মহানায়ক উত্তমকুমার সমীপেষু,

আপনাকে আমার মতো ক্ষুদ্র একজন অভিনেতা, যদিও আপনি চিত্রজগতের থেকে শারীরিকভাবে বিদায় নেওয়ার পর থেকে, পশ্চিমবঙ্গের দর্শক সংখ্যা টেলিভিশন ও বর্তমানে নেটের প্রভাবে বৃহদংশ বৃদ্ধি পাইয়াছে। তবে তা গুণমান বা স্মৃতির সরণীতে স্থায়িত্বের মানের হিসাব করিলাম না, কারণ তা আমার কর্ম নয়। সে কার্যের দায়িত্বে রয়েছে ‘সময়’। যে কাল কাল ধরে পথ চলাকে তুলে রাখে অদৃশ্য দস্তাবেজের ভাঁজে ভাঁজে। তবে স্যর, না আপনাকে বড়বাবুই বলি। কেন, সিনেমা, টেলিভিশন একটা পরিবার তো। সেই পরিবারের মূল কর্তা আপনি। তাই আজও বড়বাবু। অর্জুনের রথে কৃষ্ণের সারথীসম লাগে আপনাকে। টালিগঞ্জের মোড়ের স্ট্যাচুটিকে। বড়বাবু, আমি ১৯৭৮ সালে ২৮ অক্টোবরে জন্মানো একজন বাঙালি সন্তান। আপনার বিদায় ১৯৮০ সালে। সুতরাং হিসাব নিরিখে তখন আমার ২ বছর বয়স। মনেও নেই , আপনার মৃত্যুর ক্ষণেও মনকে নাড়া দেয় নি। তবে চল্লিশ ছুঁই ছুঁই সময়ে কম পরিবর্তন দেখলাম না।

কলকাতার প্রথম বাস আমার মানিকতলা টেলিফোন কোয়ার্টারে। সেখান থেকে দেশের বাড়ি চলে যাই। অতঃপর ভাইয়ের জন্মের সময় ৮১ সালে কলকাতায় আসি। যা এখনও মনে পড়ে। কাঠের চেয়ারওয়ালা সেলুন। হলুদ রঙের ফিকে আলো, দোতলা বাসের আনাগোনা। হরাইজন বলতে চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাশনাল। ভবানীপুরে পিসির বাড়িতে আমাদের বাস। শিশুমঙ্গল হসপিটাল এতো কর্মব্যস্ত ছিল না। পাশের পূর্ণ, ভারতী, বিজলী দেখে বড়রা দীর্ঘশ্বাস ফেলতো। পিসির বাড়ির মস্ত বারান্দার কেউ প্রশংসা করলেই, পিসি, পিসতুতো ভাইরা বারান্দা টপকে লর্ডসের ভি আই পি ধরে ফেলতো, কারণ আপনাকে বেশ কয়েকবার দেখা হয়ে গেছে যে।

কলকাতাটাকে আমিও আশির দশকের মধ্যেহতেশেষ পর্যন্ত অন্যরকম দেখেছি ধুতি বাংলা শার্ট। চায়ের দোকানে হুল্লোড়। এ সি বিহীন দোকানপাট। মিস্টির দোকানে ভিড়। টেপা হর্ণের আওয়াজ। একটু বেশি ট্রাম, ভর্তি মুড়ির টিনের মতো লোকাল বাস। মোহনবাগান – ইস্টবেঙ্গল, বাংলা সিনেমায় টুকটাক ভিড় কলকাতায়। থিয়েটার পাড়া তাও চলছে। গ্রাম থেকে দিদি ‘নহবত’ দেখে ফিরে গিয়ে তুলেছিল। সুতরাং বাঙালির মধ্যে তখনও ভাই, ভাইপো, কাকা, জ্যেঠু, কাকিমা, বৌদি, মেসোমশাই ডাকগুলো ছিল। ‘hi bro’ হয়ে যায় নি। ‘uncle’ ‘aunty’ তে ঘুরে যায় নি সব সম্বোধন আপনার কথা বলতে এতো বর্ণনাই আনছি কারণ আপনি যেমনটা দেখে গেছিলেন তেমনটাই ছিল পরের কয়েকবছর। তবে বদল এসেছে – তা আপনার কল্পনাতীত।

স্যর, জ্যোতিবাবু আর বেঁচে নেই। আর ওনার পার্টি চৌঁত্রিশ বছরের রাজ্যপাট ইতি টেনেছে। ওনার পর আপনার সময়ের বুদ্ধবাবু (পুলিশমন্ত্রী) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। বর্তমানে মমতা ব্যানার্জি আপনার বাড়ি থেকে মেইল খানেক দূরে যার বাস। তিনি মুখ্যমন্ত্রী। আপনার নামে মেট্রো স্টেশন উৎসর্গ করেছেন। স্যর আপনাকে দেওয়া আমার কাছে এটাই বড় খবর। আর মানিকবাবু, তপন বাবু গত হয়েছেন। অসিত সেন, মিসেস সেন, বেনুদি বা আপনার বাংলা ছবির সহ নায়ক নায়িকারা গত হয়েছেন। স্টুডিওগুলো আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। ঘরে ঘরে এ সি। হিরোদের ওয়ার্ল্ডক্লাস গাড়ি। ক্যামেরা থেকে, সাউন্ড, ডাবিং রুম সব প্রায় বিশ্বমানের। আপনাকে বিদেশি ছবি দেখতে বাইরে যেতে হতো। এখন মুষ্টিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশ্ব।

আপনার মৃত্যুর পর সুখেন দাস পরিচালক নায়ক হিসেবে সাফল্য পেয়েছেন। অঞ্জন চৌধুরি ও রঞ্জিত মল্লিকের যুগলবন্দী দর্শক আসন ভর্তি করেছে। তাপস পাল আপনার মৃত্যুর বছরে তরুণ মজুমদারের ছবি দিয়ে সাফল্য এনেছে। চিরঞ্জিত চক্রবর্তী বাংলার মন জয় করেছে। ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক চ্যাটার্জি ভালো রান তুলেছেন। তবে সৌমিত্রবাবু নায়ক না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করে চলেছেন। আপনার গল্প বলেন, আমাদের বড়বাবু।

নিজেকে ধরে রাখা আর অনবরত ইন্ডাস্ট্রিকে নিজের কাঁধে করে নিয়ে আঁচেন যিনি সে আপনার ‘বুম্বা’ আমাদের প্রসেনজিৎ। বড়বাবু উনি দীর্ঘদিন ধরে টেকনিসিয়ান, আর্টিস্টদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে এগিয়ে এসেছেন। আজ তো বাংলা সিনেমা দেশ কাল সীমানার গন্ডী ছাড়িয়েছে। তবে ভাল লাগুক না লাগুক প্রসেনজিৎ সবার কাছে কুর্ণিশ পাওয়ার যোগ্য। একথা আমি আপনাকে জানালাম। তারপর জিৎ, দেব, সোহম, অঙ্কুশ ভালোই টানছে দর্শক মনকে।

হেমন্ত বাবু, শ্যামল বাবু, মান্না বাবু কেউ নেই। তবু বাংলা গায়কদের গলা আজও আমাদের কাছে সমান প্রিয়। শ্রীকান্ত আচার্য, রূপংকর, রাঘব বা মনোময়দাদের তাগিদে। ব্যান্ডসঙ্গীত দাপাচ্ছে। দাপাচ্ছে অভিনেতা অভিনেত্রীদের স্টেজ শো। সৃজিত মুখার্জি, অতনু ঘোষ, কৌশিক গাঙ্গুলি, অরিন্দম শীলদের পরিচালনাও চমৎকার। নায়ক নায়িকাদের ফিগার, রূপ, বিদেশে শুটিং, রঙের আতিশয্য সবই আপনাকে মুগ্ধ করবে বড়বাবু।

বড়বাবু আমার মতো একজন ক্ষুদ্র শিল্পীও এখন স্বচ্ছল। অনেক কিছু পাওয়ার পরেও আমাদের জীবনে একটাই দুঃখ খোঁচা দেয়। আমার বাবার অবর্তমান থাকা। ঠিক তেমনই স্যর বাংলা ছবি। ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও সানাই করুণ সুরকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বছর দুই আগে আমার ফ্ল্যাট বাড়ির বাসিন্দা তাছিল্য স্বরে বলেছিল, কী করেন?

অভিনয় – উত্তরে বলেছিলাম।

আমরা বাংলা ছবি দেখি না। উত্তমবাবুর পর ও জিনিস নিতে পারি না।

স্যর, রেগে গেছিলাম। তাহলে বিগত চার দশক মিথ্যে! অপমান ঠান্ডা হওয়ার পর মনে হয়েছিল। ছিন্নমূল জীবন ত্যাগ করে অর্ধ শতাব্দী কাটানোর পর গোপালের বাবা যদি সেই বাংলা দেশের চিংড়ির প্রেমে পড়ে থাকে। বাইশ বছরের বিধবা যদি স্বামীর স্মৃতি চোখে নিয়ে অর্ধ শতাব্দী নির্জলা জীবন কাটায়, অন্যায় কী? বৃদ্ধের ডাইরির পাতায় যদি প্রথম প্রেমিকার নাম কাঁপা হাতে উঠে আসে। —- নয়। তাহলে বড়বাবু আপনাকৃত সৃষ্টির ছটায় আজও আবাল্বৃদ্ধবনিতা আপামর বাঙালির গুরুর আসনে আপনি হিমালয়সম। এক হিরো বলেছিল, আপনার চলন, বলন, পোশাক কন্টেম্পরারি।’ আমি হেসেছিলাম, মনে মনে বলেছিলাম গুরুমারা বিদ্যে বাঙালি আয়ত্ব করতে পারলেও উত্তম ছাড়িয়ে অতি উত্তম হওয়ার বিদ্যে আয়ত্ব করতে পারেনি। তোমারও হবে না। এভারেস্ট ছোট হতে পারে উষ্ণায়নে। আপনার মাধুর্য নৈব নৈব চ।

ইতি বিশ্বনাথ, আর্টিস্ট ফোরাম, কার্ড নাম্বার ৮৩৯

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp

Please share your feedback

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nayak 1

মুখোমুখি বসিবার

মুখোমুখি— এই শব্দটা শুনলেই একটাই ছবি মনে ঝিকিয়ে ওঠে বারবার। সারা জীবন চেয়েছি মুখোমুখি কখনও বসলে যেন সেই কাঙ্ক্ষিতকেই পাই