গোলাপগন্ধে সুবাসিত নীল কাগজে লেডি মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি লিখতেন পণ্ডিত নেহরু

2357

ক্রিকেট বিশেষ না বুঝলেও ভাল লেগেছিল আমির খানের ‘লগান’ | মনে দাগ কেটে গিয়েছিল ভুবন আর এলিজাবেথের সম্পর্ক | সেইসঙ্গে মাথায় নড়েছিল একটা পোকা | অতীতে শোনা আবছা স্মৃতি উস্কে গিয়েছিল | মনে হয়েছিল আচ্ছা‚ পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে লেডি মাউন্টব্যাটেনের সম্পর্ক কীরকম ছিল ?

তবে এতটা পড়ে প্লিজ ভাববেন না‚ দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকে আমি চাষাভুষোর স্তরে নামিয়ে আনছি | আমি বলতে চাইছি‚ সবই আসলে রূপক মাত্র | যাই হোক‚ ওঁদের সম্পর্ক নিয়ে একটা বেশ ভাল বই হাতে এল | ‘লগান’ দেখার বেশ কয়েক বছর পরে | সে বই হল Indian Summer: The Secret History Of The End Of An Empire | লিখেছেন Alex Von Tunzelmann |

লেখক দাবি করেছেন‚ তিনি নাকি এডুইনাকে লেখা নেহরুর বেশ কিছু চিঠি পড়েছেন | এবং দুজনের সম্পর্ক কত গভীর ছিল তা অনুভব করা যায়‚ ওই চিঠিগুলো পড়লে |

ব্রিটিশ নাগরিক টানজেলমান বলছেন‚ এডুইনা-নেহরুর মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল সেটা অবশ্যই সুগভীর প্রণয় | কিন্তু সেখানে যৌনতার কোনও জায়গা ছিল না | কারণ তার জন্য দুজনের কাছে সময় ছিল না |

প্রেমে পড়ার জন্য কোনও বয়স লাগে না | অনুঘটক হিসেবে দরকার দুজনের একাকীত্ব | সেদিক থেকে পরিস্থিতি প্রস্তুত ছিল নেহরু-এডুইনার জন্য | নেহরু ছিলেন বিপত্নীক | অন্যদিকে‚ এডুইনা ছিলেন নিঃসঙ্গ | তাঁর সঙ্গে স্বামী লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সম্পর্ক ছিল খুব জটিল | তাছাড়া‚ মানসিক ভাবে নেহরু-এডুইনার নৈকট্যের কারণ ছিল তাঁদের ওয়েভ লেংথ-এর মিল |

সবথেকে আশ্চর্য হল‚ দুজনের সম্পর্ক সম্পূর্ণ জ্ঞাত ছিল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে | এবং তাতে তাঁর প্রচ্ছন্ন সমর্থনও ছিল | তাঁর কাছে স্ত্রীর প্রণয় নতুন কিছু ছিল না | কারণ লেডি মাউন্টব্যাটেনের একাধিক প্রণয়ী ছিল বলে মনে করেন জীবনীকাররা | কিন্তু নেহরুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সবথেকে গভীর | নেহরুর জন্য এডুইনা কোনওদিন স্বামীকে ছেড়ে যেতে চাননি | কিন্তু শোনা যায়‚ আগের প্রণয়ের ক্ষেত্রে তিনি বিবাহবিচ্ছেদের কথা বলতেন | আর লর্ড মাউন্টব্যাটেন তাঁর সামাজিক ভাবমূর্তির কথা ভেবে চাননি পারিবারিক ভাবমূর্তি আহত হোক | তাই‚ মনে করা হয়‚ নেহরু-এডুইনা সম্পর্ক তাঁর কাছে অনেক বেশি কম থ্রেটনিং ছিল |

তবে একদল ঐতিহাসিকরা বলেন অন্য কথা | বলেন‚ নেহরু-এডুইনা সম্পর্ক লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল | এর সাহায্যে নেহরু তথা ভারতের উপর নিজের প্রভাব কায়েম করে রাখতে চেয়েছিলেন ভারতের শেষ ভাইসরয় | উদ্দেশ্য যাই হোক‚ নেহরু-এডুইনা ঘনিষ্ঠতা যে হয়েছিল‚ সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কার্যত নেই |

দুজনে একান্তে কাটিয়ে দিতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা | একসময় নেহরু রোজ এডুইনাকে চিঠি লিখতেন | বিষয়বস্তুর প্রাচুর্য ছিল অনেক | কোনও কোনও চিঠি ছিল শুধুই দেশের সমস্যা নিয়ে লেখা | বেশিরভাগ চিঠি নেহরু লিখতেন নীল কাগজে | কোনও কোনওটার মাঝে দেওয়া থাকত গোলাপের সুবাস | মনের মানবীকে উপহার দিতেও কার্পণ্য করেননি পণ্ডিতজি | দিয়েছেন আমেরিকার চিনি‚ মিশরের সিগার‚ সিকিমের শুকনো ফার্ন এবং ভাস্কর্যের বই | যেখানে ছিল কোণার্কের সূর্যমন্দিরের ভাস্কর্যের ছবি | শোনা যায়‚ সেই বই দেখে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন এডুইনা |

তবে নেহরুর চিঠি যে এডুইনার কাছে অমূল্য সম্পদ ছিল সেটা বোঝা যায় তাঁর মৃত্যুর পরে | ১৯৬০-এর ২১ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫৮ বছর বয়সে মৃত্যু হয় এডুইনার | তিনি তখন মালয়েশিয়ায় সফরে ছিলেন | মৃত্যুর সময়ে তাঁর শয্যার পাশে টেবিলে রাখা ছিল চিঠির বাক্স | ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল চিঠি | প্রতিটার প্রেরক ছিলেন জওহরলাল নেহরু | অর্থাৎ জীবনের শেষ মুহূর্তে ওই চিঠিগুলো ছিল বিশ্বের তৎকালীন ধনীতম মহিলাদের মধ্যে অন্যতম‚ এডুইনা মাউন্টব্যাটেনের ভরসার বড় আধার | পরে তাঁর স্মৃতিতে পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছিলেন নেহরু |

নেহরু-এডুইনা সম্পর্কের উল্লেখ আছে জ্যানেট মর্গ্যানের লেখা বই Edwina Mountbatten:A Life Of Her Own-তেও | জ্যানেট নাকি নিজে দেখেছেন এডুইনাকে লেখা নেহরুর চিঠি | তাঁর দাবি‚ দুজনের মধ্যে কয়েক হাজার চিঠি লেখালেখি হয়েছিল | তার মধ্যে গোটাকতক মাত্র এখন দেখা যায় | বিশেষজ্ঞরা মনে করেন‚দুজনের সম্পর্ক আরও ভালভাবে বোঝা যেত যদি নেহরুকে লেখা এডুইনার চিঠি পাওয়া যেত | কিন্তু নেহরু-গান্ধী পরিবারের চূড়ান্ত গোপনীয়তায় সে এখনও সম্ভব হয়নি | কোনওদিন তা সামনে আসার সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ |

মায়ের সঙ্গে নেহরুর সম্পর্ক নিয়ে লিখেছিলেন মাউন্টব্যাটেন কন্যা প্যামেলা হিকসও | তিনি তাঁর আত্মজীবনী Daughter of Empire-এ লিখেছেন মা এডুইনাকে লেখা জওহরলাল নেহরুর চিঠি তিনি পড়েছেন | উপলব্ধি করেছেন দুজনের সম্পর্কের গভীরতা | কিন্তু প্যামেলা আশ্চর্য হয়েছেন তাঁর বাবার নিস্পৃহতা দেখে | লর্ড মাউন্টব্যাটেনের নিরাসক্তি এবং ঈর্ষাহীনতাই সংসারে ফাটল ধরায়নি বলে মনে করেন প্যামেলা | তিনি কখনও দুজনের সম্পর্কে নাক গলাননি |

পরিশেষে আসি যেখান থেকে শুরু করেছিলাম‚ সেখানে |টানজেলমানের বইয়ের কথায় | তিনি এক জায়গায় বলেছিলেন‚ নেহরুকে লেখা এডুইনার চিঠি তিনি পড়তে চেয়েছিলেন | কিন্তু ভারতে এসে কোনও সাহায্য পাননি | সেইসঙ্গে আর একটা কথাও বলেছেন টানজেলমান | দাবি করেছেন‚ নেহরুকে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত বা সাহায্য (যে যেভাবে দেখেন) করতেন এডুইনা মাউন্টব্যাটেন | লিগ অফ নেশনস-এ ভারতের যোগদানে নাকি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয় |

কিন্তু টানজেলমানের সব মন্তব্য আমার নিরপেক্ষ মনে হয়নি | তিনি বলেছেন‚ ভারত ভাগের ইচ্ছা নাকি মাউন্টব্যাটেনের ছিল না | মহম্মদ আলি জিন্নাহও নাকি দেশভাগ চাননি | আমার মনে হয়‚ এইসব মন্তব্যের ক্ষেত্রে তিনি নিজের ব্রিটিশ সত্তা অতিক্রম করতে পারেননি | এছাড়া তিনি মাউন্টব্যাটেন দম্পতিকে বড় বেশি ভারতবন্ধু হিসেবে দেখিয়েছেন |

তবে‚ এ যাবৎ নেহরু-এডুইনা সম্পর্ক নিয়ে যা জেনেছি‚ সর্বত্র দেখেছি‚ দুজনের সম্পর্ককে সবাই প্লেটোনিক পর্যায়ে আখ্যা দিয়েছেন | যৌনতা সংক্রান্ত কোনও গন্ধ সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না | বরং তাঁদের সম্পর্ককে ‘স্বর্গীয়’ বলে বর্ণনা করেছেন স্বয়ং মাউন্টব্যাটেন কন্যা প্যামেলা |

(পুনর্মুদ্রিত)

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.