চন্দ্রাবতী দেবীকে ‘বিজয়া’, ‘ষোড়শী’তে অভিনয়ের অনুরোধ জানিয়েছিলেন স্বয়ং শরৎচন্দ্র!?

দিদি কঙ্কাবতীর অভিনেত্রী হিসেবে বেজায় নামডাক। তাই দেখে বোন চন্দ্রাবতীরও ইচ্ছে অভিনয় করবেন। কিন্তু সুযোগ দিচ্ছে কে? একসময় স্কুলের পাঠ শেষ। চন্দ্রাবতী ভর্তি হলেন বেথুন কলেজে। পড়ার পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখছেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। ওই সময় শিশির কুমার ভাদুড়ি ‘সীতা’ ছবি বানাবেন বলে ঠিক করলেন। রাম হবেন তিনি নিজে। সীতা হবেন কঙ্কাবতী। কারণ, কঙ্কা শিশিরবাবুর মন্ত্রশিষ্যা, তাঁর ছবি-নাটক-জীবনের নায়িকা। এবার ঊর্মিলার জন্য তিনি বাছলেন চন্দ্রাকে। কিন্তু বোনের ব্যাপারে কঙ্কা ছিলেন বাবা গঙ্গাধর প্রসাদ সাহুর মতোই ভীষণ কড়া। সোজাসুজি জানিয়ে দিলেন, ‘ওসব অভিনয়-টভিনয় এখন নয়। চন্দ্রা আগে পড়াশোনা শেষ করুক। তারপর দেখা যাবে।’ হয়ে গেল চন্দ্রাবতীর ছবিতে অভিনয়। মনে মনে সামান্য দমলেও হাল ছাড়লেন না একেবারে। কঙ্কা বড় মেয়ে হলে তিনিও তো মজফফরপুরের অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট গঙ্গাধর সাহুর ছোটো মেয়ে! তাই মনে মনে ইচ্ছেটা জিইয়ে রাখলেন।

এদিকে পড়াশোনার পাঠ চুকল। কিন্তু আর তো কেউ চন্দ্রাকে অভিনয় করতে ডাকে না! একসময় বিয়েও হল তাঁর। তাকিয়ে দেখার মতো সুপুরুষ বর। বছর ঘুরতে কোল আলো করে সন্তানও এল। কিন্তু সিনেমার পোকা মাথা থেকে নড়ল না। একদিন স্বামীকে বলেই ফেললেন, ‘আমি সিনেমায় অভিনয় করতে চাই।’ কথাটা শুনেই আঁতকে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘গান-বাজনা করছ, মেনে নিচ্ছি। তা বলে সিনেমায় নামার কথা মুখেও এনো না। যাঁরা একবার ওই লাইনে যায় তাঁরা আর ঠিক থাকেন না। তুমিও খারাপ হয়ে যাবে।’ তবুও চন্দ্রাবতীর এক গোঁ, ‘আমি অভিনয় করবই। যে ভালো থাকার সে ওর মধ্যেই ভালো থাকে। খারাপ হলে এমনিতেই হব।’ বাধ্য হয়ে স্বামী বললেন, ‘তাহলে আমাকে ছেড়ে, সংসার ছেড়ে, সন্তান ছেড়ে তোমায় চলে যেতে হবে। যদি পারো সেটা করতে, আমার আপত্তি নেই।’ কথাটা শুনে সেই মুহূর্তে ভীষণ দমে গেছিলেন চন্দ্রাবতী। কঙ্কার বোন হয়ে কী করে অভিনয়কে এড়াবেন?

শেষমেশ সব ছেড়ে একদিন স্টুডিওর ফ্লোরে পা রাখলেন চন্দ্রাবতী দেবী। নায়িকা হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি ‘পিয়ারি’। শুধু অভিনয়? একসময় বিমল পালের সঙ্গে পার্টনারশিপে মুভি প্রোডিউসার্স নামে প্রযোজনা সংস্থাও খুলেছিলেন। শ্যামবাজারে তৈরি করেছিলেন বিখ্যাত টকি-শো হাউজ। ১৯৩৩-এ অবশ্য সেই পার্টনারশিপ ভেঙে যায়। চন্দ্রাবতী তারপর যোগ দেন নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওয়।

গান, অভিনয় তো ছিলই, পাশাপাশি লেখার হাতটাও বড়ো ভালো ছিল চন্দ্রাবতীর। তাঁর সময়ের পত্রিকা ‘সাতরঙা’তে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতেই সাহিত্যমহলে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিদগ্ধ সাহিত্যিক চন্দ্রাবতীর কলমের প্রশংসা করে বলেছিলেন, ‘বড় চমৎকার লিখেছে তো! পড়তে পড়তে মনটা অন্যরকম হয়ে গেল।’ শুধু তারাশঙ্করই নন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিজে ডেকে তাঁর অভিনয়, সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রশংসা করেছিলেন। প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘দেবদাস’ রিলিজের পর স্পেশ্যাল শো করা হয়েছিল। সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল উপন্যাসের জনক শরৎবাবুকে। ওই ছবিতে চন্দ্রমুখী হয়েছিলেন চন্দ্রা। বাকিটা শুনুন তাঁর জবানিতে, ‘বড়ুয়া সাহেব যখন চন্দ্রমুখীর জন্য আমায় বাছলেন, আমার ভীষণ খারাপ লেগেছিল। বলেছিলাম, এই চরিত্রের বদলে আমায় পার্বতীর চরিত্র করতে দেবেন? বড়ুয়া সাহেব তখন মৃদু হেসে বলেছিলেন, তোমায় ভেবেই চরিত্রটিকে অন্যভাবে গড়েছি। অভিনয় শুরু করলেই বুঝতে পারবেশুট শেষ হল। স্পেশ্যাল স্ক্রিনিং হল। ছবি দেখে সবার চোখ ভিজে। হঠাৎ, শরৎবাবু উঠে এগিয়ে এলেন আমার দিকে। বললেন, তোমার চন্দ্রমুখী দারুণ ভালো হয়েছে। আমি চরিত্রটা নিয়ে এভাবেও ভাবিনি। তোমার অনুভূতি আমার চেয়েও সূক্ষ্ম। তুমি আমার ‘বিজয়া’ বা ‘ষোড়শী’ করবে? তোমাকে ছাড়া এই চরিত্রে আর কাউকে ভাবতে পারছি না। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পাশে দাঁড়ানো বড়ুয়া সাহেবের দিকে চাইতেই দেখি উনি আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছেন!’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here