অকালবোধনের পরে যুদ্ধযাত্রা ! দুর্গাপুজোর এক বিশেষ মুহূর্তে রাবণরাজাকে বধ করেছিলেন শ্রী রামচন্দ্র

1681

এক ঋষিকে নিয়ে লেখা নিবন্ধ প্রায় তৈরি | এত্তেলা এল‚ দুর্গাপুজো নিয়ে লিখতে হবে | আমি পৌরাণিক বিষয়-আশয় নিয়েই থাকতে চাইলাম | কটা দিন ভাববার জন্য চাইলাম | প্রস্তাব দিলাম‚ আমি যদি দুর্গার বিপরীত দিক অর্থাৎ দুর্গতি নিয়ে বলি ? আরও স্পষ্ট করে বললে‚ পুরাণে যাঁরা খলনায়ক তাঁদের নিয়ে বলি ? 

পাশ হল আমার প্রস্তাব | প্রথমেই বলে রাখি‚ প্রত্যেক খলনায়কের উৎস কিন্তু একই‚ যেখান থেকে নায়কের সৃষ্টি | জগতে ভালমন্দ দুটো একই সৃষ্টিকর্তার বানানো | কারণ একদিক না থাকলে অন্যদিকের ভালত্ব বা মন্দ দিক পরিস্ফুট হয় না | অন্ধকার না থাকলে বুঝতে পারতেন আলো কাকে বলে ? 

যাই হোক কিছু পৌরাণিক নেগেটিভ চরিত্রকে নিয়ে লিখব মনস্থ করেছি | প্রথমেই সেই জন‚ যিনি না থাকলে রামচন্দ্রের হাতে দেবী দুর্গার অকালবোধন হতো না |  লঙ্কাধিপতি রাবণ |

তিনি উত্তর ভারত বা আর্যাবতে যতটা ঘৃণ্য‚ দাক্ষিণাত্য‚ শ্রীলঙ্কায় ততটাই পূজনীয় | সদ্য নিহত সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশের পদবী খেয়াল করে দেখুন‚ তবেই বুঝবেন ভারতীয় সংস্কৃতিতে কতটা মিশে আছেন দশানন | এছাড়াও বেশ কিছু ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় আছেন যাঁরা নিজেদের রাবণের বংশধর বলে থাকেন |

সপ্তর্ষির অন্যতম ঋষি পুলস্থ্যর পুত্র বিশ্বশ্রবস ঋষি | বিশ্বশ্রবস এবং কৈকেশী বা নিকষার পুত্র রাবণ | ঘোর কৃষ্ণবর্ণের রাবণ পরম শৈব ও প্রাজ্ঞ | ষোড়শ শাস্ত্র এবং চতুর্বেদ ছিল তাঁর নখদর্পণে | আরাধ্য দেবতা শিবের কাছে উৎসর্গ করেছিলেন নিজের জীবন | যতবার মাথা কেটে শিবের পায়ে নিবেদন করেছিলেন‚ ততবার শিব খণ্ডিত মস্তক ফিরিয়ে দিয়েছেন | ফলে রাবণের ঘাড়ে দশটা মাথা | 

মহাপণ্ডিত রাবণ ছিলেন দক্ষ বীণাবাদক | তাঁর রচিত রাবণ সংহিতা আলোকপাত করে জ্যোতিষশাস্ত্রে | আর এক গ্রন্থ অর্ক প্রকাশম রচনা করেছিলেন চিকিৎসা শাস্ত্র ও রাজনীতি নিয়ে | বৈমাত্রেয় অগ্রজ কুবেরকে তাড়িয়ে স্বর্ণলঙ্কার অধিপতি হয়ে বসেন তিনি | রাবণ‚ তাঁর ভাই কুম্ভকর্ণ ও বোন শূর্পনখা ঘোর কৃষ্ণকায় হলেও আর এক ভ্রাতা বিভীষণ ছিলেন গৌরবর্ণ |

মন্দোদরী ব্যতীত রাবণের আরও এক স্ত্রী এবং ইন্দ্রজিৎ ব্যতীত আরও সন্তান ছিল রাবণের | তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন ধন্যামালিনী | ইন্দ্রজিৎ ছাড়া অন্য সন্তানরা হলেন অতিকায়া‚ অক্ষয়কুমার‚ নরন্তক‚ দেবন্তক‚ ত্রিশিরা এবং প্রশস্ত | 

রামায়ণে সীতাকে নিয়ে রাম-রাবণের যুদ্ধের মধ্যে আর গেলাম না | শুধু এটুকু বলে রাখি‚ অযোধ্যার রঘুবংশ এবং স্বর্ণলঙ্কার বিরোধ এক প্রজন্মের নয় | রাম-রাবণের আগে তাঁদের পূর্বপুরুষদের মধ্যেও সম্পর্ক সুমধুর ছিল না মোটেও | 

শ্রীলঙ্কায় রাবণ এতটাই নায়ক‚ যে ওদেশের মানুষের বিশ্বাস করেন বিখ্যাত সেতুবন্ধন কোনও বানরসেনার বানানো নয় | বানিয়েছিলেন স্বয়ং রাবণ | যুদ্ধে ওটা ব্যবহার করে রামচন্দ্র সসেনা প্রবেশ করেছিলেন লঙ্কাপুরীতে | শ্রীলঙ্কার ত্রিঙ্কোমালিতে কোণেশ্বরম তো বিখ্যাত রাবণ ও তাঁর মা নিকষার মন্দির | ইন্দোনেশিয়ার বহু অংশেও পূজিত হন তিনি | বৌদ্ধ ও জৈন সূত্রেও তিনি খলনায়ক নন |

মায়ের কথায় রাবণ গিয়েছিলেন কৈলাস পর্বতকে উৎখাত করে লঙ্কায় নিয়ে যেতে | সেখানে নন্দীঘোষকে পরিহাস করেন তিনি | পরিণামে অভিশাপ পান‚ একদিন বানরসেনার জন্য নির্বংশ হবেন তিনি | কৈলাস পর্বতকে যখন তুলে নিয়েছিলেন রাবণ‚ দেবাদিদেব পায়ের পাতা দিয়ে চেপে ধরেন পাহাড় | পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে রাবণের পা | তাঁর চিৎকারে কেঁপে ওঠে ত্রিলোক | এর পরেই মহাদেবের পরম ভক্ত হয়ে ওঠেন রাবণ | ওই চিৎকারের জন্য শিব তাঁর নামকরণ করেছিলেন রাবণ | অর্থাৎ ত্রিলোকভেদী চিৎকার | 

কামুক রাবণ একবার বেদবতীকে হরণ করতে গিয়েছিলেন | তাঁর হাত থেকে বাঁচতে বেদবতী অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়েছিলেন | অভিশাপ দিয়েছিলেন একদিন নারীকে অপহরণ করে নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে আনবেন রাবণ | এসব অনুঘটক ছিল রামচন্দ্রের হাতে রাবণের বিনাশকালে | তিনি কিন্তু বন্দিনী সীতাকে সম্ভোগ করতে পারেননি | সেখানেও সক্রিয় এক অভিশাপ | রাবণ একবার জোর করে সম্ভোগ করেছিলেন স্বর্গের অপসরা রম্ভাকে | রম্ভা ছিলেন রাবণের সৎ ভাই কুবেরের ছেলে নলকুবেরের প্রেয়সী | এই ঘটনায় রাবণকে অভিশাপ দিয়েছিলেন নলকুবের | তিনি কোনওদিন কোনও নারীর ইচ্ছের বিরুদ্ধে সম্ভোগ করতে গেলে তাঁর মাথা ফেটে যাবে |

পরিশেষে জানিয়ে রাখি‚ বিষ্ণুর ইচ্ছেতেই তাঁর দুই দ্বারপাল জয় ও বিজয় জন্ম জন্মান্তরে তাঁর শত্রু হয়ে জন্মান | সেরকমই এক জন্মে একজন ছিলেন রাবণ | বিষ্ণুর অবতার রামচন্দ্রের হাতে মুক্তি পান মৃত্যুকালে | অকালবোধন করে শ্রী রামচন্দ্র তো যুদ্ধযাত্রা করলেন | তারপর অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণকে বধ করেছিলেন তিনি | যে মুহূর্তকে আমরা সবাই চিনি সন্ধিপুজো বলে |

(পুনর্মুদ্রিত )

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.