এই বাদ্যযন্ত্রে মহাদেবকে তুষ্ট করতেন রাবণ‚ এখন ছড় রাজস্থানি বাঞ্জারাদের হাতে

889

রামদেওরা স্টেশনে আগুন ঘিরে দেহাতি জটলা মনে আছে তো ? যেখানে হাতের আংটি দেখে ছদ্মবেশী মন্দার বোসকে চিনে ফেলেছিল ফেলুদা | ওই দৃশ্যে রাজস্থানের লোকসংস্কৃতিকে চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছিলেন সত্যজিৎ | যার অংশ রাবণহাট্টা | সুপ্রাচীন এই সঙ্গীতযন্ত্র ব্যবহার করে আসছেন রাজস্থানি চারণকবি ও লোকশিল্পীরা‚ যুগ যুগ ধরে | এর নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সৃষ্টির উৎস | বলা হয়‚ এই যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন স্বয়ং রাবণ | তিনি বীণাশিল্পী ছিলেন | এবং লঙ্কাধিপতি আবিষ্কৃত এই যন্ত্রকেই বেহালার আদি সংস্করণ বলে ধরা হয় |

রাজস্থান ও গুজরাতে আছে নায়েক সম্প্রদায় | তাঁদের মধ্যে যাঁরা চারণকবি তাঁদের ভোপা-ও বলা হয় | মূলত ধর্মীয় গান এঁদের কণ্ঠে শোনা যায় | এছাড়াও আছে ত্রিশটিরও বেশি যাযবর বা অর্ধ যাযাবর জাতি | তাঁদের মধ্যে বহু আলাদা রীতি রেওয়াজ থাকলেও রাবণহাট্টা কমবেশি সবাই বাজিয়ে থাকেন | মূল যন্ত্র তৈরি বাঁশের | যা লাগানো থাকে নারকোলের খোলে| ছাগলের চামড়ায় তৈরি বাইরের আবরণ | ঘোড়ার কেশরে তৈরি তার এবং বাজানো হয় কাঠের ছড় দিয়ে |

‘ রাবণহস্ত বীণা ‘ থেকেই রাবণহাট্টা | বলা হয়‚ শিবভক্ত রাবণ এই যন্ত্র বাজিয়ে মহাদেবের আরাধনা করতেন | রামচন্দ্রের হাতে রাবণবধের পরে ওই যন্ত্র বাকি হনুমান লঙ্কা থেকে ভারতে এনেছিলেন | তবে লঙ্কা বা সিংহলে যে আদৌ এই যন্ত্র ছিল‚ তার কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই | তবে উপকথা বা কিংবদন্তি যাই হোক না কেন‚ এই যন্ত্র যে পৃথিবীর প্রাচীনতম ছড়সমেত বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে একটি‚ তাতে নিঃসন্দেহ ঐতিহাসিক ও গবেষকরা | পাশ্চাত্যের গবেষকরাও একে মান্যতা দিয়েছেন | ‘Ravanstorm’-কে তাঁরাও আধুনিক বেহালা বা ভায়োলিনের আদি রূপ বলে মনে করেন |

পৃথিবীতে বাদ্যযন্ত্রে ছড় দিয়ে সুর তোলার প্রথম ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায় দশম শতাব্দীতে‚ তুরস্কের বাইজানটাইন ও মধ্যপ্রাচ্যের আরবভূমিতে | আর নির্দিষ্ট করে ‘রাবণহাট্টা’ নামে বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় নান্যদেবের রচনায় | একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর এই পণ্ডিত থাকতেন মিথিলায় | তিনি তাঁর ভারতভাষ্য গ্রন্থে এই বাদ্যযন্ত্রের কথা বলেছেন | পরে সপ্তদশ শতাব্দীতে তামিল কবি রমাভদ্রাম্ভা এর কথা লিখেছেন | তাঞ্জোর রাজসভায় এই যন্ত্র নাকি বাজাতেন কোনও এক মহিলা শিল্পী | অষ্টাদশ শতাব্দীতে এই যন্ত্রকে মালাবারের মূল বাদ্যযন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন এক জার্মান মিশনারি |

ইউরোপের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীতের অধ্যাপক জোপ বোর রাবণহাট্টার উপর বিশদে কাজ করেছেন | গবেষণাপত্রে বলেছেন ভারতে এই যন্ত্র জনপ্রিয় হয় দ্বাদশ শতাব্দীতে | কিন্তু তা তখন সমাজের উচ্চস্তরে জনপ্রিয় ছিল না | রাবণহাট্টা ছিল ভিক্ষুকদের হাতে | শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এর ব্যবহার আরও সঙ্কুচিত হয়েছে | তাঞ্জোরের রাজসভা ব্যতিক্রম | আর সবাই জানে ব্যতিক্রমই প্রচলিত নিয়মকে প্রমাণ করে | রাবণহাট্টার ব্যবহার এখন সীমাবদ্ধ রাজস্থান গুজরাতের চারণকবিদের মধ্যেই | তবে তাঁদের অনেকেই এখন রাজস্থানের বিভিন্ন কেল্লার সামনে বসে রাবণহাট্টায় সুর তোলেন | পর্যটনের অংশ হয়ে গিয়েছে এই দৃশ্য | পর্যটকদের দেওয়া পয়সাই এই শিল্পীদের রুটিরুজি |

ইদানীং বাঞ্জারাদের গ্রাম্য মেঠো দেহাতি এই সুর ব্যবহার করা হচ্ছে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র‚ হোটেল‚ টেলিভিশন বিজ্ঞাপন‚ এমনকী রিয়েলিটি শো-য়েও | তবে অনেকেই জানেন না এর সঙ্গে লুকিয়ে থাকা লোকগাথা |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.