রবিজীবনে জার্মান শিক্ষিকা, যে রমণীর নাম কোনওদিনও আসেনি প্রকাশ্যে

আঁখি পানে যবে আঁখি তুলি,

দুখ জ্বালা সব যাই ভুলি

অধরে অধর পরশিয়া

প্রাণমন উঠে হরষিয়া

মাথা রাখি যবে ওই বুকে

ডুবে যাই আমি মহাসুখে

যবে বল তুমি, ‘ভালোবাসি’,

শুনে শুধু আঁখি জলে ভাসি

 

রবীন্দ্রনাথ লিখছেন অবশ্যই । তবে এই কবিতা তাঁর নিজের নয় । অন্য এক বিখ্যাত কবির । এ কবিতা জার্মান কবি হাইনের । রবীন্দ্রনাথ অনুবাদ করেছিলেন ।

রবি ঠাকুর জার্মানও জানতেন ? এ প্রশ্নটা মনে আসাটাই স্বাভাবিক। সত্যিই তো, তিনি কী জানতেন, আর কী জানতেন না, সে সম্পর্কে আর কতটুকুই বা আমরা জানি ! রবিজীবনীকার অবশ্য তাঁর জার্মান ভাষায় দখল নিয়ে একটি রা-ও কাড়েননি । তথ্যটি ফাঁস হল কবির জন্মশতবর্ষে । সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকাশ করলেন কবিগুরু অনূদিত ‘হাইনের শ্রেষ্ঠ কবিতা’। এ কবিতা তিনি কোথায় পেলেন ? সৌম্যেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, ১৮৯২ সালে এই অনূদিত কবিতাগুলি ছাপা হয় ‘সাধনা’ পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যার ৫৪৮ নম্বর পৃষ্ঠায় ।

১৮৯২ মানে কবির তখন বয়স মাত্র ৩১ বছর । তাহলে বছর তিরিশের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ আয়ত্তে এনেছিলেন জার্মান ভাষা ? নাকি এই কবিতাগুলি তিনি অনুবাদ করেছিলেন ইংরেজি থেকে ? এ প্রশ্নগুলি অবশ্যই উঠবে । উত্তর হল, এই কবিতাগুলি মোটেই ইংরেজি থেকে অনুবাদ হয়নি । কবি সে কথা জানিয়েছেন ‘সাধনা’ পত্রিকাকে। কারণ ‘সাধনা’ পত্রিকাই লেখা ছিল ‘জার্মান হইতে অনূদিত’।

তথ্য কিন্তু আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছে । দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ আরও আগে থেকেই জানতেন জার্মান ভাষা । ১৮৭৮ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায় তিনি লিখছেন ‘গ্যোয়েটে ও তাঁর প্রণয়িনীগণ’। অর্থাৎ জার্মান সাহিত্যিক গ্যোয়েটের লেখাও পড়ে ফেলেছেন বছর সতেরর কিশোর রবি । আসলে গ্যোয়েটেকে ভালবেসেই সম্ভবত তাঁর জার্মান ভাষা চর্চা শুরু । ১৯৮৫ সালে রবি ঠাকুর নিজেই জানিয়েছেন সে কথা প্রিয়নাথ সেনকে লেখা চিঠিতে—‘German চলচে Mademoiselle সম্বন্ধে দেখা হলে বলব…’ আবার তিনি লিখছেন—‘জর্ম্মান Faust অল্প অল্প করে পড়তে চেষ্টা করচি । তুমি থাকলে তোমাকে আমার সহপাঠী করা যেত । এরকম পড়া দুজনে মিলে লাগলেই তবে এগোয় । পড়ার মাঝে মাঝে মৌলবীর বক্তৃতা, নায়েবের কৈফিয়েত্, প্রজাদের দরখাস্ত এসে পড়লে জর্ম্মান ভাষা বুঝে ওঠা কি রকম ব্যাপার হয় তা তুমি সহজেই অনুমান করতে পারবে।’

তবে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু যে বইগুলি জার্মান ভাষায় পড়েছিলেন, সম্ভবত সেগুলি আগে পড়েছিলেন ইংরেজি অনুবাদে । কারণ তথ্য বলছে, গেটের ‘Faust’-এর ইংরেজি অনুবাদ উপহার দিচ্ছেন জ্ঞানদানন্দিনী দেবীকে । আবার হাইনের লেখার ইংরেজি অনুবাদও তাঁর কাছে ছিল, এ সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য ।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জার্মান কার কাছে শিখলেন ? এ বার সে প্রশ্নে আসা যাক । এ বিষয়ে কিন্তু একটি কথাও বলেননি রবিজীবনীকার। তবে অনেক তথ্য ঘেঁটে জানা যায় এক মহিলার কথা । তিনি ছিলেন একজন জার্মান মিশনারি । সম্ভবত ভারতে এসেছিলেন তিনি । তাঁর কাছেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঠ নেন জার্মান ভাষার ।

এখন প্রশ্ন হল, এই মহিলার সঙ্গে পরিচয়ের আগে না পরে রবি ঠাকুর জার্মানে আকৃষ্ট হয়েছিলেন ? তবে এই জার্মান মহিলার অনুপ্রেরণায় কি কবির জার্মান শিক্ষা ? সম্ভবত তা নয় । কারণ ইন্দিরাদেবীকে লেখা একটি চিঠিতে কবি নিজেই জানাচ্ছেন, ‘I also wanted to know German Literature and, by reading Heine in translation, I through I had caught a glimpse of the beauty there.’ অর্থাৎ  জার্মান মহিলার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই হাইনের কবিতা পড়ে জার্মান সাহিত্যকে তিনি জানতে চাইছেন । আর তখনই জার্মান রমণীর প্রবেশ । সে সম্পর্কেও কবি জানাচ্ছেন, ‘Fortunately I met a missionary lady form Germany and asked her help. I worked hard for some months, but being rather quick-witted, which is not a good Quality, I was not persevering. I had the dangerous facility which helps one to guess the meaning too easily. My teacher thought I hald almost mastered the language-which was not. ’

আর পাঁচজন শিক্ষকের কাছে রবি ঠাকুর যেমন পড়েননি, এই মহিলার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল । মহিলা তাঁকে প্রথাগত পাঠ দিয়ে জার্মান ভাষায় সুদক্ষ করে তুলতে পারেননি । উল্টে অনুভূতি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই জার্মান ভাষাকে আয়ত্তে এনেছিলেন ।

এরপর দীর্ঘ সময়, দীর্ঘ সময় ধরে কবিগুরু জার্মান ভাষা চর্চা করে গিয়েছেন । আসলে জার্মান ভাষার প্রতি তাঁর একটা অনুরাগ ছিল। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, নিজের সন্তানরাও যাতে এই ভাষা জানেন, তার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি । রথীন্দ্রনাথদের জন্য লরেন্স নামে এক গৃহশিক্ষককে রেখেছিলেন তিনি । আর সেই গৃহশিক্ষক জার্মান জানতেন । রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন লরেন্সের কাছ থেকে জার্মান উচ্চারণটা আয়ত্ত করুক রথীন্দ্রনাথরা । আবার শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলেও দেখা যাবে, সেখানে জার্মান ভাষার অনুবাদ সংশোধন করছেন স্বয়ং কবিগুরু নিজেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।