কাগজে ছাপা হয় মৃত্যুর ভুয়ো খবর‚ জীবন্ত জীবেনকেই ফুল-মালা দিতে হাজির হয়েছিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি!

ডাক্তার বাবা যতীন্দ্র নাথ বসুর ১৬জন ছেলেপুলে! সন্তান হিসেবে তাঁর সংখ্যা কত নম্বরে? কখনও কেউ জিজ্ঞেস করেনি। তিনিও তাই নিয়ে মাথা ঘামাননি। আর বাবার পক্ষেও সম্ভব ছিল না, এতজন ছেলেপুলের পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ রাখা। সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন বাংলা ছবির জনপ্রিয় পার্শ্ব চরিত্রাভিনেতা জীবেন বসু। নামকরা ডাক্তারবাবুর ছেলে হয়েও তিনি যে কী করে অভিনয়ের নাগপাশে জড়িয়ে গেলেন, তিনি নিজেও বোধহয় টের পাননি। না বুঝেই তখন স্কুল-কলেজে চুটিয়ে অভিনয় করছেন। বাড়ি থেকেও কোনও আপত্তি আসেনি। কারণ, তখন তাঁর মতো মুঠো মুঠো অ্যামেচার অভিনেতা ভবানীপুরের অলিতেগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু গোল বাঁধল তখন যখন এতে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না জীবেন। দুম করে নির্বাক ছবি ‘আঁখিজল’-এ একটি ছোট্ট রোলে অভিনয় করে বসলেন।

কাজটা করার সময় একবারও বাবার মুখ মনে পড়েনি জীবেনের। ছবি মুক্তি পেতেই একটু একটু করে ভয় এসে জুড়ে বসল মনে। বাড়ির লোক না হয় বায়োস্কোপ দেখে না। কিন্তু পড়শিরা! তাঁদের মুখ-চোখ বন্ধ করবেন কী দিয়ে? যা ভয় পেয়েছিলেন এক সময় তাই-ই ঘটল। প্রতিবেশীর থেকে বাবা যতীন্দ্রনাথ বসু জানতে পারলেন ছেলে পড়া ফেলে ‘অ্যাক্টো’ করছে। সেই সময় মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেবার পক্ষে এটুকু কথাই যথেষ্ট ছিল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাবা ডাকলেন ছেলেকে। বললেন, ‘তুমি নাকি অ্যাক্টো করছ? আমি জানি ওখানে কিলবিল করছে অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়েরা। সেখানে গিয়েছ জাহান্নামে যাবে বলে?’ তারপরেই টেবিলের ওপরে রাখা রুলার তুলে বেধড়ক মারতে লাগলেন ছেলের হাঁটুতে। সঙ্গে গর্জন, ‘যে পায়ে হেঁটে তুমি স্টুডিও পাড়ায় গেছ সেই পা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব একবারে। যাতে আর কোনোদিন ওমুখো হতে না পার। আমার কত সাধ, তুমি পড়াশোনা করবে, ডাক্তার হবে। তা নয়! যতীন বোসের ছেলে নেটো?’ বলছেন আর মেরেই চলেছেন হাঁটুতে। এক সময় মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে থামলেন। ততক্ষণে জীবেনের হাঁটু ভেঙে গেছে। প্রায় মাস তিনেক বিছানাবন্দি হয়ে রইলেন ভাঙা হাঁটু নিয়ে। সময়িক মাথা থেকে অভিনয়ের ভূত নামল।

পা সারতেই ফের মনে উসখুসানি। ডাক্তার বাবা-ও ততদিনে গত হয়েছেন। সিনেমায় অভিনয় না-ই বা করলেন, থিয়েটার তো করতেই পারেন। বাবা তো থিয়েটার করতে বারণ করেননি। এবার জীবেন নাড়া বাঁধলেন শিশির কুমার ভাদুড়ির কাছে। কিন্তু তাঁর নীচু স্বরে অভিনয় দাগ কাটল না দর্শক, পরিচালক কারোর মনেই। ফলে, ফের তিনি সিনেমায়। দু-তিনবার নায়কের ভূমিকায় দেখা যাওয়ার পরেই তিনি পাকাপাকি পার্শ্ব চরিত্রাভিনেতা। কখনও হো-হো হেসে গলা ছেড়ে ‘ভেসে যাক তরী…ডুবে যাক প্রাণ’ আওড়াতে আওড়াতে ‘শাপমোচন’-এ উত্তমকুমারকে জড়িয়ে ধরেছেন। কখনও সুচিত্রা সেনের যন্ত্রণায় কাতর বড়ো দাদার মতোই ভারাক্রান্ত মন নিয়ে স্বান্তনা দিয়ে ‘সাগরিকা’য় বলছেন, ‘যেদিন তোমার নাগর যাবে পর ঘর তোমারই আঙিনা দিয়া।’

এই অভিনয় করতে করতে একদিন জীবেন বসু অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে নামী প্রযোজকও হয়ে গেলেন। দু’জনের পার্টনারশিপে ‘আজ’ প্রোডাকশন ১৮টি বাংলা ছবি বানিয়েছিল। একমাত্র শেষ ছবি ‘দস্যু মোহন’ ছাড়া সবগুলো সুপারহিট। শেষ ছবিতে শশধর দত্তের মোহন সিরিজের একটি গল্প নিয়ে ছবি বানিয়েছিলেন তাঁরা। নামভূমিকায় প্রদীপকুমার। প্রচুর টাকা ঢালা হয়েছিল। পুরোটা লস হওয়ায় উঠেই গেল প্রোডাকশন হাউজ।.

জীবেন বসু ততদিনে পৌঁছেছেন জীবনের শেষ লগ্নে। অসুস্থ হয়ে ভর্তি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একদিন আনন্দবাজারে বড়ো হরফে খবর বেরলো, জীবেন বসু আর নেই। ফুল-মালা নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি ছুটল হাসপাতালে। সেখানে পা দিয়েই অপ্রস্তুত সবাই। অসুস্থ অভিনেতা হেঁটেচলে বেড়াচ্ছেন নিজের ওয়ার্ডে। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে সব শুনে হেসে ফেলেছিলেন, ‘মরে তো গেছিই কবে। কাঠামোটাই যা নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে। একে কি বাঁচা বলে?’ এর ঠিক পাঁচ মাস পরেই চোখ বোজেন জীবেন। জীবনতরী ভাসিয়ে দিয়ে।      

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here