সব গাছ ছাড়িয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছেই লুকিয়ে ব্যবসার জিয়নকাঠি‚ যখন বুঝেছিলেন তিনি তার অনেক আগে থেকেই তাঁর পরিবার সম্পন্ন ব্যবসায়ী | হুগলির রাজবলহাটে ছিল বড়‚ পুরনো এবং প্রাচীন ব্যবসা | সে ব্যবসা ছিল কাপড়ের‚ মূলত ধুতি ও শাড়ির | আজ থেকে দেড়শো বছর আগে সেই ধুতি কাপড়ের গাঁটরি নিয়ে রাজবলহাট থেকে কলকাতায় আসতেন জওহরলাল ভড় | মল্লিকদের হাটে আদি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাপারী ছিলেন তাঁরা | 

ভড়দের যৌথ পরিবারের আরও উজ্জ্বল হল ১৯১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর | বাবা হলেন জওহরলাল | ছেলের নাম রাখা হল দুলাল | বর্ধিষ্ণু পরিবারের সন্তান যখন‚ দুলাল ছিলেন আদরেরই | তবে বাস্তবের কাঠিন্যের মুখোমুখি হতে সময় নেননি | মাত্র তেরো বছর বয়সে ব্যবসায়ে হাতেখড়ি | সে সময় পারিবারিক কাপড়ের ব্যবসার পাশাপাশি আরও একটা ব্যবসা শুরু করেছিলেন জওহরলাল | বস্তায় সাদা মিছরি পাড়ি পদ্মার ওপাড়ে | কিন্তু বর্ষাকালে কারবার চালানো দুষ্কর হয়ে দেখা দিল | কয়েক বছর পরে বন্ধ হয়ে গেল সেই ব্যবসা | 

ততদিনে তাঁর দুলাল যুবক হয়েছেন | নামের পরে এসেছে দ্বিতীয় নাম‚ চন্দ্র | অতঃপর দুলালচন্দ্র ভড় শুরু করলেন ব্যবসার নতুন ধারা | আর সাদা মিছরি নয় | তিনি এবার মন দিলেন তালমিছরিতে | এমন একটা সময়ও গেছে যখন তালমিছরি বলতে একটাই নাম আসত‚ তা হল দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরি | কিন্তু শুরুতে বেশ কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে | সে সময় বাজারে তালমিছরি বলতে এক ও অদ্বিতীয় শ্রীমানিদের জিনিস | কিন্তু এমন একদিন এল‚ যখন দুলালচন্দ্র ভড়ের কাছে হার মানতে হল পূর্বসুরিকে | বাজার থেকে ধেরে ধীরে ধীরে পাততাড়ি গুটিয়ে নিল বড়-মাঝারি-ছোট প্রতিপক্ষ |

ব্যবসার হাল শক্ত হাতে ধরেই দুলালচন্দ্র মন দিলেন ব্র্যান্ডিং-এ | সেটা ১৯৩৭ সাল | যাতে তালমিছরি বলতে শুধুমাত্র তাঁকেই বোঝায়‚ চেষ্টার কসুর রাখলেন না তিনি | ব্যবসায় তখন ব্র্যান্ড বা ট্রেডমার্কের চল তেমন ছিল না। অথচ তাঁর ব্যবসা শুধুমাত্র তাঁরই হবে না ? ১৯৪৪-এ বের করলেন রেজিস্ট্রেশন নম্বর। আজও সেই ‘৩৯৬৫ রেজি. নম্বর’ যুক্ত থাকে দুলালচন্দ্র ভড়ের তালমিছরির লেবেলে। এখন আর ওই রেজিস্ট্রেশন নম্বরটির দরকার পড়ে না, তবু ওই নাম্বার রেখে দেওয়া হয়েছে | 

Banglalive-8

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমে চৌকো থেকে গোল হল বোতল | কাচের জায়গায় এল সাদা প্লাস্টিক | কিন্তু সবকিছুর উপরে থাকল দুলালচন্দ্র ভড়  নাম | সেইসঙ্গে তাঁর স্বাক্ষর | এই পরামর্শ দিয়েছিলেন স্বয়ং সোমনাথ চ্যাটর্জি | প্রয়াত রাজনীতিক তথা সংসদের প্রাক্তন অধ্যক্ষ একসময়ে ছিলেন ভড় পরিবারের আইনজীবী | তাঁর আইনি পরামর্শে দুলালচন্দ্র ভড়ের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহারে ব্যবসায়ে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আসে | কার্যত সমার্থক হয়ে যায় তালমিছরি ও দুলালচন্দ্র ভড়ের নাম |

Banglalive-9

কিন্তু শুধু নামে যে হয় না‚ সে কথা দক্ষ ব্যবসায়ী পরিবারের থেকে ভাল আর কে বুঝবে ! তাই গুণমানের সঙ্গে আপস করার কথা দূরতম স্বপ্নেও আসতে দেয়নি এই সংস্থা | তালগুড় তৈরিতে অনেকেই খরচ কমাতে চিনি পোড়ায় | সে পথে পা রাখার কথা ভাবতেও পারে না এই সংস্থা | বরং পাক্কা ন দিন ধরে তালমিছরির ক্রিস্টাল তৈরিতেই ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়াতেই তাদের আনন্দ | 

মূলত বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাস অবধি তালগুড় বানানো হয় | তারপর চুন দেওয়া মাটির হাঁড়িতে রাখা হয় | কারণ এর থেকেই বছরভর তৈরি হয় তালমিছরি | এই গুড় কিন্তু মসৃণ হবে না | বরং এতে থাকবে দানা | মূলত পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাছাই কিছু জায়গা থেকে আসা তাল থেকে হয় তালরস | তাতে চিনি মিশবে ও আগুনের তাপ পড়বে নিক্তি মাপা | তবে জমবে তালগুড় | যত বেশি দানা‚ তত ভাল হবে  তালমিছরি |

তালগুড় জ্বাল দিতে দিতে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নিয়ে যেতে হয়। গুড়ের এই পাক পর্বটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তার পর ফুটন্ত গুড় ঢালা হয় বড় পাত্রে। এক ধরনের বিশেষ চট দিয়ে এ বার ঢেকে দেওয়া হয় পাত্রগুলি। তারপর বন্ধ ঘরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে অন্তত ন’দিন। পাক ও মিশ্রণ ঠিকঠাক হলে পাত্রের উপরে এবং নীচের অংশে জমাট বাঁধে পুরু মিছরি। মাঝখানে থাকে মিশ্রণের জলীয় অংশ। জলীয় অংশ বিশেষ পদ্ধতিতে বের করে নিয়ে জমাট বাঁধা অংশ কাটা হয়। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণ মাসের প্রথম পর্ব, এই চার-সাড়ে চার মাস হল মিছরির মরসুম।

আরও পড়ুন:  অন্ধকারই বাঁচাবে ফোনের ব্যাটারির চার্জ

তালমিছরির কারিগরের জীবনের তাল আরও বেশি ছন্দোবদ্ধ হয়েছিল ব্যবসায়িক জীবনের গোড়াতেই | যখন ২১ বছরের দুলালচন্দ্র শুভ পরিণয়ে আবদ্ধ হয়েছিলেন ত্রয়োদশী ঊর্মিলার সঙ্গে | ঊর্মিলা নিজেও ছিলেন ব্যবসায়ী বাড়ির মেয়ে | স্বামীর হাত ধরে ব্যবসার হাল মজবুত করতে তিনি দ্বিধা করেননি | তাঁদের প্রথম পুত্রসন্তান প্রয়াত হয়েছেন বাবা-মায়ের জীবদ্দশাতেই | বর্তমানে আছেন দুই ছেলে এবং তিন মেয়ে | 

তালমিছরির স্বাদ যতই মিষ্টি হোক না কেন‚ অন্যান্য ব্যবসায়িক পরিবারের মতো এখানেও এসেছে তিক্ততা | কে হবেন বাবার ব্যবসার সরাসরি উত্তরাধিকারী‚ তা নিয়ে দুলালচন্দ্রের দুই পুত্রের মধ্যে এসেছে বিসম্বাদ | আইনি জটিলতার মধ্যেই বড় ছেলে ধনঞ্জয় ভড় সামলাচ্ছেন ব্যবসার মূল ধারা | যেখানে বজায় আছে স্রষ্টার নাম ও ব্র্যান্ডিং | এ সবের মধ্যে কখনও ‘দুলালচন্দ্রের ছবি ও সই দেখে’ কখনও শুধু ছবি দেখে’, কখনও ‘দুলালের তালমিছরি’ ইত্যাদি নানা বিজ্ঞাপন জড়ো হয়েছে চার পাশে। কিন্তু সব কিছুর কেন্দ্রে দুলালচন্দ্রের নামই।তিনি প্রয়াত হয়েছেন ২০০০ সালের ২৭ জুন | এখনও সর্দিকাশি জর্জরিত বাঙালির তাল ঠোকবার জন্য এক ও অদ্বিতীয় তাঁর তালমিছরি | এই মিছরির ছুরি হয় না | বঙ্গজীবনের সর্দিকাশি আর পেটের রোগের বারমাস্যায় এটাই মুশকিল আসান | তাই একদিন যে মিছরি নিজে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন দুলালচন্দ্র‚ তাঁর জন্মের শতবর্ষ পার করে সেই মহৌষধ আলো করে থাকে পাড়ার দোকান থেকে শপিং মল |

NO COMMENTS