প্রেতাত্মাকে বন্দি করার জন্য তৈরি বাড়ি এখন নিজেই একটি ভূতুড়ে গোলকধাঁধাঁ

1798

পৃথিবীর অন্যতম আলোচিত হন্টেড হাউস বা ভুতুড়ে বাড়ি হল ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত উইনচেস্টার হাউস। এ বাড়িটির অবস্থান উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান জোস-এ। বাড়ির মালিক ছিলেন উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টার নামের এক ভদ্রলোক। ১৮৮১ সালের সাত মার্চ কানেক্টিকাটের ওয়েস্ট হেভেনের এক হাসপাতালে মারা যান যক্ষ্মায় আক্রান্ত উইলিয়াম উইর্ট উইনচেস্টার। তিনি ছিলেন উইনচেস্টার রিপিটিং আর্মস কম্পানির কোষাধ্যক্ষ। আমেরিকার বিখ্যাত এই অস্ত্র উৎপাদনকারী কম্পানিটির অর্ধেক মালিকানাও ছিল তাঁর। উইলিয়ামের মৃত্যুতে তাই স্ত্রী সারাহ উইনচেস্টার বিশাল সম্পত্তির মালিক হন। উইনচেস্টার কম্পানির অর্ধেক মালিকানা, সঙ্গে উইলিয়ামের রেখে যাওয়া দুই কোটি ডলারের সম্পদ। ১৮৬৬ সালে আচমকাই উইলিয়াম দম্পতির একমাত্র কন্যারও মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পরেই সারাহ একজন এমন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন যিনি মৃত অতৃপ্ত আত্মাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। সারাহ মূলত তাঁর স্বামী ও তাঁর মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্যই সাহায্য নিতেন ওই ব্যক্তির।

শোনা যায়, ওই ব্যক্তির সাহায্য নিয়েই নাকি উইলিয়াম তার বিধবা স্ত্রীকে জানান, অস্ত্র ব্যবসায়ী উইনচেস্টারের সংস্থার তৈরি রাইফেল দিয়েই বেশ কয়েকবছর আগে, এক দম্পতি ও তাঁদের ছয় মাসের কন্যা সন্তানকে হত্যা করা হয়। অতৃপ্ত সেই দম্পতির আত্মাই, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই উইনচেস্টার পরিবারকে শাস্তি দিতে চায়, তাই সে সারাহ-কেও হত্যা করবে বলে জানান উইলিয়াম। তাই সারাহ যদি নিজেকে রক্ষা করতে চায় তবে তাঁকে এই বসতবাড়ি ভেঙে এমন একটি বাড়ি নির্মাণ করতে হবে, যেই বাড়ির নির্মাণ কাজ যতদিন চলবে ততদিন সারাহ বেঁচে থাকবে, আর যখনই এই বাড়ি তৈরির কাজ বন্ধ হয়ে যাবে তখনই তাঁরও মৃত্যু হবে।

এরপরেই নিউ হেভেন এর কানেকটিকাটের পশ্চিমদিকে এই বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেন সারাহ। ১৮৮৪ সাল থেকে শুরু হয়ে টানা ৩৮ বছর ধরে দিন-রাত চলতে থাকে এর নির্মাণ কাজ। বাড়িটি বানানোর জন্য পুরোও প্রাসাদের কোনও মাস্টারপ্ল্যানও ছিল না। প্রতিদিনই সকালে উঠে হেডমিস্ত্রির সঙ্গে বসতেন। প্রতিদিনের কাজের জন্য নকশা করে দিতেন। সেই অনুযায়ী তারা কাজ করত। এক দিনের কাজের সঙ্গে আরেক দিনের কাজের তেমন কোনও মিলও থাকত না। সে কারণেই বাড়িটিতে এমন অজস্র হেঁয়ালির জন্ম। বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সারাহ। এই বাড়িটি তৈরি করতে যাদের নিয়োগ করা হয়েছিল তারা বাড়িটির সাততলা অবধি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দিন-রাত পরিশ্রম করেছিলেন।

চারপাশে বাগানঘেরা সে প্রাসাদটিকে বাইরে থেকে দেখতে ভালোই লাগে। গোলমালটা বোঝা যায় ভেতরে ঢুকলে। বাড়িটির ভেতরের স্থাপত্য রীতিমতো ভুতুড়ে। ১৬০ টি ঘর বিশিষ্ট এই বাড়িটি একটি গোলকধাঁধাঁর মতো! এতে রয়েছে এক ঘর থেকে আরেকটি ঘরে যাওয়ার একাধিক গোপন পথ। এই বাড়িটির সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হল, এখানে এমন একএকটি ঘর আছে যেখানে একটি দরজা দিয়ে ঢোকা যায়, আর বের হওয়া যায় তিনটি দরজা দিয়ে। এই গোলকধাঁধায় একটি দরজা আছে যেটি খুলে পা বাড়ালে সোজা গিয়ে পড়বেন আট ফুট নিচে কিচেনে! আবার এমনও সিঁড়ি আছে যেটা ঠেকেছে গিয়ে সিলিংয়ে। রয়েছে এমন বেশকিছু সিঁড়িও যা দিয়ে বের হতে পারবেন না কোথাও! এগুলি এছাড়াও বাড়িটিতে রয়েছে একশো ষাটটি রুম, চল্লিশটি বেড রুম, ত্রিশটি বাথ রুম, ১০,০০০ টি জানালা, ২,০০০টি সিঁড়ি, সাতচল্লিশটি ফায়ার প্লেস। তবে এত বড় বাড়িতে বিশাল মাপের মাত্র দুটো আয়না ছিল। সারাহ বিশ্বাস করতেন এই মুখোমুখি রাখা আয়নাতে আটক হবে অতৃপ্ত আত্মারা।

প্রচুর অর্থের বিনিময়ে সারাহ গোলকধাঁধাঁর মতো করে এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন যাতে মৃত প্রেতাত্মারা বাড়িতে ঢুকলেও তাকে কখনই খুঁজে না পায় এবং এক সময় পথ হারিয়ে ফেলে। সোনা-রুপার ঝাড়বাতি, জার্মানি থেকে আনা রূপো-তামার দরজা, নকশা কাটা কাঠের মেঝে, বাথরুমে গরম জলের ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক-হাইড্রলিক দুই ধরনের লিফট আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাই রেখেছিলেন তিনি। ঘর সাজাতে ব্যবহার করেছিলেন দামি সব সিল্ক-লিনেন-শাটিন কাপড়, যেগুলি আনিয়েছিলেন পারস্য আর ভারত থেকে। সব মিলিয়ে বাড়িটি বানাতে তখনকার দিনেই খরচ করেছিলেন প্রায় পঞ্চান্ন লাখ ডলার। ১৯২২ সালের পাঁচই সেপ্টেম্বর ঘুমের মধ্যেই মারা যান সারাহ উইনচেস্টার। আটত্রিশ বছরের মাথায় তৎক্ষণাৎ স্থগিত হয়ে পড়ে বাড়ি নির্মাণের কাজও। তখন থেকেই ‘উইনচেস্টার মিসট্রি হাউস’ শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রতেই নয়, বিশ্বজুড়ে আজও এটি এক ভূতুড়ে গোলকধাঁধার আশ্চর্য নিদর্শন হিসেবেই সকলের কাছেই কৌতুহলের বিষয় হয়েই রয়ে গিয়েছে।

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.