পীতম সেনগুপ্ত
প্রাক্তন সাংবাদিক। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় কর্মরত। ষোলো বছর বয়স থেকে কলকাতার নামী পত্রপত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি। ছোটোদের জন্য রচিত বেশ কিছু বই আছে। যেমন 'বিশ্বপরিচয় এশিয়া', 'ইয়োরোপ', 'আফ্রিকা' সিরিজ ছাড়া 'দেশবিদেশের পতাকা', 'কলকাতায় মনীষীদের বাড়ি', 'ঐতিহাসিক অভিযান', 'শুভ উৎসব' ইত্যাদি। এছাড়া বর্তমানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা গবেষণার কাজে নিবেদিত। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। 'রবীন্দ্র-জীবনে শিক্ষাগুরু' এবং 'রবীন্দ্র-গানের স্বরলিপিকার'। পড়াশোনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে।

চেনা কবি অচেনা রবি ()

গত বছর পর্যন্ত কলকাতা মহানগরে ৪২টি আন্তর্জাতিক বইমেলা হয়ে গেছে। হৈ হৈ করে এবারে বসেছে ৪৩তম আসরটি। এ এক রাজসূয় যজ্ঞ বটে। বাঙালি কবি সাহিত্যিক লেখক প্রকাশক এবং পাঠকের এই মিলনক্ষেত্রে আর কেউ থাকুন বা না থাকুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু বরাবরই সজীব থাকেন। তাঁকে নিয়ে নানাবিধ রচনা বা তাঁর নানা রচনা আজও নানা আঙ্গিকে প্রকাশ পায়, এবং বাজারের একটা বড়ো অংশ রবীন্দ্রপ্রসঙ্গের বিবিধ বই এই বেচাকেনার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলা বইয়ের ব্যবসায়ে রবীন্দ্রনাথ আজও অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিষয়। কিন্তু কেমন করে গড়ে উঠল এই বাজার, নিশ্চয়ই উৎসুক পাঠক সে বিষয়ে জানতে আগ্রহী।

মাত্র সাতাশ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের লেখা গ্রন্থ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সেটা ১৮৭৮ সালের কথা। সেবছর নভেম্বর মাসে কবির লেখা ‘কবিকাহিনী’ প্রথম গ্রন্থ হিসেবে মুদ্রিত হয়েছিল। এই গ্রন্থপ্রসঙ্গে ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছিলেন,

আমি যখন মেজদাদার নিকট আমেদাবাদে ছিলাম তখন আমার কোনো উৎসাহী বন্ধু এই বইখানা ছাপাইয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিয়া আমাকে বিস্মিত করিয়া দেন।…”

Banglalive-8

প্রসঙ্গত বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ১৮৭৮ সালের গরমকালে অর্থাৎ এপ্রিল মে মাসে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আমেদাবাদে গিয়েছিলেন। ‘কবিকাহিনী’ গ্রন্থটি কবির উৎসাহী বন্ধু প্রবোধচন্দ্র ঘোষ ৫ নভেম্বর প্রকাশ করেছিলেন। মুদ্রিত হয়েছিল ৪৯ নং মেছুয়াবাজার রোডে সরস্বতী যন্ত্রে, মুদ্রক ছিলেন ক্ষেত্রমোহন মুখোপাধ্যায়।  ১৮৭৬ সালে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এন্ট্রান্স ক্লাসে প্রবোধচন্দ্র সোমেন্দ্রনাথ এবং সত্যপ্রসাদের সহপাঠী ছিলেন, তখনই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর আলাপ ও বন্ধুত্ব হয়, যা কিনা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়েছিল। মুখপত্রসহ মোট ৫৬ পাতার ডিমাই আকারের এই বইটি ৫০০ কপি ছাপা হয়েছিল এবং মূল্য ধার্য করা হয়েছিল ৬ আনা। 

Banglalive-9

রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছিলেন,

তিনি যে কাজটা ভালো করিয়াছিলেন তাহা আমি মনে করি না, কিন্তু তখন আমার মনে যেভাবোদয় হইয়াছিল, শাস্তি দিবার প্রবল ইচ্ছা তাহাকে কোনোমতেই বলা যায় না। দণ্ড তিনি পাইয়াছিলেন, কিন্তু সে বইলেখকের কাছে নহে — বই কিনিবার মালেক যাহারা তাহাদের কাছ হইতে। শুনা যায় সে বইয়ের বোঝা সুদীর্ঘকাল দোকানের শেলফ্ এবং তাঁহার চিত্তকে ভারাতুর করিয়া অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছিল।…”

স্বয়ং গ্রন্থকারের এই উক্তিই প্রমাণ করে বাজারে বইটি তেমনভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। এমনকী এই বইয়ের কোনো সংস্করণ বা পুনর্মুদ্রণ আর হয়নি। রবীন্দ্রনাথের  বই প্রকাশের সেই শুরু। রবীন্দ্রনাথের প্রথম বইয়ের মতো দ্বিতীয় বই, ‘বনফুল’ও ছেপেছিলেন রবীন্দ্রনাথের দাদা সোমেন্দ্রনাথ। ১৮৮০ সালের ৯ মার্চ একহাজার কপি ছাপা হয়েছিল এবং মূল্য ধার্য হয়েছিল আট আনা। রবীন্দ্রনাথ এই দ্বিতীয় বইটির প্রসঙ্গে লিখেছিলেন,

….দাদা সোমেন্দ্রনাথ অন্ধ পক্ষপাতিত্বের উৎসাহে এটি গ্রন্থ আকারে ছাপাইয়াও ছিলেন।…” 

এই কাব্যগুলি আগে জ্ঞানাঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব পত্রিকায় ধারাবাহিক ছাপা হয়েছিল। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় গ্রন্থটিরও দ্বিতীয় সংস্করণ আর কখনও মুদ্রিত বা প্রকাশিত হয়নি। 

এরপর রবীন্দ্রনাথের আরো বই ছাপা হল। তবে প্রথম দিককার বইগুলির মধ্যে মাত্র চারটে বই দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায়। এতে প্রমাণ হয় সে আমলে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের বইগুলির বাজার বা চাহিদা আশানুরূপ ছিল না। তবে বাল্মীকিপ্রতিভা বইটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছিল বারো বছরের মধ্যে। এই সময়ে কবির প্রথম গানের বই ‘রবিচ্ছায়া’ প্রকাশিত হয়। প্রকাশকাল ১৮৮৫ সাল, ২ জুন। ১৯০ পৃষ্ঠার এই বইটি এক হাজার কপি ছাপা হবার পর দাম রাখা হয়েছিল বারো আনা। এরপরই অবাক হবার পালা। সাত মাস কাটতে না কাটতেই তৎকালীন সাপ্তাহিক সঞ্জীবনী পত্রের বেশ কয়েকটি একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হল। বিজ্ঞাপনে লেখা হল,

মূল্য কমিল রবিচ্ছায়া মূল্য কমিল”।

রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম গানের বইয়ের মূল্য কমানো হল? তারমানে রবিচ্ছায়া বাজারে মোটেই কাটছিল না। বিজ্ঞাপনের শেষে লেখা হয়েছিল, “সঞ্জীবনী এবং ভারত শ্রমজীবী’র গ্রাহকগণ আমার নিকট মূল্য পাঠাইলে ছয় আনা মূল্যে পাইবেন।” ভাবা যায় বইটি অর্ধেক মূল্যে ছাড়তে হয়েছিল প্রকাশকদের। 

রবীন্দ্রনাথের প্রথম যে গ্রন্থাবলী প্রকাশিত হয় ১৮৯৭ সালে, সেটি আসলে তাঁর কাব্যগ্রন্থাবলী। ৪৭৬ পাতার এই বৃহদ বইটি প্রকাশ করেন কবির ভাগ্নে সত্যপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়। এই গ্রন্থে কৈশোরক থেকে বাল্মীকি প্রতিভা, সন্ধ্যাসঙ্গীত সহ সোনার তরী, চিত্রাঙ্গদা, বিদায় অভিশাপ চৈতালি, গানের বহি প্রভৃতি কুড়িটা কাব্যই স্থান পেয়েছিল। তিন রকমের ছাপা ও বাঁধাই হয়েছিল গ্রন্থটি। সুলভ, মধ্যম এবং উৎকৃষ্ট সংস্করণের জন্য তিন রকমের মূল্যও ধার্য করা হয়। সুলভ সংস্করণের কম দাম রেখে সেদিন কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাব্যগ্রন্থাবলী আশানুরূপ বিক্রি হয়নি। 

আজ বাংলা বইয়ের জগতে যিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ এবং সর্বোত্তম বেস্টসেলারের আসন অলংকৃত করে আছেন, সেই লেখক নোবেল পুরস্কার পাবার আগে পর্যন্ত তাঁর বইয়ের প্রকাশ এবং বাজার সম্পর্কে কতটা যে চিন্তিত এবং কাতর ছিলেন তা বোঝা যায় তাঁর একটি পত্র থেকে। শিলাইদহ থেকে প্রিয়নাথ সেনকে ১৯০০ সালের ৮ আগস্ট চিঠিতে লিখলেন,

নিজের বই এবং নিজের দেহটা ছাড়া সম্প্রতি আর কিছু বিক্রেয় পদার্থ আমার আয়ত্তের মধ্যে নেই — বই কেনবার মহাজন পাওয়া দুর্লভ, এবং নিজেকে বিক্রয় করতে গেলেও খরিদ্দার পাওয়া যেত কিনা সন্দেহ।….”

কেন এমন বলেছিলেন সে উত্তরও তাঁর সেই পত্রের ছত্রে ছত্রে পাওয়া যায়। 

আমার গ্রন্থাবলী এবং ক্ষণিকা পর্যন্ত সমস্ত কাব্যের Copyright কোনও ব্যক্তিকে ৬০০০ টাকায় কেনাতে পার? শেষের যে বইগুলি বাজারে আছে সে আমি সিকি মূল্যে তারই কাছে বিক্রি করব — গ্রন্থাবলী যা আছে সে এক তৃতীয়াংশ দামে দিতে পারব।…”

অবাক লাগে এই ভেবে যে রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে অর্থাৎ চল্লিশ বছর বয়সে নিজের বইকে সিকি মূল্যেও বিক্রি করে দিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন কারণ তাঁর বইয়ের বাজার আশানুরূপ তো ছিলই না, বরং মন্দাই ছিল। 

আজকাল বই বিক্রির জন্য যেমন বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, উনিশ বা বিশ শতকেও সে রকম বিজ্ঞাপনের চল ছিল ভালোই। রবীন্দ্রনাথের বই বিক্রির জন্যও প্রকাশকেরা বিজ্ঞাপন দিতেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ১৮৮৭ সালে ভারতী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমলের একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল এমন,

নূতন কবিতাপুস্তক! নূতন কবিতাপুস্তক!

  কড়ি ও কোমল

  শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত।

মূল্য : ডাক মাসুল সহিত এক টাকা মাত্র।

ইহাতে শতাধিক কবিতা আছে। এত বড় গীতিকাব্য বাঙ্গলায় আর প্রকাশিত হয় নাই।…”

এমনই একটি বিজ্ঞাপন ছাপা হল প্রবাসী পত্রিকায় ১৯০৯ সালে। বিজ্ঞাপনটি এমন,

গান 

 শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রণীত

কোকিলকন্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের গানে  বাঙলা দেশ আজ মুগ্ধ, সুতরাং আপনিও হয়ত তাঁহার দুই চারিটা জানেন কিংবা তাঁহার গানের একখানি বইও হয়ত সংগ্রহ করিয়াছেন। কিন্তু সভায় , সমাজে, সম্মিলনে যেখানে যত গান তিনি গাহিয়াছেন, তাহার একখানি উত্তম সংগ্রহ আপনার নিকটে আছে কি? যদি না থাকে, তবে এই নবপ্রকাশিত গানের একখন্ড সংগ্রহ করুন।…”

ওই বছরই প্রবাসীতে কবির দুটি উপন্যাসের বিজ্ঞাপন ছাপা হল । প্রথম বিজ্ঞাপনটি এমন

রবীন্দ্রবাবুর চোখের বালি

দ্বিতীয় সংস্করণ কাগজ মসৃণ, ছাপা অতি সুন্দর, চমৎকার সুবর্ণখচিত কাপড়ে বাঁধান, ৩৩৮ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত।…. বিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ লেখকের সর্বশ্রেষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস।”

এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের আরো অনেক বইয়েরই বিজ্ঞাপন সে আমলে নানা পত্রপত্রিকায় ছাপা হত। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কবির বই বিক্রির জন্যও সুমধুর ভাষা ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। অতএব বই প্রকাশ, বই বিক্রি, বই বিজ্ঞাপন রবীন্দ্রনাথের মতো কবির ক্ষেত্রেও যে কতটা বড়ো ভূমিকা পালন করত তা আজকের যুগে বসে ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। পরে অবশ্য নিজে বিশ্বভারতী থেকে বই প্রকাশের দায়িত্ব নেন। আজও তো কবি লেখকদের বই নিয়ে এমন কৌতুক আমরা বইমেলার সময়ে দেখে থাকি। 

[ গ্রন্থঋণঃ জীবনস্মৃতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চিঠিপত্র ৮ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রপরিচয়প্রশান্তকুমার পাল

রবিজীবনী (দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ খন্ড) – প্রশান্তকুমার পাল, রবীন্দ্রপুস্তক প্রকাশনার সেকাল একাল( কোরক মেআগস্ট ২০০৯ সংখ্যা )- অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য ]

আরও পড়ুন:  পাল্টা আত্মঘাতী আক্রমণই কি প্রতিরোধের একমাত্র উপায়?

NO COMMENTS