লোলিতা চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ‘নষ্ট’ করেছিলেন উত্তমকুমার!?

নাম রুনু হলে কী হবে, চেহারায়, সজ্জায় চলনে-বলনে পাক্কা মেমসাহেব। বাঙালিনীর মুখে বিশুদ্ধ ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে ইংরেজি শুনে ‘হাঁ’ হয়ে যেতেন বিদেশিরাও। এমন মেয়ে যে কী করে উত্তমকুমারের ডাই হার্ড ফ্যান হয়ে উঠেছিলেন, একমাত্র ভগবানই জানেন। বাড়ি ফেরার পথে একদিন তাঁর নজরে এল রাস্তায় বেজায় ভিড়। কারণ জানতে একে ঠেলে, তাকে সরিয়ে ভিড়ের কেন্দ্রে পৌঁছোতেই রুনু মোমের মূর্তি। সামনে ক্যামেরা। তার সামনে উত্তমকুমার! হাতের গোড়ায় মহানায়ককে দেখে মেয়ে বাক্যহারা। দুনিয়া ভুলে উত্তম ক্যারিশমায় বিভোর হয়ে শুট দেখছেন। আচমকাই তাঁর চোখের সঙ্গে মিলল মহানায়কের চোখ। এমন অদ্ভুত আকর্ষণ সেই দৃষ্টিতে যে সরেও আসতেন পারছেন না। এভাবেই শুট শেষ হল। উত্তম নিজে এগিয়ে এলেন রুনুর দিকে। রমনীমোহন হাসি হেসে আবদারের সুরে বললেন, ‘তোমার তো ক্যামেরার সামনে থাকা উচিত। এত রূপ নিয়ে ঘরে বসে কেন? আমার নায়িকা হবে?’ চিরকাল রুনু জেগে-ঘুমিয়ে যে পুরুষের সান্নিধ্য চেয়ে এসেছে আজ সেই পুরষোত্তম তাঁকে ডাকছেন! এই ডাক ফেরানোর সাধ্য তো তাঁর নেই! ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলতেই উত্তম তাঁকে পরিচালক বিনু বর্ধনের সঙ্গে দেখা করতে বললেন। উত্তমের তদ্বিরে সেন্ট জেভিয়ার্সের স্টাইলিশ ইংরেজি টিচার রুনু ‘বিভাস’ ছবিতে হলেন গ্রামের মেয়ে পদ্মা!

ভাবুন তো, কী ক্যারিশমা ছিল উত্তমের! একজন শিক্ষিকা তাঁর পাল্লায় পড়ে অভিনেত্রী হয়ে গেলেন রাতারাতি। রুনুও কি জীবনের এই পরিণতিই চেয়েছিলেন? একবার ফেলে আসা দিনের কথা বলতে বসে নায়িকা জানিয়েছিলেন, ‘বাবা আর্মি অফিসার। মা চোখ বুঁজেছেন ছোট্টোবেলাতেই। তাই ছোটো থেকেই যাযাবর জীবনযাপন। যখন যেখানে পোস্টিং হয়েছে বাবার তিন ভাই, চার বোন লটবহর নিয়ে পেছনে পেছনে পৌঁছেছে। এক সময় বাবা ঠিক করলেন, সেজ মেয়ে রুনুকে বিলেতে রেখে পড়াবেন। বাবার ইচ্ছেয় আমি গেলাম বিদেশে। সেখানে কিছু বছর কাটল। কিন্তু সারাক্ষণ আমার মন কেমন করত দেশের জন্য। বাবা, ভাই-বোনদের জন্য। তাই পড়াশোনা শেষ হওয়ার পরেই ব্যাক টু দ্য প্যাভেলিয়ান। ততদিনে বিলেত ফেরত রুনুর অনেক বদল ঘটেছে। লম্বা, টানটান চেহারা। চলনে-বলনে খাঁটি সাহেবিয়ানা। তখন আর আমি ছোটোটি নেই।’

কলকাতায় পা রেখেই রুনু প্রথমে ভর্তি হলেন লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। তারপর প্রেসিডেন্সি। বরাবরের তুখোড় ছাত্রী রুনু দেখার মতো রেজাল্ট করলেন। বিলেতে থাকার দৌলতেই হোক বা বাবার সঙ্গে নানা জায়গায় পাড়ি জমানোয় ছোটো থেকেই তিনি বয়স আন্দাজে একটু বেশিই পরিণত। তাই পড়তে পড়তেই বিয়ে সেরে নিয়েছেন। ছেলে কোলে কলেজের বৈতরণী পার হয়েছেন। তারপরেই সেন্ট জেভিয়ার্সের মোস্ট ফ্যাশনেবল শিক্ষিকা!

প্রথম ছবি ‘বিভাস’-এই রুনু সফল নায়িকা। এবং উত্তমের প্রিয় নায়িকা। ফলে, মহানায়কের সঙ্গে পরপর তাঁকে দেখা গেল মোমের আলো, জয়জয়ন্তী, অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, মেমসাহেব ছবিতে। একে চেহারায় মেমসাহেব। তারপর সলিল দত্তের ‘মোমের আলো’য় রুনু মেমসাহেবের চরিত্রে। আর যায় কোথায়! গায়ে ট্যাগ লেগে গেল ‘সাহেবিয়ানা’র। ছবিতে আসা যেমন রুনুর জীবনের বড়ো চমক তেমনি তিনি দ্বিতীয় চমক দিলেন নাম বদল করে। অবসরে সেটে বসে একদিন রুনু বই পড়ছেন। এমন সময় এক সাংবাদিক এলেন জনপ্রিয় নায়িকার ইন্টারভিউ নিতে। এসেই প্রথমে নাম জানতে চাইলেন তিনি। একটু বিব্রত হলেন অভিনেত্রী। উত্তমের নায়িকার নাম রুনু! ঠোঁট কামড়ে দু’ সেকেন্ড ভেবেই টানটান জবাব, ‘ আমি লোলিতা’! সে সময়ে তাঁর হাতে কোন বই ছিল জানেন? ভ্লাদিমির ‘লোলিটা’।

এভাবেই বাবার আদরের রুনু নিজের নাম নিজেই বদলে হয়ে গেলেন রুপোলি পর্দার মেমসাহেব লোলিতা চট্টোপাধ্যায়। ততদিনে বিয়ে ভেঙেছে। ছেলে নিয়ে লোলিতা একা। বাংলা ছবিতে তিনি টাইপকাস্ট হয়ে পড়েছেন। একসময় একরাশ বিরক্তি নিয়ে টলিপাড়াকে ধুত্তোর বলে পাড়ি জমালেন মুম্বই। ওই সময় প্রদীপ কুমার আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তাঁকে অভিনয়ের অফার দিলেন। কথা ছিল শক্তি সামন্তের সঙ্গে। কিন্তু লোলিতা ততদিনে একাধিক ছবিতে জুটি বেঁধেছেন ফিরোজ খানের সঙ্গে। এতে আপত্তি জানাল ইউনাইটেড আর্টিস্ট গিল্ড। লোলিতা তল্পি গুটিয়ে আবার কলকাতায়। সেই সময় বড়ো আক্ষেপ নিয়ে লোলিতা গায়িকা বড়দি তপতী রায়কে বলেছিলেন, ‘দেখ দিদি, বাবা আমাদের সব শিখিয়েছেন। কিন্তু শেখাননি কী করে প্রোটেক্ট করতে হয় নিজেকে।’

ক্লান্তিতে, বিরক্তিতে যতবার অভিনয় ছেড়ে দেবেন ভেবেছেন, ততবার লোলিতাকে আটকেছেন উত্তমকুমার। নিশির ডাকের মতো মাতাল করা সেই ডাকের নেশায় আবারো লোলিতা ফিরেছেন লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের দুনিয়ায়।

এক সময় মায়ের কোল শূন্য করে চলে গেছে বড়ো ছেলে। উত্তম চোখ বুজতেই আর কেউ পোঁছেনি লোলিতাকে। পেট চালাতে যাত্রাতেও অভিনয় করেছেন। দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন যাত্রার সুদর্শন নায়ক পাহাড়ি ভট্টাচার্যকে। তিনিও চোখ বোজেন লোলিতার আগে। অশক্ত লোলিতার একমাত্র অবলম্বন ইংরেজির স্পোকেন ইংলিশ ক্লাস আর ছোটোপর্দার টুকটাক কাজ। এভাবেই বার্ধক্যের ঘাটে তরী এসে ঠেকেছে অভিনেত্রীর। শেষ সময়ে ডাক পেয়েছিলেন অরিন্দম শীলের ‘আবার শবর’-এ। তাঁকে ভেবেই ‘জোনাকি’ বানিয়েছেন আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত। ঘর চেয়েও ঘর পাননি রুনু। মহানায়কের সোহাগে তিনিই নায়িকা লোলিতা ‘সখী’। তবু মৃত্যুর আগে খেদ ঝরেছিল নায়িকার গলায়, ‘উত্তমই আমার জীবন নষ্ট করেছে। ওর মোহে পড়ে অভিনয়ে না এলে হয়তো ঘরে-বরে সুখে, নিরাপদেই জীবন কাটাতাম।’      

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here