রেশিখোলা

913
রেশিখলার পাশে ইকো হাট
আরিটার থেকে ফেরার পথে

আরিটার থেকে প্রধান সড়কটি পাহাড় বেয়ে নেমে এসে যেখানে সিকিম পেরিয়ে পশ্চিমবাংলায় পা রাখছে সেই সীমানা বরাবর তরতর করে বয়ে চলেছে রেশিখোলা, নেপালিতে খোলা মানে হলো নদী | চারপাশটা ঘন জঙ্গল আর উঁচু পাহাড় ঘেরা উপত্যকা | কয়েক বছর হলো এই নদীর দুপাশে ছোট ছোট কটেজ বানিয়ে জায়গাটাকে বেশ লোভনীয় একটা টুরিস্ট স্পট করে ফেলা হয়েছে | ছবি-টবি দেখে পছন্দ হওয়াতে ঠিক করেছিলাম আরিটার থেকে ফেরার পথে এখানে একটা দিন কাটাতে হবে | আগেভাগে অবশ্য কোন ব্যবস্থা করে আসিনি, আরিটারে বসে আশীষের ঘাড়েই তাই দায়িত্বটা চাপিয়ে দিলাম | এদিকে ও তো আমাদের ছাড়তেই চায় না, খালি বলে –“রুক যাইয়ে, রুক যাইয়ে”| থাকার ইচ্ছেটা আমারও ছিল, কারণ ছবি আঁকার সাবজেক্ট এখানে প্রচুর, দূর থেকে পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়িঘরগুলোর দিকে তাকালেই কেমন হাত নিশপিশ করে ওঠে | শুধু বুকিং নয়, রেশিখলা পৌছে দেবার জন্য আশীষ নিজেই গাড়ি নিয়ে হাজির হয়ে গেল | কিছুটা পথ যেতেই চোখে পড়ল গাছপালা ঘেরা বিশাল জমির মাঝখানে পুরনো আমলের একটা ডাকবাংলো | গেটের সামনে ঘ্যাঁচ করে গাড়ি থামিয়ে আশীষ বলল, “একবার দেখে আসবেন নাকি?” লোকজন থাকলেও দরজা, জানলা সব খোলাই ছিল , বিশাল বড় বড় ঘর, মাঝখানে লাউঞ্জ, একপাশে খাবার জায়গা, একেবারে এলাহী ব্যাপার | আমাদের হাবভাব দেখে আশীষ বলেই ফেল – “ এটা বনদপ্তরের, পরেরবার এসে যদি এখানে থাকতে চান জানাবেন আমিই বুকিং করে রাখব”| দেখলাম ছেলেটা হোটেল চালায় বটে কিন্তু এখনো পাঁড় বেনিয়া হয়ে ওঠেনি, নিজের ব্যবসার ক্ষতি করেও অন্যদের কথা ভাবছে |

আমাদের দোতলা কটেজ

ঘন্টাখানেকের মধ্যেই রেশিখলা এসে গেল, গাড়িতে বসে ফোন করতেই এক ছোকরা এসে মালপত্তর কাঁধে তুলে আমাদের নিয়ে চলল আস্তানার দিকে | একটা বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে দুদিকে খাড়াই পাহাড়, আর একপাশে নদীকে রেখে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মিনিট দশেক হেঁটে আমরা কটেজে পৌছলাম | দোতলা কাঠের বাড়ি, আমাদের ঘর ওপরেই সঙ্গে একফালি বারান্দা | সামনে হাত বাড়ালেই নদী, পাহাড়, জঙ্গল সব মিলিয়ে বেশ আদিম একটা পরিবেশ | নদীর ধার ঘেঁষেই কয়েকটা এরকম কটেজ আর পিছন দিকটায় এদের অফিস, রান্না আর খাবার জায়গা | এটাও সেই হোম স্টে গোত্রের ফলে খাবার-দাবার সব আপনা থেকেই হাজির হয়ে যায় | হাতে মোটে একটা দিন তাই নাস্তা যা দিয়েছিল কোনক্রমে গলধঃকরণ করে নিয়ে ছবি আঁকতে বেরিয়ে পড়লাম | আমরা নদীর যেদিকে রয়েছি সেটা পশ্চিমবঙ্গ আর ঠিক ওপারটাই হলো সিকিম |ফলে স্রেফ একটা বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে দুটো রাজ্যের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে বেশ মজা পেলাম |

বাঁদিকের ঝুপড়িটায় বসে খেয়েছিলাম

কটেজের সামনে থেকেই সিঁড়ি ধাপেধাপে নেমে গিয়েছে নদীর একেবারে ওপরে ঝুলে থাকা খড়ের ছাউনি অবধি | কাঠের তক্তার ওপর বসে এখান থেকেও চারপাশের দৃশ্য দারুণ উপভোগ করা যায়, ঠিক করলাম এখানেই আমারা দুপুরের খাওয়াটা সারব | টুরিস্টের ভিড় তেমন নেই বলে রক্ষে, গোটা জায়গাটা তাই বেশ নিরিবিলি হয়ে আছে | সকালের দিকে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে একটা দল পাশের কোনও রিসর্ট থেকে বেরিয়ে খেতে এসে যা হইহল্লা করছিল, মনে হলো যেন ডায়মন্ড হারবারের পিকনিক পার্টি | অনেকে মিলে বেড়াতে গেলে সবাই নিজেদের নিয়েই দেখেছি এত ব্যস্ত থাকে যে কোথায় এলাম কী দেখলাম এসব নিয়ে মাথাই ঘামায় না |

পক্ষীপ্রেমিকদের জন্য আদর্শ জায়গা হলো এই রেশিখলা, একটু কান পাতলেই শোনা যায় সারাক্ষণ কত রকমের পাখি ডেকে চলেছে চারদিকে | আমার গিন্নির এ ব্যাপারে যথেষ্ট উত্সাহ কিন্তু জম্পেশ একটা দূরবীন না থাকায় শুধু খালি চোখের ওপর ভরসা করে আর জঙ্গলের মধ্যে পা বাড়াল না | আমি অবশ্য এই ফাঁকে নদীর ধারে বড় পাথরের ওপর বসে জমিয়ে একটা রঙিন স্কেচ করে ফেললাম | ততক্ষণে ওদিক থেকে খাবারের জন্য ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে | এরা দেখলাম খাওয়ানোর ব্যাপারে কোথাও এতটুকু কার্পন্য করে না, বিশাল সাইজের টিফিন কেরিয়ার ভর্তি কত রকমের ভাজাভুজি, তরকারি, মাছের কালিয়া, তার ওপর পরিমাণ দেখে মনে হলো আমাদের নির্ঘাত বকরাক্ষস ভেবে নিয়েছে |

চালাক চতুর ছেলে মহেশ সুব্বা

দু-তিনজন অল্পবয়সী ছেলে এখানে সারাক্ষণ ফাইফরমাশ খাটে, এদের মধ্যে মহেশ সুব্বা আমাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল, কখনো খাবার আনছে, কখনো পাশে বসে আমার ছবি আঁকা দেখছে| ছেলেটি বেশ চালক চতুর, সক্কালবেলা উঠে ইংরেজি স্কুলে যায়, বুঝলাম লজ মালিকেরই কেউ হবে | নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে ওকে বললাম – সাঁকোর ওপর দাঁড়ানো আমাদের একটা ছবি তুলে দাও দেখি | হালকা চলে ক্যামেরা হাতে নিয়ে পটাপট খানকয়েক ছবি তুলল মহেশ, তারপর নির্বিকারভাবে বলল – “দেখ লিজিয়ে, বঢ়িয়া আয়া হ্যায়|” দেখে সত্যি অবাক হলাম – দারুণ ফ্রেমিং করেছে ছেলেটা | উচ্চতা বেশি নয় বলে এখানে দিনের বেলা তেমন ঠান্ডা লাগেনি কিন্তু দুপুরের পর যেই সুয্যিমামা পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকোলেন অমনি গায়ে একটা হালকা জ্যাকেট চাপাতে হলো | আমাদের কটেজের বাঁদিক ধরে কিছুটা এগোলেই নদীটা অনেক চওড়া হয়ে গিয়েছে, জলের স্রোত্টাও বেশি | ছোট, বড় নানা সাইজের পাথর ডিঙিয়ে ব্যালেন্সের খেলা দেখাতে দেখাতে আমরা বেশ সুবিধেজনক একটা জায়গায় গিয়ে জলে পা ডুবিয়ে বসলাম | সামনে দেখতে পাচ্ছি দুপাশের জঙ্গলটা ক্রমশ গভীর আর গা ছমছমে হয়ে উঠেছে |  

পাথরের ওপর বসে আঁকা স্কেচ

জটায়ুর মতো আমারও তখন বলতে ইচ্ছে করছিল – “এই পরিবেশে দু-একটা হালুম হালুম হলে মন্দ হতো না মশাই” | সন্ধের পর রেশিখোলার এক অদ্ভুত রহস্যময় চেহারা বেরিয়ে পড়ল, ওই ছোট্ট বারান্দায় আধো অন্ধকারে বসে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল আমরা কর্তা-গিন্নি যেন সেকালের কোনও হান্টিং লজে শিকারের জন্য ওঁত পেতে বসে আছি আর উলটো দিকের জঙ্গল থেকে এখুনি হয়তো একটা বাঘ বেরিয়ে আসবে | ওই মায়াময় নিঃস্তব্ধতার মধ্যে কানে এলো একটু দূরে কেউ গিটার বাজিয়ে নেপালি কোনও গান গাইছে, খুব মৃদু মেয়েলি গলা | মনে হলো যেন আমার হাতের পানীয়র থেকেও অনেক বেশি মাদকতায় ভরা | মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকালাম, কৃষ্ণপক্ষের আকাশ তখন তারা আর নক্ষত্রে জমজমাট হয়ে উঠেছে | ঘন অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মতো পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে যেন অতিকায় এক একটা প্রাণী নিশ্চুপ হয়ে পড়ে রয়েছে | মেয়েটির গান কখন যে থেমে গেছে খেয়াল করিনি এখন শুধু নদীর ছলছল শব্দ শুনছি আর ঘুরে ফিরে ভীষণ আফশোস হচ্ছে কেন মাত্র একদিনের জন্য এলাম, কেন ঠিক এমনই আরেকটা সন্ধে কাটানো গেল না রেশিখলায়?

Advertisements

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.