‘তুমি খুব ভালো শো-ম্যান | স্বামী বা প্রেমিক হিসেবে তুমি খুব খারাপ’—হাতে ধরা টিফিন বাক্স তখনও খোলা হয়নি | শট শেষ করে নার্গিস বাড়ি থেকে রান্না করে আনা খাবার নিয়ে রাজের মেকআপ রুমে যাচ্ছিলেন | আলতো ভেজানো দরজা খুলতেই পা আটকে গিয়েছিল তাঁর | আর.কে ষ্টুডিও-য় ‘দ্য গ্রেট শো-ম্যান’ একান্তে তাঁর শো-ম্যানশিপ দেখাচ্ছিলেন মীনা কুমারীকে! ১৬ বছরের সম্পর্কে এই বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে পারে কেউ? সঙ্গে সঙ্গে খাবার হাতে ফেরত আসার সময় মুখের ওপর রাজ কপূরকে বলে এসেছিলেন মিস্ট্রেস নার্গিস | ১৬ বছরের সম্পর্ক তার পরেই শেষ |

Banglalive

১৯৪৭ থেকে ১৯৮৮— ৪১ বছর ধরে রাজ কপূরকে নিয়ে কেচ্ছার অন্ত নেই | রাজ কপূরকে নিয়ে কিস্যার-ও অন্ত নেই | রিল লাইফ-এর ‘গ্রেট শো-ম্যান’ বাস্তবে সেই তকমা ধরে রাখতে হয়ত কিছুটা বাধ্য হয়েই রাজ ধার করেছিলেন অবাস্তব ‘শো-ম্যানশিপ’কে | তাই কি এক এক করে তাঁকে ছেড়ে গিয়েছেন নার্গিস, বৈজয়ন্তিমালা, পদ্মিনী? শুধু ছেড়ে যেতে পারেননি আজীবনের জীবনসঙ্গিনী কৃষ্ণা | আজ ৯৪তম জন্মদিনে সবাই রাজের আলোকিত জীবনের ছবি তুলে ধরবেন | বাংলালাইভ খোঁজার চেষ্টা করবে সেই কারণগুলো, যার জন্য শেষ জীবনে নিঃসঙ্গ রাজ কপূরকে ফিরতে হয়েছিল সারাজীবন সবার আড়ালে থাকা কৃষ্ণার কাছে—

১৯৪৬-এ ২৪ বছরের রাজের যখন ১৬ বছরের কৃষ্ণা মালহোত্রা-র বিয়ে হয়েছিল, তখন রাজ নায়ক নন | বাবা পৃথ্বীরাজ কপূর নিজে পছন্দ করেছিলেন কৃষ্ণাকে | ফলে, রাজ কপূরের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ একেবারেই পাত্তা পায়নি বিয়ের ব্যাপারে | বিয়ে-বউ নিয়ে তাই খুব মাথা ঘামাননি রাজ নিজেও | কিন্তু ১৯৪৭-এ ‘নীল কমল’ আর ১৯৪৮-এ ‘আগ’— এই দু’টি ছবি রিলিজের পর রাজের জীবন গেল বদলে | ১৯৪৯-এ ‘আন্দাজ’-এ প্রথম কাজ নার্গিসের সঙ্গে | ত্রিকোণ প্রেমের এই ছবিতে বিপরীতে দিলীপ কুমার ছিলেন | প্রথম ছবি থেকেই নার্গিসের প্রতি ভীষণ পসেসিভ হয়ে পড়েন রাজ | স্বাভাবিকভাবে নার্গিস-ও একসময় সারা দেন ব্লু-আইড বয়ের ডাকে | এই প্রেম আরো গভীর হয় ‘বরসাত’-এ কাজের সময় |

আরও পড়ুন:  বিয়ের পরেই একের পর এক বন্ধ রাজের ছবি! তবে কি শুভশ্রী...!?

শোনা কথা, তখন থেকেই নার্গিস আর.কে মুভি-র ঘরের নায়িকা | রাজের সঙ্গে প্রেমের জেরে লোগোতেও জায়গা করেছেন | নার্গিস সেই সময় এতটাই প্রেমে অন্ধ হয়ে গেছিলেন যে, তিন সন্তানের বাবা, বিবাহিত রাজকে বিয়ে করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিলেন | বাড়ি থেকে রোজ কৃষ্ণা রান্না করে পাঠাতেন রাজকে | নার্গিস-ও রান্না করে আনতেন | কৃষ্ণার দেওয়া খাবার ফেলে দিয়ে নিজের রান্না খাওয়াতেন রাজকে |

এরপর ছবির সূত্রে রাজের সঙ্গে মস্কো যান নার্গিস | সেখানে গিয়ে প্রথম ধাক্কা খান তিনি | মস্কোয় সবাই রাজকে নিয়ে মত্ত | তাঁর অভিনয় নিয়ে কারো কৌতূহল নেই | তাঁর পরিচয়, তিনি রাজের দ্বিতীয় স্ত্রী! পরের ধাক্কা, মীনাকুমারীর সঙ্গে রাজের গোপন সম্পর্ক | সেদিনই রাজকে মুখের ওপর উপরে বলা কথা বলেছিলেন নার্গিস | মোক্ষম ধাক্কা খেলেন যেদিন রাজ সরাসরি জানিয়ে দিলেন, তিনি নার্গিসকে বিয়ে করতে পারবেন না | কারণ, কৃষ্ণা এবং তিন সন্তান | প্রেম ভাঙ্গার যন্ত্রনায় অবশ হয়ে ‘চোরি চোরি’-র পর আর রাজের মুখোমুখি হননি নার্গিস | এরপর সুনীল দত্তকে যেদিন বিয়ে করেন সেদিন নাকি দরজা বন্ধ করে টানা চার ঘন্টা অঝোরে কেঁদেছিলেন শো-ম্যান রাজ কপূর |

মস্কো-তে রাজের সঙ্গে যখন মনোমালিন্য হয়েছিল নার্গিসের, তখন রাজ খুব অসুস্থ | আচমকা ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হয়েছে | ওই অবস্থায় রাজকে দেখাশোনা করেছিলেন দক্ষিণী নায়িকা পদ্মিনী | নার্গিসকে ভুলতে এরপর তাঁকেই আঁকড়ে ধরেন রাজ | পদ্মিনীর সেবার প্রতিদান হিসেবে বানান ‘জিস দেশ মে গঙ্গা বহেতি হয়’ | কিন্তু এই প্রেম বেশিদিনের ছিল না | পদ্মিনীর পরে বৈজয়ন্তিমালার সঙ্গে মারাত্মক ভাবে জড়িয়ে পড়েন রাজ | তিনি নাকি লুকিয়ে মন্দিরে বিয়েও করেছিলেন | এবং তাঁর জন্য বাড়ি ছেড়ে, সন্তান নিয়ে হোটেলে এসে উঠেছিলেন কৃষ্ণা | স্বামীকে জানিয়েছিলেন, একের পর এক নারীসঙ্গ আর সঝ্য করতে পারছেন না | সব সম্পর্ক মুছে যদি কৃষ্ণাকে নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারেন তাহলে তিনি সন্তানদের নিয়ে ফিরবেন | সন্তানের মুখ চেয়ে সেদিন রাজ ঘরে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন |

আরও পড়ুন:  বাসে-গাড়িতে উঠলেই মাথাঘোরা, বমি? কোন সহজ পদ্ধতি মানলে এড়াতে পারবেন মোশন সিকনেস?

পরে আত্মজীবনীতে ‘সঙ্গম’-নায়িকা জানিয়েছিলেন, ছবি তৈরির সময় থেকে মুক্তির আগে পর্যন্ত রাজ তাঁর প্রত্যেক নায়িকার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করতেন | শো-ম্যানশিপ ধরে রাখার জন্য | ছবি হিট করানোর জন্য | রাজ কাউকে কোনদিন ভালবাসেননি | সবটাই তাঁর গিমিক | রাজের সঙ্গে তাঁর কিচ্ছু ছিল না | বিয়ে তো অনেক দূরের ব্যাপার |

পরে ঋষি কপূরের বিয়েতে খুব দ্বিধা নিয়ে যখন রাজের বাড়িতে নার্গিস এসেছিলেন, কৃষ্ণা সেদিন সাদরে আপন করে নিয়েছিলেন নার্গিসকে | বলেছিলেন, ‘অতীত মনে করে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ কেন? অতীতকে ভুলে যাও | আমার সঙ্গে তুমিও আনন্দ কর | আজ যে আমার বাড়িতে তুমি অতিথি!’ রাজ-ও নিজের ভুল বুঝেছিলেন শেষ সময়ে | অভিনয় বন্ধ করে দেবার পর সারাক্ষণ কৃষ্ণার সঙ্গে সময় কাটাতেন | আক্ষেপ করে বলতেন, ‘তোমার সঙ্গে বড্ড অন্যায় করেছি কৃষ্ণা|’ মৃত্যুর আগের দিন কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান ফিরেছিল রাজের | অবহেলিত স্ত্রীর হাত ধরে ভেঙ্গে পড়ে বলেছিলেন, ‘চলে যাচ্ছি কৃষ্ণা | আমায় ক্ষমা করবে তো?’            

NO COMMENTS