কঠিনেরে ভালোবাসিলাম

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Akhteruzzaman Elias আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পোর্ট্রেট এঁকেছেন স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পোর্ট্রেট এঁকেছেন স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

আজ আখতারুজ্জামানের জন্মদিন। ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রয়াণের পরেও দু’টি দশক অতিক্রান্ত। তিনি সেই বিরল বাংলা সাহিত্যিকদের একজন যিনি প্রয়াণের আগেও যতখানি আদৃত ছিলেন, প্রয়াণের পরেও ঠিক ততখানিই আদৃত। মেধাবী পাঠকের কাছে তাঁর আদর বরং ক্রমশ বাড়ছে।

 আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই পাঠক-সমাদৃত হওয়ার ঘটনাটি একদিক থেকে বেশ আশ্চর্যজনক বটে! দিবানিদ্রার আগে যে-আখ্যান পড়তে গড়পরতা বাঙালি পাঠক অভ্যস্ত, তিনি তো ঠিক সেই আখ্যানের নির্মাতা ছিলেন না। তাঁর ‘খোয়াবনামা’ গ্রন্থটির ব্লার্বে লেখা রয়েছে, “ইচ্ছাসুখ কল্পিত কোনো আখ্যান রচনা নয়, নির্মিত-আত্মজীবনের মৌল, তার কৃৎকৌশলের সন্ধানই তাঁর কাছে সৎ-ভাবুক হিসেবে লেখক হিসেবে একমাত্র কাজ বলতে যদি কিছু বোঝায় তা-ই। আমাদের গল্পে, উপন্যাসে যে একরৈখিক বিবরণের সঙ্গে আমরা পরিচিত, আখতারুজ্জামান স্বেচ্ছায় সেই স্রোতের বিপরীতে যাত্রা করেন”। এর চেয়ে সঠিক মূল্যায়ন আখ্যানকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আর হতে পারে না। এই কথাকটির পরে আর একটি শব্দও না লিখলেও বোঝা যায় কোন জাতের লেখক আখতারুজ্জামান ।

‘ইচ্ছাসুখ’ নির্মিত কোনও কাহিনির নির্মাতা তিনি কোনওকালেই ছিলেন না। একজন সৎ ভাবুক লেখকের যে-আখ্যান রচনা করা উচিত, আখতারুজ্জামান সেই আখ্যানই রচনা করেছেন। “সংস্কৃতির ভাঙা সেতু” শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “একথা ঠিক যে আমাদের কথাসাহিত্যে আঙ্গিক আগের চেয়ে মার্জিত ও পরিণত রূপ লাভ করেছে। সুখপাঠ্য গল্প-উপন্যাস অনেক লেখা হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ গল্প-উপন্যাস পড়ে মনে হয় যে একই ব্যক্তি বিভিন্ন নামে নানা কায়দায় একটি মাত্র কাহিনী বয়ান করছেন। সেই কাহিনীও আবার নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা নয়, তিরিশের দশকের কোনো প্রতিভাবান বা চল্লিশেরর কোনো বুদ্ধিমান লেখকের অভিজ্ঞতা বা পর্যবেক্ষণের তরল ও বিকৃত সংস্করণ। …একটু তদন্ত করলে দেখা যায় যে এগুলোর বিষয়বস্তু প্রায় একই ধরনের—ছিঁচকাদুনে প্রেম ও ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি মার্কা সেক্সের সঙ্গে উদ্ভট ও অভিনব বিপ্লবী প্রসঙ্গ চটকাবার ফলে এগুলো বেশ আঠালো হয় এবং পাঠক একনাগাড়ে কয়েক ঘন্টা এর সঙ্গে সেঁটে থাকেন। পাঠকদের সেঁটে রাখার কায়দা লেখকদের বেশ ভালোই রপ্ত হয়েছে। এজন্য এদের জাদুগিরি বলে হাততালি দেওয়া যায়, কিন্তু শিল্প বলে মেনে নেওয়া মুশকিল”। পুরোনো এই কথাগুলো আজকের বাংলা কথাসাহিত্য সম্পর্কেও কি অনেকাংশেই প্রযোজ্য নয়? মনে হয় যেন যেসব আখ্যান নির্মিত হচ্ছে আজ আখতারুজ্জামান এই কথাকটি লিখছেন সেই আখ্যানগুলিকে নিয়েই। বেশ বোঝা যায় যে, আখ্যানকার হিসেবে ঠিক কোথায় নিজেকে অবস্থিত করতে চান তিনি। কেন তিনি দেখাতে চান সেই বাস্তবতা, যা প্রায়শই ‘ইচ্ছাসুখ’ নির্মিত কাহিনি বর্জন করে থাকে।

অবশ্য বাস্তবতার কথা এলে মনে পড়ে আখতারুজ্জামানের অন্য একটি প্রবন্ধের কথা।  প্রবন্ধটির শিরোনাম, “উপন্যাস ও সমাজবাস্তবতা”। এই প্রবন্ধে একজন কথাসাহিত্যিক ঠিক কোথায় একজন মহৎ কবির থেকে আলাদা সে-বিষয়ে বেশ কিছু কথা বলেছেন আখতারুজ্জামান। ঘোষণা করেছেন:

“প্রতিভার উর্দির ভেতর বসে কবি নিরাপদে কখনো জ্বলে ওঠেন বজ্রের মতো, কখনো ঘৃণায় বিস্ফারিত হন, কখনো-বা প্রেমে নুয়ে পড়েন, কখনো-বা বাৎসল্যে স্নিগ্ধ হয়ে ওঠেন। তাঁর অনুভূতি বা উপলব্ধিকে কবি সম্পূর্ণ নিজের মতো করে প্রকাশ করতে পারেন, তাঁর নিজের স্বভাব ও রুচির পথ ধরে তাঁর অনুসন্ধান চলে। ব্যক্তির প্রবলরকম উত্থানের পর কবির স্বতঃস্ফূর্ততা অনেক বেড়েছে। যে-কোনো শিল্পীর মতো তিনিও স্বেচ্ছাচারী হতে পারেন না, কিন্তু নতুন প্রকরণ তাঁকে এতটা স্বাধীনতা দিয়েছে যে তিনি নিজের জগৎকে গড়ে তুলতে পারেন নিজের রুচি মতো।

কথাসাহিত্যিক যে কারও অধীনে কাজ করেন তা নয়। শুরু থেকে তিনিও তৎপর ব্যক্তির স্বরূপসন্ধানে। কিন্তু তাঁকে এই কাজটি করতে হয় চারপাশের প্রেক্ষিতকে গুরুত্ব দিয়ে।…পেত্রার্কা যেখানে নতুন প্রকরণে নিজের চেতনাকেই প্রাধান্য দিয়ে ব্যক্তির উন্মোচন করার কবোষ্ণ কাজে মগ্ন থাকেন, বোকাচ্চো সেখানে ব্যক্তিকে দেখেন আরও সব মানুষের অবস্থান এবং সমস্ত পরিবেশের ভেতর। তখন লেখক আর কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারেন না, সত্যকে জ্ঞাপন করার জন্য তাঁকে নানা ধরনের মানুষকে তুলে ধরতে হয় যা হয়তো তাঁর রুচি কিংবা তাঁর স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না। কবির মতো কথা সাহিত্যিকও সত্য-অনুসন্ধানে ব্যাপৃত, কিন্তু কবির দায়িত্ব তার সারাৎসারটি প্রকাশ করা, কিন্তু এই সত্যটিকে জ্ঞাপন করার জন্য কথাসাহিত্যিককে পরিভ্রমণ করতে হয় বড় দীর্ঘ ও কখনো কখনো অস্বস্তিকর পথ। …পাঠকের কাছে কবি প্রায় ঋষিতুল্য ব্যক্তি, তিনি সর্বজ্ঞ, সত্য উপলব্ধির নির্যাস দিয়ে তিনি জীবন সম্বন্ধে গভীর সত্যটিকে পাইয়ে দেন সবাইকে। কথাসাহিত্যিকের কাজও তাঁর সত্যটিকে প্রকাশ করা। কিন্তু মানুষের জীবনযাপন সেখানে খুব জরুরি, বলতে গেলে সবচেয়ে জরুরি বিষয়। এই জীবনযাপন বেশিরভাগ সময়েই একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর। এর ভেতরকার স্পন্দনটিকে তাঁকে বার করতে হয়। কান টানলে যেমন মাথা আসে, ব্যক্তির জীবন বলতে গেলে চলে আসে সমাজ। সমাজের বাস্তব চেহারা তাঁকে তুলে ধরতে হয় এবং শুধু স্থিরচিত্র নয়, তার ভেতরকার স্পন্দনটিই বুঝতে পারা কথাসাহিত্যিকের প্রধান লক্ষ্য।”

দীর্ঘ এই উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করতেই হল কারণ, এই বাক্যগুলির ভেতরে ধৃত রয়েছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সমাজবাস্তবতার ধারণা। শব্দগুলি পাঠ করতে করতে বেশ স্পর্শ করা যায় কীভাবে উপন্যাসে সমাজবাস্তবতা ব্যবহৃত হবে, তা নিয়ে তাঁর ভাবনাটিকে। একথা অবশ্য বলা যেতেই পারে যে, যেভাবে কবিকে ‘ঋষিতুল্য ব্যক্তি’ বলে আখতারুজ্জামান তাঁকে অনেকখানি স্বাধীনতা দিয়েছেন, সত্য উপলব্ধির নির্যাসটুকু তিনি জ্ঞাপন করেন—এই  অভিজ্ঞানকে দীপ্তিময় করে তুলে সমাজবাস্তবতাকে, তার ভেতরের স্পন্দনটিকে ধরতে পারার দায় থেকে তাঁকে অংশত মুক্তি দিয়েছেন, ততখানি স্বাধীনতা একজন কবি সতত ভোগ করে থাকেন না, তাঁকেও সমাজবাস্তবতার স্পন্দনটিকে ধরতেই হয়। পৃথিবীর কবিতা রচনার ইতিহাস তার প্রমাণ। কিন্তু এই তর্কটিকে দূরে সরিয়ে রেখে উদ্ধৃতিটির বাকি বাক্যগুলিকে পড়লে মনে হয় যে,  উপন্যাসে কীভাবে সমাজবাস্তবতা ব্যবহৃত হবে তা নিয়ে আখতারুজ্জামান যা বলেছেন, সেই অভিজ্ঞানটি নিয়ে তর্ক চলে না। একথা তো সর্বতোভাবে সত্য যে, সত্যকে জ্ঞাপন করার জন্য একজন কথাসাহিত্যিককে ‘পরিভ্রমণ করতে হয় বড় দীর্ঘ ও কখনো কখনো অস্বস্তিকর পথ’ তুলে ধরতে হয় ‘নানা ধরনের মানুষকে’ ‘যা হয়তো তাঁর রুচি কিংবা তাঁর স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না’। এই কাজটি করতে গিয়ে ব্যক্তির জীবনেকে ছুঁয়েই একজন কথাসাহিত্যিক সাধারণত বৃহত্তর সামাজিক/রাষ্ট্রিক বাস্তবতায় গিয়ে উপনীত হন। আখতারুজ্জামানও তাই করেছেন। আখতারুজ্জামানের ‘ব্যক্তির’ ধারণা প্রসঙ্গে শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পর্যবেক্ষণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। শিবাজী লিখেছেন, “ইলিয়াসের আদর্শ ব্যক্তি আসলে দ্বিধাবিভক্ত, দ্বৈত সত্তারঃ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের নায়ক আবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথিকৃৎ-ও। গোলটা ঠিক এখানেই”। শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণটি মিথ্যে নয়। কিন্তু একে কি একটি ‘গোল’ হিসেবে দেখা যেতে পারে? তাঁর কিছু প্রবন্ধে ‘ব্যক্তি’ নিয়ে তাঁর মতামতের ক্ষেত্রে একথা কটি অনেকখানি সত্য হলেও, আখ্যানের প্রসঙ্গে কি এই কথাকটি বলা চলে? বরং এই উপমহাদেশে যেভাবে সামন্ততন্ত্রকে ধ্বংস না করেই শিল্প বিপ্লব পুরোপুরি সম্পাদিত হতে হতেও হয় না, তাতে এই দ্বৈত সত্তার ফাঁদেই  ভারত, বাংলাদেশ বা পাকিস্থানের একজন ব্যক্তিমানুষ আটকে পড়েন না কি? আখতারুজ্জামান তাঁর আখ্যানে, সম্ভবত, এটুকুই দেখাতে চেয়েছেন। ‘ব্যক্তি’র কোনও আদর্শ রূপরেখা আঁকতে তিনি চাননি। ব্যক্তিকে অন্যভাবে আঁকলেই বরং একজন সৎ-ভাবুক লেখক হিসেবে যে সমাজবাস্তবতাকে অঙ্কনের কথা বলেছেন আখতারুজ্জামান, সেই বাস্তবতাটি অধরা থাকত।

কিন্তু কেমন সেই বাস্তবতা যা তার রুচি ও স্বভাবের সঙ্গে খাপ না খেলেও একজন কথাসাহিত্যিককে অঙ্কন করতেই হয়? “চিলেকোঠার সেপাই”-এর প্রথমদিকের একটি ছোট্ট অংশই এই প্রসঙ্গে পড়া যেতে পারে:

“ওসমানকে উঠে বসতে হল। শিকের ফাঁকে থুথু ফেলে জানলাটা বন্ধ করে ফের শুয়ে পড়লো। কিন্তু পাশের জানলা খোলাই রইলো। ঐ জানলা দিয়ে পানির ছাঁট এসে পড়ছে চেয়ারে। চেয়ারে কিংস্টর্কের প্যাকেট, দেশলাই, চাবি ও কয়েকদিন আগেকার ‘পাকিস্থান অবজার্ভার’। প্রথম পৃষ্ঠায় ৪ কলাম জুড়ে বিশ্বসুন্দরীর ছবি। রাতে ব্যবহার করবে বলে আনোয়ারের বাড়ি থেকে কাল দুপুরবেলা নিয়ে এসেছে। শালার শওকত ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে রাতে বাঙলার মাত্রাটা বেশি হয়ে গিয়েছিলো, এসে কখন যে প্যান্টট্যান্টসুদ্ধ শুয়ে পড়েছে খেয়াল নাই। সিসিলিরূপসীর পুরুষ্টু ঊরুতে শীতল বৃষ্টিপাত ঘটছে। ঐটা সামনে রেখে কম্বলের নিচে নিজের ঊরুসন্ধি থেকে দিব্যি ঘন প্রস্রবণ বইয়ে দেওয়া চলে। কিন্তু হয় না। প্যান্টের বোতাম খুলতে খুলতে বোঝা যায় যে, বাপের লাশের স্পর্শে তার সারা শরীর একদম ঠান্ডা মেরে গেছে।”

ভুলে গেলে চলবে না যে, লেখক পেশায় একজন অধ্যাপক। তাঁর নিজের সামাজিক অবস্থান থেকে অনেকখানি সরে এসে তিনি এই চিত্রটি আঁকছেন। এর মধ্যে যে কেবল রয়েছে এমন এক বাস্তবতা যা তাঁর রুচি ও স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায় না, তাই নয়; রয়েছে কথকের অদ্ভুত এক নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিও। বেশ বোঝা যায় কেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁর নানা রচনায়, সাক্ষাৎকারে বারবার রবীন্দ্রনাথ, ত্রৈলোক্যনাথ, সুকুমার, শিবরাম, মানিক ও ওয়ালীউল্লাহ্‌কে একত্রে রাখেন। এঁরা কেউ কারও মতো লেখেননি। কিন্তু আখতারুজ্জমানের মনে হয় যে, এঁদের দেখার মধ্যে কোনও কিছুর সঙ্গে খুব একটা মাখামাখির ভাব ছিল না (এই কথাকটি অবশ্য বিশেষ করে বলা রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে), এঁরা এঁদের রচনা দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, এঁরা ‘নির্বিকার’ কিন্তু ‘নিরপেক্ষ’ নন। এই একই কথা কি আখতারুজ্জামানের আখ্যানগুলি সম্পর্কেও প্রযোজ্য নয়? যেভাবে বাংলাদেশের অন্ত্যজ মানুষেরা বর্ণিত হয়েছেন তাঁর রচনায়, ঠিক তেমনটা আর কোনও লেখকের রচনাতেই হয়েছে কি?  তাঁর “চিলেকোঠার সেপাই” তাই উনসত্তরের গণআন্দোলনের এমন এক ছবি আঁকে যে ছবিতে জায়গা পায় হাড্ডি খিজির আর চেংটু। শহর ছাড়িয়ে যে ছবিতে গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সংযুক্ত হয় বৈরাগীর ভিটা। এই সমাজবাস্তবতাকে আখতারুজ্জামান অঙ্কন করতে পেরেছেন কারণ তাঁর রচনা চিরকাল প্রখর রাজনৈতিক চেতনার দীপ্তিতে থেকেছে উজ্জ্বল। এর অর্থ কিন্তু এই নয় যে, আখতারুজ্জামানের সমাজবাস্তবতা নিছকই বাস্তবতার উপরিতলে আবদ্ধ থেকেছে। তাঁর রচনা বরং প্রায়শই ভেঙে ফেলেছে বাস্তব আর অলীকের অর্গল। নিজের পথও হামেশাই বদল করেছেন তিনি। তাই “চিলেকোঠার সেপাই” রচনার পরে তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে “খোয়াবনামা”র মতো ভিন্নধারার আখ্যান নির্মাণ। এই কাজ তিনি করতে পেরেছেন বলেই তিনি বলতে পেরেছেন যে, কারও যদি “নিজের ব্যবহৃত, পরিচিত ও পরীক্ষিত রীতির বাইরে যেতে বাধো বাধো ঠেকে” , “নিজের  রেওয়াজ ভাঙতে মায়া হয়”, তাহলে ধরে নিতে হবে যে, সেই লেখকের ইন্তেকাল আসন্ন।

দুই

একটি ভিন্ন প্রসঙ্গের অবতারণা করে এ লেখার ইতি টানব। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আখ্যান নিয়ে আমরা, এ বঙ্গের বাঙালিরা, যতখানি উচ্ছ্বাস দেখিয়েছি, ততখানি মনোযোগ দিয়ে আমরা পড়েছি তো তাঁর প্রবন্ধগুলি? যে সংকটের মধ্যে দিয়ে আজ আমাদের দেশ এবং বৃহত্তর অর্থে এই উপমহাদেশের বাংলা সংস্কৃতি বহমান, সেই সংকট থেকে পরিত্রাণের পথ কিন্তু তাঁর প্রবন্ধাবলীর মনোযোগী পাঠ আমাদের বাতলে দিতে পারে। “সংস্কৃতির ভাঙা সেতু” প্রবন্ধে আখতারুজ্জামান লিখেছেনঃ

“আজ মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এর ফল কারও জন্য ভালো হয়নি। …সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ফলে দেশের শিক্ষিত অংশের সঙ্গে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর মানসিক ব্যবধান ক্রমে বেড়ে চলেছে। শিক্ষিত মানুষের প্রত্যেকেই হল এক-একটি বদমাইশ ও শয়তান—একথা ঠিক নয়। শিক্ষিত মানুষের একটি ছোট অংশ নিম্নবিত্তের মুক্তির জন্য স্থির সংকল্প। এই অংশটির সঙ্গেও নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর পূর্ণ যোগাযোগ স্থাপিত হয় না। তাদের কথাবার্তা, তাদের চিন্তাভাবনা, তাদের আচরণ ও ব্যবহার বুঝে ওঠা নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর আয়ত্তের বাইরে।”

সেপ্টেম্বর ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত এই প্রবন্ধের কথাকটি কী নির্মমভাবে আজও সত্য! এই একই প্রবন্ধে সংস্কৃতির ভাঙা সেতুটি পুনর্গঠনের কাজে বিশেষ করে  বামপন্থী সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মীদের যে ত্রুটির কথা তিনি বলেছেন সেই কথাকটিও আজও এককণাও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েনি:

“মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসা রাজনৈতিক কর্মীর কাছে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবীর প্রধান ও একমাত্র পরিচয় এই যে, লোকটি অসম্ভব রকমের গরীব। একথা ঠিক যে, দারিদ্র্য যে জীবনযাপন করতে তাকে বাধ্য করে তা মানবেতর। কিন্তু পশুর মতো জীবনযাপন করলেও তিনি যে মানুষ এই সত্যটি উপলব্ধি করা দরকার। নইলে শ্রমজীবীর মানবোচিত জীবনের মান অর্জন করার সংগ্রামে সর্বশক্তি প্রয়োগ করা রাজনৈতিক কর্মীর পক্ষে সম্ভব নয়।

দারিদ্র্য যতই ভয়াবহ ও প্রকট হোক কেবল তা-ই দিয়ে কাউকে শনাক্ত করা হলে তাঁকে মর্যাদা দেওয়া হল না। যাঁকে সম্মান করতে পারি না, তাঁর সমস্যাকে অনুভব করতে পারব না। নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী যত গরীব হোন না, তিনি একজন মানুষ। …আস্ত একজন মানুষ কখনো সংস্কৃতিশূন্য জীবনযাপন করতে পারে না। যাঁর চিন্তাভাবনা আছে, দুঃখ-শোক, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ-বিরক্তি ও ক্ষোভপ্রকাশের জন্য যিনি ভাষা ব্যবহার করতে পারেন সংস্কৃতিচর্চা না-করে তার উপায় নাই। তাঁর সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে পরিচিত হতে না-পারলে তাঁকে অন্তরঙ্গভাবে চেনা খুব কঠিন, অসম্ভব বললেও চলে। কিন্তু শিক্ষিত বামপন্থী বেশিরভাগ সময় ব্যাপারটি খেয়াল করেন না। তাঁরা মনে করেন যে, সংস্কৃতিচর্চা সীমাবদ্ধ কেবল মধ্যবিত্তের মধ্যে।”

এই যে আস্ত একজন মানুষকে আস্ত একজন মানুষ হিসেবে না-দেখা, একজন দরিদ্র মানুষকে সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল অর্থনীতির তুলাদন্ডে তার পরিমাপ করা—একদিক থেকে দেখলে এ শুধু এই উপমহাদেশে মার্কসবাদ প্রয়োগের অসম্পূর্ণতা নয়, বরং মার্কসবাদী তত্ত্ব সম্পর্কেই এ এক কঠিন উচ্চারণ। আসলে আখ্যান নির্মাণে যেমন তেমনই জীবনের সত্য উচ্চারণেও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস কঠিনের রক্তচক্ষুকে ভয় পাননি। তিনি ছিলেন রুক্ষ-বন্ধুর পথের যাত্রী। এ কারণেই আনন্দ পুরস্কার গ্রহণ করে তিনি বলতে পেরেছিলেন, “‘কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’—এটুকু জেদ না-থাকলে  কারও শিল্পচর্চায় হাত দেওয়ার দরকার কী?”

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Leave a Reply

Handpulled_Rikshaw_of_Kolkata

আমি যে রিসকাওয়ালা

ব্যস্তসমস্ত রাস্তার মধ্যে দিয়ে কাটিয়ে কাটিয়ে হেলেদুলে যেতে আমার ভালই লাগে। ছাপড়া আর মুঙ্গের জেলার বহু ভূমিহীন কৃষকের রিকশায় আমার ছোটবেলা কেটেছে। যে ছোট বেলায় আনন্দ মিশে আছে, যে ছোট-বড় বেলায় ওদের কষ্ট মিশে আছে, যে বড় বেলায় ওদের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা মিশে আছে। থাকবেও চির দিন।