সে ভয়ঙ্কর রূপটিকে তিনি টের পেলেন যেমন করে তা বর্ণনা করলেন তাঁর সুললিত লেখনীর আঁচড়ে,

কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল!!” 

আর সকলের সঙ্গে যখন 

তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল…” 

যে হাহাকারের কথা এরপর তাঁর বালক মনে অনুরণিত হতে লাগল বারবার

এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না!!”…. 

এই স্মৃতিচারণ রবীন্দ্রনাথ, মা’কে নিয়ে করেছেন।

কবির মা, সারদাসুন্দরী দেবীর পরিচয় দিতে গেলে জানা যায়, মাত্র ছয় বছর বয়সে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে হয়ে যশোর জেলার দক্ষিণডিহি থেকে এসেছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাঁর শাশুড়ির বিয়ের কথা বলতে গিয়ে লিখেছিলেন,

তাঁর [ সারদা দেবীর ] এক কাকা কলকাতায় শুনেছিলেন যে আমার শ্বশুরমহাশয়ের জন্য সুন্দরী মেয়ে খোঁজা হচ্ছে। তিনি দেশে এসে আমার শাশুড়িকে ( তিনি তখন ছয় বৎসরের মেয়ে ) কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিলেন। তখন তাঁর মা বাড়ি ছিলেন না — গঙ্গা নাইতে গিয়েছিলেন। বাড়ি এসে মেয়েকে তাঁর দেওর না বলে কয়ে নিয়ে গিয়েছেন শুনে উঠোনে এক গাছতলায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলেন। তার পরে সেখানে পড়ে কেঁদে কেঁদে অন্ধ হয়ে মারা গেলেন।…” 

খুবই মর্মান্তিক এ কাহিনি। সারদা দেবী যখন জোড়াসাঁকোর ভিটেতে প্রবেশ করেন তখন দ্বারকানাথের রমরমা অবস্থা। কথিত আছে পুত্রবধূর সৌভাগ্যকে ব্যবসার সাফল্য ধরে নিয়ে দ্বারকানাথ বালিকা সারদা দেবীকে এক লক্ষ টাকার হিরেমুক্তো বসানো খেলনা (?) উপহার দিয়েছিলেন। 

তা কেমন দেখতে ছিলেন জোড়াসাঁকো বাড়ির এই রত্নগর্ভা কর্তা মা?? কী বলছেন অবন ঠাকুর তাঁর ‘ঘরোয়া’তে??

কর্তাদিদিমাকে দেখেছি। তাঁর ছবিও আছে,…। ফোটো দিন দিন ম্লান হয়ে যাচ্ছে ও যাবে, কিন্তু তাঁর সেই পাকা চুলে সিঁদুরমাখা রূপ এখনও আমার চোখে জ্বলজ্বল করছে, মন থেকে তা মোছবার নয়। কর্তাদিদিমা রূপসী ছিলেন, কিন্তু ওই ছবি দেখে কে বলবে। ছবিটা যেন কেমন উঠেছে।…”

জ্ঞানদানন্দিনী দেবী তাঁর শাশুড়ি সম্পর্কে অবশ্য আরো তথ্য দিয়েছেন। 

আমার মনে পড়ে বাবামশায় যখন বাড়ি থাকতেন আমার শাশুড়িকে একটু রাত করে ডেকে পাঠাতেন, ছেলেরা সব শুতে গেলে। আর মা একখানি ধোয়া সুতি শাড়ী পরতেন, তারপর একটুখানি আতর মাখতেন। এই ছিল তাঁর রাতের সাজ।…”

এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় সেই আমলে স্বামীর সঙ্গে সচরাচর দেখা হওয়াটাও কত দুর্লভ ছিল স্ত্রীদের। কবির মায়ের যে বিদ্যার প্রতি অনুরাগ ছিল সেকথা জানা যায় স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা থেকে,

মাতাঠাকুরানী ত কাজকর্মের অবসরে সারাদিনই একখানি বই হাতে লইয়া থাকিতেন। চাণক্যশ্লোক তাঁহার বিশেষ প্রিয় পাঠ ছিল, প্রায়ই বইখান লইয়া শ্লোকগুলি আওড়াইতেন। তাঁহাকে সংস্কৃত রামায়ণ পড়িয়া শুনাইবার জন্য প্রায়ই কোনো না কোনো দাদার ডাক পড়িত।…”

রবীন্দ্রনাথও জীবনস্মৃতিতে মায়ের এই মার্বেল কাগজ মোড়া কোণ ছেঁড়া রামায়ণের কথা লিখেছেন। 

এরপর পরবর্তী দীর্ঘ ছয় দশকেরও উপর তাঁর বুকের উপর দিয়ে এমন নানা শোকের ছায়া ক্রমাগত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে!! 

১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনের উপাসনা মন্দিরের এক উপদেশে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন এক স্বপ্নের কথা!! 

আমার একটি স্বপ্নের কথা বলি!! আমি নিতান্ত বালককালে মাতৃহীন!! আমার বড়ো বয়সের জীবনে মার অধিষ্ঠান ছিল না!! কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখলুম, আমি যেন বাল্যকালেই রয়ে গেছি!! গঙ্গার ধারের বাগানবাড়িতে মা একটি ঘরে বসে রয়েছেন!! মা আছেন তো আছেনতাঁর আবির্ভাব তো সকল সময়ে চেতনাকে অধিকার করে থাকে না!! আমিও মাতার প্রতি মন না দিয়ে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে চলে গেলুম!! বারান্দায় গিয়ে এক মুহূর্তে আমার কী হল জানিনেআমার মনে এই কথাটা জেগে উঠল যে, মা আছেন!! তখনই তাঁর ঘরে গিয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে তাঁকে প্রণাম করলুম!! তিনি আমার হাত ধরে আমাকে বললেন, “তুমি এসেছ!!” এই খানেই স্বপ্ন ভেঙে গেল…..” 

সন্তানদের প্রতি তাঁর উদাসীনতার কথা পারিবারিক নানা রচনা থেকে জানা যায়। যদিও রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞরা একে উদাসীনতা বলতে নারাজ। তাঁদের মতে এটি বনেদি বাড়ির একটা পারিবারিক প্রথামাত্র। 

প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলা দেবীর একটি স্মৃতিচারণ দেখা যাক্।

মায়ের আদর কী তা জানিনে, মা কখনো চুমু খাননি, গায়ে হাত বোলাননি। মাসিদের ধাতেও এসব ছিল না। শুনেছি কর্তাদিদিমার কাছ থেকেই তাঁরা এই ঔদাসীন্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন।…”

রবীন্দ্রনাথও তাঁর মায়ের পরশ নাপাওয়ার যন্ত্রণাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন এমন করে,  

মাকে আমরা জানিনি, তাঁকে পাইনি কখনো!! তিনি থাকতেন তাঁর ঘরে তক্তাপোশে বসে, খুড়ির সঙ্গে তাস খেলতেন!! আমরা দৈবাৎ গিয়ে পড়তুম সেখানে, চাকররা তাড়াতাড়ি আমাদের সরিয়ে আনতযেন আমরা একটা উৎপাত!! মা যে কী জিনিস তা জানলুম কই আর!!” 

অভিমানে তাই বলেছিলেন

তাই তো তিনি আমার সাহিত্যে স্থান পেলেন না!!” 

কী যে নিদারুণ করুণ ঘটনা!!.. 

পরবর্তীকালে তিনি একটি গান বেঁধেছিলেন এমন

আঁধার দেখে তরাসেতে //

চাহিলাম তোর কোলে যেতে // 

সন্তানেরে কোলে তুলে নিলি নে // 

ছেলের প্রাণে ব্যথা দিয়ে // 

যদি, মা, তোর জুড়ায় হিয়ে //

ভালো, ভালো, তাই তবে হোক–// 

অনেক দুঃখ সয়েছি // 

মা, আমি তোর কী করেছি….!!”

সারাজীবন এত গান কবিতা গল্প উপন্যাসের রচনা করেছেন যিনি, তিনি তাঁর সমগ্রজীবনে একটি গ্রন্থও মা’কে উৎসর্গ করে যাননি!! 

ভাবলে শুধু অবাক নয়, তাঁর অভিমানের পরশ টের পাওয়া যায়!!

Advertisements

4 COMMENTS

  1. তোমার লেখার মাধুর্যে সেই অভিমানের পরশ যে চোখে জল আনলো! অনবদ্য! ?

  2. Sotti ei lekhati pore khub abeg jeno antarke Nara diye gyalo.Andarmahaler emon ajana tothyo eto Sundar bhabe tule dhora ekti kothin proyas…
    Ekdom anobodyo lekhati.

  3. খুব সুন্দর লেখা । কত সুন্দর সুন্দর সন্তানের তিনি মা ছিলেন
    তাদের কৃতিত্ব সারা বিশ্বের গর্ব ।
    মায়ের detachment বড় কঠিন ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.