ব্রিটিশ শাসনের ভিত টলিয়ে দেওয়া একদল ‘পাগল’ আজ বিস্মৃত

বিদ্রোহকে যে নামেই ডাকো না কেন‚ তা আদপে বিদ্রোহই থাকে | তাই পাগল পন্থী হোক বা সন্ন্যাস বিদ্রোহ‚ তা ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অবদমিত শোষিত মুখগুলোর গর্জন | অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে তখন বাংলায় একদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি‚ অন্যদিকে অত্যাচারী জমিদার | দু পক্ষের মাঝে জাঁতাকলে নাভিশ্বাস সাধারণ মানুষের | আজকের মেঘালয় ও বাংলাদেশের সীমান্তে এই কৃষক বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মূলত সন্ন্যাসী ও ফকিরের দল |

কৃষকদের সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহের সুফি ফকির করিম শাহ | স্থানীয় গারো ও হাজোং উপজাতির কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন | করিম শাহ অনুপ্রেরণা পেয়েহ্চিলেন তাঁর গুরু মঞ্জু শাহ-র থেকে | কানপুরে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে হওয়া সন্ন্যাস বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মঞ্জু | 

করিম শাহ অনুভব করেছিলেন কৃষক বিদ্রোহের আগে যা দরকার তা হল‚ সামাজিক অবস্থানের আমূল পরিবর্তন | তখন ধর্ম ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমাজ বহু অংশে বিভক্ত | সমাজে বৈষম্য দূর করে সাম্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন | তার জন্য একেশ্বরবাদ উপযোগী বলে মনে হয়েছিল তাঁর | করিম শাহ-র ব্যক্তিত্বের জাদুতে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দলে দলে গরিব গুর্বো নিম্নবর্ণের মানুষ এসে জড়ো হলেন তাঁর পাশে | করিম শাহ হয়ে গেলেন পাগলা বাবা | আর তাঁর অনুগামীরা পাগলাপন্থী | 

১৮১৩ সালে প্রয়াত হলেন করিম শাহ | বিদ্রোহ কিন্তু বন্ধ হল না | বরং জোয়ার এল প্রতিবাদের ঢেউয়ে | নেতৃত্বে করিমের ছেলে টিপু শাহ | এতটাই ছিল অভিঘাত‚ যে পাগলপন্থীরা সরকার গড়ে ফেলল | ময়মনসিংহের শেরপুরে টানা দু বছর ধরে ছিল সেই সরকারের শাসন | 

কিন্তু ধীরে ধীরে আলগা হল বাঁধন | ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে গ্রেফতার হলেন টিপু শাহ | দীর্ঘ ব্রিটিশ অত্যাচার সহ্য করে তিনি প্রয়াত হলেন জেলেই‚ ১৮৫২ সালে | ততদিনে আন্দোলন বা বিদ্রোহ ছত্রভঙ্গ | ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন কর ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও খর্ব হয় জমিদার শ্রেণীর ক্ষমতা | ফলে কৃষকরাও আর অতটা সামিল হয়নি প্রতিবাদে | 

অতীতের এই সহায়সম্বলহীন মুখগুলো আজ বিস্মৃত বললেও কম বলা হয় | ইতিহাস বইয়ের এক কোণায় মুখ লুকিয়েছে তাদের প্রতিরোধ | আমাদের কাছে পাগল মানে শুধুই অস্বাভাবিক ও বিকারগ্রস্ত |  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

কফি হাউসের আড্ডায় গানের চর্চা discussing music over coffee at coffee house

যদি বলো গান

ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স-এ সারা রাত ক্লাসিক্যাল বাজনা বা গান শোনা ছিল শিক্ষিত ও রুচিমানের অভিজ্ঞান। বাড়িতে আনকোরা কেউ এলে দু-চার জন ওস্তাদজির নাম করে ফেলতে পারলে, অন্য পক্ষের চোখে অপার সম্ভ্রম। শিক্ষিত হওয়ার একটা লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল সংগীতের সঙ্গে একটা বন্ধুতা পাতানো।