মূষিক নিয়ন্ত্রণেই এখন পর্বতের মূষিক প্রসব দশা

137

আমরা যেমন বসবাস করি মাটির উপরে, তাঁরা বাস করেন মাটির নিচে | আমরা দিনে কাজে ব্যস্ত থাকি, আর শহরের আলো নিভে মানুষ ঘুমে ঢুলে পড়লে আমাদের ফেলা বিপুল পরিমাণ জঞ্জালের স্তূপে মহাভোজ সারতে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসেন তাঁরা, অর্থাৎ ইঁদুরেরা | এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে আটকানো যেতে পারে ইঁদুরের অনুপ্রবেশ | ইলেকট্রিকের তার হোক বা জলের পাইপ, যেকোনও জিনিস বেয়েই নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছে যেতে সিদ্ধপদ | ইঁদুরের মধ্যেই আছে নানা ধরণ | সবথেকে বেশি পরিমানে দেখা যায় কালো ইঁদুর ( র‍্যাটাস র‍্যাটাস ) এবং বাদামি ইঁদুর ( র‍্যাটাস নরভেগিসাস ) | এদের কেউ থাকে মাটির তলায়, কেউ আবার থাকে গাছের মাথায় |

মানুষের বর্জ্য পদার্থই ইঁদুরের বেঁচে থাকার প্রধানতম খোরাক | একদিক দিয়ে দেখতে গেলে মানুষের বর্জ্য পদার্থ ইঁদুরদের এমন বিপুল সংখ্যায় টিকে থাকতে পারার অন্যতম প্রধান একটি কারণ | কিন্তু তার জন্য ধন্যবাদ জানানো বহুদূর, ইঁদুর যুগে যুগে মানুষকে উপহার দিয়ে এসেছে প্লেগের মত মারণরোগ | গত কয়েক দশকে ইঁদুরের সংখ্যা অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে | বিশেষজ্ঞদের মতে আগের তুলনায় প্রায় পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে ইঁদুরের সংখ্যায় | পৃথিবীর বহু দেশেই এখনও পর্যন্ত যেখানে ইঁদুরের মাংস খাওয়ার চল-সেখানে আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যাঁদের ইঁদুরের প্রতি রয়েছে ভয় বা ঘেন্না |

রোডেন্টোলজিস্ট ববি করিগ্যান ইঁদুর সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ | ববি জানাচ্ছেন ইঁদুরের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সরাসরিভাবে যুক্ত আছে মানুষের জনবিস্ফোরণ | আর আমাদের আশেপাশের জায়গা আমরা পরিষ্কার রাখি না বলেই ইঁদুর নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবার পেয়ে যায় | ইঁদুর যেখানে জন্মায় তার আশেপাশের ১৫০ ফিট জায়গার মধ্যে থেকে নিজেদের খাবার জোগাড় করে নিতে পারে | ইরাকে পাওয়া গিয়েছিল সবথেকে বড় ইঁদুরটি যার ওজন ছিল  প্রায় আঠাশ গ্রাম | ইঁদুরের বাসার একটি মুখ্য প্রবেশ পথ সহ আরও দুটি বেরোনোর পথ থাকে, যাতে প্রয়োজন পড়লে সেই আপদকালীন সুড়ঙ্গপথ দিয়ে পালানো যায় |

সমীক্ষা থেকে জানা যায় একটি প্রাপ্তবয়স্ক ইঁদুর দুই থেকে চোদ্দটি পর্যন্ত শিশুর জন্ম একেবারে দিতে পারে | দশ সপ্তাহ বয়সের ন’টি ইঁদুর ৩০ সপ্তাহের মাথায় ২৭০ টি ইঁদুরে পরিণত হতে পারে এবং বছরের শেষে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়াতে পারে ১১,৯০৭-এ | ১২ সপ্তাহ বয়স থেকেই ইঁদুর সন্তানের জন্ম দিতে পারে | এদের জননের হার নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপরে | যত বেশি বর্জ্য পদার্থ ও থাকার জায়গা এরা পাবে, জননের হার ততই বেশি বাড়তে থাকবে |

দেশে বিদেশে ইঁদুরের বাড়তে থাকা সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে নানা রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয় আঞ্চলিক বাসিন্দা ও সরকারের পক্ষ থেকে যৌথ উদ্যোগে | আগেকার দিনে ব্যবহৃত হওয়া ইঁদুর মারা বিষের কোনও কার্যকারিতা এখন আর দেখা যায় না | কারণ সেই বিষের বিষক্রিয়া প্রতিরোধ করার ক্ষমতা ইঁদুরেরা শিখে নিয়েছে | খাঁচায় বন্দি ইঁদুরকে মুক্ত করে নিয়ে যাচ্ছে সঙ্গী ইঁদুররা | তাই ইঁদুরের উৎপাত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিষপ্রয়োগ, খাঁচায় ধরে মারা, হকি স্টিক দিয়ে মারা বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর দিয়ে ইঁদুর মারার পদ্ধতিগুলি যথেষ্ট নয় | ভাবা হচ্ছে এমনই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কথা যার সাহায্যে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনিকে ইঁদুরদের মধ্যে সঞ্চারিত করে দেওয়া যেতে পারে জনননিরোধক জিন |

আফ্রিকার উৎপাদিত মোট ফসলের প্রায় পনেরো শতাংশ ফসল মাঠের ইঁদুরই খেয়ে ফেলে | সুদূর অতীতকালে ভারতবর্ষ ইঁদুরের অন্যতম উৎপত্তিস্থল ছিল | এশিয়া মহাদেশে শুধুমাত্র ইঁদুর যে পরিমাণ খাবার খায় তাতে অন্তত ২০ লক্ষ মানুষের আহার জোগান দেওয়া সম্ভব হত | বহু পাখির ডিম বা ছোট ছানা খেয়ে নিচ্ছে ইঁদুর | নানা ছোট ছোট পশুপাখির জীবনসংকট ঘনিয়ে আসছে ইঁদুরদের জন্য | বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সবথেকে বেশি প্রয়োজন বর্জ্য পদার্থের সুষম ব্যবস্থাপনা | নইলে ইঁদুরের উপদ্রব কাটিয়ে উঠতে পারা আসন্ন সময়ে আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন তাঁরা |প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ইঁদুরের অস্তিত্ব অবশ্যই প্রয়োজন | কিন্তু একইসঙ্গে দরকার মূষিকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ | নইলে আশু বিপদ |

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.